বুয়েনস আইরেস ব্লুজ # অক্টোবর, ২০১৬

 

না, খুব গাঢ় নয় বরং অল্পই
মনখারাপ​​
বন্দরের কাছে, ফুরনো শীতের বিকেলে
ও চলে গেল​...
যেমন এসেছিল একদিন​

পরিপাটি গুছিযে রাখা ঘরদোর​
নরম আলোর সাজগোজ​
যেন এখুনি এসে প​ড়বে
আবার কেউ

না-ভাঙা নতুন বোতল​
ঝকঝক করছে
পুরনো সুরার উজ্জ্বল​
মাজাধোয়া গেলাসেও
ভিড় করে আছে হলদেটে আলো

না, আজ কেউ অসবে না
আমী কাজ সেরে ফিরে যাব​
সাজানো ড্রয়িংরুমে
খুশি খুশি খোলতাই মেজাজে


বলেছিলাম, ফিরে যাব​
ফ্লোরিডা স্ট্রীট ধরে
গমগমে গানে বাজনায়​
মুদ্রা বিনিম​য়ের ছ​ড়া কাটা ডাকে
যুগলের চুম্বনে
পুলিশের সতর্কতায়
গোপনে মাদক বেচার চেনা ইশারায়​
কিছুটা ধোঁয়া ছেড়ে আর ক্লান্তি মিশিয়ে
মোটামুটি ভিড় ঠাসা মেট্রোয়​
তিনটে স্টেশন পেরিয়ে
হলদে অলোর এই ড্রইংরুম​
ঠিক যতটা প্র​য়োজন অমার​
ততটাই পরিপাটি

এখানে মায়াবী ফুলের মুগ্ধতায়​
অস্থির আয়নায় নয়​
বরং স্থির শার্শিতে দেখি
কতটা শিখেছি আমি
নির্লিপ্ত থাকার কৌশল​
অনন্দ​-বিষাদের মনোরম দরজায়​


ফুলের মুগ্ধতায়​
মায়াবী বলে মনে হয় তাকে
যেন ছিল খানিক অগেও
গাঢ় ও উষ্ণ​

আয়নায় পাই না
অত বেশি ধরা প​ড়ে না আর​
অসবাবপত্রে, টাঙানো ছবিতে
হলদে আবেশে, তলানি মদেতে
পরিপাটি ড্রইংরুমে

শুধু
থেকে যাওযার রেশটুকু পাই, অল্প তফাতে
গাঢ় ও উষ্ণ​


একটা অপেক্ষা থেকে অন্য অপেক্ষা
নিয়ে জেগে থাকে বন্দর -শহর​
সারারাত ধরে চলে নাচগান
ভরে ওঠে পেয়ালা রোজকার​
আর পুরনো ছাইদান

বন্দরের বাতাসে আছে ঢের বেশি
বিষাদের সুর​

নাচে-গানে-ছবিতে ও কথায়​
দেওয়ালে রাস্তায় কত অজস্র
কুশীলব​
এসবেরই অংশ আমি
তবু যেন ঠিক বেরনোর মুখেই
বৃষ্টি নেমে গেল বলে
সাজানো অসবাব ঘিরে জমে ওঠে
গাঢ় তামাকের গন্ধ​

খানিক অগেই যে ছোট জাহাজটা
বন্দর ছেড়ে চলে গেল প্রতিবেশী দেশে
তাতে ছিল কি কোনো প্রিয়মুখ
চেনা অপেক্ষা কোনো


পরের স্টেশনই নেমে যাবে
এই সকালের গানওলা
আর মিনিট খানেক​

ওর পুরনো টুপি ভরে উঠছে
কিছু খুচরো প​য়সা আর হাততালি
এভাবেই হ​য়ে যাবে রুটি-মদ​
রোজকার​

মসৃন গিটারে কথার কথা খেলে
নেমে গেল গন্তব্যহীন​
অন্য রুটের অন্য কোনো কামরায়​
ফের শিস দিতে দিতে উঠে প​ড়বে বলে


লম্বা একটা রাস্তা দিয়ে
একমাথা বৃষ্টিতে হেঁটে আসার পাশে
একটা গির্জা থাকে
থাকে একটা পার্ক​, পেট্রল পাম্প
ছিমছাম পাব, আস্ত একটা ইউনিভার্সিটি
থেমে থাকা ট্র্যাফিকে পার হ​য়ে যাওয়া
রঙিন যুবক​-যুবতীরা
আর ক্রমশ: ছোট হযে আসা একটা সিগারেট​

লম্বা একটা রাস্তা দিয়ে
একমাথা বৃষ্টিতে হেঁটে আসার মাঝে
একটা ভালোলাগা থাকে

আর থাকে নতুন করে মনে পরে যাওয়া
পুরনো কোনো ভালোবাসা


বৃষ্টি হল বলেই তো
একটু দেরি হল আজ​
জানালার বাইরে ছোট্ট
পায়রাটাও ভিজে গেল খুব

ফ্লোরিডা স্ট্রীটে দেখি
অনেকেই ছাতার দোকান খুলে বসেছে
বিক্রিবাটা নেই তেমন​
যেন গোটা শহরেরই হয়ে গেছে
ছাতা কেনা

ছাতা থাকলেও ভিজে যাচ্ছে
সবুজ জুতোজোড়া

বৃষ্টি তো ভালোবাসিই আমি
তার চেয়েও ভালোবাসি
বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া ঝকঝকে গাছপালা
গাঢ় সবুজ গন্ধটা পার্কের আশেপাশে
এক বৃষ্টির বন্দরেই এসব কথা বলেছিলাম​
যেন খুব ভালোবেসে

ছাতা থাকলেও আজ ভিজে যাচ্ছে
পুরনো ভালোবাসা


রঙিন ছাতায় সেজে গেছে রাস্তাঘাট​
কারো বা রঙিন বর্ষাতি
ক্যাফের বাইরে সাজানো চেয়ার টেবিল​
আজ ভাঁজ করে তোলা থাক​

একটা ট্যাক্সি ডেকে যেন বেরিয়ে পড়ি
জাহাজঘাটের দিকে
একা একা ছেলেমানুষের মত​
দেখি কেমন বৃষ্টি প​ড়ে
ছেড়ে যাওয়া জাহাজের ডেকে

বৃষ্টি হলেই তো দুপুর শহরে কেমন
ছেলেমানুষি এসে ধরে

খুব মনে প​ড়ে
ভাগাভাগি করা ছাতার নিচে
রঙিন হেঁটে যাওয়া
মায়াবি ক্যাফের দিকে কোনো
আর অল্প অল্প ভিজে যাওয়া
দুজনের দুপাশ​


ছুরি দিয়ে কাটতেই মাংসটা
কানে এল গমগম ব্যান্ডের বাজনা
মিছিলটা এগিয়ে অসছে এই
ঝলমল ক্যাফের দিকে
মনে প​ড়ে গেল কতদিনের
না-মেটা দাবি
রাগ-ক্ষোভ​-দাঁতে দাঁত চেপে থাকা​
ছিনিয়ে আনা রুটি
ভাগ করে নেওয়া ভালোবেসে

হ্যাঁ, মিছিল শহরে থাকি আমি
বলার নেই তেমন বিশেষ কিছু
না পাওয়ার গাঢ় বিষাদে রোজ
ম্লান হ​য়ে যায় আমাদের রাতপার্টি
মিছিল হ​য়ে যায় সমস্ত ভালোবাসা

চলো, আজ দেখা হবে এই
ব্যান্ডের বাজনায়​, চিৎকার করে
ছুঁড়ে দেওয়া স্লোগানে
দেখা হবে পায়ে-পা কাঁধে-কাঁধ
মেলানো মিছিলে

চলো, আজ ভালোবাসা হবে
বন্দরের রাস্তায়​

১০
চম​ৎকার বিকেল ছিল সেদিন
ছবিতে-হাসিতে-চুমুতে
অজস্র ভালবাসা

বেশ মনে আছে পুরনো পাড়া
বাতিল তোষক আর উপহার পাওয়া
তরোয়াল​

সবই আছে যেমন থাকে
প​ড়ে আছে পাড়া আরও
পুরনো হবে বলে
বাতিল তোষকও আজ কারো কাছে
ফুটপাথে
তরোয়াল রাখা আছে
সাজানো ড্রইংরুমে

শুধু চলে গেছে বিকেল ফুরতে ফুরতে
অজস্র ভালোবাসায়​

১১
না, খুব ঝকঝকে নয় বরং অল্পই
ফর্সা আকাশ দুদিন বৃষ্টির পর​
আমাদের বন্দরে

আজ হঠাৎ মনে পড়ল​
কেমন একটা ভয় ভ​য় ছিল​
প্রথম প্রথম একটা আনকোরা ভাব​
একদিন একবারে ক্রশ করে যাওয়া
বিশাল চওড়া রাস্তাটা প্রথম​

এখন আস্তে আস্তে অনেকটা
চিনে ফেলেছি বন্দরের রাস্তাঘাট​
কিছুটা তো সরগরই নতুন শেখা ভাষাতে
অনেকটাই তো স্বছন্দ একদিনে-প্রতিদিনে
বেশ গুছিয়ে এনেছি হলদে আলোর ড্রয়িংরুম

আস্তে আস্তে অনেকটা ভালোবেসে ফেলেছে আমায়
এই মায়াবন্দর

১২
একটা সিগারেট শেষ হতে
কতখনই বা লাগে
লা বোকা থেকে ওলিবস​
বন্দরের মুখ থেকে শহরের বাইরে
১৫২ নম্বর বাসে
কতখনই বা লাগে

এই পুরো রাস্তাটা জুড়েই তো
বাড়ি বদলে বদলে থাকা
কতদিন দেখা না হওয়া বন্ধু
কিংবা পুরনো প্রেমিকা

বন্দরের ধারে ভালোবাসা হতে
কতখনই বা লাগে

No comments:

Post a Comment