এক
হলটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। খুব বড় নয়। এক ধারে একটা ম্যাট্রেস, তার ওপর কয়েকটা কুশন সাজিয়ে বসার ব্যবস্থা। ম্যাট্রেসের সামনে একটা সেন্টার টেবল। পাশে একটা ল্যাম্পশেড। টেবলের নিচে কতগুলো পুরনো ম্যাগাজিন। এক কোণে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার একটার ওপর আর একটা। লাগোয়া ব্যালকনি। এখন সকাল তাই বেশ আলো হলটায়।
-চলুন, বেডরুমটা দেখাই। পেছন থেকে এজেন্ট লোকটি বলল। আমি ঘুরে তাকিয়ে বললাম: চলুন। ছোট প্যাসেজটা দিয়ে এগোলাম বেডরুমের দিকে।
ঘরে ঢুকে জানলাটা খুলে দিয়ে বলল: এই ঘরটাই বড়। তারপর আমার দিকে ঘুরে বলল: আর আপনার অ্যাটাচড বাথও আছে। একটা বড় খাট। তার পাশে একটা ছোট তেপায়া। সেখানে একটা অ্যাশট্রে রাখা দেখলাম। এছাড়া আছে একটা বেশ বড় আলমারি। এক কথায় চমৎকার। আমি চট করে বাথরুমে গিয়ে বেসিনের ট্যাপটা খুলে আবার বন্ধ করলাম। কমোডের ফ্লাশটাও টেনে দিলাম একবার। ওর সামনেই চেক করে নেওয়াটা জরুরি। বাথরুম থেকে বেরোতেই জিজ্ঞেস করল: ছোট ঘরটা দেখবেন কি?
আমিঃ না, এই ঘরটাই নেব, ভাড়াটা কত?
লোকটাঃ চার হাজার, আর চার হাজার ডিপোজিট।
আমি- ঠিক আছে।
লোকটাঃ তা, আপনি কবে শিফট করবেন ভাবছেন?
আমিঃ এই শুক্রবার, তবে রাত হবে কিন্তু।
লোকটাঃ কোনো অসুবিধা নেই, চলে আসুন।
আমিঃ আচ্ছা, তাহলে ওই রাত সাড়ে নটা-দশটায় ঢুকছি।
ফ্ল্যাটের বাইরে এসে সদর দরজাটা টেনে বন্ধ করে বলল: আর একজন ফোন করেছিল। বলল দেখতে আসবে। বলে অল্প হাসল।
আমি বললাম, বাঃ ভালোই তো। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকলাম। ফ্ল্যাটটা দোতলায়। নাম্বার ২বি।
দুই
কথা মত শুক্রবার রাত দশটা নাগাদ ফ্ল্যাটে পৌঁছলাম। লিফটেই উঠলাম। সাথে ছিল একটা ট্রলি আর ল্যাপটপ ব্যাগ। দরজা খুলে হলে পা দিয়েই চমকে উঠলাম। আসলে আমি কাউকে এক্সপেক্ট করিনি কিন্তু দেখলাম ম্যাট্রেসের ওপর কুশনে হ্যালান দিয়ে একটা মেয়ে বসে আছে। অল্প মেকআপ। হাতের গ্লাসে সম্ভবত রেড ওয়াইন। পাশের ল্যাম্পটা জ্বলছে। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
-আপনি? কিছুটা বিস্মিত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম।
-ছোট ঘরটা আমার। বলে ওয়াইলে চুমুক দিল। গলায় উষ্ণতার লেশমাত্র নেই। একপ্রকার উপেক্ষাই করল বলা চলে।
-ও, আচ্ছা, গুডনাইট, শুকনো গলায় বলে আমি পা বাড়ালাম বেডরুমের দিকে।
ঘরে ঢুকে লাইট জ্বেলে প্রথমেই ট্রলি থেকে একটা টি শার্ট, শর্টস, হ্যান্ডটাওয়েল আর টয়লেট কিটটা বার করলাম। চেঞ্জ করে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলাম। টাওয়েলটা টাঙিয়ে দিলাম বেসিনের পাশের হোল্ডারে। টয়লেট কিট থেকে জিনিষগুলো বার করে জায়গা মত রেখে দিলাম। তারপর জানলার একটা পাল্লা খুলে আরাম করে একটা সিগারেট ধরালাম। সিগারেটটা হাফ শেষ হয়েছে এমন সময় কিছুটা যেন নিজের খেয়ালেই মেয়েটা একটা গান গাইতে শুরু করল। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকলাম। গলাটা বেশ ভালো তবে গানের কথাগুলো গাঢ় বিষাদের। সিগারেটটা শেষ করে ফিল্টারটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিচ্ছি তখন গান গাওয়া থেমে গেল। কয়েক লাইনই গাইল ও। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।
তিন
পরদিন সকালে উঠে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। কতগুলো জিনিষ না কিনলেই নয়। যাওয়ার সময় দেখলাম ছোট ঘরের দরজা বন্ধ। হলেও কেউ নেই। বাজার করে ফিরে দেখি সদর দরজা খোলা। এজেন্ট লোকটা এসেছে। সাথে আর একজন। করিডর ধরে আসতে আসতেই গলার আওয়াজ পাচ্ছিলাম।
আমায় দেখে হেসে বলল: এনাকে জাস্ট ফ্ল্যাটটা দেখালাম। বলে নতুন লোকটিকে দেখাল। আমি তো অবাক। ‘ইনি এখানে আছেন অলরেডি’, বলে আমায় দেখাল। ‘হ্যালো’ বলে নতুন লোকটা হাত বাড়াতেই আমি শুকনো গলায় হ্যালো বলে হ্যান্ডশেক করে নিলাম। তারপরই এজেন্ট লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, ‘আপনার সাথে একটু কথা ছিল’। ‘বেশ তো’, এনাকে ছেড়ে দিয়ে আসছি। ‘চলুন’ বলে লোকটাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
ওরা চলে যেতে আমি কিচেনে ঢুকে ব্যাগ থেকে জিনিষগুলো বার করে গুছিয়ে রাখলাম টেবলে। বেশ ঘেঁটে আছি। আশ্চর্য ব্যাপার বটে! কিচেন থেকে বেরিয়ে বারান্দার সামনেটা দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আমি একটু অন্যমনস্কই হয়ে পড়েছিলাম।
চটকা ভাঙল লোকটার প্রশ্নে: বলুন, কি বলছিলেন? ও যে ফিরে এসেছে খেয়ালই করিনি।
আমি ঘুরে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম: আপনি এনাকে ফ্ল্যাটটা দেখালেন কিন্তু একটি মেয়ে তো অলরেডি এখানে আছে। কাল রাতে ঢুকেই তো দেখা হল।
মেয়ে? মানে? এখানে মেয়ে অসবে কোথথেকে? ও আকাশ থেকে পড়ল।
তা তো জানি না কিন্তু বলল তো ছোট ঘরটায় উঠেছে। আমিও বেশ অবাক।
কই? ও ঘরে তো কেউ নেই। এখুনি তো ওনাকে ঘরটা দেখালাম। লোকটার গলায় বিস্ময় ও প্রত্যয় একই সাথে।
আশ্চর্য! আমার কেমন ঘোর লেগে গেল।
তবে কি কেউ ট্রেসপাস করল! লোকটা মাথা নিচু করে স্বগতোক্তি করল।
তারপর আমায় আশ্বস্ত করার মতো করে বলল: ট্রেসপাস করে থাকলে পার পাবে না অবশ্য। সিসিটিভি আছে। আপনি টেনশন নেবেন না। আমি সিকিউরিটির কাছে খোঁজ নিচ্ছি। এখন চলি।
আচ্ছা। আমি অন্যমনস্কভাবেই বললাম।
লোকটা বাইরে থেকে সদর দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল।
কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকার পর আমি ম্যাট্রেসটার ওপর গিয়ে বসে পড়লাম। মাথাটা কিরকম ভারি লাগছে। একটু টাইমপাস হবে, হালকা লাগবে, এই ভেবে টেবলের নিচ থেকে ম্যাগাজিনগুলো টেনে নিলাম। একটা ম্যাগাজিন বেছে নিয়ে পাতা ওল্টাতে গিয়ে হঠাৎ দেখি তার ভাঁজে একটা ফটো। ফটোটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। তারপর উঠে আমি সোজা চলে গেলাম নিচে সিকিউরিটির কাছে।
-দেখুন তো, একে কখনো দেখেছেন এখানে? ফটোটা সিকিউরিটির সামনের টেবলে রেখে জিজ্ঞেস করলাম।
-হ্যাঁ, এতো 2Bতে থাকত, ফটোটা হাতে নিয়ে দেখে বলল।
-থাকত মানে? আমি বেশ উত্তেজিত।
সিকিউরিটি একটু অবাক হয়েই বললঃ গেল বছর সুইসাইড করল না!
No comments:
Post a Comment