মনে রাখার মত দিন-রাত-নাম আমি বারবার ভেবে দেখেছি। সবকটিতেই একটা না একটা ঘটনা জড়িয়ে আছে অথবা দুর্ঘটনা। পুরস্কারপ্রাপ্তি কিংবা প্রাণনাশ, দুরকমই হতে পারে। আমার কাছে মনে রাখার মত দিনগুলি ঘটনাবহুল। রাতগুলি অতিরঞ্জিত। নামগুলি মৃত। আর মনে রাখা-মনে পড়া-মনে করা একটি নিছক একক ক্রিয়া অথবা ক্রীড়া; প্রকারান্তরে।
স্মৃতি এক
ছোটা ব্রিস্টলে আমাদের শেয়ারড্ টেবিল ও কমন ওয়েটার নিয়ে একটি সন্ধ্যা। জমজমাট। কিন্তু কী কী মনে রাখার? কমন ওয়েটার? শেয়ারড্ টেবিল না ছোটা ব্রিস্টল? কোনোটাই নয়। কারণ ভুরি ভুরি টেবিল এবং তা অসংখ্য সন্ধ্যায় শেয়ারড্। আর ছোটা ব্রিস্টল হামেশাই। যেটা মনে রাখার বা পড়ার বা করার তা হল টেবিলের অপর তিনজন 'বোবা' এবং তাদের অর্ডার প্লেস করা ও ওয়েটারটির তা ঝটপট বুঝে নিয়ে সার্ভ করা। সঠিক। নির্ভুল অনুপাতে। আবার এর পুরোটাই ভুলে যাওয়া যায় কারণ এটা হতেই পারে যে ওই একই ওয়েটার আগেও অনেকবার ওই তিনজন বোবা ব্যক্তিকে অর্ডার সার্ভ করেছে এবং একই টেবিলে। সেদিনের সন্ধ্যায় আমিই বরং অবাঞ্ছিত এক দর্শক। বিস্মিত। এমনটাই বাস্তব আবার এমনটাই ঘোর।
স্মৃতি দুই
হোয়াইট ফিল্ড এলাকা। ব্যাঙ্গালোর। ২০০৯। পুরোনো কলেজফ্রেন্ডের ফ্ল্যাটে মদ্যপান হেতু জমায়েত। ঠিক হল এই ফ্ল্যাটে আরো অনেক পাব্লিক তাই নিরিবিলি অন্যত্র মদ্যপান। বেরিয়ে পড়লাম। একটা ব্লেন্ডারস্ এর লিটার। দুটো ফুল তন্দুরি চিকেন। কলেজ ফ্রেন্ড, তার রুমমেট ও আমি। হোয়াইট ফিল্ডের ক্রশিং। বাইকে একটা ছেলে এসে আমার কলেজফ্রেন্ডটির হাতে একটি ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে চলে গেল। এখুনি মনে পড়ল বাংলা না জানা একটি কেরালিয়ান ছেলেও আমাদের সাথে ছিল। সে রাত্রে।
প্রথমে অটো চেপে তারপর খানিক হেঁটে একটা বেশ বড় অ্যাপার্টমেন্টের নিচে এসে দাঁড়ালাম। কাভার্ড পার্কিং। সিকিউরিটি গার্ড। লিফটের সুবন্দোবস্ত। কলেজফ্রেন্ডটির এসবই পূর্ব পরিচিত। বুঝলাম। আমাদের গন্তব্য টপ ফ্লোর। প্রশস্ত ছাদের লাগোয়া ফ্ল্যাটের ভারী দরজাটা মানে ইয়েল লকটা খুলতেই দেখলাম মার্বেল ফ্লোর। পা দিতেই একটু কেমন লাগল। কেন? সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম আসবাবশূন্য একটি ড্রইংরুম। চারশো স্কোয়ার ফিট তো হবেই। স্রেফ একটা 'ডানলাপিলো'র গদি। মাঝখানে। বেশ বড়। দুটো বেডরুম। ঢুঁ মারলাম। আবার খটকা। একটিতে ডাবল বেড। অন্যটিতে ক্যাম্পখাট। কোনো স্যুটকেশ-ট্রলি চোখে পড়ল না। কাবার্ডগুলোও খালি। পোশাকশূন্য। প্রসাধনসামগ্রীশূন্য। এরপর কিচেন। একটা বিশ লিটারের মিনারেল ওয়াটার জার। টাটকা। দুটো-একটা রেকাবি। আর নানান মাপের গ্লাশ। বোঝাই যাচ্ছিল গ্লাশ ও রেকাবি প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। মাজাঘষা পরিষ্কার।
আড্ডা জমে ক্ষীর। নেশাও। আন্দাজ রাত দেড়টা। ইয়েল লক ফের খুলে গেল। আমরা ড্রইংরুমেই বসেছিলাম। মানে ডানলাপিলোতেই। চারজন ঢুকল। ফিটফাট। দুজন ছেলে ও দুজন মেয়ে। ভাবলাম গৃহকর্তা বা কর্তী সবান্ধবে এসে পড়লেন। নির্ঘাৎ আমাদের দেখে অবাক। একটা হাল্কা জড়ানো 'হেল্লো' বললাম। আমার সাথের বাকি তিনজন কিছুই বলল না। একটি ছেলে অর্থাৎ ওই চারজনের একজন একটু হাত তুলে সম্ভাষণ করে (প্রায় না করারই মত) হাসল। ওরা চারজন সেই বেডরুমটায় ঢুকে গেল যেটায় ডাবল বেড। কিছু পর ওদের হৈ-হুল্লোড়ে বুঝলাম ওরাও মজে উঠছে। ধীরে ধীরে। ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। বরাবরের মত।
সকালে (মানে বেশ বেলায়) উঠে দেখলাম কেরালিয়ান ছেলেটি আগেই উঠে চলে গেছে। বাকি দুজন উঠব উঠব করছে। আমার কলেজফ্রেন্ড ও তার রুমমেট। বেরোনোর সময় দেখলাম বেডরুমের দরজা খোলা। একটি ছেলে ও মেয়ে ঘুমোচ্ছে। খাটে। আর একজন (ছেলে) মেঝে ও খাট ঠিকমত কোনোটাতেই আশ্রয় না পেয়ে। চতুর্থ জনকে দেখতে পেলাম না।
নিচে নেমে চায়ের দোকানে আমি যুগপৎ বিস্ময় ও খোঁয়ারি কাটিয়ে কলেজফ্রেন্ডকে বললাম 'কি রে, দেখলি তো যাদের বাড়ি তারা রাতে চলে এল, কেমন অপ্রস্তুত হতে হল। ওরা কি তোর চেনা?' কলেজফ্রেন্ড বলল, মুচকি হেসে, 'সৌপ্তিকদা, কে বলল ওরা ফ্ল্যাটের মালিক?' আমি তো আরও অবাক। তারপর বলল, আরও একটু বেশি হেসে, 'ওরাও আমাদেরই মত। এ ফ্ল্যাটের কে মালিক, কেউ জানে না। দুটো চাবি হাতে হাতে ঘোরে। যেমন একটা দিয়ে আমরা ঢুকেছি তেমন অন্যটা দিয়ে ওরা। এই ফ্ল্যাটটা এরকম অনেকেই ইউজ করে।' আমি আর কথা না বাড়িয়ে চায়ে চুমুক দিলাম। আশ্চর্য! ফি হপ্তায় একত্রে তিন ইন্টু সাত মোট একুশটি ঘটনা-দুর্ঘটনা এই ফ্ল্যাটে যখন তখনই ঘটে যেতে পারে। হয়ত ঘটেও। আমাদের রাতটায় তৃতীয় ঘরটা আনইউজড্ ছিল। এই যা!
স্মৃতি তিন
মনে রাখার মত একটা দিন। নন্দন চত্বর। সকালবেলা আমি। কোনো জরুরি অ্যাপয়ন্টমেন্ট। ঢোকার মুখ থেকেই দেখেছি একটা জমায়েত। বেশ বড়। কিছু একটা চলছে। বড় ডায়াসটার ওপর কেউ কেউ। আর সামনে প্রায় শখানেক লোক। কিন্তু ঢুকতে ঢুকতেই একটা কেমন আনক্যানি ফিল্ করি। আর ঠিক সেই মুহুর্তে বুঝে যাই তার কারণ। এই শখানেক লোক নিজেদের মধ্যে কথা বলছে-হাসাহাসি-ঠাট্টা-তামাশা করছে। বড় ডায়াসের ওপর থেকেও একজন বলে চলেছে। অবিরাম। কিন্তু কোনো শব্দ নেই। স্বর নেই। আশ্চর্য নীরব এই সমাবেশ! আমি নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলাম।
আসলে ওটা ছিল ডেফ্ অ্যান্ড ডাম্ব সোসাইটির আয়োজিত কোনো একটি সেমিনার। কিছুক্ষণ বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে আমি একাডেমির দিকটায় এগিয়ে গেলাম। অস্বস্তিটা ক্রমশই বাড়ছিল। চেপে বসছিল।
প্রসঙ্গত আমার যাদের সাথে অ্যাপয়ন্টমেন্ট ছিল তারা তখনো এসে পৌঁছায়নি। আমি খানিক আগে পৌঁছে গিয়েছিলাম।
যে মৃত তাকেই একমাত্র ভোলা যায় না। অর্থাৎ জীবিত মানুষ মাত্রই মৃতকে মনে রাখবে। একতরফা। তাই চেষ্টা করে মনে করতে না হলে আমি যে সামান্য কয়েকজনের কথা মনে করতে পারি তারা প্রত্যেকেই মৃত আর অতীত পরিচয়টুকু আমার কাছে স্মরণীয়।
মনে রাখা প্রসঙ্গে সর্বশ্রেষ্ঠ ডায়লগটি শুনেছিলাম 'কাঞ্চনজঙ্গা' সিনেমায়। এই ছবির একটি দৃশ্য: ছবি বিশ্বাস ও হরিধন দার্জিলিং ম্যালে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছেন। সেখানেই ছিল এই অসামান্য ডায়লগটি। ভাইপো অরুণ মুখোপাধ্যায়কে দেখিয়ে যেই হরিধন ছবি বিশ্বাসকে বলেছেন তাকে একটু মনে রাখার কথা। প্রত্যুত্তরে ছবি বিশ্বাস (রাজকীয় গাম্ভীর্যে) বলছেন যে কেন ওকে মনে রাখব ওর বিশেষত্বটা কি... যতদূর মনে পড়ছে। ছবি বিশ্বাসের এই ডায়লগটি আমার কাছে পূর্ণত গ্রহণীয়। সত্যিই তো যাকে তাকে মনে রাখার অহেতুক দায় নিতে যাবই বা কেন? কোনো একটা বিশেষত্ব থাকলে তবেই না... তেমনই যাদের নাম স্মরণে রইল তাদের প্রত্যেকরই বিশেষত্ব যে তারা 'মৃত'। হত্যা-আত্মত্মহত্যা-দুর্ঘটনা যাই হোক না কেন। এ প্রসঙ্গে তাই আর কোনো স্মৃতি দেওয়া হল না। বিষণ্ণতা বড় গ্লানিময়।
রচনাকাল: ২০১২
মিনিবুক: এই চলছে, জানুয়ারি, ২০১৩
No comments:
Post a Comment