২রা এপ্রিল # ২০২২

মাসখানেক হল ব্যাঙ্গালোরে এসেছি। নতুন চাকরি। শিফটের কাজ। রোজ রাত সাড়ে দশটা নাগাদ অফিস ক্যাব আমায় ড্রপ করে দেয় বাড়ির সামনে। বাড়ি বলতে একটা আপার্ট্মেন্টে ভাড়ার ফ্ল্যাট। দিনকয়েক হল অফিস-অ্যাকোমডেশন ছেড়ে এখানে এসে উঠেছি। আজও যাথারীতি নামিয়ে দিয়ে গেল। লিফটের কাছে গিয়ে আবার পঙ্কজবাবুর সাথে দেখা হল। লিফট তখন নামছে।

পঙ্কজবাবুর সাথে গতকালই প্রথম দেখা হয়েছে। তখনও লিফট নিচে নামছিল। আমার বুকের কাছে আইকার্ডটা ঝুলছিল। সেটা লক্ষ্য করে মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ বাঙালি?

আমি মাথা নেড়ে হাসিমুখে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম।

লিফটে উঠে জানতে পেরেছিলাম ৫০২ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন। টপ ফ্লোরে। আমি থাকি ৪০২। নামটা তো জানিয়েছিলেনই সাথে জানিয়েছিলেন পেশা। একটা বাঙালি রেস্তরাঁ চালান পার্টনারশিপে।


যাইহোক, আজ জানলাম উনিও আমার মত একলাই থাকেন। বাঙালি একলা লোক। মনে মনে খুশিই হলাম। আড্ডা মারা যাবে মাঝে সাঝে। উইকেন্ডে। যাদিও পঙ্কজবাবু আমার চেয়ে বয়সে অনেকটাই বড়। চেহারা দেখে মনে হয় পঞ্চান্ন-ছাপান্ন হবে। আমার আটত্রিশ। 


প্রস্তাবটা লিফটে উঠে উনিই দিলেন। বললেনঃ কাল তো শনিবার, ছুটি নিশ্চয়ই। তা চলে আসুন না সন্ধে নাগাদ। ফাইনালের সেকন্ড হাফটা একসাথে দেখা যাবে। 

রাজি না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। আমি হ্যাঁ করে দিলাম।

লিফটের দরজাটা প্রায় বন্ধ হচ্ছে এমন সময় হাতের ইশারা করে জিজ্ঞেস করলেনঃ চলে তো? আমি আরও একটু বেশি খুশি হয়ে হাসিমুখে বললামঃ বিলক্ষণ। 


এটা সত্যি যে আগামিকাল কোনো ফাইনাল ম্যাচ সে ফুটবল কি ক্রিকেট যাই থেকে থাক না কেন আমি জানি না। খেলা আমি দেখিনা আর আমার টিভিও নেই। আড্ডা দেওয়া যাবে এই ভেবেই আমি খুশি হয়ে দরজা খুলে ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়লাম।


কথা মতো পরদিন সন্ধে নাগাদ ওপরে গিয়ে বেল বাজালাম পঙ্কজবাবুর ফ্ল্যাটে। দরজা খুলে হাসিমুখে ‘আসুন’ বলে ভেতরে ঢোকালেন। দেখলাম ভদ্রলোক একটু ড্রাংক। হলে সেন্টার টেবিলে একটা হাফ খাওয়া স্কচের বোতল। পাশে একটা গ্লাশে একটু তলানি পাশে আর একটা গ্লাশ আমার জন্যই হয়ত উপুড় করে রাখা। একটা ছোট রেকাবিতে বাদাম। উনি ‘বসুন বসুন” বলে উঠতেই আমি সোফায় বসে পড়লাম।  ঘরটা বেশ গুমোট লাগছে। দেখলাম জানালাটা বন্ধ। একটা ভ্যাপ্সা গন্ধও পাচ্ছিলাম। ঠিক কিসের ঠাওর করতে পারলাম না। টিভিটা চলছিল। তবে তেমন নজর করিনি। 


আপনাকে একটা দিই? পঙ্কজবাবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করলেন। 

আমি বললামঃ এখন না, পরে নেব। 

-আচ্ছা বেশ, এখন তো ম্যাচ ব্রেক আমি চট্ করে একটু শাওয়ার নিয়ে আসি। শরীরটা একটু কেমন কেমন লাগছে। যা টেনশন। বলেই উনি সামনের বাথরুমটায় ঢুকে গেলেন। ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগালেন না। শুধু ভেজিয়ে দিলেন দরজাটা। তারপর বুঝলাম শাওয়ার চালালেন। উনি বেশ হাই আছেন বুঝতে পেরে মজাই পেলাম। ফিক করে একটু হেসেই ফেললাম।


উনি বাথরুমে ঢুকে যেতে আমি এবার টিভিতে মনযোগ দিলাম। একটু পরেই বুঝলাম একি! এত পুরনো খেলা চলছে। আমি বললামঃ ও, পঙ্কজবাবু, এ তো পুরনো খেলা চলছে, মশাই!

কোনো সাড়া নেই। শুধু শাওয়ারের শব্দ। আমি ‘পঙ্কজবাবু, পঙ্কজবাবু’ বলে আরও দুবার ডকলাম। না, কোনো সাড়া নেই। সেন্সলেস হয়ে গেলেন না তো ভদ্রলোক! ভালই মাল্লু টেনেছেন। এবার আমি উঠে গিয়ে নক করলাম বাথরুমের দরজায়। তাতেও সাড়া না পেয়ে আমি ঠেলে খুলেই দিলাম দরজাটা। ভেতর তাকাতেই আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। শাওয়ারটা চলছে। কিন্তু কোথায় পঙ্কজবাবু! অথচ এই তো স্পষ্ট আমার চোখের সামনে উনি বাথরুমে ঢুকলেন! আমি খুব ভয় পেয়ে ভাঙা গলায় ‘পঙ্কজবাবুউউ’ বলে চিৎকার করে উঠলাম। ভ্যাপ্সা গন্ধটা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। অনেকদিনের বন্ধ ফ্ল্যাটে যেমন হয়।


আর ঠিক তখনই আমায় আরও অবাক আর সন্ত্রস্ত করে দিয়ে পঙ্কজবাবুর গলা ভেসে আসতে লাগল। একটু বেশি খ্যানখ্যানে আর যেন অনেকটা দূর থেকে আসছেঃ ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালে ইন্ডিয়ার ইনিংস্টা দেখে যেতে পারলাম না। খুব টেনশন হচ্ছিল, ড্রিংক করছিলাম আর হার্টটা তো ভাল ছিল না। ম্যাচ ব্রেকে শাওয়ার নিতে নিতেই হার্টফেল করে গেল। 


আমি কোনোমতে দৌড়ে ফ্ল্যাটের দরজার কাছে গিয়ে লক খুলে ফেললাম। তখনও পঙ্কজবাবুর গলা  ভেসে আসছেঃ আজই তো ম্যাচটা ছিল। আজ যে ২রা এপ্রিল...

আমি বাইরে থেকে সশব্দে দরজাটা টেনে বন্ধ করে কমন বারান্দায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম। 


Audio Story




No comments:

Post a Comment