প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি, ২০২০
প্রকাশক: বৈভাষিক প্রকাশনী
উৎসর্গ
হুয়ান আর মারিয়া
বন্ধু ও প্রেমিকা
আর্জেন্তিনার রাজধানী শহর বুয়েনস আইরেস। নির্ঘুম এক মায়ানগর।
প্রেমেতে-দারুতে-দোস্তিতে-মস্তিতে সেথায় রামধনু-রঙা সব দিনরাত।
এখানে রইল তার ছিটেফোঁটা।
প্রথম পর্ব
শহরে প্রথমবার
'অলওয়েজ লুক অ্যারাউন্ড অ্যান্ড ডোন্ট ট্রাস্ট এনিওয়ান ইন দ্য স্ট্রিট'
ওপরের সাবধানবাণীটা দোহা (কাতার) এয়ারপোর্টে একজন আমায় বলেছিল। যখন আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আর্জেন্তিনা সম্পর্কে। লোকটা ছিল আর্জেন্তাইন। আর ওর মুখটা আমার এখনও মনে আছে। শুধু নামটা ভুলে গেছি। কেন? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। ‘ইট্স বুয়েনস আইরেস, ম্যান’ বলে ও কাঁধ ঝাঁকিয়েছিল। হাত উল্টেছিল। ঠোঁট বেঁকিয়েছিল।
৩১শে অগাস্ট, ২০১৩, রাত সাড়ে নটায় (এখানকার সময়) আমি বুয়েনস আইরেস এয়ারপোর্টে নামি। আমার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে যে বুড়ো লোকটা দাঁড়িয়েছিল তাকে আমি একজন এক্সিকিউটিভই ভেবেছিলাম। পরে দেখলাম যে ড্রাইভার এবং ইংলিশ জানে না একফোঁটাও। এয়ারপোর্টের বাইরে কোম্পানির গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। অত বড়ো গাড়ি আমার নিজের রোজগারে কোনোদিন হবে- এ আশা রাখি না।
৩৮৫৮ লাস হেরাস্। কোম্পানির ইমেল মতো আমার মাসখানেকের ডেরা। দেখলাম ড্রাইভারকে আগে থেকেই ইনফর্ম করা ছিল। ঠিকানায় আমার জন্যে অপেক্ষা করার কথা ছিল ম্যাক্সিমোর, ম্যাক্সিমো ভানোনি। পৌছে দেখলাম একজন সত্যিই দাঁড়িয়ে আছে। ভাবলাম ম্যাক্সিমো হয়তো। কিন্তু না। সে ছিল কার্লোস। তরুণ যীশুর মতো। কাঁধ অব্ধি লম্বা চুল। জানলাম ম্যাক্সিমোর সহকারী এবং ইংলিশ জানে। আমার অ্যাপার্টমেন্টের সবকিছু দেখিয়ে-বুঝিয়ে দিয়ে চাবিটা রেখে ও চলে গেল। ফুল ফার্নিশড স্টুডিও। ওয়াই-ফাই আছে। সঙ্গে কফি মেকার ও একটি স্টিরিও সিস্টেম।
ভুল করেছিলাম এবং যথেষ্ট বড়ো রকম। আমি এয়ারপোর্টে (বুয়েনস আইরেস) ডলার ভাঙাইনি (অবশ্য এর পেছনে একটা কারণও ছিল। পরে কখনো ফাঁক পেলে বলছি)। অন্তত কিছু ডলার ভাঙানো উচিত ছিল। আমার লাগেজ আসতে দুদিন দেরী হয়েছিল। তাই শুকনো খাবার-দাবার কিছুই আমার সঙ্গে ছিল না। রাতে কিছু খাওয়াও হয়নি। সঙ্গে ছিল শুধু কিছু জরুরি ডকুমেন্টস্ আর তিনশো ডলার (কেবিন লাগেজে)। পরদিন সকালে (রবিবার ছিল) আমি ছোটো ছোটো ক্যাফে-দোকানগুলোতে ঘুরে চেষ্টা করলাম কেউ ডলার নেয় কিনা। কেউ নেয় না। অগত্যা দুপুরটাও উপবাস।
বিকালে ভাগ্যিস এক কলিগ এল। ওর কাছে কিছু পয়সা (আর্জেন্তাইন পেসো) ধার করে দিন দুয়েকের মতো বাজার করলাম। মদ আর সিগারেটও কিনে রাখলাম।
সোমবার, পরের পরের দিন আমার সঙ্গে ম্যাক্সিমোর দেখা হল। খোসা ছাড়ানো আলুসেদ্ধর মতো মুখ। তিন বছরের শিশুর মতো সারল্যের হাসি। কিন্তু দালাল সর্বত্রই এবং সর্বদাই দালাল।
'অলওয়েজ লুক অ্যারাউন্ড' ফলতঃ চোখকান আমি খোলাই রেখেছিলাম। প্রথম যেদিন আমি এখানকার বাসে উঠে অফিসের রাস্তায় তখনই দেখলাম ফুটফুটে একজন যুবতী। সুঠাম পিচের রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পাশে বাইকটা। পুলিশ ঘিরে রেখেছে। একজন নিচু হয়ে বোঝার চেষ্টা করছে শ্বাস চলছে কিনা। হুম, অ্যাক্সিডেন্ট ও ট্র্যাফিক জ্যাম। বিশ মিনিটের রাস্তা প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগল। মনটাও একটু কেমন হয়ে থাকল।
কিছুদিন পর। অফিস ফেরতা। একটা ছিনতাই। বিকেলের আলোতেই। ছেলেটাকে বার কয়েক দেখেছিলাম। ঘটনাটা ঘটার কিছুখন আগে। রোগা। বেঁটে। মাথায় ক্যাপ। সবসময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। আর সরু চোখে এদিক ওদিক মাপছিল। তারপর ও একদম দরজার গায়ে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল (সচরাচর কেউ দাঁড়ায় না; স্টপেজে দরজা ভেতর দিকে খোলে)। এরকমই একটা স্টপেজে একটি মেয়ে নামল। আর নামতেই চিৎকার করতে লাগল। কারণ তারই ভ্যানিটি ব্যাগটা ঝেড়ে ছেলেটা একছুটে রাস্তা টপকে উল্টোদিকে একটা গলির ভেতর। সবটাই (প্রায়) আমি জানলা দিয়ে দেখলাম। এর দু-স্টপ পরে আমি নেমে গেলাম আমার প্রথম ঠিকানায়। জমজমাট ও পশ্।
'ডোন্ট ট্রাস্ট এনিওয়ান ইন দ্য স্ট্রিট' এখনো রাস্তায় কোনো অচেনা লোককে বিশ্বাস করে দেখা হয়নি। যদিও একবার একটু রাতের দিকে একজন নিগ্রো কিশোরী আমায় দুবার পেছন থেকে ডেকেছিল। সাজপোশাকে বুঝেইছিলাম যে সে ছিল এক স্ট্রিক হুকার।
ছোটি সি মুলাকাত
সুমনকে যখন প্রথম দেখি জাস্ট পাঁচ মিনিট লেগেছিল আমাদের একে অন্যকে মাপতে। এত অল্প সময়ে এত সখ্যতা এই প্রথম। কথায়-আড্ডায়-গাজায়-নেশায়। দীর্ঘ আট বছর পর আমার এই দ্বিতীয় দফার ককটেল। মদ আর গাঁজার। আমি আর সুমন। যুগলবন্দী। ওর বাড়িতেই প্রথম সেই গাঁজা। অপূর্ব সুঘ্রাণ। নির্ভেজাল ও জমাট। মনপসন্দ। আমার বয়স যেন অন্তত দশ বছর কমে গেছিল। অনেকদিন পর মাথাটা খালি হয়ে গেছিল। একদম দূর হয়ে গেছিলাম। আর মনে পড়ছে কথার গলি থেকে গলতায় ঢুকে পড়ছিলাম। খেই হারিয়ে যাচ্ছিল বারবার। লাতিন দেশের গাঁজা এই প্রথম আমার ব্রেনে।
সুমনের সঙ্গেই একরাতে 'রাতের কড়া নাড়া'। একটা আনন্দ ছিল চূড়ান্ত আর মদে-গাঁজায় মিলে একটা ফুলটুস্ নেশা।
পুয়ের্তো মাদেরোর কাছে এক বিকেল আর একটা গোলাপের বাগান। ভরস্ত। প্রায় বিশ রকম বাহার। গোলাপি-সাদা-হলুদ-বেগুনি-রক্তলাল আরও নানান। পারফিউমড্ গার্ডেন যেন। সেই আমি আর সুমন। নেশায় ধূর। রঙে মশগুল। সঙ্গে পুরোনো বন্দর এলাকার একটা জলো জমাট হাওয়া। আঃ! এক স্বর্গীয় ধুনকি। সূর্যাস্তের পর আমরা ফিরে এসেছিলাম। প্রচুর ছবি তুলেছিলাম।
সুমন আর আমি একছুটে পার হয়ে গেছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে চওড়া রাস্তাটা একবারে একদিন। অফিসে তখন ফায়ার ড্রিল। আর এর সামান্যও কিছু আগেই আমি ওকে দেখি ফ্লোরিডা স্ট্রিটে। জমজমাট ও ব্যস্ত। ওর সঙ্গে ছিল মিগুয়েল। মেরেকেটে পাঁচফুট। নেই ঘাড়। ওরা পাশাপাশি হাঁটছিল। খানিক পর মিগুয়েল ওর হাতের জ্যাকেটটা দিল সুমনের হাতে। কয়েক পলকেই সুমন ফের ফেরত দিয়ে ওকে 'চাও' বলে ভিড়ে মিশে গেল। আমি ওর পিছু নিলাম। জ্যাকেটের ভেতরেই ছিল পুরিয়াটা আর 'চাও' মানে 'বিদায়'। হাঁটতে হাঁটতে কখন এক ফাঁকে সুমন গুঁজে দিয়েছে মিগুয়েলের হাতে কড়কড়ে দেড়শো পেসো।
সুমনের মুখেই শুনেছিলাম এরকম আরেক হাত বদল। সেদিন অন্যা রাস্তা। অনেক ফাঁকা। সুমন একাই হেঁটে চলেছিল। আর মোবাইলে কেউ ওকে বার বার ইন্সট্রাক্ট করে যাচ্ছিল ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ ও দেখে একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে উল্টো দিক থেকে) সুমন সেই প্রথম মোবাইল নির্দেশ মতো পেরে ওঠে। একটা গাঁজার পুরিয়া বদলে একশো পেসো। ও আমায় এও বলেছিল যে একটা ছোটো বাচ্চা এই সবে হাটতে শিখেছে ধরা ছিল মেয়েটার অন্য হাতে।
লা পারিশা। একটা দোকান রেকোলেতার। বুয়েনস আইরোসের সবচেয়ে জমজমাট এলাকা মানে বড়োলোক পাড়া যাকে বলে। হাঁটা দূরত্বে পৃথিবী বিখ্যাত রেকোলেতা সিমেটেরি। পারিশা মানে গ্রিল অর্থাৎ কাঠকয়লায় ঝলসানো মাংসের টুকরো। বড়ো বড়ো। চিকেন-বীফ-পর্ক সব মিলিয়ে মিশিয়ে। আজ এখানে প্রথম গেলাম। সুমনই নিয়ে গেল। দেখলাম একজন সত্তরোর্ধ বৃদ্ধা। একা দোকানটা চালান। সুমনই বলেছিল কেউ নেই তার নিজের। এক ভাই ছিল। খুন হয়ে গেছে। প্রথম দিনই আমি একইরকম একটা 'মা মা' গন্ধ পেলাম যেমন সুমন পেয়েছিল অনেক আগেই। তাই সুমন এখানে বারবার। কত আদরে মায়ায় উনি জড়িয়ে ধরলেন সুমনকে। আলাপ হতেই আমাকেও। সুমন ওনার সঙ্গে অনেক কথা বলল। সবটাই স্প্যানিশে। আমি না বুঝে চুপচাপ দেখে গেলাম ওনার এক্সপ্রেশন। উনি সুমনের হাতটা জড়িয়ে ছিলেন আগাগোড়া। ছলছল এ করছিল ওনার চোখ আর গলাও যেন ধরে এল অনেক। সুমনকে উনি একদিন নাকি বলেছিলেন যে সে তাঁর 'স্পিরিচুয়াল সান' তাই সুমন যেন কখনো পয়সার কথা না বলে। খিদের মুখে সুমন কিছু বলতে পারেনি। - ফলতঃ সুমন আসে কখনো ফুলের তোড়া, কখনো-বা চকোলেট হাতে করে। তার এই আর্জেন্তাইন ধর্মমা আর সুমনকে দেখে মনে মনে ভাবছিলাম এতটা মায়ায়-এতটা যত্নে যেন আমি কখনো না এখানে বাঁধা পড়ি। আমার বড়ো ভয় পিছুটানে...
সুমন আজ দেশে ফিরে গেল। আর যাওয়ার আগে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। হয়তো অন্য কোনো দিন, অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো ভাবে দেখা হয়ে যাবে আমার এই পার্টনারের সঙ্গে।
অফিস পার্টি
গত হপ্তায় ছিল অফিস পার্টি। শহরের বাইরে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে একটা বাগানবাড়িতে। প্রায় শখানেক লোক। একদম গ্রাম। গাছপালা, কাঁচা যারা আর ঘোড়ায়টানা গাড়ি। সব মিলিয়ে বেশ মনোরম। মাঠে ফুটবল খেলা হল। ইন্ডিয়া ভার্সেস আর্জেন্তিনা। ১৫ মিনিটে দু-গোল খেলাম। সকাল থেকেই মদ চলছে। খুব ভালো ওয়াইন। লাল ও সাদা দুই। এখানকার মেন্দোজা বেল্টের ওয়াইন। জগৎবিখ্যাত। সঙ্গে বিয়ার আর ফার্নেট। কোক আর ফার্নেট এদের এক বিখ্যাত ককটেল।
এক ফাঁকে চট করে রান্নার জায়গাটায় ঘুরে এলাম। পিওর আর্জেন্তাইন ফুড 'আসাদো'- গোরুর বিভিন্ন অংশের মাংসের টুকরো কাঠকয়লার আগুনে ঝলসানো সঙ্গে মুরগির লেগপিস। একটা আস্ত শুয়োর আগুনের চেয়ে একটু দূরে লম্বালম্বি চিরে রাখা। স্রেফ আঁচে সেদ্ধ হবে। কাছে গিয়ে দেখলাম চর্বি গলে গলে পড়ছে টপটপ করে মাটিতে। ঘামের মতো।
খাওয়া-দাওয়ার শেষে তুমুল নাচ। বলিউডের খবর এরাও রাখে-টাখে তা আমাদের ধুম-এর তালে লাতিন সুন্দরীরা পা মেলাল। সে এক মজা দেখলাম এক কোস্টারিকার মেয়ের সঙ্গে নাচছে এক নিতান্তই বঙ্গসন্তান কোথায় লাগে ইশা দেওল কি উদয় চোপড়া! এরকম বেশ কিছু ফ্রেম আমি ধরে রেখেছি সেলফোনে।
রামধনু রঙের দিনগুলো
আজ সকালে জলদিই উঠলাম। সাধারণতঃ ছুটির দিন দেরি করি উঠি একটা চূড়ান্ত হ্যাং। আদ্যও মন মেজাজ খিচড়ে আছে। নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে চলেছি গত দু মাস ধরে। মিশ্র একটা মনোভাব। খাপছাড়া অগোছালো।
গরমটা কমে এখন বেশ কিছুদিন ধরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। কাদা হয় না ঠিকই তবে অল্পেই জল জমে। এমনকি লাইনে জল জমে মেট্রোও বন্ধ যখন তখন। আমি বার কায়েক চড়েছি মেট্রো। কলকাতার থেকে ছোটো স্পীডও কম। তবে মন কাড়ার মতো এগুলো সব এবড়ো-খেবড়ো পেইন্ট কর। নানান ছবি ও লেখায় সাজানো।
এর মধ্যে দু-দুবার বাড়ি পাল্টালাম। লাস হেরাস ছেড়ে সান হোসে উঠে এসেছি কোরিয়েন্তেস অ্যাভেনিউতে। বুয়েনস আইরেসের বিখ্যাত ওবেলিস্কোটার (যার ছবি গুগুলে আছে) একদম সামনেই আমার অ্যাপার্টমেন্ট। এগারো তলায়। ওবেলিস্কোর নিচ দিয়েই চলে যাচ্ছে - পৃথিবীর সবচেয়ে চওড়া রাস্তাটা। অ্যাভেনিদা নুয়েভে দে হুলিও। অর্থাৎ এর ৯ই জুলাই অ্যাভেনিউ। আর্জেন্তিনার স্বাধীনতা দিবস। কোরিয়েন্তেসের এর ওপর বেশ কয়েকটা বড়ো বড়ো পিৎজার দোকান আর মস্ত বড়ো একটা ম্যাকডোনাল্ডস। আর দোকানগুলোর ধার ধরেই বেশ কিছু হোমলেস্ তাদের বাচ্চাকাচ্চা, প্যারাম্বুলেটর, কম্বল, মাগ, বোতল নিয়ে। সঙ্গে কিছু পাতাখোর। ঢুকতে ঢুকতেই গ্যাস আর বাথরুমের ফ্লাশটা খারাপ হল। দিন কয়েকের ভোগান্তির শেষে সারাইও হল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেই দু-দুটো প্রেক্ষাগৃহ। একটায় চলছে কাসি নর্মালেস নামে একটা নাটক। অন্যটায় জোয়ান বায়েজের পোস্টার। উনি আগামী মার্চে সফর করছেন।
টুকটাক পার্টি-ফুর্তি লেগেই আছে। আমার বাড়িতে প্রায় প্রতি উইকেন্ডেই কিছু ভারতীয় বন্ধু সহযোগে। মাঝে একদিন গেলাম কাসা বারে। কাসা মানে বাড়ি। একটা পুরনো দিনের বাড়ির দোতলা জুড়ে বার। বারের মালিক ফেসুকে ভারতীয়দের বেছে বেছে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছেন। একপ্রকার পাবলিসিটি। কিন্তু হপ্তায় এখানে দিনভিত্তিক বিভিন্ন মদে ছাড় পাওয়া যায়। মন্দ কি। সারারাত খোলা। অনেককাল বাদে আমি দুটো জে-ডি খেলাম। পকেট খসল ভালোই কিন্তু মন ভরল।
সবচেয়ে সস্তায় স্কচ পাওয়া যায় ভারতীয় রেস্তরাঁ স্বাগতে। এটা কিন্তু আমারই আবিষ্কার। অন্যরা আগে গেলেও মদ খায়নি। জলের দরে ব্ল্যাক লেবেল। নজর কাড়ে রেস্তরাঁর এক কলম্বিয়ান ওয়েট্রেস। তাকে দেখে যে কারও রাঙা বউদির কথা মনে পড়বে। স্বাগতে একটা ভালো ডিশ হল গোস্ত নবাবি। আহা!
নাইটক্লাব গুলো মূলত পালেরমো বা সান তেলমো এলাকায়। দুটোই জমজমাট ট্যুরিস্ট এলাকা। গেছি দু-একবার। সস্তা। এন্ট্রি ফির সঙ্গে এব গ্লাস বিয়ার বা মকটেল ফ্রি। অ্যাভারেজ ক্রাউড হল ১৮ থেকে ২৫। সে তুলনায় আমি একটু বয়স্কই। এখানকার নাইট ক্লাবে মেয়েদের কোনে এন্ট্রি ফি নেই। ওদের জন্য ফ্রি।
আনন্দ উৎসবে
আজ বলব একটা উৎসবের কথা। বসন্ত উৎসবের মতো না হলেও বেশ কড়া ও আমিষ। ঘুরে এলাম কার্নিভাল থেকে। লাতিন আমেরিকার কার্নিভাল নিয়ে প্রভূত কৌতূহল জড়ো হয়ে আছে সারা পৃথিবীর মানুষের মনে। এর ছবি ও ভিডিও দুইই গুগুলে দেখা যায় বটে কিন্তু চাক্ষুষ! সে এক বিচিত্র উত্তেজনা। নানা থিমে-রঙে-পোশাকে-মুখোশে সুসজ্জিত নারী ও পুরুষের শোভাযাত্রা। বাজনা ও সঙ্গীতের তালে তালে গ্যালারি থেকে হাজারও করতালি। আবালবৃদ্ধবনিতা। লাস্যময়ী সুন্দরীদের দেহভঙ্গী উত্তেজক ও উলঙ্গপ্রায়। এমনকী হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। র্যাম্পে নেমে জড়িয়ে ধরে ছবিও। আমিও তুলি। আমি আর নর্তকী, খানকয়েক সেলফি। সারারাত জেগে বসে নেশায় ধূর হয়ে খোলা আকাশের নীচে এত আলো-রঙ-সঙ্গীত আর খোলা শরীর ও করতালি মিলিয়ে কেমন এক শিহরণ চলে গেল দাঁড়া দিয়ে! খুব কমই হয়তো আছে এমন ভাগ্যবান বঙ্গসন্তান!
কার্নিভাল হয় বছরে একবার। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। প্রতি শনিবার। এনত্রে রিওস প্রদেশে। বুয়েনস আইরেস থেকে তিন ঘণ্টার রাস্তা। রেতিরো টার্মিনাস থেকে বাসে। রাস্তা চমৎকার। দুদিকে চোখ জুড়ানো সবুজ' আর থোকে থোকে কাশ ফুল। দূষণমুক্ত ঝকবাকে আকাশ। নীল। এনতে রিওস খুবই সাধারণ। বুয়েনস আইরেস তুলনায় নিতান্ত অনুন্নতই বলা চলে। লোকজনও কম তবে রাস্তাঘাট ভালোই আর কাঁচা বাড়িগুলো পাকা হচ্ছে ধীরে ধীরে। একতলার বেশি তো চোখে পড়ল না খুব একটা।
আমরা সকালের বাসে পৌঁছই। টার্মিনাস থেকে ট্যাক্সি নিয়ে যাই সোলার দেল এস্তে, একটা বিচ ক্লাব, নদীর ধার ঘেঁষে। আশি পেসো এন্ট্রি ফি। ভেতরে মজা অফুরন্ত।
প্রথমেই নদীতে স্নান করলাম। সে অনেকখন। অনেকদিন পর। বিচের ধার জুড়ে হাজার নারী-পুরুষ। সারা দেশ থেকে এসে জড়ো হয়েছে। ছেলেরা বারমুডা। মেয়েরা বিকিনি। এই বিকিনি সমারহোর তুলনায় সাম্প্রতিক বলিউডের 'বিকিনি বিপ্লব' নিতান্তই ছেলেমানুষী। এর বেশি বিবরণ অনর্থক। একটা মঞ্চ হয়েছে। দেখলাম। ওপরে একজন পুরুষ অ্যাঙ্কর সঙ্গে সাত আট জন বিকিনিসুন্দরী। তারা সাদা-কালো-তামাটে-গমরঙা সব মিলিয়ে। গানের তালে তালে পাছার নজর ও শরীর কাড়া ভঙ্গী। নীচে নারী ও পুরুষ কণ্ঠ মিলে সমস্বর শোরগোল। এই প্রথম মদে স্নান করলাম। আক্ষরিক অর্থেই। বিয়ার-ভ্যোদকা-হুইস্কি-ফার্নেট- সব মিলিয়ে। দফায় দফায় ছিটকে আসছে মদ। এতটাই উদ্বৃত্ত। আর গাঁজা আর চরস মিলে ম-ম করছে ধুনোর মতো মিষ্টি ঝিম ধরা একটা গন্ধ। তুরীয়ানন্দ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। প্রচুর ছোট বড়ো গ্যাং এসেছে। ছেলেদের। মেয়েদের। ছেলে-মেয়ে মিশিয়ে। অনেকেই অনেককে চেনে না কিন্তু অনাবিল মিলে যাচ্ছে, মিশে যাচ্ছে এ ওর শরীরে নাচের তালে তালে। তারা অকুতোভয়, নিঃসঙ্কোচ এবং ভণিতাহীন। সারা গা চটচটে হয়ে আছে মদে- বালিতে-স্প্রেতে (কৃত্রিম বৃষ্টি)। তাই নিয়ে উল্লাস আর জড়ামড়ি। একে বলে রেইন ডান্স!
মঞ্চের নিচ থেকে নারীপুরুষ সমবেত কণ্ঠে মুহুর্মুহু 'শো' 'শো' করে -শার উঠছে আর অ্যাঙ্কর নর্তকীদের পাছা বুক ভিজিয়ে দিচ্ছেন শাওয়ার দিয়ে। নিজেও ড্রামসের তালে তালে বলছেন 'শো' 'শো'। একে একে নতীকরাও খুলে দেখিয়ে দিচ্ছে স্তনের আভিজাত্য কয়েক ঝলক। কখনো-বা সম্পূর্ণ টপলেস হয়ে ব্রা কিংবা টপ তুলে ঘোরাচ্ছে শূন্যে আর নীচে ফেটে পড়ছে উল্লাস। চাপ নেই, পুরোটাই ভিডিও করা আছে। মঞ্চের একধারে একটা লেসবিয়ান কাপল্ সেক্স শো দেখাচ্ছে সেই প্রথম থেকেই। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবি দেখ। খুলে আম।
কেউ কেউ সারা গায়ে পেইন্ট করেছে। রঙিন পরচুল ও বিচিত্র মুখোশে কেউ কেউ। কিছু মেয়ের হাতে ডিল্ডো। কারো কারো গলায় লকেট যার পেন্ডেন্টা প্লাস্টিকের বাঁড়া। ছোটো সাইজের উইথ বলস্। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন গলায় বাঁশি ঝুলিয়েছে। কেউ কেউ শরীরে শরীরে মেলাতে ইচ্ছুক। আবার অনিচ্ছুকও পাওয়া গেল। যেমন একটি মেয়ের খোলা পাছায় দুই যুবক হাত রাঙিয়ে এঁকে দিল পাঞ্জার ছাপ। আর জোড়া রঙিন ছাপে মেয়েটিও খিলখিল। আবার একটি নেশায় ধূর মেয়ের খোলা পাছা অপরিচিত যুবকটি যেই তবলায় বোল তোলার মতো বাজিয়ে দিল মেয়েটি ছুট্টে এসে পা দিয়ে তার গায়ে বালি ছিটিয়ে দিল। খুব রেগে গেছে। তো বালি তো লম্বা যুবকের স্রেফ বুক অব্দিই। তালি বাজিয়ে একটা লম্পট হাসি সে হেসে উঠল। বিরক্তমুখ ঘুরিয়ে মেয়েটিও সঙ্গীদের খোঁজে...
সারাদিন ধরে রেইন ডান্স আর সারারাত জেগে কার্নিভাল দেখে পরদিন ভোর ছটার বাসে ফিরে আসি বুয়েনস আইরেস। এ দেশে এই আনন্দ উৎসবে এসে আমি যে অপূর্ব আনন্দ পেলাম তা আমি আমার গোটা শরীর ভরে নিলাম। মন কি আর শরীরের বাইরে!
লং উইকেন্ড
বুয়েনস আইরেসে ঘাঁটি না গাড়লে আমার হত না। কী? রিও ট্রিপ। রিও দে জেনেইরো, ব্রাজিল। গত মার্চের এক লং উইকেন্ডে, দিন চারেক কোপাকাবানা বিচের ধারেই আমাদের হেস্টেল। নাম কাবানাকোপা একজন আইরিশ, একজন নাইজেরিয়ান, আর আমরা চারজন বঙ্গদেশ থেকে। ছয়জনের ডর্ম। এরকম আরো অনেক ঘর। কোনোটা চারজনের, কোনোটা ছয়জনের আবার কোনোটা বা আটজনের। ছেলে-মেয়ে মিলেমিশে। কেউ নেদারল্যান্ড, কেউ পেরু, কেউবা সুইডেন, কেউ অস্ট্রেলিয়া। আমাদের হল-কিচেন-বাথরুম সব শেয়ারড্। আলাপ হল অনেকের সঙ্গেই। আড্ডাও।
একরাতে রুমমেট গবু এসে বলে গেল যে ঘরে একটা ভেনেজুয়েলার ছেলে ঢুকেছে আর বলছে আমাদের এক বং এর বেডটা নাকি তার। আমি আর সেই বং তখন এক চিলতে ছাদে ভ্যোদকা নিয়ে সঙ্গে খুব নরম একটা বৃষ্টি। এরকম ভুলচুক হয়েই থাকে। সিজন টাইম। অনেক বলে কয়ে তাকে মাঝরাতে বার করা গেল। জিনিসপত্র গুছিয়ে সে গম্ভীর মুখে অন্য ঘরে চলে গেল। আমরা আবার ভ্যোদকায়। আসলে হিউমিডিটি হিউজ তাই ভ্যোদকাই।
টিকিট কেটে ছিলাম অনেক আগেই। এমিরেটস্। হোস্টেল বুকিংও অনলাইন। রিও যাওয়ার আগে তাই প্রয়োজন ছিল শুধু হাত-খরচের জন্য কিছু ব্রাজিলিয়ান রিয়েল। অগত্যা ফ্লোরিডা স্ট্রিট, বুয়েন্স আইরেসের মুদ্রা কেনাবেচার ব্ল্যাক মার্কেট সঙ্গে অন্য ধান্দাও। এই কারণেই আমি প্রথম দিন এয়ারপোর্টে ডলার ভাঙাইনি। ফ্লোরিডা স্ট্রিটের ব্ল্যাকাররা অফিসিয়াল এট এর চেয়ে অনেকটাই বেশি দেয়। বিশেষত ডলার টু পেসো কি পায়েল। প্রসঙ্গত, এখানকার অধিকাংশ রাস্তার নামই কোনো দেশ-রাজধানী- শহর কি দেশনায়ক বা প্রখ্যাত মানুষের নামে। যেমন ভেনেজুয়েলা প্যারাগুয়ে-মেক্সিকো বা লিমা (পেরুর রাজধানী) মন্তেভিদেও (উরুগুয়ের রাজধানী) আমার ফ্লোরিডা (শহর) কিংবা লুই বোর্হেস- সবই এখানকার রাস্তাঘাট। সব রাস্তাই প্যারালাল ও পারপেন্ডিকুলার। জেফ ক্রশিংটা মনে রাখলেই চেষ্টা করলেও হারানোর ভয় নেই।
কিছু লংশট রিও থেকে
১। বুয়েনস আইরেস-এর তুলনায় সামান্য ঘিঞ্জি। একটু নোংরা হালকা ভীড়ভাট্টা। বাস ধরার তাড়া। ভিখিরি-পাতাখোর-লাথখোর প্রায় সব রাস্তাতেই। এদিক সেদিক হালকা বৃষ্টির জমা জল। মানে অনেকটা কলকাতা কাটিং।
২। দেখলাম সপ্তআশ্চর্যের এক সেই আশ্চর্য যীশু। পাহাড়ের মাথায়। অনেকবার গাড়ি পাল্টে পাল্টে পাহাড়ের মাথায় উঠতে হয়। অবশেষে দেখা মেলে। একটা অদ্ভুত ফিলিং। তাজমহল কী নায়াগ্রা দেখার মতোই। যদিও এ জামানায় নায়াগ্রা কি তাজ পাড়ার নাটুও দেখে ফেলেছে। ওমুক-তমুক সব বাবুরই কৃতি সন্তান তো এখন মার্কিন দেশে কিংবা নয়ডায়।
৩। পাও দে আজুগার বা সুগার লোফ মাউন্টেইন। এর ওপর থেকে আখখা শহরটাই দেখা যায়। রোপওয়েতে করে চড়ে এলাম। ওখানেই কিছু বাংলাদেশী ব্যুরোক্র্যাটের সঙ্গে আলাপ হল। অমায়িক ও হাসিখুশি। আর ও হ্যাঁ, ভুট্টা খেলাম। এরা পোড়াতে জানে না গরম জলে সেদ্ধ করে মশলা মারে। খারাপ লাগল না।
৪। ইপানেমা বিচের ধারে রবিবারের হাট। মেট্রো করে ঘুরে এলাম মূলত চামড়া আর কাঠের জিনিস। ব্যাগ-চটি-খেলনা-আসবাব শো-পিস। জাঙ্ক জুয়েলারি আর নানান ডিজাইনের জামাকাপড় ঘুরে ঘুরে একটা রেক্সিনের ব্যাগ, কাঠের যীশু আর খান দুয়েক টি-শার্ট কিনলাম। এইসব ছোটো ছোটো অস্থায়ী দোকানগুলোও ক্রেডিট কার্ড নেয়। আসলে একটা ক্রেডিট কার্ড পকেটে থাকলে গোটা ব্রাজিলটাই ঘুরে ফেলা যায়। এ ব্যাপারে দেখলাম আর্জেন্তিনার চেয়ে এরা অনেক এগিয়ে।
৫। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং যেটা সেটা হল আইল্যান্ড ট্রিপ। অনেকেই জানে না। স্রেফ শহর ঘুরে ফিরে যায়। রিও শহর থেকে আড়াই ঘণ্টা বাসে আংরা। ওখান থেকে বোটে করে তিনটে আইল্যান্ড। আটলান্টিকের ওপর ছ-ঘন্টা। এমনকি অতলে নেমে প্রচুর মাছ ও ফোটোশুট। বোটে পর্তুগীজ গান-নাচ। অঢেল মদ-বিকিনি সুন্দরী সঙ্গে দফায় দফায় তরমুজ ও আনারস ফালা করে কাটা। লাস্ট আইল্যান্ডটায় কমপ্লিমেন্টারি লাঞ্চ। এখানকার রান্না অনেকটা ভারতীয় টাইপ। ভাত-ব্ল্যাকবীন কারি-ফিশ আর চিকেন ফ্রাই সঙ্গে সালাড। অপূর্ব।
৬। যে কদিন ছিলাম, কোপাকাবানার ধারে পেঁদিয়ে মাল খেয়েছি। এমনকি ছিনতাই এর ভয় অগ্রাহ্য করে সারারাত। সঙ্গে অপূর্ব সব চাট। জিভে জল আসার মতো:
চিংড়ি ভাজা
সার্ডিন ভাজা
মাটন কাবাব
পিন্তোদা (একরকম মাছ) কাবাব
সঙ্গে ছিল ডাব। মিস্টি জল আর জল খাওয়ার পরে কলকাতার মতো চিড়ে দেয়। নরম বা পুরু শাঁস ভিতরে। বিচের ধারে ছোটো ছোটো সব অস্থায়ী দোকান। ভিখিরি-হিজড়ে-আর পাতাখোরের হালকা উপদ্রব আছে বটে কিন্তু পাত্তা না দিলেই হল।
চব্বিশ তারিখ রাতে বুয়েনস আইরেস ঢুকেছি। পঁচিশ তারিখ থেকে ফের অফিস। চলছে এক রকম।
মিছিল
শত সোমবার অফিস যাওয়ার পথে এই প্রথম একটা মিছিল দেখলাম কমিউনিস্টদের। শুনেছিলাম ওরা আছে। যদিও সংখ্যায় নগণ্য। ওদের জানতে চে-এর ছবি আঁকা পতাকা দেখে বুঝলাম। ছোট্টো মিছিল আর তাকেরই জামাকাপড় দেখে মনে হল খুব গরীব।
এর আগে দেখেছিলাম পেরনিস্টদের মিছিল। নুয়েভে দে হলিওতে। বিশাল মিছিল। ব্যারিকেড। যানজট। পেরনিস্টরাই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী। এই রাস্তাতেই এভিতা পেরনের বিশাল ছবি আঁকা অফিসবাড়িটা আছে।
আসলে গোটা দেশটাই ফের চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। জিনিসপত্রের দাম আর খুচরো ক্রাইম বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে আমার ইনসিকিউরিটিও। ফিরে যাবই ভাবছি। এর আগে এরকম হয়েছিল ২০০১ সালে।
যাইহোক, একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটা দিলাম উল্টোদিকে অফিসের রাস্তায়।
আজকাল
এক লাফে সিগারেটের দাম তিন পেসো বেড়ে গেল। ইনফ্লেশন পাগল করে দিচ্ছে। শুনছি আগামী মাস থেকে নাকি মাইনে বাড়বে। নতুন করে বলার মতো তেমন কিছু নেই। দরজা-জানলা যেমন খোলা রাখার তেমনি রেখেছি আমি। আলো-হাওয়া যেমন আসার তেমন আসছে। সঙ্গে কিছু ধূলোবালিও।
জমজমাট পালেরমো এলাকায় শিফ্ট করেছি। একটা থ্রি বি-এইচ-কে কিচেন-ডাইনিং-ড্রইং-বাথরুম শেয়ারড্। প্রাইভেট রুম। অন্য রুম দুটোর একটায় এক বং কলিগ আর একটায় এক মার্কিন যুবক।
মার্কিন যুবক বছর চব্বিশেক, হাসিখুশি, ভদ্র ও বিনয়ী। সানফ্রান্সিস্কে থেকে এসেছে। এখানে একটা স্কুলে স্প্যানিশ পাড়ে। মার্কিন ছেলেটিও আমার মতো বারমুডা আর হাওয়াই চপ্পল পড়ে রাস্তায় ঘোরে। আমি জিজ্ঞেস করতে বলল যে ওর দিকেও নাকি লোকে আড়চোখে তাকায় আসলে এখানে সবাই সবসময়ই জুতো কোট এসব পরে থাকে। জুতো তো মাস্ট। ইউরোপীয় কায়দা।
এখানকার মশলা ছাড়া রান্না দেখলাম এও পছন্দ করে না। মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফিরে ওকে মশলাদার রান্না শেখাই। এই যেমন ও পাস্তা সেদ্ধ করত শুধু। ওকে এখন সেদ্ধ করার পর পিয়াজ-লঙ্কা-আদা-রসুন দিয়ে হালকা তেলে ভাজতে শিখিয়েছি। হাত দিয়ে ভাত খাওয়াও শেখালাম একদিন। মাংস ভাত দিয়েছি। দেখি আগে শুধু ভাত খাচ্ছে পরে মাংস খাবে। ঝোল দিয়ে ভাত মেখে খাওয়া শেখালাম।
এত দেশের পাবলিকের সঙ্গে মাল খেয়ে একটা জিনিস বুঝেছি যে ভারতীয়দের থেকে বেশি মাল কেউই জেনারেলি টানে না। টানতে পারেও না। মাতাল হলে আলাদা কথা। যেমন হুইস্কি তো এখানে কেউ খায় না বললেই চলে। এই ছেলেটাও দেখি একদিন সবচেয়ে জালি আর সস্তা হুইস্কিটা এনেছে।
মাঝে মাঝে ওর বন্ধু-বান্ধবীরা আসে। আনার আগে ও পারমিশন নেয়। অল্প বিয়ার খেয়ে ওরা ডিনারে চলে যায়। শুক্রবার রাতে ওর প্রেমিকা আসে অনেক রাতে। তখন শুধু আমি জেগে থাকি তুরীয়ানন্দ হয়ে। ভোর ভোর মেয়েটি বেরিয়ে যায়। যদিও বাড়ির মালিক ড্যান চায় না রাতে কোনো গেস্ট থাকুক। কিন্তু প্রেম কে কবে কোথায় আটকাতে পেরেছে?
সেদিন ও এসে বলে গেল ও নাকি ওর বন্ধুদের বলেছে যে ওর সঙ্গে এক ইন্ডিয়ান ছেলে থাকে যে খুব ভালো রান্না করে। তারা শুনে নাকি বলেছে একদিন এসে একসঙ্গে রান্না করবে। এসব আমার নতুন নতুন কিছু পাওয়া।
পালেরমো থেকে রোজ মেট্রো চেপে অফিস যাচ্ছি। ফলে খরচ বেড়েছে। আগের বাড়ি দুটো ছিল অফিস থেকে হাঁটা দূরত্বে। দেদার মাল্লু টেনে যাচ্ছি। পয়সা না থাকলে বাড়িতেই আর থাকলে পাবে পাবে।
এই যেমন কিছুদিন আগে ডে বারে মাল খেলাম। এটা আমার জীবনে এক উল্লেখযোগ্য মাল খাওয়া। 'আফটার অফিস' এখানে একটা কনসেপ্ট। অফিসের পর পর মানে এই সাতটা থেকে আটটার মধ্যে নানান পাবে নানান অফার চলে। তো ঢুকে তো পড়েছি সাতটা নাগাদ কিন্তু খেতে খেতে রাত বাড়ল। বারের মালিক নিকোলাস বিদেশি দেখে খুব আড্ডায় ডুবে গেল। আর মালের পর মাল খাওয়াতে লাগল নিখরচায় সঙ্গে ওর চেনা একটি ছেলে ও দুটি মেয়ে ছিল। তারাও চলে গেল। শেষমেশ শুধু আমরা তিন কলিগ আর নিকোলাস। অনেক আগে থেকে আমার কোনো হুঁশ ছিল না। পরে শুনেছিলাম:
* ভোর চারটে নাগাদ নাকি আমরা বেরিয়েছিলাম।
* বারের সদর দরজা বন্ধ করে পিছনের রান্নাঘর দিয়ে বেরিয়েছিলাম।
* বেরোবার সময় আমি নাকি দু-দু বার মাটিতে পড়ে যাই।
* আর নিকোলাস তিনবার বমি করে রাস্তায়।
কোকেনের মজা
অনেকদিনের সখ মিটল। ইচ্ছে ছিল একা একা কোকেন নেব। আগে একবার নিয়েছিলাম বটে তবে সেদিন প্রচুর পাবলিক থাকায় তেমন মস্তি পাইনি। তো ঠিক করেছিলাম একা একদিন মালটা নিতে হবে। এক কলিগ খানিক মাল তুলেছিল এক বাংলাদেশির থেকে। তারই কিছুটা দিয়েছিল আমায়।
অফিস থেকে ফিরে স্নানটান করে ঘরে ঢুকে গেলাম। ওয়ালেট থেকে বার করলাম পুরিয়াটা। সাদা ধবধবে মালটা দেখে চনমন করে উঠল মনটা। টুক করে কিচেনে গিয়ে একটা প্লেট মাইক্রোওয়েভে একটু গরম করে নিয়ে এলাম। অল্প একটু মাল ঢেলে ডেবিট কার্ড দিয়ে সরু সরু তিনটে লাইন বানালাম প্লেটে। রোল করে নিলাম একটা কাগজ। মিহি করে মালটা গুঁড়ো করে নিয়েছিলাম কার্ড দিয়ে। বড়ো দানা থাকলে নাক থেকে ব্লিডিং হতে পারে। কাগজের নলটা ঢুকিয়ে নিলাম নাকে। ব্যাস পরপর তিনটে লাইন ফিনিশ। একটা ভালো হুইস্কি ছিল। এক পেগ মারতেই চনমন করে উঠল শরীর। আঃ আরাম। খানিক পর আরো তিনটে লাইন। আর এক পেগ হুইস্কি। ফুল চার্জড হয়ে গেলাম।
প্রায় নির্ঘুম রাত কাটিয়ে পরদিন চলে গেলাম অফিস। ক্লান্তিবোধ ছিল না কোনো। এ হল ক্লান্তিহীন কোকেনের মজা।
মেন্দোজা ট্রিপ
মেন্দোজা থেকে ঘুরে এলাম। আর্জেন্তিনা-চিলে বর্ডারে। আন্দিজ পাহাড়ের কোলের প্রখ্যাত ওয়াইন বেল্ট। বুয়েনস্ আইরেস থেকে বাসে ১৫ ঘণ্টা। অগাস্ট মাস। শীতের শেষ। দুজন কলিগ ছিল সঙ্গে। আন্দিজ বেড়াতে গিয়ে যেখানে লাঞ্চ করলাম সেখান থেকে চিলে মাত্র ১২ কিলোমিটার। ওয়াইনারি দেখলাম। দু তিন রকম ওয়াইন চেখেও দেখলাম। খাসা।
দ্বিতীয় পর্ব
তথ্যচিত্রের আইডিয়া
নভেম্বর মাস। বসন্তকাল। বুয়েনস আইরেসে আমার দ্বিতীয় বসন্ত। এক বন্ধু কাম কলিগ বা কলিগ কাম বন্ধু ফোন করে বলল যে আগামী শনিবার একটা ডান্স শো আছে। কাছেই। পালেরমো ছাড়িয়ে একটা খোলা মাঠে। বিকেলে শুরু। সন্ধেয় শেষ। জিজ্ঞেস করল যে আমি যাব কিনা। অন্য কোনো প্ল্যান ছিল না। 'হ্যাঁ' করে দিলাম। ডান্স শোয়ের থিম নাকি বলিউড।
বিকেলের খানিক আগেই পৌঁছে গেলাম। গিয়ে জানলাম যে ইন্ডিয়াম এমব্যাসি একটা ইন্ডিয়ান ফেস্ট করছে। দশ দিন ধরে। গতকাল শুরু হয়েছে আগামী রবিবার শেষ। আজকের ডান্স শো তারই অংশ। অন্য সব প্রোগ্রাম হচ্ছে এবং হবে বোর্হেস কালচারাল সেন্টারে। আরো কিছু কলিগের সঙ্গে দেখা হল। অনেক পাবলিক দেখলাম ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসাডরের সঙ্গে দাঁত কেলিয়ে সেলফি তুলছে।
ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম। মাঠের মধ্যিখানে বড়ো স্টেজ। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সব পারফর্মাররা। রঙিন ঝলমলে কস্টিউম। একধারে একটা ছোট স্টল করে দুজন (ভারতীয়) শিঙারার কাউন্টার দিয়েছে। দুটো কিনলাম।
আমি ভেবেছিলাম প্রবাসী ভারতীয়রাই বুঝি পারফর্ম করবে। কিন্তু দেখলাম পারফর্মারদের বেশির ভাগই আর্জেন্তাইন। একটা ট্র্যুপের সঙ্গে আলাপ হল। নাম চাক দে ইন্ডিয়া ব্যালেট। এসেছে সালতা থেকে। সালতা আর্জেন্তিনার উত্তরের এক প্রভিন্স। পাহাড়ের নীচে ছিমছাম সুন্দর সালতা শহর। ট্র্যুপের দুজনকে দেখে ভারতীয় মনে হতে নাম জিজ্ঞেস করলাম। বলল যে ফাবিয়ান আর নাহির। দুজনেরই পদবী সিং। সঙ্গে ওরা এটাও বলল যে ওদের বাবা-মা ভারতীয় হলেও ওদের জন্ম নাকি সালতাতেই। কথায় কথা জানলাম, আর্জেন্তিনায় শিখ ডায়াস্পোরা শতাব্দী প্রাচীন। প্রথম প্রজন্ম আসে ব্রিটিশদের সঙ্গে। আখ চাষ ও রেলওয়ে ট্র্যাক নির্মাণের জন্য তাদের নিয়ে আসা হয়। তারা আর ফিরে যায়নি। সালতা ও তার আশেপাশের প্রভিন্সে সেট্ল করে। দ্বিতীয় প্রজন্ম আসে সত্তরের দশকে। বিদেশে ভালো জীবিকা ও জীবনের খোঁজেই আসে তারা। এরাও আর ফিরে যায়নি। তো ফাবিয়ান-নাহিররা হল এদেরই বংশধর। আজকের শিখ-আর্জেন্তাইন।
ডান্স দেখে বুঝলাম এরা প্রত্যেকেই বেশ প্রফেশনাল। সবশুদ্ধু সাত-আটটা ট্র্যুপ ছিল। সালতা থেকে আরো একটা ট্র্যুপ ছিল। বাকি বুয়েনস আইরেসের। এদের মধ্যে পিলি রুবির ট্র্যুপ দুর্দান্ত। পিলির সঙ্গে ডুয়েটে ছিল এক ভারতীয় ছেলে। নাম অবিনাশ। দারুণ নাচে ছেলেটা। প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে ভিড় করেছিল প্রচুর আর্জেন্তাইন পাবলিকও। তাদের হাততালির বহর আর ছবি তোলার ধুমে বুঝলাম বলিউড ঘিরে এদের প্রবল উদ্দীপনা। সন্ধের কিছু পর শেষ হল প্রোগ্রাম। কলিগরা বলল - কাসা বারে গিয়ে মাল খাওয়া যাক। মন্দ কি। ডগমগ হয়ে চললাম। যাওয়ার পথে একজন বলল যে সালতার ট্র্যুপ দুটোও নাকি আসছে কাসা বারে। আমি তো দ্বিগুণ উৎসাহে পা বাড়ালাম।
কাসা বারে ধুমা পার্টি হল। তিন-চারটে টেবিল জড়ো করে বসেছিলাম আমরা সব। খানাপিনার পাশাপাশি বলিউড গান চালিয়ে চলল নাচানাচি। পার্টি শেষ হল রাত তিনটে নাগাদ।
জব্বর একটা নেশা নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে হঠাৎ করে একটা আইডিয়া এসে গেল মাথায়। আর্জেন্তিনায় ইন্ডিয়ান ডান্স ও ডায়াস্পোরা নিয়ে একটা ডকু বানালে কেমন হয়।
হুয়ানের ক্যামেরা
তথ্যচিত্রের আইডিয়াটা আসার পরই যেটা ভাবলাম সেটা হল আইডিয়া তো এল কিন্তু শ্যুট করব কীভাবে? মানে, ক্যামেরাটা করবে কে? ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল হুয়ানের কথা। হুয়ান আমার সিনিয়র কলিগ। বয়সে আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড়ো। দোহরা চেহারার সঙ্গে মানানসই পনিটেল। অফিস ইভেন্টে ওকে ফটো তুলতে দেখেছি। একটা ডি.এস.এল.আর ক্যামেরা আছে ওর। প্রায়ই অফিসে নিয়ে আসে সেটা। আলাপ হওয়ার পরপরই বলেছিল ফটোগ্রাফিই ওর প্যাশন। পড়াশুনাও ফটোগ্রাফি নিয়ে।
সোমবার লাঞ্চের পর গেলাম হুয়ানের ডেস্কে। ও ভেবেছিল আমি বুঝি কাজ সংক্রান্ত কোনো জরুরি দরকারে এসেছি। বললাম যে না অন একটা বিষয়ে কথা আছে। ওর কিছুটা সময় আছে কিনা। ও ফাঁকাই ছিল। আমরা একটা কফি ব্রেকে গেলাম। প্যান্ট্রিতে বসে ওকে ডিটেইলে বললাম আইডিয়াটা। ও দেখলাম খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠল। বলল যে ও ওর গার্লফ্রেন্ড আর তার বন্ধুরা মিলে নাকি একটা শর্ট ফিল্ম বানিয়েছে অলরেডি। ওর দুটো টাংস্টেন আলো আর ল্যাপেলও আছে একটা। ভিডিওগ্রাফিতে ওর দারুণ ইন্টারেস্ট। আমি চাইলে ও ওদেরকে নিয়ে আসতে পারে আমার বাড়ি। বিষয়টা নিয়ে আলাপ আলোচনা করা যাবে। মনে মনে ভাবলাম এতো মেঘ না চাইতেই জল। প্রবল উৎসাহ দেখিয়ে বলে দিলাম যে উইকেন্ডে চলে আসতে। হুয়ান বলল ওর গার্লফেন্ডের সঙ্গে চেক করে আগামিকাল কনফার্ম করবে।
পরদিন হুয়ান জানাল যে আগামী শনিবার বিকেলে ওরা আসছে। এমব্যাসিতে মেইল করে আর ইন্টারনেট ঘেঁটে আমি এমন বেশ কিছু আর্জেন্তাইনকে পেলাম যারা দীর্ঘদিন ইন্ডিয়ান লিটারেচার, মিউজিক ও ডান্স নিয়ে কাজ করছেন। ঠিক করলাম ডান্স আর ডায়াস্পারের পাশাপাশি লিটারেচার আর মিউজিকও রাখব ডকুতে। গোটা সপ্তাহ ধরে এইসব ভেবে ও করে একটা রাফ ড্রাফ্ট বানিয়ে হুয়ানকে শেয়ার করে রাখলাম। শনিবারে কাজে লাগবে।
কথা মতো শনিবার ওরা এল। তিনজন। হুয়ান, ওর গার্লফ্রেন্ড এলিজাবেথ আর তার বান্ধবী মারিয়া। মারিয়াকে দেখে মনে হল বয়সে আমাদের চেয়ে ছোটোই হবে বেশ কিছুটা। ওরা প্রত্যেকেই খুব ভালো ইংলিশ বলে। না হলে আমার বেশ চাপ হত। আমি স্প্যানিশে এখনো তত সড়গড় নই। পুরো আইডিয়াটা শুনে প্রত্যেকেই বেশ অ্যাপ্রিশিয়েট করল। ঠিক হল এলিজাবেথ আর মারিয়া প্রোডাকশনটা দেখবে। ওদেরই কোনো বন্ধু করবে সাউন্ড। স্ক্রিপ্ট নিয়ে কখনো সখনো কনসাল্ট করে নেব এলিজাবেথের সঙ্গে। আমি ওদের আমার কলকাতায় বানানো ডকুটা দেখালাম। সিনেমাটা-দেখে ওদের বেশ ভালোই লাগল বলে মনে হল।
হুয়ান ওর ক্যামেরাটা নিয়ে এসেছিল। বেশ কয়েকটা গ্রুপ ফটো তুলল। কয়েকটায় আমরা তিনজন, আর কয়েকটায় টাইমার সেট করে আমরা চারজনেই। হুয়ান হেসে বলল, প্রথম মিটিং-এর একটা স্মৃতি রাখা দরকার। ওদেরকে পাশে পেয়ে আমি তো বেজায় খুশি। ওদেরকে বললাম সে কথা বেশ কয়েকবার। পরদিন অর্থাৎ রবিবার ছিল ইন্ডিয়ান ফেস্টিভ্যালের শেষ দিন ওদেরকে জানাতে ওরা বলল যে আমার সঙ্গে ওরাও যাবে বোর্হেস কালচারাল সেন্টারে। ভালোই হল, ওরা একটা আইডিয়া পাবে।
মারিয়ার একটা কাজ থাকায় ও আগেই চলে গিয়েছিল। একটু বিয়ার খেতে খেতে নানান বিষয়ে আড্ডা মেরে আড্ডা আটটা নাগাদ হুয়ান আর এলিজাবেথও বেরিয়ে গেল। ওদের নীচে ছেড়ে এসে মহানন্দে একটা দারুর বোতল খুলে বসলাম। উত্তেজনায় টগবগ করছিলাম।
ফেস্টিভ্যালের শেষ দিনে
পরদিন কথা মতো পৌঁছে গেলাম বোর্হেস কালচারা সেন্টার। তখন বিকেল। আমি যাওয়ার পরপরই এল হুয়ান আর এলিজাবেথ। মারিয়া একটু পরে।
অডিটোরিয়ামগুলোর বাইরে দোতলার পুরো প্যাসেজটা জুড়ে নানান সব অস্থায়ী দোকান। প্রবাসী ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সাজিয়েছে। অনেকেই সিন্ধ্রি। জামাকাপড়-হাতের কাজ-জুতো এই সবের সঙ্গে দু-একটা ফুড স্টল। হুয়ান ছবি তুলছিল। এলিজাবেথ আর মারিয়া দোকানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিল। লক্ষ্য করলাম তিনজনের চোখে-মুখেই বেশ উত্তেজনা। একটা দোকানে একজন ভারতীয় মহিলা মেহেন্দি করে দিচ্ছিল এক আর্জেন্তাইন মহিলার হাতে। তাকে ঘিরে উৎসাহী মহিলাদের ভিড়। হুয়ান বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভিডিও করল মেহেন্দি আঁকা। জুতোর দোকানে চামড়ার টিপিক্যাল একটা স্যান্ড্ল পছন্দ হল মারিয়ার। কিনতে গিয়ে দেখল ক্যাশ নেই। আমি ওকে বললাম যে নিয়ে নিতে। ক্যাশ ছিল। বলল যে বেরিয়েই নাকি ও টাকাটা তুলে আমায় দিয়ে দেবে। আমি ওকে ব্যস্ত হতে বারণ করলাম।
পিলি রুবির সঙ্গে দেখা হল। ওর একটা বাইট নিলাম ওর ডান্স স্কুল সম্পর্কে। আর বাইট নিলাম জানকী রঙ্গরাজনের। ইনি এক নামকরা ভারতনাট্যম ডান্সার। এ বছরের আমন্ত্রিত অতিথি। উনি এখানকার মানুষদের ইন্ডিয়ান ডান্স সম্পর্কে আগ্রহ দেখে অভিভূত। বললেন যে বেশ কয়েকটা ওয়ার্কশপ ও শো করেছেন এখানকার ডান্সারদের নিয়ে। উনি আবারও এখানে আসতে চান। এইসব করে সন্ধে নাগাদ বেরোলাম সেন্টার থেকে।
বেরিয়েই ওরা প্রস্তাব করল আইসক্রিম পার্লার যাওয়ার। আইসক্রিম আমার তেমন প্রিয় না হলেও আড্ডা আলোচনার লোভে রাজি হলাম। হুয়ানের গাড়িতে ওঠার আগেই একটা এটিএম থেকে মারিয়া তিনশ পেসো তুলে আমায় দিয়ে দিল। গাড়িতে আমি আর মারিয়া বসেছিলাম পেছনের সিটে। এলিজাবেথে বসেছিল সামনে হুয়ানের পাশে।
যেতে যেতে মারিয়ার সঙ্গে অল্প অল্প কথা শুরু করলাম। দারুণ মিষ্টি একটা মেয়ে। হুয়ান আর এলিজাবেথ নিজেদের মধ্যে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সঙ্গেও কথা বলছিল। মারিয়া ভারতবর্ষ সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করছিল। উত্তর দিতে দিতে পৌঁছে গেলাম।
তিনটে ফ্লেবার মিশিয়ে একটা বড়ো কাপ আইসক্রিম টপিংস্ দিয়ে নিয়ে বসলাম ওদের সঙ্গে। ফ্লেবার ও টপিংস্ অবশ্য সাজেস্ট করেছিল মারিয়া। ওর উৎসাহ দেখে আমার খুব মজা লাগছিল। ওর উৎসাহের কারণ আমি এই প্রথম আইসক্রিম খাচ্ছি ওর দেশে।
অনেকক্ষণ ধরে ভেঙে ভেঙে মারিয়া আমার পদবীটা উচ্চারণ করে হেসে উঠল। হালকা আইসক্রিম ভেজা ঠোঁটের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। ওর পদবী শুনেই বললাম: তোমার ওরিজিন তো ইতালি। তাই না? ও বেশ অবাক হয়ে হ্যাঁ বলল। আমি বললাম যে পদবী শুনে আমি মোটামুটি ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও ফ্রেঞ্চের পার্থক্য করতে পারি।
এখানে বলে রাখা দরকার আর্জেন্তিনায় ইউরোপিয়ান সেটলমেন্ট হয়েছিল বহু আগে। উনবিংশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের গোড়া পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষ এসে এখানে সেটল করে। সবচেয়ে বেশি এসেছিল ইতালিয়ান ও স্প্যানিশ। এছাড়াও জার্মান, স্লাভ ও ফ্রেঞ্চরা এসে এদেশে পাকাপাকি বসবাস শুরু করে।
আইসক্রিম খাওয়া হলে হুয়ান আমায় বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে চলে গেল মারিয়া আর এলিজাবেথকে ড্রপ করতে।
সে রাতেই মারিয়া আমায় ফ্রেন্ড বিক্যুয়েস্ট পাঠায়। অনেক রাত অবধি। জেগে বসে এক প্রবল উত্তেজনা নিয়ে চাটি করলাম ওর সঙ্গে।
মারিয়ার প্রতি মুগ্ধতা বাড়ছিল।
প্রথম ডেট
দিন তিনেক চ্যাট করার পর গত পরশু মারিয়া বলল মিট্ করতে। আমার এখন ফেসবুক ছেড়ে হোয়াটসঅ্যাপে উঠে এসেছি। শুক্রবার। হুয়ানার বলে একটু আগেই বেরোলাম অফিস থেকে। তবে মারিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি সেটা বললাম না।
কথা মতো মিট করলাম কোরিয়েন্তেস আ নুয়েভে দে ছলিওর ক্রশিং-এ ম্যাকডোনাল্ডটার সামনে। আমি যাওইয়ার কিছু পরই মারিয়া এল। শেষ বিকেলের আলোয় ওকে দেখার উত্তেজনাই ছিল আলাদা।
প্রথমে মারিয়া আমায় নিয়ে গেল একটা ক্যাফেতে। নাম এল গাতো নেগ্রো অর্থাৎ কালো বেড়াল। নীচের তলায় বসার জায়গা ও কাউন্টার ছাড়াও ছিল রকমারি মশলার একটা স্টোর। তার ভুরভুরে গন্ধ ভাসছিল ক্যাফের হাওয়ায়। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে একটা কোণের টেবিরে বসলাম আমরা। মুখোমুখি দু’পেয়ালা ফার্স্টক্লাস চা আর কুকিজ নিয়ে ডুবে গেলাম আড্ডায়। মারিয়ার ঠোঁটে মিষ্টি ইংলিশ দারুণ লাগছিল শুনতে।
কথায় কথায় জানলাম মারিয়া সোশ্যাল সায়েন্স নিয়ে পড়ে ইউনিভার্সিটি অব বুয়েনস আইরেসে। সেকেন্ড ইয়ার। আমায় বলল যে আজ ওদের ক্যাম্পাসে নাকি একটা প্রতিবাদ সভা আছে। আমি যেতে চাইলে ও আমায় নিয়ে যাবে। কীসের প্রতিবাদ জানতে চাওয়ায় বলল যে মেক্সিকোর এক কলেজ থেকে বিক্ষোভরত ছাত্র-ছাত্রীদের পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে এব তারপর থেকে তারা নিখোঁজ। লোকের অনুমান পুলিশ তাদের গুমখুন করেছে। তারই প্রতিবাদে আজকের এই সভা। মেক্সিকোর ছাত্র প্রতিনিধিরাও নাকি থাকবে। এই প্রতিবাদে তো সামিল হতেই হয়। আমার শহর কলকাতায় যাদবপুর ইউনিভাসিটিতেও হচ্ছে প্রতিবাদ। হোক কলরব আমি যেতে রাজি শুনে মারিয়া খুব খুশি হল। আড্ডায় বুঝলাম মারিয়া সমাজ ও রাজনীতি সচেতন বেশ এবং অনেকটাই আদর্শবাদী। যাইহোক, চা শেষ করে আমরা উঠে পড়লাম।
মারিয়ার ক্যাম্পাস যাওয়ার পথে এভিতা পেরনের ছবি আঁকা বিশাল বল্ডিংটা পড়ে। ওটা দেখিয়ে ও আমায় বলল যে ও ওখানেই সরকারি চাকরি করে। ওর মাও করেন সরকারি চাকরি। প্রসঙ্গত আর্জেন্তিনায় কলেজ স্টুডেন্টরা পড়ার খরচ নিজেরাই চাকরি করে তোলে। ক্লাস হয় মূলতঃ সন্ধেয়।
আমরা পৌঁছতেই মারিয়ার বন্ধুরা ওকে ঘিরে ধরল। মারিয়া আমার সঙ্গে ওদের আলাপ করিয়ে দিল। বিদেশি দেখে উত্তেজিত হয়ে তারা অনেক কথাবার্তা শুরু করে দিল। মারিয়া সামাল দিয়ে বলল যে আমি স্প্যানিশ তেমন বুঝি না। অল্প নিরাশ হল তারা। একটি মেয়ে হাতে খুঁজে বল একটা প্ল্যামফ্রেট। তাতে দেখলাম বড় করে লেখা ফ্রেন্তে ইস্কিয়েরদা। মারিয়াকে মানে জিজ্ঞেস করতে বলল লেফট্ ফ্রন্ট।
মাঝখানে একটা বড়ো ডায়াসে দাঁড়িয়ে একজন বক্তৃতা দিল। পুরোটাই স্প্যানিশে বলে তেমন বুঝলাম না। বক্তৃতা শেষ হতে শুরু হল ডাম্সের বাজনা। এখানে মিছিল কিংবা জমায়েত সবেতেই দেখেছি ড্রামস্ বাজিয়ে বিক্ষোভ জানানোর রেওয়াজ। সঙ্গে সুর করে সমবেত কণ্ঠে গান ও স্লোগান। এখানেও তার ব্যতিক্রম হল না। বাজনার তালে তালে নেচে নেচে উঠছিল জড়ো হওয়া ছাত্রছাত্রীরা। হাত তুলে মাঝে মাঝেই চিৎকার ছুঁড়ে দিচ্ছিল স্লোগান। মারিয়াও পা ও গলা মেলাল। আমি পাশ থেকে হাসিমুখে তালি মেরে ওকে উৎসাহ দিতে থাকলাম। এসব হওয়ার পর একধারের কাউন্টার থেকে একটা বিয়ার নিয়ে দুজনেই বসলাম ক্যাম্পাসের কোণে একটু নিরিবিলিতে। দুজনেই বেশ খুশি ও উত্তেজিত।
বিয়ার শেষ হওয়ার পর মারিয়া আমায় নিয়ে গেল ওদের ডিপার্টমেন্টে। আলাপ করাল ওর এক প্রফেসরের সঙ্গে। এনার বিষয় অল্টারনেটিভ মিডিয়া স্টাডিজ। ভাঙা ভাঙা ইংলিশ আর স্প্যানিশ মিশিয়ে তিনি আমায় বুঝিয়ে বললেন বিষয়টা। যা বুঝলাম তা হল আর্জেন্তিনার মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলো হয় সরকার পক্ষের নয় বিরোধী পক্ষের। তাই তাদের পরিবেশিত তথ্য পক্ষপাতদুষ্ট ও আংশিক সত্য। কখনো কখনো অসত্যও। এর বাইরে ছোট ছোট ইন্ডিপেন্ডেন্ট যেসব মিডিয়া (প্রিন্ট ও অনলাইন) অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রবল প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও মানুষের কাছে প্রকৃত তথ্য তুলে দিচ্ছে তাদের ইতিহাস, সাম্প্রতিক কার্যকলাপ ও ভবিষ্যত নিয়েই এই বিষয়। বিষয়টা মারিয়ার স্পেশাল ইন্টারেস্ট।
কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে মারিয়াকে প্রস্তাব দিলাম কাসা বার যেতে। আসলে ওর সঙ্গে আরো কিছু সময় কাটাতে ইচ্ছে করছিল। মারিয়া রাজি হল। কাসা বার যেতে যেতে বুঝলাম আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছি। বাস স্ট্যান্ডে ও আমায় দুটো টাইট হাগ দিল। বাসে উঠে আমি ওকে জানালাম যে টাকা-পয়সা বিশেষ নেই। মাসের শেষ ফলতঃ মারিয়ার একই হাল। তাই ঠিক করলাম কাসা বারে আমরা শুধু একটা বিয়ার নেব ভাগ করে খাব। চাট নেব না কিছু।
কাসা বার মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। মাসের শেষে এখানে বারে কিংবা রেস্তোরাঁয় ভিড় কম থাকে। বিয়ারটা খেতে খেতে আড্ডা মারছিলাম। ক্রমে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এসে গেল। জানলাম প্রায় আট মাস আগে মারিয়া সম্পর্ক ভেঙে গেছে। আমিও যে দীর্ঘদিন সিঙ্গল সেটাও জানালাম ওকে। একটা সিগারেট খাব বলে নীচে যাব বলতেই মারিয়া বলল যে ও-ও যাবে আমার সঙ্গে। মারিয়া সিগারেট খায় না। শুধু সঙ্গ দেওয়ার জন্যই যাবে বুঝলাম। বিয়ারটা অল্প বাকি ছিল।
নীচে গিয়ে সিগারেট খেতে খেতে ওকে একটা হাগ করলাম। বেশ দীর্ঘ হল সেই হল হাগ। মারিয়ার ঘাড়ের কাছে আমার মুখ। পারফিউমের গন্ধে মশগুল। মারিয়া দেখলাম আমায় শক্ত করে ধরেছে। আমি আর দেরি করলাম না। মারিয়াকে চুমু খেলাম। চুমুও হল হাগের মতোই দীর্ঘ তারপর পরপর বেশ কয়েকটা চুমু খেলাম আমরা। মারিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম যে ও আমার বাড়ি যাবে কিনা। মারিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি দিল সিগারেটটা হাতেই পুড়ছিল বেশিটা। শেষ টান মেরে ফিরে এলাম বাকি বিয়ারটা শেষ করব বলে।
এখানে বলে রাখা ভালো বুয়েনস আইরেসে ‘ডেট’ মানে শুধুই কফি-পকোড়া-সিনেমা দেখা নয়। প্রথম সাক্ষাতেই সঙ্গম হয় হামেশাই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঙ্গম হয় দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সাক্ষাতে। সেদিন মারিয়ার সঙ্গে ছিল আমার তৃতীয় সাক্ষাৎ। একা একা প্রথম।
বাড়ি ফেরার পথে বাসে মারিয়াকে বললাম যে আমার কাছে কন্ডোম কেনার পয়সা নেই। ও বলল যে কুড়িয়ে বাড়িয়ে ওর কাছে হয়ে যাবে। বাড়ির সামনের স্টেশনারি দোকানটা থেকে মারিয়াই কিনেছিল কন্ডোমের প্যাকেটটা। ডটেড।
বাড়ি ঢুকে আর দেরি করলাম না। অ্যাপার্টমেন্ট মেট দুজনেরই দরজা রাস্তা বন্ধ। অল্প ফোরপ্লের পর মারিয়া মুখ দিয়ে পড়িয়ে দিল কন্ডোম। তারপর প্রবল সঙ্গম। শীৎকারে আর ঠাপের শব্দে অ্যাপার্টমেন্টে কারও ঘুম ভেঙে গেল কিনা কে জানে!
পরদিন সকালে উঠে আমরা আবার সঙ্গম করলাম।
তৃতীয় পর্ব
প্রেমের উইকেন্ডগুলো
তিন মাস কেটে গেছে। উইকেন্ডগুলো কাটছে দুর্দান্ত। প্রতি উইকেন্ডেই মারিয়া চলে আসে আমার বাড়ি। শুক্রবার রাতে আসে সোমবার সকালে চলে যায় অফিস। সেখান থেকে বাড়ি। এই রঙচঙে দিনরাতের কথা খুব গুছিয়ে বলা মুশকিল। তবুও যতটা সম্ভব বলছি।
প্রথম উইকেন্ডে মারিয়া এল একটা 'আরবান টি'-এর বক্স নিয়ে। আরবান টি সব জায়গায় পাওয়া যায় না। আমার জন্য ও অর্ডার দিয়ে কালেক্ট করেছে। আমি তো দারুণ খুশি। বক্সে চারটে কৌটোর একটায় আবার ভুরভুরে গন্ধওলা দার্জিলিং।
রেস্তরাঁ এক্সপ্লোর করতে আমরা দুজনেই বেশ পছন্দ করি। আর পালেরমো জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য রেস্তরাঁ। নানান দেশের রকমারি খাবারের সম্ভার। উইকেন্ডে তাই প্রায়ই ঢুঁ মারি কোথাও না কোথাও। সেদিন যেমন গেছিলাম একটা মেক্সিকান রেস্তরাঁয়। নাম মারিয়া ফেলিক্স। খেলাম ব্রোচেতাশ দে পোশো। কাঠিতে গাঁথা চিকেন টিক্কার মতো অনেকটা। সঙ্গে আলু সেদ্ধ আর রকমারি সস দিয়ে পরিবেশন করল। ভালোই লাগল খেতে। মাঝে মাঝে মারিয়াকে নিয়ে যাই ভারতীয় রেস্তরাঁ তন্দুরে। ওখানকার শিক কাবাব ওর জিভে লেগে গেছে। বাড়িতেও চলছে রকমারি রান্না। রান্না আমার একটা শখ। আমার হাতে ভারতীয় রান্নাতেও মারিয়ার রুচি এসে গেছে। চিকেন স্ট্যু আর গরম ভাতে মুসুর ডালই ও বেশি পছন্দ করে। তার একটা বড়ো কারণ অবশ্যি এই দুই পদেই তেল মশলা কম। আর্জেন্তাইনরা একেবারেই ঝাল খেতে পারে না। মারিয়া একদিন এনেছিল হোমমেড পাস্তা। রাবিওলি। ওর পাশে দাঁড়িয়ে শিখে নিয়েছি হোয়াইট ও রেড সস বানানোর কারিকুরি। পাস্তার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া সসই হল আসল। শুধু পাস্তা সেদ্ধ করলেই তো আর হবে না।
নানান সব দোকানে নিয়ে যায় মারিয়া। টুকিটাকি জিনিস কেনে আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সঙ্গ দিই, পছন্দ অপছন্দ জানাই। এতে আমার দারুণ লাভ হচ্ছে। শহরের নানান দোকানপাট আর কোন জিনিসটা কোথায় ভালো পাওয়া যায় এসব জেনে যাচ্ছি আমি।
এর মধ্যে একদিন চায়না টাউনে গিয়ে বাসমতি চাল, ঘি আর ভারতীয় মশলা কিনে আনলাম। সেই বোর্হেস কালচারাল সেন্টার থেকে আইসক্রিম খেতে আমরা চায়না টাউনেই এসেছিলাম। পুরনো স্মৃতি সব ঝলমল করে উঠল।
প্রায়ই বিকেলে যাই কাছে আলতো পালেরমো মলে। উইন্ডো শপিংই বেশি। প্লাস খানিক ঘোরাফেরা। মলের পাশের ডেলিসিটি ক্যাফেতে বসে আড্ডা দিই খানিক। ডেলিসিটির ফ্রোজেন ইয়োগার্ট মারিয়ার খুব প্রিয়। পছন্দ মতো টপিংস দিয়ে দারুণ তার স্বাদ। একদিন আমায় নিয়ে গেছিল মলের কাছেই রাপানুই নামে একটা আইসক্রিম পার্লারে। এটা খুবই জনপ্রিয় ব্র্যান্ড শহরের। স্বাদই আলাদা।
আলতো পালেরমো মলেই আমি প্রথম কিছু গিফ্ট করি মারিয়াকে। একটা ফরাসি আতর। খুশির ঝিলিক খেলে গেছিল ওর মুখে। এবার মলের সবচেয়ে মনে রাখার মতো ঘটনাটা বলি।
প্রথম প্রথম মারিয়া বলতঃ উই আর জাস্ট ডেটিং। উই আর নট্ কাপল্। এখানে এমনই চলে কিছুদিন তা জানি। যাইহোক, ঘটনাটা ঘটল র্যাংলারের শোরুমে। একটা জিন্স মনে ধরেছে কিনব ভাবছি। মারিয়া স্টোর কিপারের সঙ্গে কথা বলছিল স্প্যানিশে আর আমার সঙ্গে ইংলিশে। হঠাৎ লোকটা আমায় বিদেশি দেখেই বোধহয় মারিয়াকে জিজ্ঞেস করলঃ এস তু আমিগো (আমার দিকে ইশারা করে)? যেটুকু সামান্য স্প্যানিশ বুঝি তাতে প্রশ্নটা বুঝতে অসুবিধা হল না। এ কি তোমার বন্ধু? মারিয়া আমায় অবাক করে দিয়ে উত্তর দিল নো, এস মি নোবিও। এর মানেও আমার অজানা নয়। না, আমার প্রেমিক। আমি দারুণ খুশিতে চোখ তুলে তাকালাম মারিয়ার দিকে। ঠোঁটে একটা মিষ্টি হাসি নিয়ে চোখটা একটু নাচাল। শোরুম থেকে বেরিয়েই একটু গভীর চুমু দিলাম ওর ঠোঁটে। সে রাতেই বিছানায় মারিয়া আমায় বলেছিল আই লাভ ইউ। সেই প্রথম।
মারিয়া বই পড়তে খুব ভালোবাসে। হারুকি মুরাকামি আর মিলান কুন্দেরার উপন্যাস হাতে ওকে আমার বাড়ি আসতে দেখেছি। ওর বাড়ি গিয়েও দেখেছি বিশ্ব সাহিত্যের কালেকশন মন্দ নয়। ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট ইংলিশের কাউন্টার থেকে ওকে একদিন তাই কিনে দিলাম অরুন্ধতী রায়ের গড অব স্মল থিংস।
একদিন আমায় নিয়ে গিয়েছিল একটা পাবে। একটা আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের লাইভ পারফর্ম্যান্স ছিল সেখানে। ওখানে আলাপ হল ওর বান্ধবী ও তার প্রেমিকের সঙ্গে। পারফর্ম্যান্স শেষ হবার পর আমরা চারজন অনেক রাত অবধি আড্ডা মারলাম অন্য এক পাবের খোলা চাতালে। জায়গাটা ছিল প্লাজা সেরানো।
ভ্যালেন্টাইনস্ ডে চলে গেল। মারিয়া আমায় উপহার দিয়েছে দারুন লেদারের এক ওয়ালেট। আমি দিয়েছি একটা সামার ব্ল্যাঙ্কেট।
এর মধ্যে আর একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল মারিয়ার পীড়াপিড়িতে ও আমার সামান্য তাগিদে আমি স্প্যানিশ কোর্সে ভর্তি হয়েছি। ইউনিভার্সিটি অব্ বুয়েনস আইরেসের ল্যাঙ্গুয়েজ ডিপার্টমেন্টে। মর্নিং ক্লাস। দিব্যি লাগছে শিখতে।
কিছুদিন হল ঘরের পুরনো ম্যাট্রেসটা ফেলে দিয়ে নতুন একটা ম্যাট্রেস কিনেছি। গুড ডিল পেলাম। আগেরটার স্প্রিং-ফ্রিং ভেঙে গেছিল। মারিয়া ভালোবেসে একটা নতুন বেড শীট কিনে এনেছে।
মাঝে মধ্যে খিটিমিটি ঝগড়াঝাঁটি যে হয়নি তা নয়। তবে একদিন দুদিনেই মিটে গেছে। সব মিলিয়ে ভালোই আছি। এই অল্প অল্প একসঙ্গে থাকা। মনেতে শরীতে একটা নতুন উদ্যম আর উদ্দীপনা।
মারিয়ার বাড়িতে প্রথমবার
এই মাস তিনেকে মারিয়ার বাড়ি গেছি বেশ কয়েকবার, তবে প্রথম দিনের স্মৃতি একেবারে আলাদা। সেদিন ছিল ৩১শে ডিসেম্বর। আমায় ডিনারে নিমন্ত্রণ করেছিল। সেটাই ছিল কোনো আর্জেন্তাইন পরিবারের সঙ্গে আমার প্রথম ডিনার। মারিয়ার সঙ্গে মেলামেশার দরুন আর খুব একটা সঙ্কোচ বোধ ছিল না।
সন্ধে নাগাদ পৌঁছে গেলাম। একটা ভালো ওয়াইন নিয়েছিলাম সঙ্গে। মারিয়ার বাড়ি লা বোকা এলাকায়। এখানেই সেই বিখ্যাত ক্লাব বোকা জুনিয়রস্ যেখানে মারাদোনা খেলতেন এককালে। জেনেছিলাম মারিয়ার বাবা সেই ক্লাবের লাইফটাইম মেম্বার।
মারিয়ার বাড়ি প্রায় একশো বছরের পুরনো। বড়ো বড়ো দুপাল্লা দেওয়া দরজা। বড়ো বড়ো জানালায় ভেতরে কাঁচের পাল্লা আর বাইরে খড়খড়ি। সিলিং অনেক উঁচুতে। লাল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো টানা বারান্দা। পুরনো দিনের ভারী কাঠের আসবাবপত্রে ঠাসা।
আলাপ হল ওর বাবা-মার সঙ্গে। বাবা ভদ্রলোক সৌম্য চেহারার। মাঝারি হাইট। মাথায় টাক। চোখে চশমা। পরনে হাফ শার্ট আর ফুল প্যান্ট। পায়ে জুতো। একেবারে ফিটফাট যাকে বলে। অমায়িক ভদ্রলোক। মা ছিলেন রান্নাঘরে। আমায় দেখে হেসে জড়িয়ে ধরলেন। খুবই আন্তরিক মহিলা। পরনে একটা ঢোলা টি-শার্ট আর লং স্কার্ট। কাঁচাপাকা মেশানো চুল। আমাকে ওনারা খাতির করে বসালেন। ভারতীয় বলেই বোধ হয় চা দিলেন। দার্জিলিং। আর আলাপ হল অতিবৃদ্ধা ড্যাশউন্ড লিলুর সঙ্গে। বয়সের কারণেই কানে ভালো শুনতে পায় না। দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ। থপথপ করে আস্তে আস্তে চলাফেরা করে। বেশির ভাগ সময় এককোণে বসেই ছিল। চোখ দুটো ভারী মায়াময়।
বৈঠকখানা কাম ডাইনিং বাদ দিয়ে বাড়িতে সবশুদ্ধ তিনটে ঘর। একটা মারিয়ার বাবা-মার ঘর। একটা মারিয়ার। আর তিন নম্বর ঘরটা হল মারিয়ার বাবার স্টাডি কাম মিউজিক রুম। এই ঘরটার কথা মারিয়া আমায় আগেই বলেছিল।
চা খাওয়া শেষ হতেই মারিয়ার বাবা সোৎসাহে নিয়ে গেলেন সেই ঘরে। ভদ্রলোক প্রায় কুড়ি বছর ধরে নানা রকম সাউন্ড সিস্টেম-স্পিকার- উফার মিলিয়ে ঝুলিয়ে তৈরি করেছেন এই রুম। আর বিশাল এক সিডি কালেকশন। আমি সাউন্ডের ব্যাপারে বিশেষ কিছুই বুঝি না তবে দেখলাম প্রায় পনেরো বিশটা স্পিকার বা উফার আছে ঘরে। ওনার সঙ্গে আমার মিউজিকের টেস্ট মিলে যেতে ভীষণ খুশি হলেন। বিটলস্-এর অ্যাবি রোড অ্যালবামটা পুরোটা আমায় শোনালেন। ওই দুর্দান্ত সাউন্ড সিস্টেমে শোনাটা একটা আলাদা অভিজ্ঞতা ছিল সেটা বলাবাহুল্য। কথাবার্তা হল ভাঙা ইংলিশ আর স্প্যানিশে। মারিয়াকে বেশির ভাগ সময়ই দোভাষীর কাজ করতে হল।
ডিনারে ছিল মস্ত আয়োজন। আর্ধেকের বেশি পদের নাম ও প্রিপারেশন আমি জানতামই না। মারিয়াই পাশ থেকে সব বলে গেল আর আমি চেখে চেখে গেলাম। খাওয়াটা বেশ বেশি হয়ে গেছিল। মারিয়ার মা দারুণ রান্না করেন বুঝলাম।
ঠিক বারোটায় ওয়াইন গ্লাস তুলে আমরা চিয়ার্স করে নববর্ষকে স্বাগত জানালাম। মারিয়ার বাবা-মা চুমু খেলেন একে অপরকে। আমাদের আলিঙ্গন করে গালে দিলেন চুমু। মারিয়া আমার ঠোঁটে দিল ওয়াইন ভেজা চুমু। বাইরে তখন বাজির শব্দ। বেশ কিছুক্ষণ আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম আকাশে বাজির আলোর খেলা। মারিয়ার বাবা আমার আর মারিয়ার একসঙ্গে কয়েকটা ছবি তুললেন। পরে সেকথা এক কলিগকে গল্প করে বলতে ঠাট্টা বলেছিল: তুমি ফেঁসে গেলে, কাকা। মেয়েকে উল্টোপাল্টা কিছু করে পালালে ওই ছবি উনি পুলিশকে দেবেন।
রাত আরো বাড়লে আমরা শুতে গেলাম। আমি মারিয়ার ঘরেই ঘুমিয়ে ছিলাম। না, সে রাতে সঙ্গম করিনি।
পরদিন সকালে উঠে ব্রেক ফাস্ট করে আমি বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। মারিয়া বাসস্টপে এসে আমায় বাসে তুলে দিয়েছিল।
আমি ভেবেছিলাম আরশোলা
কথা ছিল ভিশা গেসেল যাওয়ার। আমার আর মারিয়ার। সেইমতো হোটেল ও বাসের টিকিট বুক করা ছিল। ভিশা গেসেল বুয়েনস আইরেস থেকে বাসে চার ঘণ্টার রাস্তা। শেষ গ্রীষ্মের লং উইকেন্ডটা কাটাব বিচের ধারে ভেবে মনটা খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু হল না। কেন? সেটাই বলছি।
রওনা দেওয়ার দিন পনেরো আগে আমি মারিয়ার সঙ্গে কন্ডোম ছাড়া সঙ্গম করি। সেবারই প্রথম। ও একটু কিন্তু কিন্তু করলেও শেষে আমারই পীড়াপিড়িতে সায় দিয়েছিল। যাইহোক, সব ঠিকই ছিল তারপর। ওর ফোনটা পেলাম অফিসে। তখন দুপুর। রওনা দেওয়ার ঠিক আগের দিনই ফোনটা করল। যা বলল তা সংক্ষেপে হল এই যে পিরিয়ডের দিন পেরিয়ে গেছে তিনদিন হল। তাও পিরিয়ড হয়নি। গলা শুনেই বুঝলাম যে ও ভয় পেয়ে গেছে। আমি ওকে আশ্বস্ত করার জন্য বললাম যে কোনো চিন্তা নেই। ওদিন কিছুই হয়নি। মাঝে মাঝে তো দেরি হতেই পারে। ওর আগে কখনো দেরি হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করতে বলল যে হয়েছিল বার দুয়েক কিন্তু চারদিন দেরি এই প্রথম। আমি একটু ঘাবড়ে গেলেও প্রকাশ করলাম না। আর্জেন্তেনিয়ায় গর্ভপাত নিষিদ্ধ জানতাম। বেআইনি ক্লিনিকগুলো থেকে গর্ভপাত করার কারণে মৃত্যুও হয়েছে- এ খবরও জানা ছিল। তবে আমার মন বলছিল যে ওর কিছুই হয়নি। এমনি হয়তো এমাসে একটু দেরি হচ্ছে।
বিকেলে আবার ফোন করল আমি বোঝাতে গেলে এবার একটু ঝগড়াই হয়ে গেল। বালছাল বলে যাচ্ছিল। এদিকে আমি শিওর যে আমি কিছু করিনি। আমি ট্যুরের কথা তুলতে রেগে গেল। চিৎকার করে বলতে থাকল যে আমার লজ্জা করা উচিত ওর এই অবস্থায় আমি কী করে ট্যুরের কথা বলতে পারি। আমি চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এইসব হেনাতেনা। তারপর ফোন কেটে দিল। আমিই ফোন করে ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাতে আমার বাড়িতে আনলাম। আসলে রাগ নয় টেনশনেই শুকিয়ে ছিল মারিয়া। বাড়িতে এসেই বলল যে ও আমার বাড়িতে এসেছে বটে কিন্তু ট্যুরে যাবে না। আমি বললাম যে ঠিক আছে যেতে হবে না। আর ও সত্যিই গর্ভবতী হয়ে গেলে আমি দায়িত্ব-টায়িত্ব নেব এসবও বলে দিলাম। সে রাতেও পিরিয়ড হল না। খাওয়া-দাওয়া করে থমথমে মুখ করে মারিয়া শুয়ে পড়ল। একটু মাল খেয়ে আমিও খানিক বাদে শুয়ে পড়লাম। ভালো হয়েছিল যে আমার সেই বং কলিগ ও মার্কিন ফ্ল্যাটমেট দুজনেই দেশে ফিরে গেছিল। আমি একাই ছিলাম।
পর দিন ভোরে ছিল বাস। সকালে চা খেতে খেতে আফশোষ হল: ইস্! এমন চমৎকার ট্রিপটা ভেস্তে গেল। সারাদিন মারিয়া আমার সঙ্গে কোনো কথা বলল না। দুপুরে খেলও না। ওর চোখের দিকে চাইলেই দেখছিলাম একটা রাগ আর ঘৃণা মেশা অদ্ভুত চাহনি। যেন আমি পুরো খলনায়ক। কী আর করব! মুখটা টেনশনে কালো হয়েছিল ওর।
সন্ধে নেমে গেছে খানিকক্ষণ। রাত সাড়ে আটটা হবে। আমি বসার ঘরে সোফায় বসে মাল খাচ্ছিলাম। বেশ টেনশন হচ্ছিল। চতুর্থ দিনও হয়ে গেল। কে জানে বাঁড়া, তবে কি পড়েই গেছে নাকি এক ফোঁটা! এইসব ভাবছিলাম। মারিয়া ঘরে দরজা বন্ধ করে বসেছিল।
হঠাৎ ঘরের দরজাটা দড়াম করে খুলে মারিয়া দেখলাম প্রায় দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। গিয়েই 'ইট হ্যাজ কাম' বলে এক চিৎকার দিল। আমি জানি মারিয়া আরশোলাকে হেভি ভয় পায়। এর আগে একদিন বাথরুমে আরশোলা দেখে এমনই চিৎকার দিয়েছিল। সেদিন মারতে পারিনি। পালিয়েছিল মালটা। তবে কি ব্যাটা আবার এল? আজ মেরেই ফেলব শালাকে- এই ভেবে চটি-হাতে আমিও দৌড়ে ঢুকলাম বাথরুমে। ঢুকে দেখি কোথায় আরশোলা! ঝলমলে মুখে কমোডের ওপর বসে আছে মারিয়া। আর হাঁটুর কাছে নামানো প্যান্টিতে টাটকা রক্তের দাগ। আঃ আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।
এরপর সব রাগারাগি মিটে গেল। সেজেগুজে ডিনারে গেলাম দুজনে। ট্রিপটা হল না এই যা।
জন্মদিনের পার্টি
ফেসবুকে ইভেন্ট ক্রিয়েট করে ইনভাইট করেছিল হুয়ান। ওর জন্মদিনের পার্টি। অফিসে উইশ করতে বলল যে জন্মদিন গেছে দিনকয়েক আগে। ও উইকেন্ড দেখে পার্টি অর্গানাইজ করেছে। না যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। হুয়ান এখন আর শুধু কলিগ নয় বরং বন্ধু। বলেই দিলাম যে আমি অবশ্যই যাচ্ছি। মারিয়া যে যাবে তা বলাবাহুল্য।
সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ যথারীতি একটা ওয়াইন নিয়ে আমি আর মারিয়া পৌঁছলাম হুয়ানের বাড়ি। ওর বাড়ি শহরের আউস্কার্টে ওলিবোস বলে একটা জায়গায়। দেখলাম জায়গাটা বেশ সুন্দর আর নিরিবিলি। মারিয়া হুয়ানের বাড়ি আগে এসেছে তাই ও চিনত। দরজা খুলে সাদর আমন্ত্রণ করে ভেতরে নিয়ে গেল হুয়ান।
বাড়ির ছাদে পার্টিটা অর্গানাইজ করেছিল। ছাদে উঠে দেখলাম সেখানে একটা ছোট ঘর আছে। সেই ঘরে হুয়ান ওর তোলা বেশ কিছু ছবি টাঙিয়ে একটা একজিবিশন করেছে। ঘুরে ঘুরে ছবিগুলো দেখলাম। দারুণ ছবি তোলে হুয়ান। ততক্ষণে অনেক লোকজনই এসে পড়েছিল। একধারে -একটা বড়ো টেবিলে সাজানো আছে নানান মদ-সফট্ ড্রিংক্স-স্যান্ডউইচ্- চিপস্-বাদাম এইসব। আমাদের আনা ওয়াইনটা সেখানে রেখে আমি আর মারিয়া দুটো বিয়ার নিলাম।
ছাদে অনেকগুলো চেয়ার পাতা ছিল। তার অধিকাংশ জুড়েই বসেছিল হুয়ানের পরিবার। পরিবার বলতে ওর বাবা ও সপরিবারে আসা সৎ ভাইবোনেরা। হুয়ানের মা নেই। অনেক বছর আগেই তিনি মারা গেছেন। হুয়ান আমায় প্রত্যেকের সঙ্গেই আলাপ করাল। দেখলাম ও সবাইকে আমাদের তথ্যচিত্রটার ব্যাপারে বলেছে। এখানে বলে রাখি এই কয়েকমাসে আমাদের তথ্যচিত্রের আর্ধেক শুটিং হয়ে গেছে। আমায় হুয়ান ডিরেক্টর বলে আলাপ করাল। এতে আমি খানিক লজ্জাই পেলাম। আমি তো আর পুরোদস্তুর ডিরেক্টর নই। আলাপ হল হুয়ানের ছোটবেলার বন্ধু লেও আর মায়ের দিকের কাজিন লাওরার সঙ্গে। বাকি লোকেদের অধিকাংশকেই আমি চিনতাম। তারা আমাদের কমন কলিগ। এলিজাবেথই প্রধান হোস্ট। দারুণ সাজগোজ করে হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
দু-চারজন কলিগের সঙ্গে একটু হাই হ্যালো করলাম। মারিয়ার সঙ্গে পরিচয় করলাম। তারপর ছাদের এক কোণে গিয়ে আমি আর মারিয়া নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিতে থাকলাম। খোলা ছাদ তাই সিগারেট খেতেও কোনো অসুবিধা ছিল না।
কিছুক্ষণ পর হুয়ান উঠে দাঁড়িয়ে বলল যে এলিজাবেথ এবার একটা গান গাইবে। এলিজাবেথ যে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের লিড সিঙ্গার সেটা আমি জানতাম। গান শুনে বুঝলাম বেশ ভালো গায় এলিজাবেথ।
এর কিছু পর কেক কাটা হল। সবাই কোরাসে গাইল বার্থডে সং। আমি জানি না বলে শুধু হাততালি দিলাম। আসতে আসতে অতিথিরা বিদায় নিল। থাকলাম শুধু এলিজাবেথ মারিয়া আর আমি। আমরা হুয়ানের সঙ্গে নীচে গিয়ে বসার ঘরে বসলাম।
চারজন বসে আড্ডা দিচ্ছি হঠাৎ হুয়ান আমার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলে উঠল: এই দাঁড়াও তোমার জন্য একটা স্পেশাল জিনিস আছে। বলেই উঠে পাশের ঘরে ঢুকে গেল। ফিরে এল একটা ব্ল্যাক লেবেলের বোতল হাতে। আমার তো চোখ চকচক করে উঠল। এলিজাবেথ আর মারিয়ার ঠোঁটে মুচকি হাসি। আসলে হুয়ান ও এরা সকলেই জানে যে হুইস্কি আমার বড়ো প্রিয়। পার্টিতে হুইস্কি ছিল না।
তিন পেগ মেরে আমি আর মারিয়া উঠে পড়লাম। বেশ রাত হয়ে গেছিল। বেরনোর সময় হুয়ান আর এলিজাবেথকে আমার নতুন ফ্ল্যাটে একদিন আসতে বলে এলাম। নতুন ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি রেকোলেতায়। এবারে আর শেয়ারড্ নয়। পুরোটাই নিজের। একটা সিঙ্গল বি.এইচ.কে।
পালেরমোয় বিকেলে
সেদিন বিকেলে মারিয়ার সঙ্গে গেছিলাম পালেরমোর পার্কে। পালেরমো আমার পুরনো পাড়া। ঝলমলে স্মৃতিতে ভরা। এখানেই প্রথম দেখেছিলাম মারিয়াকে আর বিকেলের পালেরমো তো দারুণ লাগে বরাবর। শরৎকাল। মিষ্টি রোদের সঙ্গে দারুণ একটা হাওয়া। মারিয়া পরে ছিল সাদা টি-শার্ট আর নীল ডেনিম। প্রেমে মজে ছিল মন। আমার মজার মজার কথায় খিলখিল করে হেসে উঠছিল ও।
মারিয়া হাঁটতে ভালোবাসে তাই দুটো পপকর্ন কিনে হাঁটতে থাকলাম পার্কে। বিশাল পার্ক। পার্ক ঘিরে পিচের রাস্তা। মাঝখানে জলাশায়। দেখলাম রাজহাঁস আর হংসী চলেছে পাশাপাশি, এদিক সেদিকে কলরব মুখর বাচ্চার দল খেলায় মত্ত, রাস্তা ধরে কেউ করছে জগিং, কেউ-বা সাইক্লিং, এক জায়গায় স্কেটার নিয়ে প্র্যাকটিসে মেতেছে ছেলের দল আর দেখলাম প্রিয় পুয্যির সঙ্গে খেলছে কেউ কেউ।
দারুণ মুডে ছিল মারিয়া। চুমুতে চুমুতে আমায় ভরিয়ে দিচ্ছিল। আমার তো দিলে ধুম লেগেছিল। ওর অনেকগুলো ছবি তুলে দিলাম। আমারও ছবি তুলে দিল ও। সিগারেট ঠোঁটে স্টাইল করে দিলাম পোজ। ওর সাথে সেলফিও তুললাম বেশ কয়েকটা। কোনোটায় মারিয়া আমার গালে গাল ঠেকিয়ে আছে। কোনোটায় চুমু দিচ্ছে গালে, কোনোটায় আমার দিকে ভেংচি কেটে আছে আবার কোনোটায় বা দু আঙুল দিয়ে আমার মাথার ওপর শিং বানিয়ে হাসছে, এইসব।
সারা বিকেল পার্কে হাঁটাহাঁটি করে সন্ধে নাগাদ বাজার করে ফিরে এলাম। দুজনেই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সেদিন ওই বিকেলে পার্কের স্মৃতি নিয়ে অনেকদিন পর একটা কবিতা লিখেছিলাম। এরকম:
চমৎকার বিকেল ছিল সেদিন
ছবিতে-হাসিতে-চুমুতে
অজস্র ভালোবাসা
খুব মনে পড়ে পুরনো পাড়া
বাতিল ম্যাট্রেস আর
উপহার পাওয়া ওয়ালেট
সবই আছে যেমন থাকে
পড়ে আছে পাড়া
আরও পুরনো হবে বলে
বাতিল ম্যাট্রেস আজ কারো কাছে
ফুটপাথে
রাখা আছে ওয়ালেট
জিন্সের পকেটে
শুধু চলে গেছে বিকেল ফুরোতে ফুরোতে
অজস্র ভালোবাসায়...
ব্রেকআপ
সম্পর্কটা ভেঙে গেল। এই ন’মাসের কত কথাই যে মনে পড়ছ… যাইহোক, সিদ্ধান্তটা মারিয়ারই ছিল। আমায় দিন পাঁচেক আগে ফোন করে বলল যে এই সম্পর্কটা ও আর এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় না। ও কম্ফর্টেবল হচ্ছে না। আমি তখন অফিসে। ওকে বার কয়েক বোঝানোর চেষ্টা করলাম। বললাম যে আর একবার চেষ্টা করে দেখা যায় কিনা। কিন্তু দেখলাম ও অনড়। অগত্যা মেনে নিতে হল।
যেহেতু মারিয়া উইকেন্ডে আমার সঙ্গে থাকত তাই আমার বাড়িতে ওর কিছু জিনিস ছিল। বলল যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসে নিয়ে যাবে। আর কথা বলতে পারলাম না। খুব কষ্ট হচ্ছিল। অফিসের কাজেও আর মন বসল না।
গত দুমাস ধরে বেশ বুঝতে পারছিলাম যে আমার আর মারিয়ার মধো বিস্তর ফারাক। আমরা একেবারেই পরিপুরক নই। বয়সের ফারাকের কারণেই হয়তো মারিয়ার কিছু কিছু চাহিদা আমার ছেলেমানুষী বলে মনে হত। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যেতাম। রেগে গিয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠলে মারিয়া ঝরঝর করে কেঁদে ফেলত। আমারও খুব খারাপ লাগত তখন।
এ শহরের অনেকটাই চিনেছি মারিয়ার হাত ধরে। আদব-কায়দাও যেটুকু শিখেছি ওই শিখিয়েছে আমায়। মারিয়াকে আমি সত্যিই খুব ভালোবেসেছিলাম।
কথা মতো গতকাল মারিয়া এসেছিল। ওর বাবাও ছিলেন সঙ্গে। আসার আগে আমায় জানিয়েছিল যে ওর বাবা থাকবেন সঙ্গে। আমি প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম। তারপরই বুঝেছিলাম যে একে ওর অল্প বয়স তার ওপর আমি বিদেশি তাই হয়তো ভেবেছে যদি যেতে না দিই। ওর বাবাকে আমি বসার ঘরে বসালাম। উনি আমাদের ব্রেকআপ নিয়ে একটাও মন্তব্য করলেন না।
মারিয়া শোওয়ার ঘরে কাঁদতে কাঁদতে ব্যাগ গুছাচ্ছিল। বিচ্ছেদের কষ্টে ও কাঁদছিল ঠিকই কিন্তু এটাও বুঝে গেছিল যে এ সম্পর্কে এগিয়ে নিয়ে গেলে ওকে আরো বেশি কষ্ট পেতে হবে। নিজেকে পরিবর্তন করা আমার মতো লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। মারিয়া বুঝেছিল সেটা।
নীচে গিয়ে জলভরা চোখে যখন মারিয়া আর ওর বাবাকে বিদায় দিলাম মারিয়া তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো মারিয়া আমায় জড়িয়ে ধরে বিদায় চুম্বন দিয়ে বলে গেল: কে তেঙ্গাস উনা বুয়েনা ভিদা অর্থাৎ তোমার জীবন ভালো হোক।

No comments:
Post a Comment