উবেরটা স্টার্ট দিতেই চিরন্তন মোবাইলটা খুলে হোয়াটস্যাপে কুহকিনীকে মেসেজ পাঠালঃ অন দ্য ওয়ে। সন্ধে তখন সাতটা। যদিও কুহকিনীই তার আসল নাম কিনা তা সে জানায়নি।
কুহকিনীর সাথে তার আলাপ টিন্ডারে। আজই প্রথম দেখা হবে। ডেস্পারেশন যে চিরন্তনের আছেই তা ওকে যারা চেনে সকলেই জানে। চিরন্তনের বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ। ছিপছিপে পেটানো চেহারা। গায়ের রঙ মাজা। বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখ। বেশ ভালই লম্বা। মাস কমিউনেকেশনে মাস্টারস করে ফ্রিল্যান্স করছে বছর দুয়েক হল।
ডেট করাটা চিরন্তনের কাছে নতুন কিছু নয় বরং একরকম তার হবিই বলা চলে। তার অভিজ্ঞতায় বুঝেছে যে কুহকিনীও বেশ ডেস্পারেট। টিন্ডারে প্রথম লাইক সেইই করেছে। তারপর টিন্ডার ছেড়ে হোয়াটস্যাপে আসতে দেরি করেনি। এই কদিনে সে যে চিরন্তনে বেশ মুগ্ধ তার আভাসও দিয়েছে। আবার আজ চিরন্তনকে সে প্রথম ডেটে ডেকেইছে তার নিজের বাড়িতে। ফলে চিরন্তন উত্তেজনায় ফুটছে সেটা বলাই বাহুল্য। মাঝরাস্তায় একটা ওষুধের দোকানে উবের থামিয়ে ও একটা মাউথফ্রেশনার আর এক প্যাকেট কন্ডোম কিনল। উবেরে উঠে একটা মাউথফ্রেশনার মুখে দিল। তার মন বলছে হাই চান্স আছে আজ রাতে।
বিজয়গড়ের কাছে একটা সরু গলির মুখে চিরন্তন উবের থেকে নামল। গলির ভেতর ঢুকে দ্বিতীয় বাড়িটায় দেওয়ালে দেখল ১/৩৩ নম্বর। উল্টোদিকের শিশুউদ্যানের আলোয় দেখল অবশ্য। বাড়ির সামনে কোনো আলো জ্বলছিল না। ছোট্ট লোহার গেটটা খুলে কথামতো তিনতলায় চলে গেল। এটা আসলে একটা স্ট্যান্ডঅ্যালোন বিল্ডিং। তিনটে তলায় তিনটে ফ্ল্যাট। সিঁড়িতে কম পাওয়ের হলুদ বাল্ব জ্বলছিল। তিনতলায় ফ্ল্যাটের দরজায় মাথায় একটা হালফ্যাশনের লন্ঠন। তার মধ্যে মোমবাতি জ্বলছে।
দরজায় বেল দিতেই অল্পক্ষণ পর দরজা খুলে গেল। হাসিমুখে কুহকিনীঃ ওয়েলকাম, এসো, বলে হাত বাড়িয়ে দিল। রেড স্পাগেত্তি-হারেমে আর খোলাচুলে কি দারুন সিডাক্টিভ লাগছে তাকে! মানে চিরন্তনের তেমনই লাগল। বয়স আন্দাজ চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হবে। ‘চিরন্তন’ বলে সে হাত বাড়িয়ে দিল।
ভেতরে ঢুকে চিরন্তন দেখল বেশ বড় লম্বা একটা হল। তার শেষ মাথায় জানালা। পর্দাগুলো টানা। দুপাশে বেডরুম-কিচেন-বাথরুম। ডানহাতে প্রথম ঘরটা ছাড়া বাকিগুলোর দরজা বন্ধ। কিচেনে অবশ্য দরজা নেই। মনে হল তিনটে বেডরুম হবে। আশ্চর্য এই যে কোনো বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে না বরং হলের পুরো লাইটিংটাই করা হয়েছে লন্ঠনবন্দী মোমবাতি দিয়ে। আর সাথে ধুনোর একটা সুগন্ধ ম-ম করছে ঘরে। চিরন্তনের মনটা চনমন করে উঠল। এমন আলোআঁধারিই তো চাই।
দরজার ডানহাতে জুতোর র্যাকের সামনে কিটোটা খুলে রেখে ও সোফার একপাশে গিয়ে বসল। অন্যপাশে কুহকিনী বসে আছে।
সামনের সেন্টার টেবিলে রাখা মাটির অ্যাশট্রে থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা তুলে নিয়ে একটা হাল্কা টান মেরে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কুহকিনী হালাকা হাস্কি এবং আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলঃ ওয়াইন চলবে? নাকি অন্য কিছু?
-না, ওয়াইনই হোক। বলল চিরন্তন।
কুহকিনী তার জন্য গ্লাশে ওয়াইন ঢালতে থাকে। চিরন্তন লক্ষ্য করল রেড ওয়াইন এবং বেশ দামি।
হলে আসবাব বলতে তেমন বিশেষ কিছু নেই। সেন্টার টেবিলের পাশে একটা বীনব্যাগ আর দেওয়ালের গায়ে একটা সরু লম্বা ক্যাবিনেট। সেন্টার টেবিল ও ক্যাবিনেটের মাথায় লন্ঠনবন্দী মোমবাতি। হ্যাঁ, বেশ কিছু মুখোশ দেওয়ালের বিভিন্ন জায়গায় টাঙানো। চিরন্তনের যেমন বুদ্ধমুর্তির শখ কুহকিনীর তেমন মুখোশের। এটা সে আগেই জেনেছিল। যেমন জেনেছিল কুহকিনী একলা থাকে। ডিভোর্সি।
অনেকক্ষণ একথা সেকথা হল। ওয়াইনের বোতলটা প্রায় শেষ। চিরন্তন বুঝতে পারছিল মুডটা আস্তে আস্তে তৈরী হচ্ছে। দুজনেরই। কাছাকাছিও এসে পড়েছে অনেকটা। কিন্তু সে এখনো ঠিক অ্যাপ্রোচ করতে পারছে না। ভাবল একবার বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসবে। অনেক্ষণ হিসু চেপে রেখেছে সে।
তলানি ওয়াইনটা শেষ করে জিজ্ঞেস করলঃ বাথরুমটা কোনটা?
কুহকিনী আঙুল দিয়ে বাথরুমের দরজাটা দেখিয়ে দিল। বাথরুমের দরজায় চিরন্তন পৌঁছতেই বললঃ বাঁদিকের সুইচটা।
সুইচটা জ্বেলে বাথরুমের দরজাটা ঠেলতেই আঁতকে উঠল সে। এ কী দেখছে সে! মার্বেলের মেঝের ওপর কুহকিনীর নিথর দেহটা পড়ে আছে। সেই একই স্পাগেত্তি-হারেম। বাঁহাতের শিরাটা ডিপ করে কাটা। রক্ত চুঁইয়ে সাদা মার্বেলের ওপর গড়িয়ে যাচ্ছে। আতঙ্কে ‘কুহকিনীইই!’ বলে একটা চিৎকার দিয়ে সোফার দিকে ঘুরতেই আরও চমকে উঠল সে। কোথায় কুহকিনী! কেউ নেই। বহুদিনের ধুলো পড়া সেন্টার টেবিলটা বিলকুল ফাঁকা। ঠিক তখনই বাথরুমের ভেতর থেকে কুহকিনীর হাস্কি-আদুরে গলাটা শোনা গেলঃ এসো। চিরন্তন ঘুরে বাথরুমে তাকাতেই সেই একই দৃশ্য।
চিরন্তনের মনে হল তার বুকের বাঁদিকে কেউ যেন শাবল দিয়ে প্রবল এক আঘাত করল। যন্ত্রনায় বুক চেপে ধরে সে বাথরুমের সামনে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
কতক্ষণ তার হিসাব নেই তবে চিরন্তন বুঝতে পারল ধুনোর সেই গন্ধটা পাচ্ছে। সে আস্তে আস্তে উঠে বসল। সামনে বাথরুমের দরজাটা বন্ধ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কুহকিনী সোফায় বসে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। হাতের ওয়াইনে গ্লাশে একটা আলতো চুমুক দিল। চিরন্তন হাসি হাসি মুখে উঠে গিয়ে সোফায় বলস। কুহকিনীর একেবারে কাছ ঘেঁষেই।
-তোমায় আর একটু ওয়াইন দিই? একটু জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল কুহকিনী।
-দাও। বলল চিরন্তন।
ওয়াইন ঢালতে গিয়ে কুহকিনী এত কাছে চলে এল যে গায়ে গা ঠেকে গেল। ওর চুলের গন্ধটা নাকে ঝাপ্টা মারল তার। অভিজ্ঞ চিরন্তন আর বেশি দেরি করল না। ওয়াইনে হাল্কা একটা চুমুক দিয়েই কুহকিনীকে কাছে টেনে নিল। ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল তার। এরপর ওরা প্রগাঢ় চুম্বনে মেতে উঠল।
ওদিকে বাথরুমের সামনে মেঝের ওপর বুকের বাঁদিকে হাত রেখে চিরন্তনের নিথর দেহটা পড়ে আছে।
No comments:
Post a Comment