স্ক্রিনে কাস্টমারের নামটা দেখেই পলাশ চমকে উঠেছিল। রূপসা। যাইহোক, একই নামে তো কতো মানুষই থাকে। যাদবপুরের কাছে একটা অ্যাপার্ট্মেন্ট। অ্যাক্সেপ্ট করে পলাশ রওনা দিল। সে উবের চালাচ্ছে আজ দুবছর হল।
অ্যাপার্ট্মেন্ট থেকে রূপসা বেরিয়ে এল। চল্লিশ ছুঁয়েছে। স্বাস্থ্য়বতী। পরিপাটি। অভিজাত্য়ের ঔজ্জ্বল্য় ছড়িয়ে আছে ত্বকে। নিচেই অপেক্ষা করছিল পলাশ। গাড়িতে বসে রূপসা প্রথম ভাল করে দেখতে পেল তাকে।
-তুই? বেশ বিস্মিত রূপসা।
-হ্যাঁ, মানে অমিও শিওর ছিলাম না যে তুইই হবি। তা কি ক্য়ানসেল করে দিবি? শান্তভাবে জিগ্গেস করল পলাশ।
-না, থাক, চল। কিছুটা অন্য়মনস্ক ভাবে রূপসা বলল।
গাড়ি ছেড়ে একটু এগিয়ে পরিবেশটা কিছুটা হাল্কা করার জন্যই পলাশ জিগ্গেস করল: তা তুই কি গোখেলে পড়াস, নাকি? ডেস্টিনেশনটা গোখেল মেমোরিয়্যাল বলেই প্রশ্নটা তার করা।
-না, মেয়ে পড়ে। আমি কমপ্লিট হাউজ ওয়াইফ। আজ প্যারেন্টস মিটিং। হাজব্যান্ড গাড়িটা নিয়ে অফিস গেছে। ওখান থেকে অসবে। আর অমি এই যাচ্ছি। এক নিঃশ্বাসে পুরোটা বলে থামল রূপসা।
-বেশ্, বেশ, হ্যাপি ফ্যামিলি তবে? আলগা একটা হাসি ধরে রেখে পলাশ বলল।
-তা বলা যায় বই কি। হেসে বলল রূপসা। তারপরেই ছুঁড়ে দিল প্রশ্নটা: তা, তুই বিয়ে করেছিস?
-না। বলে পলাশ স্পিডটা বাড়িয়ে দিল।
মিররে পলাশ দেখল রূপসা মোবাইলে ডুবে আছে। বেশ মুটিয়েছে সে তবে গ্ল্যামার যেন দশগুণ বেড়েছে।
তার চোখের সামনে বুদ্বুদের মতো ভেসে উঠতে থাকল কলেজবেলায় রূপসার সাথে কাটানো দিনরাতগুলো। সেই প্রোপজের দিনটা, তারপর করিডোর-ক্যান্টিন-ক্লাশরুম জুড়ে বলা অজস্র কথা, সবার অলক্ষ্যে আলগোছে ছুঁয়ে দেখা, ফেস্টের রাতে সেই প্রথম চুমু, অন্ধকারে মাঠের কোনে হাতে-হাত নিয়ে বসে থাকার উষ্ণতা, কোচিং কেটে মজুমদার কেবিন, ক্লাশ বাঙ্ক করে নন্দনায় ফ্লপ ছবির নুন শোগুলো, কুটীঘাটে নৌকায় চড়ে রূপসার ভয়, কৌশিকের ফ্ল্য়াটে কাটানো সেই উন্মাদনার দুপুরগুলো, এরকম অরো কতো কি...আগেকার শার্টে লেগে থাকা রূপসার সেই গন্ধটা যেন টের পেতে থাকল আবার।
একটু স্লো হয়ে পড়েছিল পলাশ। চটকা ভাঙল রূপসার কথায়ঃ এই, একটু জলদি চালা না। পলাশ আবার স্পিডটা বাড়িয়ে দিল। রূপসার মোবাইলটা বেজে উঠল। সম্ভবত ওর হাজব্যান্ড। পলাশ আন্দাজে বুঝল।
-হ্যাঁ, আমি এই তো আর দশ মিনিট।
-
-ও, তুমি পৌঁছে গেছ, বেশ।
-
রূপসা ফোনটা কেটে দিল। পলাশ স্পিডটা আরও বাড়িয়ে ফের ডুব দিল স্মৃতির অতলে। আজকের কথা! প্রায় বিশ বছর হয়ে গেল।
না, কলেজের গন্ডি পলাশ পেরোতে পারেনি। রূপসা গ্র্যাজুয়েট হয়ে যাওয়ার পরও বছরখানেক চলেছিল তাদের সম্পর্ক। রূপসার বাবা-মা কোনোদিনও পলাশকে মেনে নেননি। আর কলেজ ফেল করে তো সে কফিনে শেষ পেরেকটা মেরে দিয়েছিল। যাইহোক, অবশেষে একদিন রূপসাও তার ভুল বুঝতে পারল। ইতি টেনে দিল পলাশের সাথে সম্পর্কের। পলাশের স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনটার কথা যেদিন সে শেষবারের মতো রূপসার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। না, দেখা হয়নি। আমার মেয়ে তোমার সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না-এই বলে দড়াম করে তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন রূপসার বাবা। সত্যিই তো, ডাঃ সুবীর ঘটকের জামাই হবে নন-গ্র্যাজুয়েট, এইমলেস একটা ছেলে!
এরপর পলাশ শিলিগুড়ির একটা হোটেলে ম্যানেজারি নিয়ে চলে যায়। তার বাবার সুপারিশে পাওয়া। কলকাতা তার কাছে দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। পরে কলেজের বন্ধুদের মধ্যে যে দু-একজন যোগাযোগ রেখেছিল তাদের কাছে সে রূপসার বিয়ের খবর পায়।
গোখেলের সামনে ‘আসছি’ বলে রূপসা নেমে যেতেই গাড়িতে স্টার্ট দিল পলাশ। রূপসা কয়েক পা এগিয়েছে, এমন সময় হঠাৎ কি মনে হতেই পলাশ পিছু ডাকলঃ এই, শোন।
রূপসা ঘুরে তাকাতেই পলাশ হাসিমুখে বললঃ শুভ, জন্মদিন।
বিস্ময় আর একটা প্রচন্ড খুশিতে ভরে ওঠে রূপসার মুখ। এত মিষ্টি করে এবং বাংলায় একমাত্র পলাশই তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাত। সে চেঁচিয়ে উঠল: থ্যাংক্স, তোর মনে আছে এখনও?
পলাশ স্মিত হেসে, ‘অবশ্যই। ভাল থাকিস।’ বলেই গাড়ি ছেড়ে দিল।
No comments:
Post a Comment