অশ্বমেধ #​ ২০০৩

ধূ-ধূ নক্ষত্রলোক চারণভূমি ছড়িয়ে আছে। কক্ষপথ ধরে একে একে বৃষ্টিমন্ত্র ঘোড়ারা উঠে এল। তাদের নিষ্পলক চোখে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের সঞ্চার। আকাশের বোবা রঙ চুইয়ে পড়ছে আস্তাবলের আনাচকানাচে। একপাশে হলুদ ঘাসের বিছানায় বুড়ো সহিসের কুঁজো শরীরটা। কোমরের গোঁজ থেকে বুড়ো হ্যাঁচকা টানে এক পাঁইট রাম বার করে আনল। এরপর সহিসের গলার নলির আন্দোলন এবং আগাগোড়া বোতল শেষ হলে মুখে এক তীব্র বিকৃতি। চোখের কোণে খানিক নোনাজল।


ঘোড়ারা নিয়ন্ত্রণ মেনেছে। জকিদের ইশারায়-পেটের দু’পাশে বুটের খোঁচায় লাগামের টানে পোলো কিংবা হার্ডলগুলো অবিরাম চারপেয়ে কৌশল। ট্র্যাক-শোরগোল-হাততালি-বাজি জিতে-হেরে একঘেয়ে দৌড়। ঘোড়ারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সহিস রাত নামিয়ে আনে হাতের মুদ্রায়। দলাই-মলাই গোটা রাত। মাংসপেশীগুলো সচল হয়; রক্তপ্রবাহ কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ে শীর্ণ হাত বেয়ে। এই সময় সহিসকে বিড়বিড় করতে দেখা যায়, বিশেষত ঘোড়াদের কানে মুখ ডুবিয়ে।   


সহিসের চোখের নিচে অনেক আঁচড়। চোখের তারা সবসময় ঘোলাটে-পাংশুমুখ কিছুটা রক্তাভ। সময়-অসময় সহিস আস্তাবলের দেওয়ালে চেয়ে থাকে। রামের নেশায় তার চোখের মধ্যে চোখ তৈরী হয়। দেওয়ালে ফুটে ওঠে সুদূর নক্ষত্রলোক, চারণভূমি আর প্রস্তরযুগীয় সেইসব ঘোড়া, তাদের উদ্দাম গতি, প্রান্তরের পর প্রান্তর ডিঙিয়ে অবাধ পরিক্রমা আর সমবেত রমণ। রতিক্রিয়ার সময় আস্ফালন; চোখগুলো খুব লাল হয়ে যেত মদ্দাগুলোর আর মাদীদের তীব্র শীৎকার ভেসে আসত… এরপর ধাতুপাত। আস্তাবলের চতুর্দিকে তখন কঠিন শীত ঝরে খুব। অবশেষে এই শীত স্থিতি পায়। দৃশ্যের জন্ম- মত্যু যুগপৎ ঘটে চলে।


আড়াই ঘর চালের পদ্ধতি বিষয়ক জ্ঞান সহিসের পর্যাপ্ত তবু গরমিল মনে হয় সারিবদ্ধ নিয়মে দাঁড়িয়ে পড়া এবং ব্ল্যাঙ্কফায়ার। এক লক্ষ্যমুখী অবান্তর দৌড়। যেন ঘোড়াদের পায়ের ওপর পা গজায়! এই পায়ে কোনো সন্ধি নেই; কোনো ধমনী নেই।


এখন উলম্ব ঘুম। সহিস একলা জেগে বসে। কড়া মদ তলানি পড়ে আছে। টলমল পায়ে উঠে পড়ে। এক এক করে প্রত্যেক ঘোড়ার কানে মুখ ডুবে যায়। বিড়বিড় করে ওঠে সহিস। এক অবাস্তব স্মরণ প্রক্রিয়ায় একে একে অন্তর্ভুক্ত হয় রণক্ষেত্র-রণশিঙা-অসি-গোলা-বারুদ, মধ্যযুগীয় ঘোড়াদের ক্রম অভিজ্ঞতার প্রবাহ। সহিস এই প্রবাহধারা ঘুমের মধ্যে ঢেলে দেয়। গল্পের মতো বলে চলে। সহিসের গল্প রাতভোর চলে। পরদিন ভোর হয়ে এলে আবার ঘোড়ারা দানাপানি পায়। ঘোড়ারা ধীরে ধীরে প্রতিযোগী হয়ে ওঠে, এইভাবে…  


দিন ফুরিয়ে রাত নামে আঙুলের কড় বেয়ে বেয়ে। ঘোড়ারা আবার পায়ের ওপরকার পা খুলে ফেলে। আস্তাবলে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে চোখ রাখে। অলৌকিক স্তব্ধতা ফিরে আসে। চোখ নিষ্পলক হয়ে যায়। প্রাগৈতিহাসিক ঘোড়াজীবন ভিড় করে আসে স্তব্ধতায়। সহিসের অদম্য স্পৃহায় এক এক করে দৃশ্যত হয় ঘোড়াদের জীবনচর্চার পাপ-পুণ্য-স্খলন-অর্জন; এর সংশ্লেষে থেকে উঠে আসে তাদের জাতীয় ইতিহাস আর ঘোড়াদের পাকস্থলীর মধ্যে পাক দিয়ে ওঠে মহাজাগতিক এক তীব্র ক্ষুধা। সকল ইতিবৃত্ত শৃঙ্খলিত হবে জেনে জলছাপ হয়ে রয়ে যায় আস্তাবলের দেওয়ালে দেওয়ালে। 


আস্তাবল ঊর্ধ্বমুখে। দরজায় শাস্তিপ্রাপ্ত সহিস, তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে সময়ের ভগ্নাংশ মুক্তি পেতে থাকে অনর্গল…  


রচনাকাল: ২০০৩, অগ্রন্থিত

প্রতিষেধক-৩, জুলাই ২০০৩


No comments:

Post a Comment