প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি, ২০২৫
প্রকাশক: বৈভাষিক প্রকাশনী
(১৯৩৮ - ২০০৫)
বাংলা গদ্য নিয়ে 'খেলাধূলা' করেছিলেন যিনি
পান্নার ঘরে রুবি আর বাইরে তখন বৃষ্টি
এবার, একটু চিৎ হয়ে শোবে? পান্না জিজ্ঞেস করল, রুবিকে। অল্প হাঁফাচ্ছে।
হুঁম। জড়ানো গলায় বলে, রুবি, ডগি-স্টাইল থেকে আস্তে আস্তে চিৎ হল, বিছানায়।
হাত দুটো ভাঁজ করে ছড়িয়ে দিল মাথার দুপাশে। চোখ বুঁজে আছে আরামে। সামনে দাঁড়িয়ে, ওর পা দুটো দুহাতে ফাঁক করে ধরে, পান্না ফের শুরু করতেই, মৃদু শীৎকার করে উঠল রুবি আর সেই আদুরে শীৎকারের রেশ ধরেই ঠিক শুরু হল বৃষ্টি। সেপ্টেম্বরের।
ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে এই বড় দোতলা বাড়িটা। পাড়ার একদম শেষ লেনে। গঙ্গার ধার ঘেঁষে। শতাব্দী প্রাচীন। জরাজীর্ণ। সদর দরজা ছিল এককালে। এখন একটা লোহার গেট। তাও, রং-পালিশ উঠে গিয়ে জং ধরেছে তাতে। গেটের বাঁদিকে একটা ঘর। রাস্তার দিকে একটা দরজা আর দুটো জানালা। সামনে রোয়াক। খানিকটা ভাঙা। ঘরে বাল্ব জ্বলছে। জানালার অল্প খোলা পাল্লা আর পর্দার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছে কম পাওয়ারের হলদেটে আলো। ওই আলোর পরিধি জুড়ে দেখা যাচ্ছে বৃষ্টির উজ্জ্বল ফোঁটা। কান পাতলে, বৃষ্টির শব্দের ভেতর দিয়ে, শীৎকার ও ঠাপের আওয়াজ।
গেটের ডানদিকে দুটো ঘর। পাশাপাশি। বেশ বড়। সামনে একইরকম রোয়াক। ফেটে গেছে মাঝামাঝি। সিমেন্টও উঠে গেছে প্রায়। দুটো ঘরেই রাস্তার দিকে একটা করে দরজা আর দুটো করে জানলা। বন্ধ। দুই ধাপ সিঁড়ি উঠে সদর দরাজা, থুরি, ওই জংধরা লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলে আরও এক ধাপ সিঁড়ি উঠে বাঁধানো বারান্দা। বারন্দা থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি নেমে গেছে ফুটিফাটা উঠোনে। শ্যাওলাধরা। এদিকে ওদিকে আগাছা গজিয়ে গেছে। সেই উঠোন ঘিরে, ভেতর দিকে ডানহাতে আরও তিনটে বড় বড় ঘর। টানা বারান্দা চলে গেছে। ঢাকা ও থামওয়ালা। বারান্দার জায়গায় জায়গায় লাল সিমেন্ট চটে গিয়ে ঘায়ের মতো গর্ত আবার কোথাও কোথাও পুরনো লালের মধ্যে ধূসর সিমেন্টের তাপ্পি। ঘা সারলেও দাগ রয়ে গেছে ক্ষতের। ডানহাতে ঘর শেষ হয়ে বারান্দা বাঁদিকে ঘুরেছে। সেখানে পাশাপাশি দুটো বাথরুম। তার পাশ দিয়ে উঠে গেছে একটা লোহার ঘোরানো সিঁড়ি। এককালে বেশ বাহারি ছিল তার কারুকাজ। এখন ভেঙে গেছে। দোতলায় সিঁড়ির মুখ তাই কাঠ, টিন ইত্যাদি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সদর গেটের বাঁদিক প্রথমে সিঁড়ি। সিমেন্ট চটা, চিড়ধরা। তারপর একটাই ঘর আর টানা বারান্দা ডানহাতে ঘুরে একটা বাথরুম। তারপর একইরকম ভাঙা লোহার সিঁড়ি। দোতলায় যার মুখ বন্ধ। এককালে যখন এবাড়ির শান ছিল তখন পেছনের ওই দুটো সিঁড়ি দিয়ে জমাদার ওঠানামা করত।
প্রতি ঘরের সামনে বারান্দার শেষে উঠোনে নামার সিঁড়ি। তিন ধাপ। যার অনেকগুলোরই এখন কোণা ভেঙে গেছে। ধাপে ধাপে ফাটল। শ্যাওলা পড়ে গেছে কোথাও কোথাও। কোণায় কোণায় উঁকি মারছে কচি কচি গাছের চারা। আগাছা। বাঁদিক থেকে ডানদিকে উঠোনের খোলা অংশ জুড়ে কলতলা, পাতকুয়ো আর একটা পরিত্যাক্ত ভাঙা বাথরুম। পাতকুয়োটাও ব্যবহার হয় না আর। জং ধরে ফুটো হয়ে যাওয়া একটা টিনের পাত দিয়ে মুখ বন্ধ। তার ওপর পচা কাঠ, সাইকেলের বাতিল চাকা, রঙের পুরনো ডাব্বা, শ্যাওলাধরা থান ইট ইত্যাদি, অবিন্যস্ত। কলতলায় একটা নলকূপ, মাথাভাঙা ও বিকল। তার পাশে একটা জলের কল। উঠোনের শেষ মাথায় খিড়কি দরজা ছিল। এখন নেই। তার হাঁ মুখটাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই টিন, কাঠ ইত্যাদি দিয়ে। নাহলে, কুকুর-বিড়াল ঢুকে পড়বে বাড়ির অন্দরে। উঠোনের মাঝখানে বাঁধানো তুলসিতলা ছিল। তরতাজা গাছসমেত। এখন গাছ-মাটি কিছু নেই। শ্যাওলা ধরে নিষ্প্রদীপ পড়ে আছে তুলসিতলা। একটা কোণা ভেঙে গেছে খানিক।
ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে উঠোন, পাতকুয়ো, কলতলা, তুলসিতলা, ভাঙা বাথরুম, সব।
বাড়ির দোতলাও একইরকম তবে অবস্থা একতলার চেয়েও বেশি খারাপ। দোতলার ঘরগুলোর সাথে বাইরের দিকে আছে ঝুলবারান্দা। ঢাকা। তার কোনো কোনোটা এখন ভেঙে গেছে আংশিক বা ভেঙে পড়তে পারে বলে ব্যবহার হয়না আর। বন্ধই পড়ে থাকে। সেখানে পায়রা-ঘুঘুদের বাস। দোতলার ভেতর বারন্দা জুড়ে কারুকাজ করা রেলিং। যার মাঝের গ্রিল ভেঙে গেছে, জায়গায় জায়গায়। রেলিং-এ ভর দেওয়া বিপজ্জনক।
রুবির সাথে সাথে এখন পান্নাও শীৎকার করছে। শরীরে শরীরে ঠোকাঠুকি চলছে অবিরাম। পান্নার ঘাম ঝরে ঝরে পড়ছে রুবির শরীরের ওপর। খোলা ও টানটান। ওরা করে যাচ্ছে। মনের ভেতর বৃষ্টি হচ্ছে যেন। দুজনের। জোরে, জোরে এবং আরও জোরে…
বড়ির সদর গেট দিয়ে বেরিয়ে ডানদিকে গঙ্গার ধার ধরে খানিক এগোলেই শ্মশানঘাট। তারপর কিছুটা এগিয়ে রায়বাবুদের প্রকান্ড অট্টালিকা। তিনশো বছরের প্রাসাদসম বাড়ি আজ খাঁ-খাঁ, ভগ্নস্তুপ প্রায়। রায়বাড়ি ছাড়িয়ে কিছুটা এগোলে পড়ে জামতলার মোড়। ওখানে একটা বাজার বসে, ছোট। তারপর আধ কিলোমিটার মতো গেলে দত্তবাগান। ওখান থেকে এই পাকা রাস্তাটা বাঁহাতে ঘুরে গিয়ে মিশেছে বড় রাস্তায়। বাঁদিকে ফেরিঘাট। হাঁটা রাস্তা। ফেরিঘাটে অটোস্ট্যান্ড আছে। ফেরিঘাট থেকে একটা রুট ডানদিকে এই বাড়ির সামনে দিয়ে দত্তবাগান হয়ে চলে যাচ্ছে বড় রাস্তার কাছে বাসস্ট্যান্ড অব্ধি। অন্য রুটটা সোজা। জেটিঘাট রোড ধরে রূপনগর বাজার ছাড়িয়ে সামনে বড় রাস্তার মোড় অব্ধি। এছাড়া আছে রিকশাস্ট্যান্ড। একটা ফেরিঘাটে। অন্যটা জামতলার মোড়ে। গঙ্গার ধার ধরে এই মাধব রায় রোডে কোনো বাস চলে না।
বৃষ্টির জোর বাড়ল।
রাত বারোটা বেজে গেছে। গোটা তল্লাট নির্জন। অন্ধকার। কাছের ল্যাম্পপোষ্টের বাতিটা জ্বলছে না। বাড়ির ডানপাশে একটা পুরনো কারখানা। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাঁপাশে স্কুল, মন্মথনাথ প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ। উল্টোদিকে বাঁহাতে কয়েকটা বাড়ির পর মিলন সংঘ ক্লাব। সামনে ক্লাবের মাঠ। পাঁচিলের ওপর মোটা তার দিয়ে ঘেরা। ডানহাতে পরপর বেশ কয়েকটা বাড়ি। অধিকাংশই হতশ্রী এবং একতলা জুড়ে দোকান কিংবা গুদাম। দোতলা জনশুন্য প্রায়। তারপর কিছুটা এগোলেই রায় কালীবাড়ি। রায়বাবুদের বাড়ির ভগ্নস্তূপের ঠিক উল্টোদিকেই। জাগ্রত নাকি! লোকে তো বলে। প্রায় দুশো বছর আগে, এলাকার প্রখ্যাত রায় পরিবারের তৎকালীন কর্তা, বাবু মাধব রায় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এখন অবশ্য ট্রাস্টির হাতে। সেই রায় পরিবারের নামেই এই পাড়ার নাম, রায়পাড়া। শ্মশান ও ফেরিঘাট এপাড়ারই অংশ।
অসংখ্য চিড় ও উঁকি মারা বট-অশ্বত্থ নিয়ে বাড়িটা ভিজছে। ভিজে ভিজে আরাম পাচ্ছে একটু। জায়গায় জায়গায় প্লাস্টার খসে পড়ে ইট বেরিয়ে গেছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় যেন আধখাওয়া শিকার কোনো। খুবলে খুবলে খেয়ে নেওয়া নধর মাংসের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে সাদা হাড়।
এই বৃষ্টিই যা সামান্য শুশ্রূষা দেয় তাকে। তার ক্ষতগুলোতে যেন একটু প্রলেপ পড়ে। যদিও নিরাময় নেই কোনো তার জরা ও ব্যাধির। বছরের পর বছর ধরে নিদারুণ অনাদর ও অযত্ন সয়ে নীরবে দিন গুনছে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে স্রেফ ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাওয়ার।
স্থানীয় লোকেরা বলে ‘সেনবাড়ি’।
একটা প্রবল শীৎকারের সাথে রুবি, কাঁপতে কাঁপতে, জল ছেড়ে দিল…রুবি ভিজে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে। আরামে আরামে।
পান্না আর অল্পক্ষণ করার পরই ঝরঝর করে ঝরে গেল, তৃপ্তিতে। গমগমে শীৎকার। রুবির গরম শরীরের ওপর ছড়িয়ে পড়ল তার আরামবিন্দুগুলো। গরম।
বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে…
কল্লোলের দিনকাল ও কিছু ফ্ল্যাশব্যাক
সকালে ঘুম ভাঙতেই কল্লোল বুঝল মেঘলা হয়ে আছে। গতকাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। মোবাইলে দেখল সাড়ে সাতটা। কল্লোলের কোনো অ্যালার্ম লাগে না। রোজ সে এই সময়ে ঘুম থেকে ওঠে। আজ প্রায় তিরিশ বছর হল।
দোতলার বাঁদিকের ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা ধরে বাঁহাতে হেঁটে ঢুকে গেল স্যাঁতস্যাঁতে বাথরুমটায়। কভারভাঙা কমোডে বসে বিড়ি ধরিয়ে ছাতাপড়া দেওয়াল দেখতে দেখতে ওর মনে হল, সত্যি, কী অবস্থা হয়েছে বাড়িটার, আজ! ওপরে তাকিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ভাবল, ভেঙে না পড়ে, শালা। ঘন ঝুলের মধ্যে দিয়ে সিলিং-এ ফাটল। একটা মোটাসোটা টিকটিকি তার দিকে চেয়ে আছে, সিলিং থেকে। কল্লোল বিড়িতে আর একটা টান দিয়েই হেগে ফেলল।
মুখ-হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে, কল্লোল বাথরুম থেকে বেরিয়েই দেখতে পেল, মিতালিকে। বারান্দায়, তার নিজের ঘরের সামনে। উঠোনের দিকে তাকিয়ে আছে সে। মিতালির মুখের দিকে তাকালে কল্লোলের বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। উদভ্রান্তের মতো চোখ-মুখ। ফোলাফোলা। শুকনো আর কালিপড়া। এবাড়িতে বউ হয়ে আসার পর তার রূপে বাড়ির অনেক মেয়ে-বউয়েরই ঈর্ষা হয়েছিল। আগেকার সেই লালিত্য-লাবন্য সব ঝরে গেছে। কতই বা বয়স হবে মিতালির! ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ হবে, বড় জোর। চোখাচুখি হতে কল্লোল জোর করে হেসে ঘরে ঢুকে গেল। মিতালি প্রায় না হাসার মতো করে হাসল। কেমন যেন হয়ে গেছে আজকাল। ঘুমের ওষুধ খেয়ে যখন তখন অঘোরে ঘুমোয়।
মিতালি সমীরণের বউ। সমীরণ ছিল এবাড়ির এক শরিক। কল্লোলের এক শরিকি জ্যাঠা ইন্দ্রনাথের দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে। দোতলার ডানদিকের সামনের দুটো ঘর আর তার পর বাঁহাতে ঘুরে প্রথম ঘরটা নিয়ে সমীরণের অংশ।
ইন্দ্রনাথকে ছেলেবেলায় কল্লোল দেখেছে। বেহেড মাতাল। রেসের মাঠেও নাকি যাতায়াত ছিল, কল্লোল পরে শুনেছিল। তার বাবারা তাকে বলত লম্পট। তার প্রথম পক্ষের এক মেয়ে আর এক ছেলে ছিল। প্রথম পক্ষের স্ত্রী মারা যায় ইন্দ্রনাথেরই অবহেলা, উপেক্ষা ও অনাদরে। অল্প বয়েসে।
মেয়ের বিয়ে দিয়ে ইন্দ্রনাথ ১৯৭০-এ যখন সমীরণের মাকে এবাড়িতে নিয়ে এসে তুলল তখন সে ছেচল্লিশ আর সুজাতা, সমীরণের মা আঠাশ। কল্লোলের বাবারা বলত বিয়ে নাকি হয়নি তাদের। ইন্দ্রনাথের বড় ছেলে নীলাঞ্জন তখন জলপাইগুড়িতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।
বছর দুয়েক পর জন্মায় সমীরণ। ইন্দ্রনাথ তখন সর্বস্বান্ত প্রায়। পড়া শেষ করে নীলাঞ্জন চাকরি নিয়ে চলে যায় জার্মানি। বাপের সাথে সে আর কোনো সম্পর্ক রাখেনি। বাপকে সে মনে করত তার মায়ের হত্যাকারী। এরপর থেকে নীলাঞ্জনের আর কোনো খবর এবাড়ির কেউ জানে না। কল্লোল শুনেছিল, নীলাঞ্জনের এক মামাই নাকি তার পড়ার খরচ জুগিয়েছিল।
১৯৭৮-এ কল্লোল যখন বছর চোদ্দর কিশোর, ইন্দ্রনাথ একদিন হার্টফেল করে মারা যায়। শেষকৃত্য করে বছর ছয়েকের সমীরণ। এরপর সুজাতা সংসার চালাতে কয়েকটা বাড়িতে কাজ নেয় আর পেছনের ঘরে ভাড়াটে বসিয়ে দেয়। এটুকু বলা যায় যে এবাড়ির শরিকেরা অমানুষ নয়। হলে হয়তো, মা আর শিশুপুত্রকে ভাগচ্যুত করতে সর্বশক্তি দিয়ে দিত। সবাই মিলে।
সমীরণ বড় হয় কল্লোলের চোখের সামনেই। ভয়ানক বদ। ক্লাশ সেভেন-এইটের পর আর পড়েনি। মদ ধরে কৈশোর পেরোতে না পেরোতেই। পঁচিশে পড়তে না পড়তেই বিয়ে। ফ্ল্যাটের দালালি করত, টুকটাক। রোজ রাতে ক্লাবের পেছনে বসে মদ খেয়ে একদম ফুলটু হয়ে বন্ধুদের কাঁধে চেপে বাড়ি ঢুকত। সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ঘর পর্যন্ত যেত মিতালি আর কল্লোলের কাঁধে। খিস্তি করত অবিরাম। মাঝে মাঝে বমি।
কল্লোল রেডি হয়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে, ঘরে তালা মেরে দিল। ক্রিম রঙা, পকেট দেওয়া, টেরিলিনের হাফ শার্ট। খয়েরি রঙের টেরিলিনের ফুলপ্যান্ট। ব্যাকব্রাশ করা চুল। অনেকটাই সাদা হয়ে গেছে। পাতলা হয়ে এসেছে সামনের দিকে। সরু মেটাল ফ্রেমের চশমা। দিন তিনেকের বাসি দাড়ি-গোঁফ। পাকা। কাঁধে একটা কালো রঙের ঝোলাব্যাগ। চেইন দেওয়া। পায়ে ফোমের চপ্পল। লম্বা। ছিপছিপে চেহারা। সৌম্যকান্তি। মুখে একটা আলগা হাসি যেন লেগেই আছে, সবসময়। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। এবাড়ির প্রত্যকেই অবশ্য সুপুরুষ।
সমীরণের ছেলে হয় বিয়ের বছর ঘুরতেই। নাম চয়ন। সে আবার বাপ ও ঠাকুরদার থেকেও এককাঠি ওপরে। মদ-গাঁজা দিয়ে শুরু করে ধরল পাতা। কুড়িতে পড়তে না পড়তেই। সমীরণ এক-দুবার রিহ্যাবেও পাঠিয়েছিল। কখনও তিন মাস, কখনও চার মাস। কিন্তু ওই কিছুদিন ভালো থাকে তারপর আবার ধরে। লক ডাউনে বেরোতে পারেনি তাই ভালো ছিল। তার ঠিক আগ দিয়েই সুস্থ হয়ে ফিরেছিল রিহ্যাব থেকে। টেনেটুনে এইচএস পাশ করেছিল।
ছেলেটার জন্য টেনশনেই হোক কিংবা অত্যাধিক মদ্যপানের কারণে, বছর পাঁচেক আগে সমীরণ মারা গেল, হার্ট অ্যটাকে। ঠিক তার বাপের মতোই। সুজাতা অবশ্য তার আগেই মারা গিয়েছিল। টিবি হয়েছিল।
বাড়ির সামনের দিকে বাঁদিকের ওপরে-নিচে দুটো ঘর কল্লোলের। নিচের ঘরটায় থাকে পান্না। কল্লোলের ভাড়াটে। পান্না জামতলার মোড়ে কল্লোলের বন্ধু পলটুর ভাতের হোটেলে হেল্পার আর বাসন মাজার কাজ করত। লক ডাউনের পর হোটেলটা উঠে যায়। ইদানীং পান্না কী করে, তা কল্লোল সঠিক জানে না। জিজ্ঞাসা করতে বলেছিল কিছুদূরে একটা দোকানে নাকি কাজ পেয়েছে। কল্লোল এ নিয়ে আর বিশেষ মাথা ঘামায়নি। কল্লোল এসব নিয়ে অত মাথা ঘামানোর লোকও নয়। নিজের খেয়ালে থাকে।
গত বছর চয়ন বিয়ে করে ফেলল। মাত্র পঁচিশে। বাপ কা বেটা। বউ রুবি। বয়স কুড়ি-একুশ। চয়ন একটা প্রাইভেট ফার্মে ছোটখাটো চাকরি করত। একদিন বাড়িতে পুলিশ এল। চয়নের চাকরি গেল। কোম্পানির জিনিশপত্র চুরি করেছিল। পাতার খরচ তো আর মুখের কথা নয়। রুবি জানত না চয়নের এই মারণ নেশার কথা। ও লুকিয়ে গিয়েছিল। যেমন প্রথমে লুকিয়েছিল বাড়িতে।
কল্লোল নিচের গেট খুলে রাস্তায় এসে পড়ল।
জামতলার মোড়ে এসে ছোটুর স্টল থেকে একটা আজকাল কিনল কল্লোল। রোজই কেনে। মেঘলা তো হয়েই ছিল। এবার শুরু হল বৃষ্টি। কল্লোল হাঁটার গতি বাড়িয়ে ঢুকে পড়ল সামনে রবির চায়ের দোকানে।
রোজ এখানে এসে এক কাপ চা আর ব্রেড টোস্ট নিয়ে কল্লোল আড্ডা মারে। যে বা যে যে থাকে কল্লোল আড্ডা শুরু করে দেয়। আজ যেমন চেনা বলতে একমাত্র রূপক আছে। কল্লোলের হাঁটুর বয়েসি। তাতে কল্লোলের কিছু যায় আসে না। সে আড্ডা শুরু করে দিলঃ
কি রে, পরীক্ষা হয়ে গেছে?
হ্যাঁ, সেমেস্টার হয়ে গেল।
কেমন হল?
ভালোই।
বাঃ, তা কী মনে হচ্ছে তো বল তো? বৃষ্টিটা কি চলবেই? শালা, তিনদিন টানা হয়েই চলেছে।
খবরে তো তাই বলছে। এইবার রবি বলে উঠল। কল্লোলে উৎসাহভরা চোখে তার দিকে ঘুরে তাকাল।
এই শুরু হল। এইটাই হচ্ছে কাল্লোল সেন। আশেপাশে অন্তত চার পাঁচটা পাড়ার বিভিন্ন আড্ডার লোকেরা-বিভিন্ন বয়স ও পেশার আড্ডাবাজরা সব্বাই চেনে কল্লোলকে। সেই সতেরো বছর বয়স থেকে কল্লোল আড্ডা মেরে যাচ্ছে। কলেজ ক্যান্টিনে, চায়ের দোকানে, ফেরিঘাটে, শ্মশানঘাটে, বাজারে, কোনো বাড়ির রোয়াকে, ক্লাবের সামনে, ভাতের হোটেলে, মিষ্টির দোকানের সামনে এরকম আরও অজস্র জায়গা জুড়ে ছিল এবং রয়েছে কল্লোলের আড্ডার ঠেক। আজ সে সিনিয়র সিটিজেন হয়ে গেল। দিনে দু-বান্ডিল বিড়ি আর দু-কাপ চা। মাঝে সাঝে, শখ করে বা কেউ খাওয়ালে, সিগারেট। অন্য আর কোনো নেশা কল্লোলের নেই। আড্ডাই হচ্ছে তার প্রধান নেশা।
এবাড়ির ছাদে কেউ ওঠে না। বহুদিন। ছাদে ওঠার সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেক উঠে সিঁড়ির চাতালে দেওয়ালের এককোণে বসে চয়ন পাতা খেত। সারারাত পড়ে থাকত ওখানে। প্রায়শই। সকালে হয় নিজে নাহয় রুবি-মিতালি গিয়ে নামিয়ে আনত। একদিন সকালে রুবি ডাকতে গিয়ে চীৎকার করে ওঠে। কল্লোল-মিতালি ও দোতলার ভাড়াটদের কেউ কেউ ওপরে উঠে দেখে সিঁড়ির চাতালের কোণে পুরু ধূলোর মধ্যে, পোড়া বিড়ি, রাংতা, লাইটার আর ব্রাউন সুগারের রঙিন মোড়কের মাঝে পাশ ফিরে, হাঁটুমুড়ে, হাতদুটোকে বুকের কাছে জড়ো করে, মরে পড়ে আছে চয়ন। মুখ থেকে গ্যাঁজলা বেরিয়ে শুকিয়ে গেছে জুন মাসের গরমে।
প্রণবেশ, পাড়ার ডাক্তার, ডেথ সার্টিফিকেট দিতে চাইল না। ওভারডোজ কেস। বাড়িতে আবার পুলিশ এল। মৃত চয়নের জন্য।
এখন সমীরণের অংশে থাকে শুধু মিতালি আর রুবি। ঘর ভাড়ার সামান্য টাকাটুকুই যা সম্বল। পোড়া কপাল যাকে বলে! দুজনেরই।
ওদিকে, রবির চায়ে দোকানে, তখন আরও দু-চারজন জড়ো হয়েছে। জোর আড্ডা চলছে। নটা বাজতে না বাজতেই, কল্লোল আড্ডা ছেড়ে উঠে পড়ল। রাস্তা পেরিয়ে, চলে এল উল্টোদিকের কৃষ্ণা মেডিক্যালস-এ। কাউন্টারে একটা রিভলবিং চেয়ারে বসে আছে স্বপন কুন্ডূ, প্রোপাইটর। তার মায়ের নামেই দোকানের নাম। কল্লোল একটু হেসে, কাউন্টারের ডালা তুলে, ভেতর ঢুকে একটা প্লাস্টিকের হাতল ছাড়া চেয়ারে গিয়ে বসল। এখন কোনো কাস্টমার নেই তাই ব্যাগ থেকে আজকালটা বার করে পড়তে শুরু করল। স্বপন কল্লোলের ছেলেবেলার বন্ধু। আজ প্রায় তিরিশ বছর হল কল্লোল এই দোকানে কাজ করছে।
সকাল নটা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত কল্লোলের ডিউটি। সোম থেকে শনি। রবিবার দোকান বন্ধ থাকে। সেকন্ড হাফে আসে স্বপনের ছেলে রঞ্জন, কেমিস্ট, আর অন্য স্টোর বয় কুনাল। তারপর রাত দশটা পর্যন্ত দোকান সামলায় তারাই। কল্লোলকে সামান্য যা মাইনে স্বপন দেয় তাতেই তার চলে যায়। তবে এখনও একটু একটু দুঃখ হয় তার। সকাল-দুপুরের সেই দারুণ আড্ডাটা আর মারা হয় না। কী আর করা যাবে! খালি পেটে তো আর আড্ডা মারা যায় না। অগত্যা।
পেডলার পান্না
পান্না আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল খাটে। মানে বার্ণিশ ছাড়া চৌকিতে। সকাল নটা কুড়ি। উঠে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। প্রায় মিনিট দশেক বসে থাকার পর পান্না একটা বিড়ি ধরিয়ে নেমে পড়ল বিছানা ছেড়ে। বাঁদিকের বাথরুমে গিয়ে হেগে ছুঁচিয়ে নিল। তারপর সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিল লিঙ্গ, কুঁচকি ইত্যাদি। গামছায় মুছে নিল। গতরাতে রুবির সাথে করার পর ধোয়া হয়নি। সব শেষে হাত-চোখ-মুখ ধুয়ে, দাঁত মেজে ও জিভ ছুলে বেরিয়ে এল।
কালো স্যান্ডো গেঞ্জি আর রঙ উঠে যাওয়া লাল বারমুডা। কাঁধে গামছা। রোগা। মাঝারি হাইট। পায়ের রঙ মাজা। চোখদুটো কেমন উদাস। তবে মধ্যে মধ্যে জ্বলে ওঠে। দাড়ি-গোঁফ কামানো। সরু-লম্বা জুলপি। মাথার সামনের দিকে বড় বড় চুল। কালো। কয়েকটাতে প্রায় উঠে যাওয়া সোনালি রঙ। দুপাশে আর পেছনের চুল একদম ছোট করে ছাঁটা। কপালের বাঁদিকে ভ্রুর ঠিক ওপরে একটা কাটা দাগ। বেশ স্পষ্ট। পান্না ঘরে ঢুকে গেল।
মেরুন রঙের গোলগলা হাফহাতা টি-শার্ট, কালো জাঙ্গিয়া আর সস্তা ফেডেড জিন্সের বারমুডা পরে চুল আঁচড়ে নিল। প্লাস্টিকের চেয়ারে রাখা বেশ বড় সাইজের নকল আদিদাসের কালো-সাদা ব্যাগ খুলে দেখে নিল তার ভেতরটা ভালো করে। হাতড়েও দেখল খানিক। বিছানা থেকে বিড়ির প্যাকেট আর লাইটারটা তুলে ভরে নিল ব্যাগের সামনের পকেটে। এককোণে, একটা প্লাস্টিকের টুলের ওপর রাখা ডিস্পেন্সার থেকে একটা প্লাস্টিকের হাফ ফাঁকা বোতলে জল ভরে নিল পুরোটা। ব্যাগের সাইডের একটা পকেটে ভরে নিল সেটা। মানিব্যাগটা নিল হিপ-পকেটে। মোবাইলটা পকেটে ভরে, এদিক ওদিকে খুঁজে একটা ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকের প্যাকেট বার করে ভাঁজ করে পুরে নিল অন্য পকেটে। তারপর দেওয়ালে ঝোলানো শিবের একটা ছোট বাঁধানো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম ঠুকল। একবার। দুবার। তিনবার।
ব্যাগটা পিঠে নিয়ে একটা রঙিন হাওয়াই গলিয়ে পান্না একতলার ঘরের সামনের দিকের দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল ভাঙা-ফাটা রোয়াকে। তালা মেরে দিল বাইরে থেকে। সকাল দশটা বাজছে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। কিনব কিনব করে, পান্না, আজও ছাতা কিনে উঠতে পারেনি। প্লাস্টিকের প্যাকেটটা পকেট থেকে বার করে মাথায় জড়িয়ে নিল। সিমেন্ট ওঠা সিঁড়ি দিয়ে রোয়াক থেকে নেমে পড়ল রাস্তায়।
ফেরিঘাটের কাছে এসে একটা ছোট দোকান থেকে পান্না চারটে কচুরি আর আলুর তরকারি খেল। তারপর পাশেই একটা দোকান থেকে খেল একটা ছোট কাপ দুধ-চা। ওই দোকান থেকেই তিনটে সিল্ক কাট কিনল, প্যাকেটে। চা শেষ করে, বিড়ি ধরিয়ে, গঙ্গার ধারের রাস্তাটা ধরে এগিয়ে চলল। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে হাঁটতে দারুণ লাগে পান্নার। সেই ছেলেবেলা থেকেই।
কিছুদূর এগিয়ে একটা বিশাল বটগাছ। গোড়াটা বাঁধানো হয়েছিল বহুকাল আগে। এখন ফেটে প্রায় চৌচিড় হয়ে গেছে। পাশেই একটা ঘাট। ঘাট আর ব্যবহার হয় না। সিঁড়ি ভেঙে গেছে। লোকে বলে ভাঙাঘাট। পাকা রাস্তাটাও এই ঘাটের কাছে এসে শেষ। তারপর দুভাগে ভাগ হয়ে সরু সরু গলি চলে গেছে। ইট বাঁধানো। সোজা গলি ধরে গঙ্গার ধার ঘেঁষে ডোমপাড়া। ডানহাতের গলি ধরে মেথর পট্টি। অধিকাংশই বাড়িই আধপাকা, টালি কিংবা টিনের চাল। সুবিধে এই যে এদিকটায় তথাকথিত ভদ্রলোকেদের বিশেষ আনাগোনা নেই।
বটগাছের পেছনে চলে গেল পান্না। ভালো করে দেখলে দেখা যায় বটগাছের ঠিক পেছনে একদম গঙ্গার ধার ঘেঁষে একটা ছোট্ট চালাঘর। চার বাই চার কি পাঁচ ফুট হবে। পেছন দিক ও দুপাশ দরমার দেওয়ালে ঘেরা। মাথায় দরমার চাল। ঘরের সামনের দিকটা খোলা। সোজা গঙ্গা দেখা যায়। পান্না ওই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল।
ঘরের ভেতর একটা বেঞ্চি। বাঁশের খুঁটিগুলো মাটিতে পোঁতা। তার ওপর কাঠের তক্তা মারা। পান্না পিঠ থেকে ব্যাগটা বঞ্চির একপাশে নামিয়ে রাখল। তারপর বেঞ্চিতে বসে ব্যাগ থেকে বিড়ি আর লাইটার বার করে হাতের পাশে রাখল। ব্যাস, এখানেই এখন সারাদিন বসে থাকবে পান্না। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ উঠে যাবে। গরম পড়লে অবশ্য দুপুর একটা-দেড়টা নাগাদ উঠে খেয়ে বাড়ি চলে যায়। বিকেল পাঁচটা নাগাদ আবার এসে বসে। সন্ধের পর থেকে একটা এভারেডির ব্যাটারি-লন্ঠন জ্বেলে রাখে। সন্ধে-রাতের টাইমটায় মাঝসাঝে আবার একটু বটগাছের সামনে বেদিতেও গিয়ে বসে। রাতের খদ্দেরদের জানান দেয় যে সে আছে। এইভাবেই চলে আসছে প্রায় বছর তিনেক।
যারা এলাকার গাঁজাখোর যারা তারা জানে এই চালাঘরের কথা। তারা জানে, গাঁজার পেডলার পান্নার টাইমিং। সেই মতো হাজির হয়, ছোট কিংবা বড় খামের জন্য। পান্নার ওই নকল আদিদাসের ব্যাগে থাকে জামতলার রতনের মাল। কে যে রতনদার সাপ্লায়ার তা পান্না জানে না তবে ছিটকে দেওয়ার মতো নেশা, ওই কলিতে! মার্কেটে হিট।
পান্না একটা রিফার বানাল। রিফারটা ধরিয়ে টানতে টানতে গঙ্গা দেখতে থাকল। গঙ্গার ধারে হাওয়া একটু ভারী। দারুন লাগে পান্নার। রোজ দেখে তাও পুরনো হয় না গঙ্গা!
এই রিফারটুকু বানানোর জন্যই পান্না সিগারেট কেনে। তাও, দিনে তিন-চারটের বেশি নয়। এমনিতে বিড়িই খায় সে। মদ একবারেই খায় না। দু-একবার বাংলা খেয়ে দেখেছে সে। খাইয়েছিল কেউ কেউ। তেমন জমেনি তার। গাঁজাই সেরা, তার কাছে। এমন চমৎকার ধুনকি আবার বেসামাল হওয়ার ভয়-ঝক্কি নেই কোনো, তায় আবার খরচাও কম।
রিফার শেষ করে পান্না বিড়ি ধরাল। আস্তে আস্তে ঝিম ধরে আসছে তার। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে, পান্না কোথায় যেন তলিয়ে গেল…
পিছন পানে চাইলে
আজ প্রায় বিশ বছরের পরিশ্রমে এখানে এসেছে পান্না। তার আজও স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনটার কথা। আজীবন হয়তো মনেও থেকে যাবে। বছর বিশেক আগে, সেদিন, তার মাকে আর তাকে ঘর থেকে বার করে সোনাগাছির ফুটপাথে বসিয়ে দিয়েছিল মাসী ও বাড়ির অন্যান্যরা মিলে। তার মায়ের তখন ‘এডস’ না কী একটা অসুখ হয়েছে। কেউ ছোঁবে না। সে এক অদ্ভুত বিশ্বাস। পান্না তো বুঝতেই পারেনি, কী হয়েছে। পরে বড় হয়ে বুঝেছিল, তার মায়ের শরীরে বিষ ঢেলে দিয়ে চলে গিয়েছিল কোনো এক ফুলকুমার।
দশ-এগারো বছরের পান্না পেটের দায়ে তখন লেখাপড়া ছেড়ে টিন-বোতল বেচা, ভিক্ষা করা, তারপর আর একটু বড় হয়ে, ভেড়ুয়াগিরি, বাবুদের দারু-পান-সিগারেট আনা, এইসব করত। ভেড়ুয়াগিরিতে খুব একটা সুবিধা করত পারত না। হয়, ছোট বলে বাবুরা পাত্তা দিত না, নয়তো, সিনিয়াররা খদ্দের হাইজ্যাক করে নিত। পেছনে পেছনে তাও নাছোড়ের মতো গিয়ে বারবার বায়না করলে দরজার সামনে গিয়ে হাতে দু-দশ টাকা ধরিয়ে দিত। বাকি টাকা তারাই নিয়ে নিত। এইসব করে কখনও পাঁউরুটি কখনও কচুরি কখনও বা মুড়ি-চপ কিনে এনে মাকে দিত। মাও বিশ্বাস করত যে সে অচ্ছুত। পান্না খাবার দিতে এলেই বলতঃ দূর থেকে দে বাবা, দূর থেকে দে, কাছে আসিস না, মানিক আমার। ওঃ! পান্নার কানে আজও বাজে মায়ের সেই কথাগুলো। সেই কান্নাভেজা চোখদুটো।
তাকে দয়া করে থাকতে দিয়েছিল এক মাসী। তাও মীনার কথায়। মীনাও গণিকা ছিল। পান্নার মায়ের পাশের ঘরেই থাকত। ‘দিদি’ বলে ডাকত তাকে। খুব ভালোবাসত সে পান্নাকে। দুমুঠো খেতেও দিত তাকে।
সিঁড়ির নিচে একটা মাদুর আর ছেঁড়া তোশক পেতে পান্না শুয়ে থাকত রাতে। কোনো আড়াল ছিল না। টানা আট বছর প্রায়, সে সেখানেই ছিল। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবত. একদিন সোনাগাছি ছেড়ে সে নিশ্চয়ই বেরোতে পারবে। কিছু একটা করতে পারবে ঠিক। অন্য কোথাও। সোনাগাছির ওপর ঘেন্না ধরে গিয়েছিল তার। হয়তো, তার মায়ের পরিণতির কারণেই। থাকতে মন লাগত না একদম।
এতদিন পরে সে পেরেছে। আজ, এই এলাকার পেডলার, পান্না রক্ষিত। বছর তিনেক আগে শুরু করে ইদানীং সে মন্দ কামাচ্ছে না। পার্টির সেয়ানা বাবলুদা আর থানার ছোটবাবু রজত সাঁতরার সাথে সেটিং করে নিজে খেটে খাচ্ছে।
মাথার ওপর আছে তার মায়ের আর রতনদার আশীর্বাদ।
চোখের সামনে পান্না দেখেছিল ধুঁকতে ধুঁকতে মা কেমন ফুটপাথে মরে গেল। মরার আগে তাকে দূর থেকে আশীর্বাদ করে গিয়েছিল। মা মরে যাওয়ার পর পান্না আর স্থির থাকতে পারেনি। সব ভয় জয় করে মায়ের হাড্ডিসার মৃতদেহ আঁকড়ে হুহু করে কেঁদে ফেলেছিল সে। ডুকরে ডুকরে চীৎকার করে কাঁদছিল সে। কোনো শালা সেদিন এগিয়ে আসেনি। সব দূর থেকে গোল হয়ে মজা দেখছিল। ‘শুয়োরের বাচ্চা, মরবি মরবি, সব্বাই মরবি, শালা’ এই বলে মনে মনে খিস্তি করে পান্না, জলঝরা চোখে, নিশ্চুপ অভিশাপ দিয়েছিল সমবেত সব্বাইকে।
মায়ের দাহকাজ করেছিল, অকুতোভয় পান্না। তার তখন বারো-তেরো বছর বয়স। সেই থেকে পান্না আর কিছু ভাবে না। যে যা খুশি ভাবুক তাকে। সেইদিন থেকে তার আর কিৎসু যায় আসে না, বাল।
একটা ছোট খাম।
পান্না সম্বিৎ ফিরে পেল। চেনা মাল। পান্না দিয়ে দিল। টাকা ভরে রাখল মানিব্যাগে। ছেলেটা চলে যেতে পান্না বোতল থেকে একটু জল খেয়ে আবার একটা বিড়ি ধরাল।
ভালো করে নজর করলে দেখা যেত তার লালচে চোখ চিকচিক করছে, জলে। পান্না দুই তালু দিয়ে চোখ মুছে নিল।
নীরবে বাড়ির স্বর
আমার গায়ে শেষবার রঙ পড়েছিল প্রায় একশো তিরিশ বছর আগে। তখন আমার নতুন মালিক হন শ্রী সুরেন্দ্রনাথ সেন। কাঠের ব্যবসায় বেশ টাকা করেছিলেন। আমায় কিনে নিজের পছন্দ মত রঙ করেছিলেন আমার গায়ে। ঝকঝকে সুন্দর ছিলাম আমি। গায়ে ছিল হলুদ আর লাল। দরজা-জানালায় ছিল হাল্কা সবুজ আর বারান্দার রেলিং-এর গ্রিল ছিল গাঢ় সবুজ। নিজেকে নিয়ে গর্বের সীমা ছিল না তখন। মাথা উঁচু করে এই আকাশের নিচে আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম। দৃঢ় ও দাম্ভিক।
সুরেন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন আমার ভেতর। আমার ভেতরেই আরও এক মেয়ে ও এক ছেলে হয় তাঁদের। মেয়েদের বড় বড় ঘরে বিয়ে দেন তিনি, দামী দামী যৌতুকসমেত। এলাহি আয়োজন আর জব্বর খানাপিনা।
ছোট মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরপর সুরেন্দ্রনাথের জীবনে আবির্ভাব হয় জগাবাবা নামে এক গুরুর। তার সান্নিধ্যে এসে, আস্তে আস্তে, কেমন বৈরাগী মতো হয়ে যান তিনি। বড় ছেলে বিশ্বনাথ ও মেজো ছেলে সতীনাথ ধরে ব্যবসার হাল। ছোট ছেলে উমানাথ আগেই বাপের থেকে টাকা নিয়ে এক বন্ধুর সাথে শুরু করে কাগজের ব্যবসা। বৈঠকখানা বাজারে দোকান দিয়েছিল।
বাপের গুণ কিছুই পায়নি বিশ্বনাথ ও সতীনাথ। পেয়েছিল শুধু দোষ। মদে চুর ও গণিকা আসক্ত। আস্তে আস্তে এতটাই ডুবে গেল নেশায় যে দুই ভাই মিলে শেষে এক মারোয়াড়িকে বেচে দিল ব্যবসা। ওদিকে তাদের ছেলেরাও অবহেলায় তেমন পড়াশুনা শিখল না। নানান নেশা, রেস, জুয়া, মহিলা এসবে বুঁদ হয়ে গেল। একজনই যা ছিল সামান্য ব্যতিক্রম। অর্থাৎ আসক্তি বা নেশায় ডোবেনি তেমন।
বিশ্বনাথের ছিল দুই ছেলে হরিনাথ ও বদ্রীনাথ। মাতাল ও গণিকাসক্ত। দালালি, চিটিংবাজি, বন্ধুদের বিভিন্ন ব্যবসায় খেপ খাটা এইসব ছিল এদের পেশা। স্থায়ী কোনো পেশা ছিল না।
সতীনাথের ছেলে ইন্দ্রনাথ ও চন্দ্রনাথ। ইন্দ্রনাথ, সেও মাতাল, তার ওপর জুয়াড়ি, একটা ব্যবসা শুরু করেছিল কিন্তু চলাতে পারেনি। লাটে উঠে যায়। ব্যতিক্রম চন্দ্রনাথ। বাজে কোনো নেশার খপ্পরে পড়েনি। স্কুল ফাইনাল পাশ করেছিল। ট্রাম কোম্পানিতে কন্ডাক্টরের চাকরি পায়। স্ত্রী, ছেলে বৈদ্যনাথ ও মেয়েকে নিয়ে বহুদিন আগে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। দোতলায় তার অংশে অর্থাৎ ডানদিকের পেছনের দুটো ঘরে সে ভাড়াটে বসিয়ে দেয়। সেই ভাড়াটে তিন প্রজন্ম সেখানেই আছে।
মেয়েদের বিয়ে বিশ্বনাথ ও সাতীনাথ কোনোমতে দিয়ে দিয়েছিল। বংশ মর্যাদার জোরে ছেলেদেরও বিয়ে হয়ে যায়। নিজেরাই দেখেশুনে করে।
ওদিকে উমানাথ যে ছিল সব থেকে মেধাবী, হিসেবী ও সাবধানী ভাগ্যের ফেরে জেরবার হয়ে গেল তার জীবন। সব কিছু ঠিকই চলছিল। মদ-সিগারেট খেত একটু। তবে বাড়াবাড়ি রকমের কিছু না। তার ছিল দুই ছেলে ও এক মেয়ে।
বড় ছেলে শিবনাথ। শিবনাথ বড় হতে হতে বোঝা গেল যে সে মানসিক ভারসাম্যহীন। তারপর উমানাথের যখন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স তখন এক দুরারোগ্য রোগে তার স্ত্রী শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। মন ভেঙে গেল উমানাথের। টানা তিন বছর ভুগে তার স্ত্রী যখন মারা গেল তার ঠিক আগেই স্ত্রীর পছন্দ করা পাত্রের সাথে সে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। ব্যবসার কাজ সে ছেড়ে দিল। পার্টনারকে বেচে নিল তার অংশ, নামমাত্র টাকায়।
এরপর থেকে উমানাথ, দোতলার বাঁদিকের ঘরে বসে, সারাদিন শুধু গান শুনত আর মদ খেত। মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়েসে লিভার সিরোসিসে মারা গেল উমানাথ। ছোট ছেলে রমানাথ তখন একুশে পড়েছে। এইটে দুবার ফেল করে পড়া ছেড়েছে। ভাগ্যিস, কোনো নেশার খপ্পরে পড়েনি! অতি কষ্টে একটা গ্লাশ ফ্যক্টরিতে লেবাররের কাজ জোটায়। প্রথমে ডেইলে পেইড। পরে মাস মাইনে হয়।
বছর দুয়েক পর গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায় শিবনাথ। রমানাথ তখন ফ্যক্টরিতে। উমানাথ বেঁচে থাকতে সবসময় চোখে চোখে রাখত শিবনাথকে। নিজের ঘরে আটকে রাখত মাঝে সাঝে। কিন্তু সে মারা যাওয়ার পর, রমানাথের অনুপস্থিতে, সে তো আর সম্ভব ছিল না। প্রায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিকে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াত। কোনো দিকে কোনো হুঁশ থাকত না। চেনা কেউ দেখতে পেলে ধরে বাড়ি দিয়ে যেত। সেরকমই একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাসের তলায় পড়ে মারা গেল শিবনাথ।
আজ যারা বাস করছে আমার ভেতর তারা হল এই সেন বংশের বিভিন্ন শরিক। হরিনাথের দিকে তার বড় ছেলে দেবনাথের বিধবা স্ত্রী, ছেলে আনন্দ, তার স্ত্রী ও এক নাতি। ছোট ছেলে রাঘুনাথ ও তার স্ত্রী। বদ্রীনাথের ছেলে সোমনাথ, তার স্ত্রী আর ছেলে বিপ্লব, এখনও বিয়ে করেনি। আর ওদিকে রমানাথের ছেলে কল্লোল। ইন্দ্রনাথের পুত্রবধু মিতালি আর নাতবউ রুবি। আর ভাড়াটেরা।
যাইহোক, আসল কথাটা হল, এদের কারওরই আর আমার পুরোপুরি তদারকি ও মেরামত করার সামর্থ্য ছিল না। সম্মিলিত ভাবেও না। মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সময় বা অন্য কখনও, ওই একটু একটু যে যার মতো নিজের নিজের ঘরের বাইরে-ভেতর একটু প্লাস্টার মেরেছিল, রঙ করেছিল কিংবা একটু কিছু বানিয়েছিল।
চার প্রজন্মের অযত্নে আজ আমার এই হতশ্রী দশা। আমি আর খুব বেশি দিন মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। ভেতরে ভেতরে আমার কড়ি-বরগায়, ছাদে, দেওয়ালে, থামে ঘুণ ধরে গেছে। যেমন ঘুণ ধরেছে এই বংশে। এবার হয়তো, একদিন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে যাব আমি। অদৃষ্ট!
মিলে গেছে বারো আনা, এ জীবনে
তোমার কী হবে? মাছ, ডিম, না চিকেন?
মাছ কী কী আছে, রে?
রুই আছে, কাতলা আছে আর চারাপোনা।
টাটকা হবে তো?
আরে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, টাটকা ছাড়া খাইয়েছি কোনোদিন?
বেশ, তাহলে, চারাপোনাটাই দে। কাতলটা, তো, খেলামই কাল।
কল্লোল দোকানের কাজ সেরে ভাত খেতে এসেছে, আশীষের হোটেলে। জামতলার মোড়ে। মাঝারি হোটেল। টিনের চাল। দুটো কাঠের টেবিল আর কাঠের বেঞ্চিতে বসে খাওয়া। আগে বন্ধু পলটুর হোটেলে খেত। পলটুটা করোনায় মারা গেল। সেই হোটেল এখন রেডিমেড গারমেন্টসের দোকান। দুপুর প্রায় আড়াইটে বাজছে।
কল্লোলকে বলা চলে হাফ গ্র্যাজুয়েট। পার্ট টু ফেল করে বিএ পড়া ছেড়ে দেয়। মাথা ভালোই ছিল। কিন্তু ওই আড্ডার নেশা। কলেজে ঢোকা থেকেই আড্ডা। সেই ইলেভেন। আড্ডাটা একটু কম মারলে সে নাকি অনার্সও পেয়ে যেত। তার বাবা, রমানাথের তাই ধারণা ছিল।
কল্লোল অবশ্য এসব নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামায়নি। আড্ডাই তার সব। কত রকম লোকের সাথে আলাপ হয়, কত কথা জানা যায় আর কত যে অনুভুতির আদান প্রদান হয় এই আড্ডার মারফত তা যারা আড্ডা মারেনা বা মারেনি তারা বুঝবে কী করে! আড্ডার সুবাদেই তো কল্লোল চারপাশের এত সব মানুষকে চিনেছে। জেনেছে তাদের কথা। আড্ডা মারা মোটেও খারাপ কাজ নয়। কল্লোল এমনটাই মনে করে আসছে আজ এতদিন ধরে।
কেমন চলছে রে, ব্যবসা?
প্রশ্নটা কল্লোলের। তার খাওয়া হয়ে গেছে। সেরকম খদ্দের আর নেই। একজন দুজনই যা বসে খাচ্ছে। তিনটেয় হোটেল বন্ধ করে দেয় আশীষ।
আর কী বলব? জিনিশের দাম দেখেছ? পেঁয়াজ বলো, মাছ বলো, সব আগুন দাম। লাভ করতে আরা পারছি কই?
তা, যা বলেছিস। মাছটা কিন্তু ভালো ছিল। তা তোর ছেলের যেন কোন ক্লাশ হল?
কল্লোল কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা শুরু করে দিল। কর্মচারীরা গোছগাছ করতে শুরু করে দিয়েছে। একজনের খাওয়া হয়ে গেল। আর একজনের শেষপাত। সে একটু মাছের ঝোল চাইল।
তিনটে পনেরো নাগাদ হোটেল বন্ধ হলে আশীষের সাথে কল্লোলও বাড়িমুখো হল।
এবার বাড়ি ফিরে স্নান করে ঘন্টা খানেক বিশ্রাম নেবে। তারপর বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই কল্লোল বেরিয়ে পড়বে। তখন তার মনের আনন্দ দেখে কে! গুনগুন করতে করতে সে আড্ডা দিতে যাবে। একটা নয় অন্তত তিন থেকে চার জায়গায় আড্ডা মেরে রাত দশটা নাগাদ কল্লোল বাড়ি ফিরবে। এটাই তার রোজকার রুটিন। কল্লোল একদিন চা-বিড়ি না খেয়ে থাকতে পারে, একদিন খাওয়া না জুটলেও ‘কুছ পরোয়া নেহি’, তার। কিন্তু একদিন আড্ডা মারা না হলে তার খুব মন খারাপ হয়ে যায়।
ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে কল্লোল মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকল, বিকেলে যেন খুব বেশি ঝড়-জল না হয়। ঝিরঝিরে হোক ক্ষতি নেই। তারপর হোক না সারারাত ঝমঝম বৃষ্টি।
বাড়ি ফিরে স্নান সেরে গামছাটা বারান্দার দড়িতে মেলতে গিয়ে কল্লোল দেখল ছিঁড়ে গেছে মালটা। নতুন একটা কিনতে হবে আবার।
ফ্যান চালিয়ে কল্লোল বিছানায় আধশোয়া হয়ে আজকালটা খুলে পড়তে শুরু করল। ভেতরের পাতাগুলো। আজকাল পড়াটাও তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। সেই কলেজবেলা থেকে। অন্য কোনো খবরের কাগজ কল্লোল পড়ে না।
১৯৯৩-এ যখন রমানাথ রিটায়ার করল তখন কল্লোল একটু মুশকিলে পড়ে গেল। রিটায়ার্ড বাপের থেকে তো আর হাতখরচ চাওয়া যায় না। তার দিদি কাকলির তখন বিয়ে হয়ে গেছে। সেই খরচ সামলে আর সামান্য কিছু সঞ্চয়ই অবশিষ্ট ছিল, রমানাথের। তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই, সকালের আড্ডা মারা ছেড়ে, কল্লোল কৃষ্ণা মেডিক্যালস-এ পার্ট-টাইম চাকরিটা নেয়। তার অবশ্য আরও একটা কারণ ছিল। সেটা হল সেই বছরই কল্লোল বিয়ে করে।
পৃথার বাড়ি ছিল পাশের পাড়ায়। কোনো এক পুজোয় আলাপ। তারপর প্রেম। কল্লোলকে দেখতে শুনতে ভালো আর কাথাও বলতে পারে চমৎকার। হয়তো এতেই বাজিমাত করে সে। বছর পঁচিশের পৃথার সাথে যখন উনত্রিশের কল্লোলের বিয়ে হচ্ছে তখন পৃথা চাকরি করে। একটা মার্চেন্ট অফিসের রিসেপশনিস্ট। এ নিয়ে কল্লোলের পরিবারের কোনো আপত্তি তো ছিলই না, উল্টে বরং হাতে যেন চাঁদ পেয়েছিল কল্লোল।
মনে আছে, হানিমুনে দীঘা গিয়েছিল তারা। ওঃ স্বপ্নের মতো ছিল সেই তিনরাত-চারদিন। তালসারি আর জুনপুটেও গিয়েছিল সেবার। মনে পড়লে, কল্লোলের আজও একটা কেমন অনুভূতি হয় শরীরে। ওটাই কল্লোলের প্রথম ও শেষ বার বেড়াতে যাওয়া।
বছর দেড়েক সব কিছু ঠিকঠাক ছিল। পৃথাই ফ্রিজ কেনে। গ্যাসের সিলিন্ডার নেয়। আগে তারা রান্নাবান্না করত স্টোভে। কল্লোলও মজায় ছিল। নিজের রোজগারে বিড়ি-চা-আজকালের খরচ তো তার উঠে যেতই এমনকি পৃথাকে সিনেমা দেখাতেও নিয়ে যেত মাঝে মধ্যে, বড় রাস্তার ওপর বাসনা হলে। এখন উঠে গেছে। টুকটাক রোল-ফ্রাই-চাউমিনও হত।
তারপর থেকেই আস্তে আস্তে আশান্তি শুরু হল। আসলে কল্লোলের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। ওদিকে পৃথা তার অফিসের কলিগদের সাথে তুলনা শুরু করে দিল। কথা শোনাতে শুরু করল কল্লোলকে। শুরু করল খোঁটা দেওয়া।
একটা ঠিকঠাক চাকরি করতে পারো না, তুমি?
সারা জীবন কি বাপ-বউ খাওয়াবে?
কোনো মুরোদ আছে, তোমার?
লজ্জা করে না? বন্ধুদের দেখো, কে কী করছে।
এইসব অবিরাম পৃথা বলে চলত। অভিযোগ আর বিরক্তি মেশানো তীব্র স্বর। সেই মধুভাষী পৃথা তখন আর কই! তা, মুরোদ অবশ্য কল্লোলের ছিল না। পৃথাকে নিয়ে সে নিজের রোজগারে কখনও কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেনি। জামা-কাপড়-গয়না এসব কিছুই কিনে দিতে পারেনি। তাই কল্লোল চুপচাপ শুনে যেত শুধু।
বছর দুয়েকের মাথায় পৃথা বাপের বাড়িতে চলে গেল। সব কিছু নিয়ে। রেখে গেল শুধু গোদরেজের আলমারি। তারপর কয়েক মাস পর এল ডিভোর্সের নোটিশ। কল্লোল চুপচাপ সই করে দিয়েছিল। ভাগ্যিস, এর মধ্যে তারা ফ্যামিলি প্ল্যানিং করে বসেনি!
পৃথা ততদিনে তার এক অফিস কলিগের প্রেমে হাবুডুবু। কল্লোল শুনেছিল, পরে পৃথা তাকেই নাকি বিয়ে করে। তারপর দিল্লি চলে যায় দুজনে। সেখানেই পাতে নতুন সংসার।
ফ্রিজ কল্লোল বেচে দিয়েছে অনেকদিন। খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কল্লোল ফিরিয়ে দিতে চাইলেও আলমারিটা পৃথা নিতে চায়নি। ওটা খুললেই একটা বিচ্ছিরি শব্দ হয় এখন। তার বিয়ের স্মৃতির মতোই বিরক্তিকর। কল্লোল অবশ্য আলমারি বিশেষ খোলে না। রোজের জামাকাপড় রাখে বাবা-মায়ের পুরনো আলনায়।
কল্লোল আজকালটা ভাঁজ করে খাটের পাশে টুলের ওপর রেখে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল। চারটে বেজে গেছে। এবার একটু গড়িয়ে নেবে।
রুবির কথা
রুবি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিল নিজেকে, মুগ্ধ ও গর্বিত। সে শুধু সুশ্রী নয় সাথে একটা চূড়ান্ত আবেদন আছে তার, তা সে খুব ভালো করেই জানে। মায়ের আদল ও রূপ দুইই পেয়েছে। দেখতে দেখতে, কোন খেয়ালে একটা দুষ্টু হাসি খেলে গেল তার ঠোঁটের কোণায়। অল্প টোল পড়ল গালে।
ছিপছিপে মেদহীন চেহারা। সরু কোমর। চোখ-নাক-মুখ বেশ ধারালো, চোখাচোখা। থুতনির বাঁদিকে একটা ছোট্ট তিল। হাত-পা-বগল যত্ন করে কামানো। প্লাক করা ভ্রুর মাঝে ছোট্ট টিপ পরে। ব্যান্ড দিয়ে পেছনে টেনে বেঁধে রাখে কাঁধ অব্ধি চুল। মুখের ভেতর মাঝে মাঝে লবঙ্গ কিংবা পিপারমেন্ট। শরীরে বারকয়েক সস্তা পারফিউম। সব সময় ফ্রেশ। চোখেমুখে একটা চাপা টেনশন ধরা পড়ে মাঝে সাঝে। এছাড়া, সপ্রতিভ রুবি চনমনেই থাকে সারাদিন।
পড়াশুনায় অগা ছিল। ইলেভেনে ফেল করে পড়া ছেড়ে দেয়। পটিয়সী বলে পাড়ায় নাম ছিল। গেঁথেওছিল বেশ কয়েকটা ছেলে। পরপর। তবে সেগুলো ঠিক সিরিয়াস ছিল না। শেষমেষ, চয়নে এসে সে নোঙ্গর ফেলে।
চয়ন তখন সুস্থ ছিল। নেশার কথা চয়ন তাকে পুরোপুরি লুকিয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পরও কিছুদিন চয়ন ভালো ছিল। তারপর আবার শুরু করল। যখন রুবির ব্যাগ থেকে টাকা সরাল, মিতালির গয়না, নিজের মোবাইল এইসব বেচে দিল তখন রুবি বুঝতে পারল। কিন্তু তখন তো আর কিছু করার নেই তার। হায়, কী ভুলই না করেছিল সে!
চয়নকে দেখার আগে রুবি কোনোদিন পাতাখোর দেখেনি। সেই যে বিশ্রী আওয়াজ তুলে জলবমি। সেই সিঁড়ির চাতালে মাথা ঝুঁকিয়ে হাগতে বসার মত বসে বসে ঝিমানো। তোতলে তোতলে কথা বলা। আর খিঁচ উঠলে তো কথাই নেই। উফঃ রুবির যেন দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয় সেইসব দিনরাত।
রুবি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রেলিং এর জায়গায় জায়গায় গ্রিল ভাঙা। রেলিং এর থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে থাকল রুবি। পান্না বাড়ি নেই। কল্লোল ও মিতালি ঘুমাচ্ছে। ওদিকে ভাড়াটেদের দরজাগুলোও বন্ধ। চারিদিক চুপচাপ।
রুবির বেশ ভালো লাগছে মনটা। তার কারণ অবশ্য পান্নার সাথে ইদানিং এর এই সেক্স। শেষের দিকে চয়নটা সব সময় আউট থাকত বা বাড়িতেই ফিরত না দিনের পর দিন। কোথায় পাতা খেয়ে পড়ে থাকত কে জানে? তবে সব থেকে বড় কথা, লাগাতে পারত না, একদম। রুবি অতিষ্ট হয়ে গিয়েছিল যেমন তেমনই ক্ষুধার্ত। চয়নটা মরে গিয়ে তাকে যেন বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে।
রুবি এবাড়িতে কেন পড়ে আছে? যখন চয়নই আর নেই। তার কারণ আছে। রুবির বাবা, সুমিতাভ, শুধু মাতাল নয়, দুশ্চরিত্র এবং চিটিংবাজ। তার জন্য নিত্য অশান্তি হত তার বাবা-মায়ের। পাড়ায় ক্যালানি খেয়েছিল বেশ কয়েকবার। চিটিংবাজি করার জন্য। বাড়ি বয়ে এসেও লোকে থ্রেট দিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া রোজ মদ খেয়ে ফিরে খিস্তি-মারধর-ভাঙচুর তো ছিলই।
যখন রুবির মা জানতে পারল শেফালির কথা, যার পেটে তখন সুমিতাভর বাচ্চা। তার সহ্যের সব বাঁধ ভেঙে গেল। গায়ে আগুন দিয়ে মরল। রুবি তখন স্কুলে। ক্লাশ নাইন। এরপর শেফালিকে ঘরে এনে তোলে সুমিতাভ। সেও এক শরিকি বাড়ি। দুটো ঘর। লম্পট বাপ, সৎমা আর সৎভাই মিলে নরক করে তুলেছিল।
চয়নকে পাওয়ার পর তাই রুবি আর দেরি করেনি। মাস চারেকের প্রেম। ওয়োর রুমে বার কয়েক শোয়াশুয়ি। আর তারপরই বিয়ে। রেজিস্ট্রি। কিন্তু কপাল! চয়নটা যে পাতাখোর এটা সে জানতে বা বুঝতে পারেনি। বাড়ি ছাড়াই ছিল তখন তার একমাত্র লক্ষ্য।
এখন, সে আবার স্বপ্ন দেখছে ঘর বাঁধার। পান্নাটা খুব ভালো লাগায়। আর ছেলেটার মনটাও ভারী ভাল। পান্না তাকে নিজের সব কথা বলেছে। এমনকি এটাও যে সে গাঁজার পেডলিং করে। তা করুক। অনেক কষ্ট পেয়েছে সে। পাতার থেকে গাঁজা ঢের বেশি ভালো। আসল কথা হল, পান্না জীবনে ‘মার’ খাওয়া মাল তাই মনে হয় না তাকে ধোঁকা দেবে। দেখা যাক কী হয়! তার তো এমনিই পোড়া কপাল। রুবি আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
চয়ন মারা যাওয়ার পর তার বাবা, সুমিতাভ, তাকে নিয়ে যেতে চাইলেও সে যায়নি। এই বাড়িতে রুবি অনেক বেশি স্বাধীন। তার নিজের ঘর রয়েছে একটা। হোক না নোনাধরা। ছাতাপড়া। চিড়ধরা। জানলার পাল্লা ভাঙা। হতশ্রী। তবুও তো নিজের ঘর। নিভৃত একলার। আবার মিতালি যতটা আসহায় ততোটাই ঠিক মায়ের মতো যেন। তাই এখানে অনেক বেশি শান্তি। অনেক বেশি সুখ ও স্বস্তি। তাই রুবি আপাতত এখানেই।
সুমিতাভ ইদানিং একটু শুধরেছে নিজেকে। মানে চিটিংবাজিটা ছেড়ে একটা সিগারেট-বিড়ির দোকান দিয়েছে। গুমটি। মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠায় রুবিকে। বউকে লুকিয়ে।
এবার যদি সব কিছু ঠিকঠাক চলে তো পান্নার হাত ধরে সে দেবে ছুট।
দেখা যাক।
গণধোলাই
বাঞ্চোত, পকেট কাটবি? শালা, খানকির ছেলে। বলেই একটা ঘুষি চালাল লোকটা।
ঘুষিটা থোবনায় লাগতেই আর টাল সামলাতে পারল না পান্না। মাটিতে পড়ে গেল।
ক্যালা, বাঞ্চোতকে।
শালা চোর, শুয়োরের বাচ্চা।
মেরে গাঁড় ভেঙে দে, বোকাচোদার।
এই সব বলে ও আরও অনেক রকম খিস্তি দিতে দিতে আরও তিনজন মিলে ক্যালাতে থাকল বছর ষোলোর পান্নাকে। লাথি মারছে তার বুকে, পেটে, মুখে।
পকেটমারি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে পান্না, সোনাগাছিতে। রামবাগানের কাছেই। লোকটা প্রচুর মাল খেয়েছিল। তাক বুঝে তাই পেছন থেকে পান্নার চেষ্টা, কিন্তু আনাড়ি তো, মারতে পারেনি পকেট। আগেই ধরা পড়ে গেছে। শাস্তি দিচ্ছে কিছু পাব্লিক। উন্মত্ত। জাগ্রত বিবেক তাদের। কারও কারও মুখে বাংলার গন্ধ। ভর দুপুরেই, ভুরভুরে।
তিন চারজন থেকে আস্তে আস্তে আরও পাব্লিক জড়ো হয়ে প্রায় জনা সাত-আটেক লোক মিলে পান্নাকে ক্যালাচ্ছে। তাকে মাটি থেকে তুলে এখন চড়-থাবড়া-ঘুষি চলছে। তার মুখ ফেটে রক্ত ঝরছে। কপাল কেটে গেছে। বাঁচোখটা আর খুলতে পারছে না। চপ্পলপরা লাথি পড়েছে চোখে।
আর করব না, আর করব না। ছেড়ে দাও। পায়ে ধরছি, আর মেরো না। কোঁকাতে কোঁকাতে বলে
চলেছে পান্না। কিন্তু তারা শুনছেও না এবং থামছেও না। আস্তে আস্তে পান্নার ডান চোখের সামনে সব ঝাপ্সা হয়ে আসছে। ‘মার খানকির ছেলেকে’, ‘কেলিয়ে গাঁড় ভেঙে দে, শালার’ ইত্যাদি চীৎকারের শব্দ তার কানে ফিকে হয়ে আসছে…
এই, ছাড় ওকে, ছাড় বলছি। ওইটুকু ছেলেকে এমন ভাবে মারছিস? প্রাণে কোনো দয়া নেই রে, তোদের, নাংমারানি? পান্নার কানে এল মীনার গলা। এত আস্তে যে প্রায় শোনাই যায় না।
না, মারব না, শালা পকেট কাটছিল। উত্তেজিত স্বরে, একজন মারা থামিয়ে, প্রত্যুত্তরে।
কিসের দয়া? একশোবার ক্যালাব, শালা, পকেটমার। আরও একজন, ঝাঁজালো ও প্রত্যয়ী।
পান্নার মাথাটা ঝুঁকে আসছে সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। মাটিতে পড়ে যেতে যেতে অস্পষ্ট শুনতে পেল।
এই, বাঁড়া, বেশি হুব্বা হয়ে গেছিস? এই শিবু, ছাড় ওকে। চল, ফোট, এখান দিয়ে। এটা কিন্তু বাঁড়া, আমার এলাকা, উদো। কেলিয়ে গাঁড় টাইট করে দেব, বাঞ্চোত। ভাগ, শালা।
সনাতনদা। এলাকার হুব্বা। গলা শুনে, পান্না, ঝিমিয়ে পড়তে পড়তে বুঝতে পারল। সনাতনদা মনে হল যেন তাকে ধরে নিল। বুকে চেপে। জড়ো হওয়া পাব্লিক দূরে সরছে। ঝাপ্সা।
গায়ের ব্যথায় পান্না তিনদিন ঘুমোতে পারেনি। পেইন কিলার খেয়ে পড়ে ছিল সিঁড়ির নিচে। মীনা খাবার দিয়ে গেলে উঠে খেতে পারত না ঠিক মতো। শুধু দুধ আর ডালসেদ্ধ খেতে দিত তাকে কিন্তু মুখের যন্ত্রণায় সেটুকুও খেতে পারত না ঠিক মতো। চারটে স্টিচ পড়েছিল কপালে। ভাগ্যিস, শুধু হাত-পা দিয়েই ক্যালাচ্ছিল তাকে!
উফঃ যদি মীনা সেদিন টাইম মতো, সনাতনদাকে নিয়ে না এসে পড়ত তবে হয়তো মরেই যেত সে।
পান্নার ধুনকি এসে গিয়েছিল। মোবাইলে দেখল সাড়ে চারটে। দুপুরে ফেরিঘাটের ধারে একটা হোটেল থেকে চিকেন-ভাত খেয়ে এসে আবার বসেছে বটগাছের পেছনের চালাঘরে। তারপর বেশ কয়েকটা কাস্টমার এল। এই একটু আগে একটা রিফার খেয়ে বিড়ি ধরিয়ে তন্ময় হয়ে পড়েছিল ধুনকিতে।
একটু আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসল পান্না। গঙ্গার হাওয়ায় ঘুম পায় খুব। গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল। একটু জল খেয়ে একটা বিড়ি ধরাল আবার।
সেনবাড়ির অন্দরমহল আর বয়ে চলা এই জীবন
বিকেল পাঁচটা নাগাদ কল্লোল প্রতিদিনের মতো আড্ডা মারতে বেরল। একই জামা-প্যান্ট আর সেই কালো ঝোলাব্যাগ।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখা হল আকাশের সাথে। সদর গেট দিয়ে বাড়িতে ঢুকছে সে। স্কুল থেকে ফিরল। চোদ্দ-পনেরোর কিশোর। স্থনীয় রূপনগর হাইস্কুলে পড়ে।
কি রে, কেমন আছিস তুই?
ভালো।
লেখাপড়া করছিস, তো? প্রশ্নটা শুনেই আকাশের ঝাঁট জ্বলে গেল।
না, করছি না। এমনি এমনি স্কুলে গিয়েছিলাম। বলেই কল্লোলের পাশ কাটিয়ে টুক করে ঢুকে গেল ঠাকুমার ঘরে।
ঢ্যামনা হয়েছে ছেলেটা খুব। কথার কী ছিরি! সম্পর্কে সে তার দাদু। কল্লোল মনে মনে বলল, বাড়ি থেকে বেরতে বেরতে। ওকে কল্লোল বিড়ি খেতেও দেখেছে। কিছু বলেনি। বাপের মতো বদ হচ্ছে আস্তে আস্তে। ফেলও করেছে এইবার, কল্লোল শুনেছে।
আকাশ দেবনাথের নাতি, আনন্দর ছেলে। দেবনাথটা মা্রা গেছে করোনায়। তার থেকে প্রায় ষোলো বছরের বড় জ্যাঠতুতো দাদা। তার বাবা রমানাথের জ্যাঠতুতো দাদা হরিনাথের ছেলে দেবনাথ আর রঘুনাথ। দুটোর কোনোটাই স্কুলের গন্ডি পেরোয়নি। দেবনাথ ছিল গ্রিলের মিস্ত্রি আর রঘুনাথ প্রাইভেট বাসের কন্ডাক্টর। এখন রিটায়ার্ড। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিচের তলায় একখানা ঘর নিয়ে থাকে। বাহাত্তরে পড়ল এবার। স্ত্রী আছে। দিদির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর সামনের দিকের দুটো ঘর আনন্দ নিয়েছে। পড়াশুনায় সেও বাপের মতোই। বড় রাস্তার ওপরে একটা রেস্তারাঁয় ওয়েটার। এখন আকাশটা যদি বড় কিছু করে।
নিচের তলায় পেছনের দুটো ঘর নিয়ে সপরিবারে থাকে সোমনাথ। এ হল তার আর এক জ্যাঠতুতো দাদা। বদ্রীনাথ জ্যাঠার ছেলে। সোমনাথটা অবশ্য স্কুল ফাইনাল পাশ করেছিল। সিগারেট-বিড়ি-চা ছাড়া আর তেমন নেশা ছিল না। পুজো-পার্বণে, হয়তো, বন্ধুসঙ্গে একটু মদ। বাইন্ডার ছিল। আশেপাশের কয়েকটা প্রেসে কাজ করে সংসার চলে যেত। বিপ্লব হল সোমনাথের একমাত্র ছেলে। এটা ব্রাইট। গ্র্যাজুয়েট। ইংলিশ অনার্স। একটা কোচিং সেন্টারে পড়ায়। বিপ্লবের টাকাতেই চলে তাদের সংসার।
কল্লোল বিপ্লবকে সিগারেট খেতে দেখেছে। চোখাচুখি হতে বিপ্লব যে ট্যাপ করে নিয়েছে সেটাও দেখেছে। বিপ্লব কবিতা লেখে। কল্লোলকে তার একটা পাতলা বই দিয়েছিল একবার। কল্লোলই চেয়ে নিয়েছিল। তবে পড়ে বিশেষ বোধগম্য হয়নি তার। পরে বিপ্লব জিজ্ঞেস করতে বলেছিলঃ দিব্যি লিখেছিস, আরও লেখ। এবাড়িতে আনন্দ ছাড়া বাকি সকেলেই বিপ্লবকে বেশ সমীহ করে চলে।
বৃষ্টিটা ধরেছে। তাও কল্লোল ব্যাগে ছাতা নিয়ে বেরিয়েছে। সাথে, ব্যাগের ভেতর, যথারীতি, আছে ঝাপ্সা হয়ে যাওয়া নীলচে জলের বোতল আর চশমার খাপ। কল্লোল চলেছে সত্যর মুদির দোকানের দিকে। শ্মশানঘাটের উল্টোদিকে একটা সরু গলির মধ্যে সত্যর দোকান। ওখানে দোকানের পাশের রোয়াক আর প্লাস্টিক টুল মিলিয়ে একটা আড্ডা বসে।
কি রে, রাজা, চললি কোথায়?
এই, একটু, মাল কিনতে।
ও, তা, কী মাল কিনবি?
বাংলা, আবার কী!
কল্লোল দাঁড়িয়ে পড়েছে। গলিতে ঢোকার মুখে। অগত্যা রাজাকেও দাঁড়াতে হল। গলি থেকে বেরোচ্ছিল সে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কল্লোল এটা সেটা বলতে শুরু করল। রাজা শেষটায় অতিষ্ট হয়ে উঠল। ঠিক তখনই ওর মোবাইলটা বেজে উঠল। পকেট থেকে বার করেই কল্লোলের দিকে আঙুলের ইশারায় একটু কথা বলার পারমিশন নিয়ে নিল।
বেশ, তুই, তাহলে, কথা বল। আমি চলি। বলে কল্লোল পা চালাল। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আসলে, কল্লোলের আড্ডা মারার এমনই নেশা, সবসময় যে অনেকে মিলে আড্ডা মারতে হবে তা ঠিক নয়। হয়তো কোনো একজনকে পেল। কথা জুড়ল। তারপর একথা-সেকথা হয়ে সে আড্ডা চলতেই থাকল। সে রাস্তায় দাঁড়িয়েও হতে পারে। কোথাও বসেও হতে পারে। সকাল-বিকেল-সন্ধে-রাত যখন খুশি তখনই হতে পারে। আড্ডা মারাটাই হল আসল কথা।
রাজা ওর যাওয়ার তাকিয়ে মোবাইলে কথা বলতে বলতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ভাগ্যিস, শালা, ফোনটা এসেছিল! নাহলে কল্লোল যে কখন তাকে ছাড়ত বা হয়তো জোর করে নিয়েই যেত কোনো আড্ডায়। কল্লোলটা এরকমই। বৃষ্টি-বাদলার দিন। ওদিকে, বাড়িতে গিলে-মেটে হচ্ছে। তাই দিয়ে কোথায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে বাংলা খাবে, ভাবছে। তা, না, আর একটু হলেই, শালা, কল্লোল চৌপাট করে দিচ্ছিল, তার সাধের প্ল্যান। হয় দেরি করিয়ে দিত। নয়তো মুডটাই কেঁচিয়ে দিত, বাঁড়া, আলবাল গাল-গপ্পো জুড়ে। মনে মনে গজগজ করে উঠল রাজা।
১৯৯৬-এ কল্লোলের ডিভোর্সের ঠিক পরপরই রমানাথের ক্যান্সার ধরা পড়ল। বছর দুয়েক পড়ে পড়ে কষ্ট পেল। সব সঞ্চয় শেষ করে সে মারা গেল। তারপর থেকে তাদের সংসার বলতে শুধু মা আর ছেলে। গ্যসের সিলিন্ডার নেওয়া বন্ধ হয়ে যায় ওই সময়ই। পরে ওভেনটাও বেচে দেয় কল্লোল।
কল্ললের বিয়ের আগ দিয়েই রমানাথ স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসে নিচের ঘরে। ওপর ঘরটা ছেড়ে দিয়েছিল তাদের। তাই নিচের তলার ঘরে মা, এককোণে জানলার ধারে রান্নার আয়োজন আর দোতলায় একলা কল্লোল। এই চলেছিল বহুদিন।
ক্ললোলের মা মারা গেল ২০১২-তে। তার দিদি কাকলি আর জামাইবাবু অনেক করেছিল তার বাবা-মায়ের অসুস্থতার সময়। মায়ের ক্ষেত্রে তো শেষের দিকে কাকলি এখানে এসে নিচের ঘরে মায়ের সাথে থাকত। আর রোজ অফিস ফেরত খবর নিয়ে যেত জামাইবাবু, শৈবালদা। টাকাপয়সা তো খরচ করেইছিল। কল্লোলের তো আর তেমন কোনো সামর্থ্য ছিল না। তবে, হ্যাঁ, নিয়ম করে বাবা-মায়ের ওষুধ-পথ্য নিয়ে আসত কল্লোল। কোনোদিনও মিস হয়নি।
মা মারা যাওয়ার পর কল্লোল তার বাবা-মায়ের খাট বেচে দেয়। ঘুণ ধরে গিয়েছিল। তখন বেচেছিল তাই কিছু টাকা পেয়েছিল, না হলে, ওটাকে স্রেফ ফেলে দিতে হত, আজ।
এরপর নিচের ঘরটা ভাড়া দিয়ে দেয়, পান্নাকে।
সত্যর দোকানে পৌঁছে কল্লোল দেখল, এই বৃষ্টি-বাদলা মাথায় নিয়েও অনেকে এসে পড়েছে। মনটা খুশি হয়ে উঠল তার। স্টিলের গেলাশে চা এল। সাথে প্লাস্টিকের কাপ। একটু পরেই চাঁদা তুলে আসবে মুড়ি-চানাচুর। গৌর, নান্তু, সমীর, সিধু, বুড়োদার সাথে একপাশে বসে কল্লোল একটা বিড়ি ধরিয়ে চুমুক দিল চায়ে। তারপর আস্তে আস্তে ডুবে গেল তার প্রিয় নেশায়। আড্ডায়…
সাক্ষাৎ দেবদূত
সন্ধে নেমে গেছে একটু আগে। পান্না গুমটি ছেড়ে উঠে চা আর সিঙারা খেয়ে এল। তারপর একটু পায়চারী করে বসল বটগাছের চাতালে। গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে আকাশে। বিশু, বাবলুদার স্যাঙাত, এসে হপ্তা নিয়ে গেল। একটা বিড়িও খেল ফোকটে।
পান্না ঠিক করল আজ আর বেশিক্ষণ বসবে না। এমনিতে সাড়ে আটটা-পৌনে নটা অব্ধি বসে। আজকের লাস্ট রিফারটা খাবে। তারপর খুব বেশি হলে ঘন্টা খানেক থেকেই কেটে পড়বে। পুজা আসছে, থানার রেইডও বেড়েছে। কিছুই না, বাঁড়া, পুজোর আগে শালাদের পয়সার খাঁই। পান্না একটা কলি ভেঙে মাল ডলতে শুরু করল।
গান্ডু, এই ভাবে কেউ আলু ছড়ায়? আদ্ধেক আলু নষ্ট করলি। বলেই পান্নাকে একটা চাঁটি মারল তপন।
এই গায়ে হাত তুলবি না, ও নতুন, ওকে শেখা। কাউন্টার থেকে বলে উঠল পলটুবাবু।
পান্না গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তপনদা রোজই তাকে নানান বাহানায় বকাবকি আর খিস্তি করে। চাঁটিও মারে। আজ পলটুবাবু দেখতে পেয়ে ভালোই হয়েছে। শালা, আর আর সাহস পাবে না। বোকাচোদা যেন মায়ের পেট থেকে আলু ছাড়ানো শিখে এসেছে। মনে মনে বলল পান্না। খুব রাগ হয় তার কিন্তু মুখে কোনোদিন কিছু বলতে পারে না।
পলটুবাবু তাকে দয়া করে এই হোটেলে কাজ দিয়েছে। সব্জি কাটা, ডিম সেদ্ধ ছাড়ানো, এঁটো পাত তোলা আর বাসন মাজা। এই হল তার কাজ। তপনদাই মেইন কুক।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে পান্নার সেইসব দিনের কথা মনে পড়তে থাকল। আজ অবশ্য তপনের মতো পাব্লিক তার গায়ে হাত তুললে পাল্টা ঘুষি মেরে পান্না তার থোবনা ফাটিয়ে দেবে। একমাত্র পার্টির কিংবা ক্লাবের ছেলেরা, এলাকার কোনো হুব্বা আর পুলিশই যা তার গায়ে হাত তুলতে সাহস করবে আজকাল।
পলটুবাবু ছিল মীনার বাঁধা বাবু। সত্যিই মীনা পান্নার জন্য সব করেছে! মীনা না থাকলে পান্না এতদিন বেঁচে থাকত না। তার থাকার ব্যবস্থা, তাকে খেতে দেওয়া, তাকে পাব্লিকের ক্যালানি থেকে বাঁচানো এমনকি তার প্রথম চাকরিও মীনার দৌলতেই পাওয়া।
ইস! মীনা যখন মারা গেল করোনায়, পান্না তার দাহকাজটাও করতে পারেনি। তার বডি পুড়িয়ে দিয়েছিল সরকারি লোকজন। গণচিতায়। ভাবলেই পান্নার কান্না পায়। মীনাকে সে মায়ের মতোই দেখত। সন্তান স্নেহে তাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে সে।
পলটুবাবু মীনার কাছে যখন আসা শুরু করে তখন পান্নার বয়স পনেরো। তারপর আস্তে আস্তে যখন পলটুবাবু মীনার বাঁধা হয়ে গেল, বছর খানেকের মাথায়, তখন মীনাই একদিন সেক্স করার পর পান্নার জন্য সুপারিশ করে। যদি তার ভাতের হোটেলে কোনো কাজ হয়। পলটুবাবু সটান না বলে দেয় কারণ পান্না মাইনর। তবে বলেছিল পান্নার আঠারো হয়ে গেলে সে ভেবে দেখবে। তো, সেই আঠারো বছর বয়স হলে, মীনা আবার পাড়ে পান্নার চাকরির কথা। বাঁধা মেয়েমানুষের কাছে তার কথার দাম রেখেছিল, পলটুবাবু। ভদ্রলোক বলতে হবে।
অবশেষে, একদিন, বছর আঠারো-উনিশের পান্না সোনাগাছি ছেড়ে বেরোতে পারল। চলে এল এই উত্তর শরতলিতে। পান্নার মনে হয়েছিল যেন সে স্বর্গে এল। ওঃ সেই দিনটার কথা পান্নার আজও মনে আছে। সারা জীবন মনে থাকবে। অমন শুভদিন তার জীবনে খুব বেশি আসেনি। মন্দিরে পুজো দিয়েছিল সে সেদিন। চলে আসার আগে দুহাতে ফুল ছড়িয়ে দিয়ে এসেছিল ফুটপাথের সেইখানটায় যেখানটাতে তার মা মারা গিয়েছিল। সাথে রেখে এসেছিল অস্ফুট কান্না খানিক যা কেউ শুনতে বা দেখতে পায়নি।
এরপর থেকে পান্না আর কোনোদিন সোনাগাছি যায়নি। মীনার সাথে সে দেখা করত সোনাগাছির বাইরে। প্রথম মাইনেতে পান্না মীনাকে উপহার দিয়েছিল একটা চিরুনি আর কয়েক পাতা নানা রঙের টিপ।
সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। ফেরিঘাটের সামনে এসে পান্না দেখল, টিকিট কাউন্টারের পাশে সিমেন্টের বেঞ্চিটাতে বসে জনাকয়েক পাব্লিকের সাথে আড্ডা মারছে কল্লোল। তাদের কেউ কেউ বসে আছে বেঞ্চিতে আর বাকিরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারছে। ও ওদের ক্রশ করে চলে গেল। কল্লোল আড্ডায় মশগুল। খেয়াল করল না পান্নাকে। করলে হাত তুলে হাসত।
ওই ভাতের হোটেলে প্রথম দিনেই তার সাথে দেখা কল্লোলের। শুধু দেখা নয় আলাপও। পলটুবাবুই করিয়ে দিয়েছিল। পান্নার ভাগ্য! তার দরকার ছিল একটা ঘরের। সেই দিন সকালেই সে সোনাগাছি ছেড়ে এসেছে। হোটেলেই আপাতত রাতে শোবে ঠিক আছে। সাথে একটা চটের ব্যাগ ছিল খালি।
পলটুবাবুর হোটেলটা ছিল মোটামুটি বড় আর পাকা। সামনে কাউন্টার আর তার পাশে রান্নার জায়গা। পেছন দিকে দুটো বড় বড় টেবিল। দুপাশে বেঞ্চি পাতা। প্রতি টেবিলে ছজন করে বসতে পারত। পেছন দিকে দেওয়ালের কোণায় ছিল বেসিন আর মাঝখানে লোহার গ্রিল দেওয়া একটা জানলা। যেটা বন্ধই থাকত। দুটো সিলিং ফ্যানও ছিল। হোটেলের সামনে বড় বড় দুটো গামলায় বাসন মাজত পান্না। একটা বড় ড্রাম ছিল জলের আর একটা এঁটো পাতা ফেলার।
তো, যাইহোক, সেইদিন, সবার খাওয়া শেষ। চলেও গেছে খদ্দেররা। লাস্ট কয়েকটা বাসন মেজে নিয়ে পান্না ঢুকেছে হোটেলের ভেতর। তপনদা আর দীপকদা রান্নাঘরের সব কিছু গুছিয়ে নিচ্ছে। কল্লোল বসে বসে আড্ডা মেরে যাচ্ছে পলটুবাবুর সাথে।
এই নতুন ছেলেটাকে কোত্থেকে জোগাড় করলি, রে, পলটু? পান্না মাজা বাসন নিয়ে দোকানে ঢুকতেই, চোখের ইশারায় তাকে দেখিয়ে, প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল কল্লোল।
ওই, একজন দিল। বাপ-মা মরা ছেলে। পলটুবাবু বেশি ভাঙল না। তারপরেই বললঃ শোন না, বলছি কি এর একটা ঘর লাগবে, একদম কম টাকায় বুঝলি? একটু দেখ না।
আরে, আমিও তো ভাবছি একতলার মায়ের ঘরটা ভাড়া দিয়ে দেব। প্রশান্তকে কালই বললাম ভাড়াটে দেখতে। বেশ তো, ওই থাকবে না হয়। যা দিতে পারবে দেবে। বলে কল্লোল পান্নার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলঃ চল, যাবি নাকি, দেখে আসতে?
শুনেই, পান্নার মনে হল যেন হাতের বাসনগুলো সব ঝনঝন করে পড়ে যাবে মাটিতে, তার হাত থেকে। কপাল মাইরি! একদম অবাক আর সাঙ্ঘাতিক কৃতজ্ঞতা মেশানো চোখে ভালো করে তাকাল কল্লোলের দিকে। আগে ভালো করে সে নজর করেনি কল্লোলকে। কল্লোল যখন খেতে ঢুকল পান্না তখন বাইরেই ছিল। বাসন মাজছিল। তাকাতেই তার মনে হল, সামনে বসে তার দিকে চেয়ে ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি নিয়ে যে তার উত্তরের প্রত্যশায়, সে মানুষ নয় কোনো, এক দেবদূত যেন!
তার মায়ের আশীর্বাদ তো আর বিফলে যেতে পারে না! পান্নার আবার তার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। কনোমতে বাসনগুলো রেখে হাত দুটো জোড় করে দিল কল্লোল ও পলটুবাবুর সামনে। চোখ ছলছল করছিল তার।
আরে ঠিক আছে, পাগলা, আর, নমস্কার করতে হবে না। তোর কাজ সেরে নে, তারপর চল, বেরিয়ে পড়ব। হাসিমুখে বলল কল্লোল।
একদম ছবির মতো সব মনে পড়ে গেল পান্নার। সে প্রায় বারো বছর আগের কথা। বড় রাস্তার ওপর ইন্ডিয়ান ব্যাংকে অ্যাকাউন্টটাও, পলটুবাবুর বলাতে, একদিন কল্লোলই খুলিয়ে দিয়েছিল তাকে।
বাড়ির কাছাকাছি এসে, মিলন সংঘ মাঠের পাশে, একটা রুটির দোকান থেকে পান্না রুটি, চিকেন কষা আর আলুমটর কিনল। একটা বিড়ি ধরিয়ে সোজা হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।
লক ডাউনে ভাতের হোটেল যখন বন্ধ হয়ে গেল তারপর অনেকদিন কল্লোল পান্নার থেকে কোনো ভাড়া নেয়নি। চালে-ডালে-আলুতে ফুটিয়ে খেত পান্না আর কল্লোল। সাথে ডিম সেদ্ধ, কাঁচা লঙ্কা আর সরষের তেল। পান্নাই বানাতো। তার টাকাও দিত কল্লোল।
কল্লোলের পুরনো স্টোভটা তখনও জ্বলত।
গোপন কথা ও এক বড় সিদ্ধান্ত
বাড়ি ফিরে স্নান করে পান্না গায়ের ওপর ছড়িয়ে দিল ডিও। এটা রুবি তাকে উপহার দিয়েছে। পান্না বলে ‘ফুস ফুস’। ওঃ গায়ে মাখলেই কী দারুন আরাম! আর গন্ধের তো তুলনাই নেই। পান্না যে কোনোকালে ডিও মাখবে গায়ে তা সে কল্পনাও করেনি। এও হয়তো তার মায়েরই আশীর্বাদ!
দেওয়ালে টাঙানো লাল ফ্রেমের ছোট্ট আয়তকার আয়ানাটার সামনে দাঁড়িয়ে পান্না চুল আঁচড়াতে থাকল। জলের ছিটে পড়ে খানিক ঝাপ্সা হয়ে গেছে আয়নাটা। মোছা হয়নি অনেকদিন।
পান্না চৌকিতে আধশোয়া হয়ে একটা বিড়ি ধরাল আরাম করে। একটাই মাত্র মাথার বালিশ। দেওয়ালে ঠ্যাস দেওয়ানো। লাল-হলুদ ফুলের নক্সা আঁকা কভারটা একটু ছিঁড়ে গেছে। সামান্য ময়লাও। ম্যাচিং বেড কভারটাও ময়লা হয়েছে। বিড়ির আগুন ঝরে ফুটো হয়ে গেছে দু-এক জায়গায়।
আধঘন্টা হল। অল্প অল্প বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। রুবিকে একটা মেসেজ করতে যাবে আর ঠিক তখনই বাইরের দরজায় নক পড়ল। পান্না উঠে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলঃ কে?
আমি বিপ্লব, দরজা খোল।
পান্না দরজা খুলে দিল।
ছাতা ভাঁজ করতে করতে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বিপ্লব বললঃ তোর ঘরে আলো জ্বলছে দেখে নক করলাম। আজ তাড়াতাড়ি ফিরেছিস?
হ্যাঁ, বৃষ্টি-বাদলা তাই।
ভালো করেছিস। দে, একটা খাম দে, দেখি।
বিপ্লব এবাড়ির চেহারা পেয়েছে আর সেটাই স্বাভাবিক। পান্নার থেকে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা। ভালো স্বাস্থ্য। ট্রিম করা দাড়ি-গোঁফ।। যত্ন করে ছাঁটা চুল। চোখে-মুখে একটা দীপ্তি আছে। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। কালোর মধ্যে হালাকা সবুজের কাজ করা একটা কুর্তা, হাতাদুটো সামান্য গোটানো। ব্র্যান্ডেড জিন্স আর কিটো। বুকের ওপর আড়াআড়ি রাখা ছোট সাইডব্যাগ। হাল ফ্যশনের। ভিজে গেছে অল্প।
বিপ্লব মাল নিয়ে টাকা দিয়ে পান্নার ঘরের ভেতর দিকের দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর চলে এল। বৃষ্টির বারান্দায় কেউ নেই। তাই কেউ লক্ষ্য করল না ব্যাপারটা। পান্না ছাড়া এবাড়ির কেউই জানে না যে বিপ্লব তার খদ্দের।
আসলে বিপ্লব যে ঠেক থেকে আগে গাঁজা স্কোর করত এখন সেই ঠেকটাই চালায় পান্না। তাদের বাড়ির কাছে পড়ে জামতলার রতনের ঠেকটাই। কিন্তু বিপ্লব ওখান থেকে স্কোর করত না। ওখানে এপাড়ার গাঁজাখোররা যেত। তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ বিপ্লবের স্টুডেন্ট বা এক্স-স্টুডেন্ট। এই ঠেকটা দূরে বলে এখানে তাদের পাড়া বা আশেপাশের গাঁজাখোররা আসেনা।
লক ডাউন উঠে যাওয়ার পরও বেশ কিছু দিন বন্ধ ছিল সেই ঠেক। বিপ্লব তখন আরও দূরে অন্য একটা ঠেক থেকে স্কোর করত। তারপর একদিন সে ঠেক খুলেছে কিনা দেখতে গিয়ে দেখে খুলেছে। চালাঘরে উঁকি দিতেই দেখে প্রদীপের জায়গায় পান্না। খুবই অবাক হয়ে যায় বিপ্লব। পান্নাকে তো সে প্রায় দশ বছর আগে থেকেই চেনে। একই বাড়িতে থাকে তারা। সেই পান্নাই কিনা আজ গাঁজা বেচছে!
তুই? বিস্মিত বিপ্লব। তারপর জিজ্ঞেস করললঃ প্রদীপদা নেই?
তুমি? পান্না চমকে গেছে। বাড়িতে বলো না, প্লিজ। পান্না ধরা গলায় অনুরোধ করল।
না, না, আর তুইও কাউকে বলিস না কিছু। সাবধানী বিপ্লব। দে, একটা বড় খাম, দে।
প্রদীপদা করোনায় মরে গেছে। এখন আমিই বসছি। পান্না ব্যাগ থেকে খাম বার করতে করতে বলল।
ওহ! বলে বিপ্লব খাম নিয়ে টাকা দিয়ে বেরিয়ে গেল ঠেক ছেড়ে।
এরপর থেকে আর বিপ্লব ঠেকে যায় না। বাড়িতেই স্কোর করে নেয় স্টক।
বিপ্লব যে গাঁজা খায় এটা তার মা আন্দাজ করলেও করে থাকতে পারে। তার বাবা সোমনাথ তার ঘরে তেমন আসে না। মা ঘর পরিস্কার করতে এসে হাল্কা গন্ধ পেলেও পেতে পারে। তবে কোনোদিন কিছু বলেনি তাকে। যদিও বিপ্লব ঘরের পেছনের দিকে অর্থাৎ বাড়ির বাইরের দিকের জানলা খুলে দিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে জয়েন্ট খায়। তারপর রুম ফ্রেশনার দিয়ে দেয়। ঘরে গাঁজার গন্ধটা সে নিজেও পছন্দ করে না, একদম।
বিপ্লব একতলার বারান্দা ধরে হেঁটে গিয়ে ডানহাতের শেষ ঘরটাতে ঢুকে গেল। একটা সাদা-কালো বিড়াল বসেছিল দরজার পাশে। বিপ্লবের পিছুপিছু ‘ম্যাও-ম্যাও’ স্বর তুলে সেও ঢুকে গেল ঘরের ভেতর। ওটা বিপ্লবদের পোষা বিড়াল। মর্জিনা। নাম রেখেছে বিপ্লব।
বিপ্লব চলে যাওয়ার একটু পরেই রুবি এল পান্নার ঘরে। আগেই মেসেজ করে দিয়েছিল। পান্না ভেতর দিকের দরজাটা খোলাই রেখেছিল। চৌকিতে আধশোয়া হয়ে বিড়ি টানছিল।
রুবি ঘরে ঢুকে বিছানায় বসতে বসতেই বলে উঠলঃ আমি ডিসাইড করে নিয়েছি। আমি তোমার সাথে যাব। তুমি বাড়ি দেখা শুরু কর। চটপট।
সত্যি! পান্না বিস্মিতি ও উচ্ছ্বসিত, যুগপৎ। উত্তেজনায় উঠে বসেছে বিছানায়।
আচ্ছা বেশ, আমি দেখা শুরু করছি তবে। কালই একবার রতনদাকে বলব, তাহলে। কাল সকালে রতনদার ওখানে যাব, মাল তুলতে। পান্না বিড়িটা ধরাতে ধরাতে বলল।
হ্যাঁ, একটা ঘর আর বাথরুম হলেই চলবে আমার। আর বাড়িটা এরকম পোড়ো-ভুতুড়ে না হলেই হল। রুবি বিছানার ওপর আয়েশ করে বসেছে।
ঠিক আছে, আমি দেখছি। পেলে তোমাকে নিয়ে যাব দেখাতে। তারপর দুজন মিলে ঠিক করব। কেমন?
বেশ, রাতের জন্য কী এনেছো?
তোমার জন্য রুটি আর চিকেন কষা।
আর তোমার জন্য?
রুটি-আলুমটর।
তুমি চিকেন খাবে না কেন?
আমি দুপুরে চিকেন-ভাত খেয়েছি, তাই।
ও, আচ্ছা।
বিড়ি টানতে টানতে আবার আধশোয়া হল পান্না। খুব খুশি সে। একদিকে যেমন নিশ্চিন্ত লাগছে তেমনই আবার মনে-মাথায় একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছে, একটা আনন্দ হচ্ছে, খুব।
রুবি এবার কাছে এসে পান্নার বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। পান্না আধখাওয়া বিড়িটা ভাঁড়ে গুঁজে দিয়ে রুবিকে জড়িয়ে ধরল, এক হাত দিয়ে। রুবির গায়ের আর চুলের গন্ধটা নিল কিছুক্ষণ। তারপর ওরা আদরে আর সোহাগে ডুবে গেল…
সোয়া নটা নাগাদ রুবি পান্নার ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে উঠে রুটি-চিকেন কষা নিয়ে চলে গেল। দুপুরে ভাত খেয়েছে, সাথে ডাল, আলুর চোখা আর অমলেট। চা, ম্যাগি, টোস্ট, ডিমসেদ্ধর পাশাপাশি রুবি এটুকু রান্নাবান্না পারে। মিতালি শিখিয়েছে তাকে। মাছে তার কোনো রুচি নেই। পান্নারও না।
আজ মিতালিও দুপুরে খেয়েছে। ঘুম না ভাঙলে মিতালি অনেক দিনই দুপুরে কিছু খায় না। রাতে খায় দুধ-মুড়ি বা দুধ-সাবু। কোনো কোনো দিন আবার শুধু দুধটুকু খেয়েই কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আজ রুবি আসার আগে দেখে এসেছে, মিতালি ঘুমিয়ে পড়েছে।
যাওয়ার আগে রুবি পান্নাকে বলে গেল যে রাতে সে আবার আসবে।
রুবি চলে গেলে, পান্না ভেতরের দিকের দরজাটা ভেজিয়ে দিল। ছিটকিনি দিল না। বিছানায় বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে জুত করে টানতে থাকল। মনটা দারুন খুশিতে ভরে উঠেছে আজ।
শেষমেষ, রুবি তাহলে তার সাথে যাচ্ছে! ওঃ এতদিনের অপেক্ষার পর রুবি তাকে সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করেছে! পান্না প্রায় আত্মহারা। সেই চয়ন মারা যাওয়ার মাস দুয়েক আগে থেকে শুরু তাদের মেলেমেশা। আস্তে আস্তে ভালোবাসা হয়ে এবার তবে নিজেদের নতুন একখানা বাসাও হবে তাদের! পান্না স্বপ্নতাড়িত। বিড়িতে ঘনঘন টান মেরে চলেছে।
রুবি যখন ভেবে নিয়েছে একবার তখন তাইই তো হবে। রুবির সিদ্ধান্তই যে তার সিদ্ধান্ত।
পান্না বিড়িটা শেষ করে গুঁজে দিল ভাঁড়ে। মনের ভেতরটা যেন ফুটছে, টগবগ করে।
স্বপ্নহীন মানুষ এক
কল্লোল ফেরিঘাটের আড্ডা ছেড়ে উঠে পড়ল। এবার যাবে নকুলের মিষ্টির দোকানে। সেই রূপনগর বাজারের কাছে। রোজই যায়। বৃষ্টি নেমেছে আবার ছাতা মাথায় দিয়ে কল্লোল পা চালাল।
নকুলের দোকানের পাশে দুটো কাঠের বেঞ্চিতে আড্ডা বসে। দেবু, কমলদা, শুভদা, বিশ্বকর্মা এরা সব এসে জড়ো হয়। মাঝে মাঝে আসে অমিতাভ আর কিংশুক। দারুন জমাটি আড্ডা হয়। আড্ডা শুরু হয়ে যায় সন্ধে সাতটা-সাড়ে সাতটা থেকেই। কল্লোল অবশ্য তার অন্যান্য আড্ডা মেরে এখানে এসে বসে নটা-সোয়া নটা নাগাদ।
না রে, বাবা, না, যন্ত্র কখনোই পুরোপুরি মানুষের জায়গা নিতে পারবে না। কথাটা বলল কমলদা।
ঠিকই বলেছ। আমিও তাই মনে করি। যদিও শুনেছি, অনেক কিছুই নাকি করতে পারে মানুষের মতো। শুভদা সিগারেটে একটা টান মেরে ধোঁয়া ছেড়ে বলল। তারপর একটু থেমে বললঃ শুনেছি তো, কোড করে নাকি ভরে দেয় ভেতরে। ওতেই নাকি লেখা থাকে সব। কী কী করতে হবে।
না, এখন এই যে সব বট মানে রোবট তৈরী হচ্ছে সেগুলো লাইভ সিচ্যুয়েশন বুঝে রিয়্যাক্ট করতে পারে। নিজে থেকেই। সব কিছু আগে থেকে প্রোগ্রামিং করা থাকে না। মানে শিখিয়ে দেওয়া থাকে না। দেবু কথাটা বিশদে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল। খুবই উত্তেজিত। কথাটা ওই পেরেছে।
দেবুর বক্তব্য একদিন রোবটই মানুষের সব কাজ সামলাবে। ওদিকে কমলদা আর শুভদা সেটা বিশ্বাস করে না। তারা নানান কাজকর্ম যা মানুষ পারে তা রোবট কী করে করতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন করে যাচ্ছে। আর দেবু তাদের নানান যুক্তি, অজানা উদাহরণ ও উপায় দেখাচ্ছে।
কল্লোল চুপ করে শুনছিল। খানিক আগেই এসে বসেছে নকুলের দোকানের পাশে। আজ বৃষ্টি-বাদলা বলে শুধু আড্ডার লোক কম, তারা চারজনই আছে শুধু। দেবু কম্পিউটারের একটা কোর্স, বিসিএ না কী একটা পাশ করেছিল। সল্টলেকে একটা কোম্পানিতে চাকরি করে । নকুলের দোকানের ওপরে তিনতলার ফ্ল্যাটে থাকে। রোজই রাত আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ অফিস ফেরতা এখানে কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে ওপরে চলে যায়।
শুভদার থেকে সিগারেটের কাউন্টারটা নিয়ে টান মেরে, হঠাৎ কল্লোল দেবুকে উদ্দেশ্য করে বলে বসলঃ আচ্ছা, দেবু, আমায় একটা কথা বল, তোদের এই রোবট কি স্বপ্নও দেখতে পারে বা কখনও স্বপ্ন দেখতে পারবে কি? মানে মানুষের মতো করে। কী দেখবে কিছুই জানে না। আবার যা যা দেখবে তা সব মনেও রাখতে পারবে না। এমন হয় কি বা হবে কি, কখনও?
এটা দেবুও দেখা গেল ঠিক জানে না। ও আমতা আমতা করতে থাকল। তারপর সব শেষে বললঃ
ব্যাপারটা নিয়ে আমি একটু রিসার্চ করে তোমায় বলব। বলেই মোবাইলটা একবার দেখে নিয়ে বললঃ যাক, সাড়ে নটা বেজে গেল। আজ উঠি।
আরে, বোস না, আর একটু। কাল তো তোর ছুটি। বলল শুভদা।
না, গো, আজ উঠি। দেরি হলে আবার বউ খচে যাবে। বলে হেসে, দেবু উঠে, ফ্ল্যাটবাড়ির গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
আরও কিছুক্ষণ গেঁজিয়ে কল্লোল দুশো টক দই কিনে বাড়ি ফিরে এল।
কল্লোল জলে ভেজানো চিঁড়ে, দই আর চিনি দিয়ে মাখছে, একটা মাঝারি সাইজের স্টিলের বাটিতে। তার মা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ার পর থেকে কল্লোলের ডিনার দই-চিঁড়ে কিংবা দই-খই। তার মাও রাতে তাইই খেত। যতদিন বেঁচে ছিল।
খাওয়া দাওয়া সেরে, বাথরুমে গিয়ে বাটি ধুয়ে, হিসু করে, কল্লোল ঘরে এসে ঢুকল। ঢকঢক করে জল খেল বোতল থেকে। জলের বোতলটা আবার খাটের পাশের টেবিলে নামিয়ে রাখল। খাটে বসে একটা বিড়ি ধরাল, ধীরেসুস্থে ।
আজ, রোবট স্বপ্ন দেখতে পারে কিনা এই নিয়ে কল্লোল যে প্রশ্নটা তুলল তার প্রসঙ্গ ধরে একটা কথা এখানে বলা যায় যে কল্লোল হল একজন স্বপ্নহীন মানুষ। মানে, এই নয় যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আলবাল হিজিবিজি স্বপ্ন সে দেখে না। তা দেখে। কিন্তু তার আশেপাশে আর সব মানুষের যেমন স্বপ্ন থাকে, এই যেমন কেউ বাড়ি করবে, কেউ অনেক টাকা করবে, কেউ গাড়ি করবে, কেউবা বিয়ে করবে, কেউ ছেলে-মেয়েকে বড় স্কুলে পড়াবে, এইসব, মানে, যাকে আমরা বলি জীবনের স্বপ্ন। সেরকম কোনো স্বপ্নই কল্লোলের নেই। বহু বছর। শুধু আড্ডা মেরে দিন কাটিয়ে যাওয়া। তাই, তার না আছে কোনো চিন্তা, না আছে কোনো আক্ষেপ, না তো কোনো মনকষ্ট। দারুন ঘুম হয় রাতে।
বিড়িটা শেষ করে, উঠে ঘরে আলো নিভিয়ে এসে কল্লোল যখন বিছানায় টানটান হল তখন রাত প্রায় এগারোটা। বেশ জোরে বৃষ্টি হচ্ছে।
বিপ্লবের ব্যাপার স্যাপার
আজ সকালে বিপ্লব দেরি করে ঘুম থেকে উঠল। প্রায় নটা বাজছে। আজ তার পড়ানো নেই। টেবিলের ড্রয়ারের লক খুলে বার করল একটা চ্যাপ্টা টিনের বাক্স, তালুসমান। ওখানেই থাকে তার গাঁজা আর ফিল্টারের প্যাকেট। খাটে বসে বাক্সের ঢাকনাটা খুলে রাখল বিছানার ওপর। তার মধ্যে দু-তিন কলি গাঁজা, ছোট লিফের প্যাকেট আর কয়েকটা সরু ফিল্টার। বাক্সের ডালায় গাঁজা আর সিগারেটের তামাক মেশাতে থাকল।
জয়েন্ট বানানো হলে উঠে ঘরের পেছনের দিকে জানলা দুটো খুলে দিল। জানলার ওপাশে স্কুলবাড়ির মাঠ। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাঁদিকের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে জয়েন্টটা ধরাল। আয়েশ করে একটা টান মেরে মনে মনে বললঃ না, পান্না স্টাফটা দেয় খাসা! প্রদীপদা এত ভালো স্টাফ দিত না।
জয়েন্ট শেষ করে রুম ফ্রেশনার দিয়ে খাটে এসে বসল। একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে তার মনে হল, আসলে নেশা নয়, তার পূর্বপুরুষের লেখাপড়া না শেখা আর ব্যলেন্সের অভাবেই আজ এই বাড়ির এই দশা।
নেশা তো সেও করে। জয়েন্ট, দিনে দু-তিনটে। এক প্যাকেট ছোট গোল্ডফ্লেক। দু-তিন মাসে এক-আধবার মদও খায়। সস্তা হুইস্কির নিপ তুলে নেয় বড় রাস্তার ওপর কাউন্টার থেকে। মদ-গাঁজা অবশ্য সে পাড়ায় বা আশেপাশে বসে কোথাও খায় না। বাড়িতেই খায় শুধু। এছাড়া, বিপ্লব মদ-গাঁজা খেলে খায়, এলাকার বাইরে, তার লেখক-কবি বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে, ওই বইমেলা, লিটল ম্যগাজিন মেলা, এইসবে অথবা যদি কখনও কয়েকজন মিলে কোনো সস্তা বারে যাওয়া হয়, তখন।
সেই কিশোর-যুবা বয়স থেকেই বিপ্লব নেশা করে আসছে। সিগারেট নিয়মিত ধরে সতেরোয়। তখন অবশ্য দিনে দুটো-তিনটে খেত। গাঁজা ধরেছে উনিশে। মদও ওই সময়ই। আর আজ তার ছত্রিশ বছর বয়স হল। কই, তার তো করে খেতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না? এর কারণ দুটো। এক সে পড়াশুনা শিখেছিল। তাই পড়িয়ে রোজগারটা করতে পারছে। আর দুই হল সে কখনওই বেসামাল হয়নি। নিজেকে ধরে রেখেছে যতটা সম্ভব। তার সুচারু ব্যালেন্সেই সে বাঁচিয়ে নিয়েছে তার ইহজীবনের ঘরবাড়ি ও সামাজিক সম্মানটুকু, আজ। তাই সে সংসারে মাসে মাসে টাকা দিতে পারছে। তাদের সংসার একরকম ভালোই চলছে। তার বাবা এখন আজ কাজ করতে পারে না। সাতষট্টিতে পড়ল এবার।
পাড়ায় একজন দুজন ছাড়া তার তেমন বন্ধুবান্ধব নেই। তাদের সাথে ওই চা-সিগারেট, ব্যাস। প্রাইভেট টিউটর হিসেবে এলাকায় তার সুনাম ও সম্মান দুইই আছে। বিপ্লব সেটা বাঁচিয়ে আসছে বরাবর। কোনো দাগ লাগতে দেয়নি।
বিপ্লব অনেকবার সোমনাথকে বলেছে বাড়ি ছেড়ে আশেপাশে অন্য কোথাও বাড়ি ভাড়া নিতে। সোমনাথ রাজি হয়নি। এ বাড়িটার এমন হতশ্রী দশা যে আর থাকতে মন চায় না বিপ্লবের। দোতলার দিকে তো বাইরে থেকে আর চাওয়াই যায় না। তাদের অংশটাই অবশ্য সব থেকে তকতকে আছে। বাপ-ব্যটায় মিলে বছর সাতেক আগে ঘরের সিলিং-দেওয়াল রিপেয়ার করেছিল। রঙও করেছিল ঘরে ভেতরে-বাইরে। বছর দুয়েক আগে সে নিজের টাকাতেই তাদের ঘর দুটোর আর বাথরুমের সামনের বারন্দার কিছু কিছু জায়গা নতুন করে বাঁধিয়েছে। সিমেন্ট উঠে গর্ত গর্ত গিয়েছিল। ওতেই, একদিন রাতে বাথরুমে যেতে গিয়ে, পা পড়ে মচকে তার মা বেশ কিছুদিন ভুগেছিল।
আসলে সোমনাথ যে ভাড়াবাড়িতে যেতে রাজি হয়নি তা এই বাড়ির প্রতি তার কোনো ইমোশনের কারণে নয়। বাড়ি ভাড়া নিলে তাতে বিপ্লবেরই তো খরচ বাড়বে, তাই। এ বাড়িতে সোমনাথেরও কোনো মোহ নেই। আলাদা ঘর বা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য তার ছিল না বলেই ভাগের ঘরে থেকে যাওয়া।
সিগারেট শেষ করে বিপ্লব ঘর থেকে বেরিয়ে ঢুকে গেল বাথরুমে। এরপর তার মা চা দেবে। বিপ্লবের লিকার। চিনি এক চামচ।
বিপ্লব ঘরের সামনে বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে চা খাচ্ছিল। মর্জিনা বসে ছিল ঠিক তার গা ঘেঁষেই। দোতলার বারান্দায় মিতালিকে দেখতে পেল বিপ্লব। চোখাচুখি হতেই ও হাত নাড়ল। মিতালি তেমন সাড়া দিল না। শুধু তার মুখে সামান্য একটা হাসির আভাস ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। মিতালি ঘরে চলে গেল। বিপ্লব চা খেতে খেতে মর্জিনাকে আদর করতে থাকল।
ভালো লাগছে? লাগছে না, তো? বিপ্লব জিজ্ঞেস করল, হাঁফাতে হাঁফাতে।
খুব ভালো লাগছে। না, লাগছে না। থেমো না, করো, করো। জড়ানো গলায় বলে উঠল মিতালি।
করা হয়ে গেলে মিতালিই দরজা খুলল। সন্তর্পণে দেখে নিল আশপাশ। কেউ নেই বারান্দায়। তারপর বিপ্লব চোরের মতো মিতালির ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে গেল।
বিপ্লব একটা সময় মিতালির সাথে শুতো। তখন সমীরণ অলরেডি মিতালির জীবন নরক করে তুলেছে। সমীরণ সম্পর্কে মোহভঙ্গ হয়ে গেছে তার। মদ্যপ অবস্থায় আর লাগাতেও পারত না অধিকাংশ দিন। বেশ কয়েকবার মিতালি আর বিপ্লব সেক্স করেছিল। সমীরণ বা চয়ন কেউই সেই সেই সময় বাড়িতে ছিল না। কল্লোলও না। বছর দুয়েক চলেছিল ব্যাপারটা। তারপর আস্তে আস্তে একদিন বন্ধ হয়ে যায়।
তারা দুজন ছাড়া, বোধহয়, এবাড়ির আর কেউই ব্যাপারটা জানত না। বোধহয় নয়, নিশ্চয়ই জানত না। বিপ্লববের দৃঢ় বিশ্বাস।
এসব প্রায় বছর দশেক আগের কথা।
বিপ্লব স্নান-খাওয়া সেরে নিল। আজ ঝরঝরে ভাতের সাথে হয়েছিল মুগ ডাল, বেগুন ভাজা, মোচার ঘন্ট আর লাউ-চিংড়ি। শেষের দুটো পদ তার মায়ের হাতে যেন অমৃত!
রান্না-খাওয়া হয় তার বাবা-মায়ের ঘরেই। বলতে নেই, এবাড়ির ঘরগুলো সব পেল্লায় পেল্লায়। ঘরের পেছনের একটা জানলার পাশ ঘেঁষে সিমেন্ট বাঁধানো গ্যাসের টেবিল। তার এক কোণে সিঙ্ক। দু-বার্নারের ওভেন আর গ্যাস সিলিন্ডার। এসব তার বাবা, সোমনাথই করেছিল। নতুন ফ্রিজ আর মাইক্রোওয়েভ, বিপ্লবের কৃতিত্ব। মাটিতে আসন পেতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা। রাতের খাবারটা অবশ্য বিপ্লব তার নিজের ঘরে খায়, পড়ার টেবিলে। খাবার গরম করে তার মা দিয়ে যায়, ঘরে। রাতের রুটি নিয়ে আসে সেই। মাঝে সাঝে, আনে তাদের ফেভারিট, চাইনিজ কিংবা বিরিয়ানি।
গতবছর, বাবা-মাকে একটা স্মার্ট টিভি কিনে দিয়েছে বিপ্লব। তাদের বিবাহবার্ষিকীতে। দুজনেরই খুব সিরিয়াল দেখার নেশা। সন্ধে থেকে তাতেই বুঁদ হয়ে থাকে। সিরিয়ালের সুখ-দুঃখ গভীর ছাপ ফেলে তাদের মনে-মাথায়, বিপ্লব লক্ষ্য করেছে তা।
বিকেল চারটে নাগাদ একটা জয়েন্ট খেয়ে বিপ্লব বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। যাবে কলেজ স্ট্রিট। ওখানে কফি হাউসে রোজ শনিবারের আড্ডা হয় তাদের। মূলত ছোট পত্রিকার কবি-লেখক-সম্পাদক-প্রকাশক মিলে জড়ো হয় টেবিলে। রাত আটটা অব্ধি চলে আড্ডা। যে যার সময় মতো উঠে যায়।
কফি হাউসে আজ অনেকদিন পর বিপ্লবের সাথে বিদিশার দেখা হল। লেখালিখির সুত্রেই আলাপ হয়েছিল। বিদিশা তার থেকে কয়েক বছরের ছোট। একটা ইংলিশ মেডিয়াম স্কুলে পড়ায়। বেশ কয়েক বছর আগে একটা সময় তারা দুজনে কিছুদিন সম্পর্কে ছিল। ঠিক প্রেম নয়। ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিট বলা চলে। মানে খুব ভালো বন্ধু ও বান্ধবী, সাথে ক্যাজুয়ালি শোয়াশুয়ি।
অনেকদিন কোনো আর কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। বিদিশার বিয়েও হয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি ডিভোর্স হয়েছে। বছর পাঁচেকের ছেলেকে নিয়ে আপাতত বাপের বাড়িতে আছে। শিগ্গিরি নাকি ফ্ল্যাট নেবে রেন্টে। ওর স্কুলের কাছে। এতদিন পরে দেখা হয়ে বিপ্লবের খুব ভালো লাগল।
সে রাতে কফি হাউস থেকে ফিরে বিদিশার সাথে বিপ্লবের অনেকক্ষণ কথা হল। নতুন করে আবার নম্বর দেওয়া নেওয়া হয়েছিল কফি হাউসেই। পুজোর ঠিক পরপরই দিন দুয়েকের জন্য বোলপুর যাওয়ার প্ল্যান হল। পুরনো সম্পর্কটা একবার ঝালিয়ে দেখবে। ক্যাজুয়ালি, দুজনে।
এই পথে এই ভাবে এই চলে আসা
পরের দিন পান্না রতনের ঠেকে গিয়ে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার কথাটা পাড়তেই রতন ফিক করে হেসে ফেলল। হাসতেই হাসতেই জিজ্ঞেস করলঃ বিয়ে করচিস নাকি?
পান্না মাথা নামিয়ে লাজুক ভাবে বললঃ হ্যাঁ। করব, ঠিক করেছি।
রতন খুশি হয়ে চোখ দুটো ছোট করে মিটিমিটি হেসে বললঃ হুমমম, বুজেচি, বাঞ্চোত। তা, কেমন ঘর চাইচিস? একটা ঘর আর একটা বাদরুম হলে চলবে?
পান্নাঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাতেই হবে। খালি খুব পুরনো না হলেই হল।
রতনঃ ঠিক আচে। তুই আমায় কয়েকটা দিন টাইম দে। আমি দেকচি।
রতনের থেকে মাল নিয়ে পান্না তার ঠেকের রাস্তা ধরল। পান্না অল্প অল্প মাল তোলে, বেচে, শেষ হলে আবার এসে নিয়ে যায়। বড় কোনো সাপ্লায়ারের সাথে তার পরিচয় নেই। হবে, পরে আস্তে আস্তে। ব্যবসা বাড়লে নিশ্চয়ই হবে। আপাতত রতনদাই তার ভরসা।
জামতলার মোড়ে একটা পরোটার দোকানের পাশ দিয়ে ছোট্ট সরু গলি চলে গেছে গঙ্গার দিকে। গলির দুপাশে কয়েকটা টালির চালের ঘর। গলির শেষ মাথায় ডানহাতে একদম গঙ্গার ধার ঘেঁষে একটা ছোট্ট একচালা। টিনের দেওয়াল ও চাল। কাঠের ফ্রেমে টিনের দরজা, শেকল ও তালা। সেই ঘরের ভেতর একটা চৌকি। গঙ্গার দিকে লোহার জাল দেওয়া ছোট্ট জানলা, একমাত্র। ওইটাই রতনদার ঠেক।
আচ্ছা, আমি পেডলিং করতে পারি না? পান্না মিনমিনে গলায় জিজ্ঞেস করল।
পেডলিং করবি? তুই? রতন অবাক। ছিলিম পরিস্কার করা থামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রতন ঠেকে বসে বার দুই-তিন ছিলিম তোলে। সামান্য কয়েকজনই তার ভাগ পায়। তাদের একজন হল পান্না। হোটেলের কাজ সেরে সে রোজই রতনদার ঠেকে আসে। আজও তাই এসেছে। রতন তাকে খুব স্নেহ করে। ছিলিম টানা হয়ে গেছে। অন্য লোকটা, আজ ছিল তারক, উঠে চলেও গেছে। সে একাই বসে ছিল রতনের পাশে। তখনই সে প্রশ্নটা করল।
বছরের পর বছর এই এঁটো তোলা আর বাসন মাজা করতে করতে সে খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল। সাথে কথা তো শুনতেই হত। ছোটখাটো ভুল হলেও তপন তাকে যা তা বলত। কী আর করবে পান্না?
বেশ্যার ছেলে সে। ভদ্র পাড়ায় থাকছে। একবেলা হোটেলে ফ্রিতে খেতে পাচ্ছে। এই ভাগ্যই বা তার মতো কজনের হয়! চুপচাপ অপমান হজম করত। কিন্তু পান্না বড় কিছু করতে চাইত। যেখানে তার ইজ্জত আরও কিছুটা বাড়বে।
পেডলিং করতে গেলে, সব্বার আগে কী লাগে, বল তো? রতন আবার ছিলিম খোঁচাতে খোঁচাতে জিজ্ঞেস করল।
মাল। আবার কী? পান্নার সটান জবাব।
বাল। সে মাল তো নয় আমিই দিলাম তোকে। তারপর, বেচবি কোতায়?
পান্না বোকার মতো চেয়ে থাকে। এটা তার মাথায় আসেনি।
রতন বলে চলেঃ আমার এলাকায় তো আমি তোকে মাল বেচতে দেব না। তেমন অন্য এলাকায় যে বেচছে, সেও তোকে মাল বেচতে দেবে না। তারপর পুলিশ আর পাটির কেত্তন তো আচেই।
পান্না চুপচুপ শুনে যাচ্ছিল।
রতন ছিলিম-সাফি ছোট একটা ব্যাগে ভরে একটা বিড়ি ধরিয়ে আবার বলা শুরু করলঃ তাহলে, মোদ্দা কতা হল, পেডলিং করতে গেলে সব্বার আগে লাগে এলাকা।
এইবার পান্না দুম করে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলঃ তা, তুমি করছ কী করে?
রতন হেসে উঠল জোরে। তারপর বললঃ আরে আমরা হলুম গে পুরনো পাপী, বুজলি। আমি যখন মাল বেচতে শুরু করি তখন তুই বোদহয় জন্মাস নি রে, ভাই। সে প্রায় তিরিশ বচ্চর আগের কতা। আমি, তো, এই এলাকারই লোক। বন্ধুদের কেউ কেউ ছিল হুব্বা। তো, তারা পার্টি করতে শুরু করল। তখন তোর সেই সিপিএমের জামানা, বুজলি। আমি গাঁজা খেতাম আগে থেকেই। পয়সাকড়ি ছিল না তেমন। রোজাগারও ছিল না কোনো। তো, একদিন হঠাৎ করেই ঠিক করলাম, কাটিং করে মাল বেচব। কিছু টাকা এক বন্ধুর থেকে ধার করে অনেকটা মাল একবারে তুলে বসা শুরু করে দিলাম। তকন এখানে কোনো পেডলার ছিল না। এই আর কী! তারপর একদিন পুলিশ তুলল। হুব্বা বন্ধুর ডাক পড়ল। সেটিং হল। সব্বার হিস্যা চাই। দরাদরি করে রফা হল। ব্যাস, চলতে থাকল।
হুমম। বলে পান্না গোঁজ হয়ে থাকল।
যা, এবার বাড়ি যা, এসব ভাবনা ছেড়ে, যেটা করচিস, সেটা মন দিয়ে কর। এসব পচুর লাফরার ব্যাপার রে, ভাই। গাঁজা টানা আর গাঁজার পেডলিং করার মোদ্দে অনেক ফারাক।
লক-ডাউনের ঠিক আগে এইসব কথাবার্তা হয়েছিল।
তবে ভাগ্যের চাকা ঘুরল, পান্নার। করোনায় পেডলার প্রদীপ মারা গেল আর রতনও দেখল, এই সুযোগ, তার ব্যবসটা বাড়ানোর। অন্য কেউ টেক ওভার করার আগেই দখল নিতে হবে প্রদীপের এলাকার পেডলিং-এর।
পেডলিং করার কতা এখনও ভাবচিস নাকি? লক ডাউন উঠতেই রতনদা একদিন নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করল পান্নাকে। সে তখন বেকার ও হতোদ্যম।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ভাবছি। সটান জবাব পান্নার। উৎসাহিত।
পান্নার প্রত্যয়ী জবাবে রতন খুবই খুশি হল। এমন ছেলেই তো চাই, এসব কাজে।
ব্যাস, রতন বসিয়ে দিল পান্নাকে।
প্রদীপের ওই দরমার চালাঘর ফুটিফাটা হয়ে গিয়েছিল। অব্যবহারে আর ঝড়-জলে। একটু সারিয়ে খুরিয়ে নিতে হয়েছিল পান্নাকে। টাকা ধার দেয় সেই রতনদাই।
কিছুদিন সব ঠিকঠাক চলছিল। কোনো হুজ্জুত ছিল না। কিন্তু তারপরই একদিন হঠাৎ পুলিশ এল। জিপে করে। থানার ছোটবাবু, মানে এএসআই রজত সাঁতরা আর সাথে দুজন কন্সটেবল। এসেই পান্নাকে ঘিরে ধরল যাতে ও পালাতে না পারে।
কি, রে বোকাচোদা, মাল বেচছিস? ওর ঘাড়টা ধরে প্রশ্নটা করল রজত।
পান্নাকে পুলিশ তুলে নিল। মোবাইল কেড়ে নিল। ঝাড়া দুঘন্টা থানায় বসিয়ে রাখার পর ওই দুই কন্সটেবলের একজন, সুকান্ত নন্দী, পান্নাকে ডেকে নিয়ে থানার বাইরে এল। তার আগে অবশ্য রজতের সাথে তাকে নিচু গলায় অনেক্ষণ আলোচনা করতে দেখেছে পান্না। ফোনেও কথা বলতে দেখেছে। তবে শুনতে পায়নি কিছু সুতরাং কী নিয়ে কথা তা সে বুঝতে পারেনি। তার বিষয়েই কিনা তাও বোঝেনি।
ছেড়ে দিন না, স্যার, আর করব না। বলতে বলতে পান্না সুকান্তর পেছন পেছন বাইরে এল।
সুকান্তর তার কথায় পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করলঃ রতনের মাল বেচছিস তো, তুই?
পান্না অবাক। সত্যি বলবে না লুকিয়ে যাবে ভাবছে।
কি রে, বাঁড়া, বল? আমরা সব জানি।
মিনমিন করে ‘হ্যাঁ’ বলল পান্না। খুব ভয় পেয়ে গেছে সে। পাব্লিকের হাত মার খেয়েছে আগে। এবার বোধহয় নির্ঘাত জেল।
শোন…বলে এমন সব কথা সুকান্ত এবার বলে গেল তা ধরতে পান্নার একটু সময় লাগল।
ও আচ্ছা, সেটিং, বলেছিল বটে রতনদা। ধাঁ করে মনে পড়ে গেল তার। ব্যপারটা ভালো করে ঠিক বোঝেনি তখন। এইবার বুঝল।
সুকান্ত পান্নার মোবাইলটা ফেরত দিয়ে, ‘মনে থাকে যেন’, বলে তাকে ছেড়ে দিল।
থানার বাইরে এসেই পান্না ফোন করল রতনকে।
আমায় পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল, রতনদা। থানায় নিয়ে এসেছিল। এই ছাড়ল। পান্না উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল।
অ, তা হয়ে গেছে তো, সব কতা? রতন নিরুত্তাপ গলায় জিজ্ঞেস করল। যেন কিছুই হয়নি।
হ্যাঁ, কিন্তু থানায় নিয়ে আসার কী দরকার ছল? আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।
আরে, গান্ডু, পুলিশ কি আর তোর ঠেকে বসে হিস্যার কতা বলবে? ওরকমই হয়। আস্তে আস্তে ওব্বেশ হয়ে যাবে তোর। চিন্তা করিস না। আমি তো আচিই।
আচ্ছা, বেশ। বলে পান্না ফোনটা কাটতে যাবে এমন সময় ওপাশ থেকে রতন বলে উঠলঃ ও, হ্যাঁ, শোন, এর মোদ্দে বাবলু বলে একজন আসবে। ও যা যা বলবে শুনে নিবি। দরকার হলে ফোন দিবি আমায়।
সে, কে?
পুলিশ হল, এবার পাটিকেও তো দেকতে হবে, চাঁদু। বলেই খিকখিক করে হাসতে হসতে থাকল রতন।
পান্না চুপ। ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ফেলছে। এখনও চাপটা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
আচ্চা, চল, একন রাকি। বলে রতন ফোন কেটে দিল।
ফোন রাখার পর পান্না বুঝল, প্রচন্ড মুত পেয়েছে তার। এতক্ষণ ভয়ে চেপে ছিল।
এরপর যথারীতি বাবলু, পান্না ডাকে ‘বাবলুদা’, এল। সাথে এক স্যাঙাত। মোটোরবাইক। সেই স্যাঙাতই, নাম বিশু, এসে ঠেকের বাইরে ডেকে নিয়ে গেল তাকে। বটগাছের সামনেটায় দাঁড়িয়ে কথাবার্তা সব হয়ে গেল। এইবার, সেটিংটা কমপ্লিট হল। পুরোপুরি ধান্দা শুরু করল পান্না, নিশ্চিন্তে। রতনদা পেছন থেকে সব করেই রেখেছিল। রতনদা তার জীবনে ভগবান।
এই বছর তিনেকে পান্না বেশ জমিয়ে নিয়েছে। রতনদাও খুশি হয়ে বলেছে যে একদিন তার ধান্দা সে পান্নাকেই দিয়ে যাবে। তার মায়ের আশীর্বাদ ছাড়া পান্না এটাকে আর কী-ই বা বলবে!
পান্না ঠেকে এসে বসল। রতনের ওখানে একটা ছিলিম খেয়েছিল। ধুনকি ধরেছিল। একটা বিড়ি ধরিয়ে গঙ্গার হাওয়া খেতে থাকল। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। দারুন লাগছে পান্নার। এখন ঘরটা পেয়ে গেলেই হল। রতনদা অবশ্য যখন দেখছে তখন কোনো চিন্তা নেই তার।
প্রতিযোগিতায় নেই
আজ সকালে উঠে বিপ্লব গাঁজা খেল না। ভোর বলাই ভালো। পৌনে ছটা বেজেছে সবে। মহালয়া চলে গিয়ে দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেছে। আজ তার সকালের ক্লাশ। সাতটা থেকে। পাশের ঘরে ‘খুটুর-খুটুর’ শুনে বুঝল, তার মা উঠে পড়েছে। সোমনাথ ঠিক এই সময়ই বেরিয়ে যায় মর্নিং ওয়াকে, রোজ।
সিগারেট-পটি ও তারপর চা খেয়ে বিপ্লব চলে গেল কোচিং সেন্টারে। ঘন্টা দেড়-দুয়েক পড়াবে। ব্যাস, তারপর তার ছুটি। আবার সন্ধেবেলা আর একটা ব্যাচ। হপ্তায় পাঁচদিন দুটো করে ক্লাশ নেয় বিপ্লব। নাইন-টেন আর ইলেভেন-টুয়েল্ভ।
রূপনগর বাজার শেষ করে বাঁহাতে একটা চওড়া গলি ঢুকে গেছে। ঘোষ পাড়া লেন। ওই গলিতেই কিছুদূর গিয়ে বিপ্লবের কোচিং সেন্টার। কলেজের বন্ধু প্রতাপের বাড়ির একতলায়। প্রতাপ বাংলায় এমএ। স্কুল টিচার। হাইস্কুল। বলাইবাহুল্য, বাংলাটা সেই পড়ায়। ইংলিশের জন্য আছে যেমন বিপ্লব তেমনই অঙ্কের জন্য দেবরূপ। দেবরূপ তাদের থেকে বছর দশেকের ছোট। অঙ্কে এমএসসি। আপাতত তারা তিনজনই।
পড়িয়ে, কোচিং সেন্টারে বসে দেবরূপের সাথে কিছুক্ষণ বসে আড্ডা মেরে, বিপ্লব তাকে নিয়ে গেল তুষারদার দোকানে। রূপনগর বাজারে। বেলা সাড়ে দশটা বাজছে। হপ্তায় অন্তত দুদিন, ব্রেকফাস্টে তুষারদার দোকানের মাছের কচুরি না হলে তার চলে না। কচুরি খাওয়া হলে এক রাউন্ড চা খেয়ে, যে যার মতো বাড়ি ফিরে গেল, ওরা। ফেরার পথে এক প্যাকেট সিগারেট কিনল বিপ্লব।
বাড়ি ফিরে বিপ্লব বসল নতুন কেনা উপন্যাসটা নিয়ে। পেজ মার্কটা সরিয়ে খাটে আধশোয়া হয়ে সিগারেট ধরিয়ে পড়তে শুরু করল। আজ শেষ করবে ঠিক করেছে। কিছুক্ষণেই বিপ্লব ডুবে গেল তার ভেতর…
উপন্যাস শেষ করে, দুপুরে স্নান-খাওয়া সেরে বিপ্লব, কতগুলো নতুন ও পুরনো ম্যাগাজিন নিয়ে বসল খাটে। অনেকদিন তার কোনো কবিতার বই হয়নি। এইবার একটা সংকলন করবে ভেবেছে। কিছু কবিতা বাছা হয়ে গেছে। আজ আরও কিছু বাছবে। একজন প্রকাশক বন্ধু খরচ শেয়ার করবে বলেছে।
ঘন্টা খানেক ধরে প্রায় দশ বারোটা ম্যগাজিন ঘেঁটে, তার নিজের কবিতা খুঁজে বার করে বারবার পড়ে, অবশেষে বিপ্লব পাঁচটা কবিতায় টিক মেরেছে।
ভালোবাসার মজা
আমাদের কথাগুলো বাসি হতে হতে ক্রমশ:
মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়
স্রেফ তোমার হাসিটুকুই
যা মনে থেকে গেছে
আজ অল্প মেঘলা
বৃষ্টি নামতে পারে
মহাকুমা জংশনে সেবার খুব বৃষ্টি
আপ লোকাল থেকে নেমে
ভাগাভাগি ছাতায় রিকশাস্ট্যান্ড
তারপর হুড-তোলা পর্দা-নামানো
রিকশায় ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে
সেই দারুন মজা!
তোমার মনে পড়ে?
কে বলে ভালোবাসা মোটেও "মজার" ব্যাপার নয়!
জীবনের ওলিগলি জুড়ে
যত বিচিত্র মজার সম্ভার
তুমি ছিলে তারই অংশ এক
ভালোবাসার মজায় আমি আজও মজে আছি…
অহল্যা
উফ্! অহল্যা, কী শরীর তোমার!
তোমার প্রতিটি পেশীর এই ওঠানামা
আমি প্রত্যক্ষ করছি
হাঁফাতে হাঁফাতে স্রেফ্
যখন কব্জি তুলে মুছে নিচ্ছি মুখের এই ঘাম
তুমি কেন এমন পাষাণ বসেছিলে,
কোনো অমৃতপুরুষের অপেক্ষায়!
যদি তুমি না জাগো নিজে থেকে
কোনো বৈভব-পুরুষ কি পারে
তোমায় জাগাতে!
পারে কি বাঁধতে গ্রন্থিতে গ্রন্থি!
উফ্! অহল্যা, তুমি কী আশ্চর্য
জাগালে এই স্থবির, পাথর আমায়!
শুনে রাখো হে, পাষাণহৃদয়িনী,
পাথরে পাথর ঠুকলে তবেই জ্বলে
সন্ধ্যাপিদিম, অঙ্গার ইত্যাদি
মনশরীর
যখন কোনো শরীর স্পর্শ করি
যেন মনকেই করি আলিঙ্গন
আদপে মন তো আর শরীরের বাইরে নয়
বরং ঘিলুই যেন স্রেফ
মাথার ভেতর আটকে
কেনই বা বেঁচে গেলে দমবন্ধ
ওহে, আটপৌরে
শুধু শরীর বাজি রেখে,
অন্ধকারে অধিকারবোধে
গুমরে মরে...
এসো হে, আজ মনের ভেতর মন ঢেলে দিই
সঙ্গমের ছলে
আংশিক জীবনের পোর্ট্রেট
আমি জানি ফ্যাকাশে মৃত্যু এসে একদিন
জল ঢেলে দেবে জীবনের সব রঙে
তবু আমি রোজ ধরি রঙ-তুলি
আর বারবার আঁকি
জীবনের উজ্জ্বল যত প্রতিচ্ছবি
জানি মৃত্যুই জিতে যাবে ঠিক
হোক না সে যতই আকস্মিক
আদপে তো অমোঘ
তায় অনিবার্য
তবে পরোয়া করি না আমি
রোজ রোজ তাই নানা রঙে বানাই
জীবনের আংশিক এই পোর্ট্রেট
বাতিল জিনিশপত্রের মতো
না হয় দাড়িপাল্লায় মেপে
কোনো প্রিয়জন কোনো একদিন
বেচে দেবে আমার এই আনাড়ি রঙিন ছবি জীবনের
কিলো দরে স্রেফ
প্রতিযোগিতায় নেই
হুইশেল বেজে গেলে কিংবা
আকাশে শূন্যগুলি ছুঁড়ে দিলে
আর কী-ই-বা পড়ে থাকে
ট্র্যাক আর টার্গেট ছাড়া
তবে ট্র্যাকের দুধারেই পড়ে থাকে
খোলা জমি খানিক
ডাঁয়ে কিংবা বাঁয়ে
তুমি ফোকাস করো টার্গেটে
খেয়ালে রাখো ট্র্যাক
ওহে, দৌড়বিদ
আমি বরং ডিসকোয়ালিফায়েড
খানিক পায়চারী করে নি
ট্র্যাকের বাইরে খোলা জমিতে
ডাঁয়ে কিংবা বাঁয়ে
আকাশ যাকে জানে
মুক্তাঞ্চল বলে
তিনটে ম্যগাজিন, যাতে এই পাঁচটা কবিতা ছাপা হয়েছে, সেগুলোকে পড়ার টেবিলের ওপর একধারে রেখে, বাকিগুলো বিপ্লব তুলে রেখে দিল বইয়ের তাকে। এই বইটা হলে সেটা হবে তার চতুর্থ কবিতা সংকলন। দেখা যাক।
খাটে বসে একটা জয়েন্ট বানাল বিপ্লব। পেছনের জানলা দুটো খোলাই ছিল। উঠে গিয়ে তার একটার পর্দা সরিয়ে জয়েন্টা ধরাল।
বেলা সাড়ে তিনটে। আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
ছাদ থেকে দেখা যায় গঙ্গা
রতনদা, যুগ যুগ জিও। লোকটার মাইরি জবাব নেই! পান্না মনে মনে বলে আর ভাবে। দিন তিনেক পরেই তিনটে বাড়ির খোঁজ দিল, রতনদা!
মহালয়ার দিন পান্না সক্কাল সক্কাল গিয়ে দুটো বাড়ি দেখে এল। আর তার পরদিন বিকেলে এক ফাঁকে গিয়ে দেখে এল আর একটা। এইটাই সব থেকে মনে ধরল পান্নার। একটাই ঘর। বাড়িটা খুব পুরনো নয়। ষাট-সত্তর বছর হবে। বাড়ির মালিক সুদর্শন হালদার বলেছিল, পান্না জিজ্ঞেস করতে। দেখেও তেমনই মনে হল, পান্নার। রতনদা ডিরেক্ট কন্ট্যাক্ট দিয়েছিল।
রুবিকে ও বাড়িটা দেখাতে নিয়ে গেল তার পরদিন।
কিছুদিন বৃষ্টি ছেড়ে গিয়েছিল। আজ আবার জোর বৃষ্টি। সকাল থেকেই। যাইহোক, বৃষ্টিটা একটু ধরতে, বিকেলের দিকে ওরা দুজনে বাড়ি দেখতে গেল। রিকশা চেপে।
আজ অবশ্য পান্না টি-শার্ট-বারমুডায় নয়। রঙচটা জিন্সের প্যান্ট আর চেককাটা ফুলশার্ট। হাতা গোটানো। বুকের বোতাম খোলা। রুবির সিঁথিতে হাল্কা সিঁদুর। পান্নাই বলেছিল পরতে। দেবীপক্ষ, তাইই বোধহয় রানী রঙের শাড়িও। ম্যাচিং ব্লাউজ। স্লিভলেস।
রুবির থেকে যেন আর চোখ সরছিল না পান্নার! ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে, মেঘলা বিকেলের আলোয় যেন কনেই দেখে ফেলল সে! পান্নার তেমনই মনে হতে থাকল।
এই বাড়িটা দত্তবাগানে। ‘সেনবাড়ি’র মতোই গঙ্গার ধার ঘেঁষে। বাড়ির সামনের দিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে দুপাশে আর কোনো পাকা বসতবাড়ি নেই। বাড়ির ঠিক পাশ দিয়ে পরপর লাইন দিয়ে কতোগুলো ভাতের হোটেল, কচুরি-পারোটার দোকান, চায়ের দোকান, এইসব। টিনের চাল। তারপর একটা পাকা ক্লাবঘর, সামনে একটা পতাকা তোলার বেদি। তারপর একটা প্রায় উঠে যাওয়া সিপিএমের পার্টি অফিস। পাকা। একতলা। সামনে একটা শহীদ বেদি। নির্মিত, ষাট দশকে খুন হয়ে যাওয়া কোনো এক কমরেডের রক্তিম স্মৃতিতে। এখন মালা চড়ে না আর। কাক-পায়ারার হাগায় ঢাকা। এরপর ঘাটের সিঁড়ি। ঘাট শেষে দত্তদের প্রকান্ড বাগানবাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে ভুতের মতো। পরিত্যাক্ত ও জংগুলে। পলেস্তরা খসে ইঁট বেরিয়ে গেছে। দরজা-জানলা বলে আর কিছু নেই। বাড়ির উল্টোদিকে একটা ওষুধ ফ্যাক্টরি, তার লম্বা বাউন্ডারি পাঁচিল ধরে কয়েকটা পাকা-আধপাকা হোটেল আর পান-বিড়ির গুমটি দোকান। তারপর খাওয়ার জলের কল আর একটা পাব্লিক টয়লেট। টয়লেটের পাশ দিয়ে এই পাকা রাস্তাটা বাঁহাতে ঘুরে চলে গেছে বড় রাস্তার দিকে।
বাগানবাড়ির সদর গেটের পর ভাঙা পাঁচিলের পাশ দিয়ে সামনের দিকে চলে গেছে সরু পায়ে চলা গলি। ইট বাঁধানো। ওই সাইকেল-রিকাশা-মোটরবাইক যাতায়াত করতে পারে, বড় জোর। ওখান থেকে শুরু হয়েছে শুঁড়ি পাড়া। ওখানে পাকা বাড়ির পাশাপাশি চোখে পড়ে বেশ কিছু আধপাকা বাড়িও।
কোনো এককালে, ওই ভাঙা বাগানবাড়ি নিয়ে এই গোটা এলাকা জুড়েই ছিল দত্তদের বাগান। আম-জাম-লিচু-সবেদা-বাতাবি ফলে থাকত, গাছে গাছে। পাহারাদার থাকত। থাকত পেল্লায় পেল্লায় সব কুকুর। নিজস্ব নৌকায় চড়ে, রাঁড় সহযোগে, গঙ্গাবিহার ছিল দত্তদের বাবুদের। দুপুরে খাওয়া রেওয়াজি খাসির গন্ধ তোলা ঢেকুর ছিল, মাঝ গঙ্গায়। ছিল শহরের অন্য সব বিখ্যাত বাবুদের সাথে তাদের খানাপিনার আসর। তবলার বোল আর চমৎকার মেয়েলি কন্ঠে সেইসব গানের কলি ও অন্দরমহল জুড়ে তার সুরেলা আবেশ। ছিল সুর আর সুরার মাঝে ভোগ করে নেওয়া খানদানি সেইসব বাইজিদের শরীর। কুসুমসম। আতরভেজা। তাস ছিল। দাবা ছিল। গাড়ি ছিল। পায়রা ওড়ানো ছিল। ছিল আরও হরেক কত কী! দারুভেজা সেইসব বাবুগিরির দিনরাত আজ অতীত। বাগান, ফল ও রস কিছুই নেই আর। পড়ে আছে শুধু সেই বাগানবাড়ি, হানাবাড়ি হয়ে। এলাকার ভবঘুরে আর পাতাখোরদের নিভৃত আস্তানা, আজ।
বাড়ির একতলায় সামনের দিকে বাঁহাতের ঘরটাতে সুদর্শনের মুদিখানা। হালদার স্টোর্স। তার বাপের আমলের। সামনের দিকের ডানহাতের ঘরটা, তার পেছনের একটা ঘর আর তার পাশে বাথরুমটা নিয়ে থাকে এক ভাড়াটে। স্বামী-স্ত্রী আর বছর চারেকের ছেলে। বাথরুমের পর সিঁড়ি। সিঁড়ির মুখে লোহার গেট। মানুষসমান। মাঝখানে বাঁধানো উঠোন। এক কোণে পাতকুয়ো আর কলতলা। দোকানঘর থেকে সিঁড়ি অব্ধি টানা বারান্দা। ঢাকা ও থামওয়ালা। উঠোন থেকে এই ফুট খানেক উঁচুতে। লাল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। এখন পালিশ উঠে গেছে অনেক। বাড়ির বাঁপাশে বাড়ি আর বাউন্ডারি পাঁচিলের মাঝখান দিয়ে যাতায়াত। সেখানেও একটা লোহার গেট। বেশ উঁচু।
দোতলায় থাকে সুদর্শন হালদার। বছর পঞ্চাশেক বয়স হবে। পরিবার বলতে তার অসুস্থ মা আর মেয়ে। স্ত্রী মারা গেছে অনেকদিন। মেয়েটা কলেজে পড়ছে। রতনদা গোপনে তাকে জানিয়েছে যে সুদর্শন তার খদ্দের ও বন্ধু স্থানীয়। সাত্ত্বিক লোক। ‘ধম্মো-কম্মে’ মতি আছে।
পান্না আর রুবির জন্য তিনতলায় ছাদের ওপর একটা পাকা ঘর। হালে বানানো আর বেশ বড়। দরাজা দিয়ে ঢুকে ডানহাতে একটা জানলা আর সামনে দেওয়ালের মাঝামাঝি আর একটা। নতুন করা রঙের গন্ধ। বাঁহাতে অ্যটাচ্ড বাথরুম। ঘরের বাইরের দেওয়ালে বাঁদিকের কোণে আবার কল দেওয়া একটা বড় সিঙ্ক। তার মাথার ওপর টিনের চাল। আর কী চাই! রুবি খুশিতে ডগমগ। ঘরের থেকেও ভালো যেন এই ছাদ। সেখান থেকে গঙ্গা দেখা যায়। ওঃ কতদিন যে রুবি ছাদে ওঠেনি!
সদর আর একতলার সিঁড়ির মুখের গেটের চাবি তাদের দেবে সুদর্শন। ছাদের ঘর, মানে, তাদের ঘরের তালা-চাবি তাদেরকেই কিনে নিতে হবে। সুদর্শন জানিয়েছে, তারা ছাদে খুব একটা ওঠে না। পান্নারা ইচ্ছে করলে ভেতর থেকে ছিটকিনি কিংবা খিল দিয়ে রাখতে পারে। সিঁড়ির গেটে সব সবময়ই তালা দেওয়া থাকে, তাই ঢোকা ও বেরনোর সময় যেন মনে করে তারা তালা আটকে দেয়। সদর গেটে তালা পড়ে রাত দশটায়, তাই রাতে ফিরতে দেরি থাকলে তারা অবশ্যই যেন চাবি নিয়ে বেরোয়।
কথাবার্তা সব পাকা হয়ে গেল সুদর্শনের সাথে। পান্না যথারীতি বলেছে যে সে দোকান কর্মচারী। ঠিক হল আগামিকাল কিংবা পরশুই তারা বাড়িতে ঢুকবে। মানে তাদের ঘরে। সুদর্শন এগ্রিমেন্ট করতে দেবে। রুবি-পান্না দুজনের নামই থাকবে তাতে। পান্না ভাবল সুকান্তকে ধরে একটা উকিল দেখতে হবে। যদিও সুদর্শন নাকি বাংলায় করবে, তবুও, এগ্রিমেন্ট পড়ে বোঝা তার পক্ষে দুষ্কর। রুবিও তথৈবচ। ও ঠিক হয়ে যাবে। আগে ঢুকে তো যাওয়া যাক।
এখান থেকে অবশ্য ঠেকে যেতে পান্নাকে অটো নিতে হবে, রানিং। ফেরিঘাট অব্ধি।
ভালো করে তোমরা দেখে নাও সব। আমি নিচে গেলাম। দোকান খুলব, এবার। বলে সুদর্শন নিচে নেমে গেল।
রুবি আর পান্না আর একবার ঘরের অন্দরে চোখ বুলিয়ে ছাদের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। রুবির রঙিন ছাতার নিচে। পাশাপাশি দুজনে। এইদিক থেকেই দেখা যায় গঙ্গা। অল্প অল্প ভিজে যাচ্ছে, দুজনের দুপাশ।
কি, পছন্দ? খুশি তো, তুমি? পান্নার ঠোঁটে হাসিমাখা প্রশ্ন।
হ্যাঁআআ, দারুন। খুব খুশি, আমি। টোল পড়া হাসি। রুবির গালে।
রুবি, আলতো করে, হাত রাখল পান্নার হাতের ওপর। ছাদের পাঁচিলে। অন্য হাতে তার ছাতা। লালের মধ্যে সাদার ডট। ওরা চমু খেল তার আড়ালে। ভিজে গিয়ে যেন আরও বেশি রঙিন লাগছে, ছাতাটা।
গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পান্নার মনে পড়ল তার মায়ের কথা। মা যদি আজ থাকত তাহলে দেখতে পেত তার পান্না ঘর নিচ্ছে। বিয়ে করছে। হয়তো, ভবিষ্যতে নাতি-পুতিও। পান্নার চোখ ছলছল করে উঠল।
রুবি, সে, তো, ঠিক একটা পাখির মতো। আবার বাসা বাঁধতে চলেছে। এবারে সব ভালো হবে। এই ভেবে দেখতে থাকল ভরা বিকেলের গঙ্গা।
বৃষ্টি পড়ছে ছাদে। বৃষ্টি পড়ছে গঙ্গায়।
বৃষ্টি পড়ছে শরীরে।
আজ বৃষ্টি পড়ছে মনের বারান্দায়।
সেই রাতে
সেই রাতে রুবি যখন পান্নার ঘরে এল তখন রাত বারোটা বেজে গেছে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি।
অনেক্ষণ ধরে ওরা আলোচনা করল। প্রথমে বিয়ে আর তারপর গেরস্থালির এটা সেটা নিয়ে। এই যেমন একটা ছোট গ্যাস স্টোভ লাগবে একটা, পর্দা কিনতে হবে সবার আগে, প্রেশার কুকার তো কিনতেই হবে, ফ্রিজ হলে খুব ভালো হয়, এইসব। রুবিই মূলত বলে যাচ্ছিল। পান্না মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা। তাকে এত খুশি আর উত্তেজিত পান্না আগে কখনও দেখেনি। ঠিক হল আপাতত কাছের রায় কালীবাড়িতেই বিয়ে করবে তারা। তারপর রেজিস্ট্রি।
ধোঁকা দেবে না তো, আমায়? রুবি পান্নার গা ঘেঁষে এসে জিজ্ঞেস করল।
বলে কী রুবি! পান্না অবাক হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। ওর মাথাটা পান্নার বুকের মধ্যে।
পান্না হিসহিসে গলায় বললঃ আমি দেব ধোঁকা? তাও, তোমাকে? আমি বেশ্যার ছেলে, পান্না। আমার নিজের জীবনটাই হল এক মস্ত ধোঁকা। আমি পারবই না কাউকে ধোঁকা দিতে। বিশ্বাস কর। আর তোমার মতো কাউকে যে জীবনে পাব তা কখনও ভাবতেই পারিনি। তুমিই আমার সব।
তুমিও আমার সব। বলে রুবি পান্নাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
এত ভালো করে আগে বোধহয় কখনও হয়নি। আজ চূড়ান্ত সেক্স করছে তারা। এখন দ্বিতীয় বার। পান্নার ওপরে উঠে বসে রুবি জোরে জোরে করছে। আর তেমনই শীৎকার। আজ কেউ শুনতে পেলেও তাদের আর কোনো পরোয়া নেই।
প্রচন্ড জোরে বাজ পড়ল। রুবির জল খসে গেল। ও আস্তে আস্তে এলিয়ে গেল পান্নার বুকে। পান্না দুহাতে ওকে আঁকড়ে ধরে ধরল। চুপচাপ ওরা এইভাবে শুয়ে থাকল।
হঠাৎ প্রবল একটা শব্দ হল। ওপর তলায় একটা ভীষণ ভারী কিছু পড়ল যেন। পান্নার ঘরটা কেঁপে উঠল। সিলিং থেকে ঝুরঝুর করে চুন-প্লাস্টার খসে পড়তে লাগল। পান্না রুবিকে বুকের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে সটান উঠে বসল। সিলিং এর দিকে তাকিয়ে কম পাওয়ারের বাল্বের আলোয় দেখল চিড়। রুবি ততক্ষণে উঠে বসেছে বিছানায়।
এক হ্যাঁচকা টানে পান্না রুবিকে টেনে নামাল চৌকি থেকে। রুবির হাতে নাইটি। মাটি থেকে বারমুডাটা তুলে নিয়ে ঘরের দরজা খুলে একছুটে ওকে নিয়ে বাইরে এল। সিঁড়ি দিয়ে দুড়দ্দাড় করে উঠতে থাকল। পেছনে রুবি। পান্না ওর হাত টেনে ধরে রেখেছে। দুজনেই সম্পূর্ণ উলঙ্গ। প্যান্টিটা রুবি আর তুলে আনতে পারেনি। পড়ে আছে পান্নার বিছানায়।
দোতলায় ওঠার আগে সিঁড়ির চাতালে এসে থামল পান্না।
নাইটিটা পরে নাও, এবার। চাপা গলায় বলেই পান্না বারমুডাটা গলাতে থাকল এক পা তুলে।
ঠিক তখনই দোতলায় ভাড়টেদের একটা ঘরের আলো জ্বলল। দরজা খুলল।
আলো জ্বলল, দরজা খুলল, আনন্দের ঘরে। বিপ্লবের ঘরেও।
তাড়াহুড়োয় আর অন্ধকারে রুবি নাইটিটা পরল উল্টো।
সবার আগে পান্না, পেছন পেছন রুবি, তারপর ভাড়াটেদের দুজন আর একদম শেষে, দোতলার বারান্দা থেকে পান্নার ‘ওপরে এসো, জলদি, এদিকে’ শুনে, আনন্দ ও বিপ্লব এসে দেখল কল্লোর ঘরের দরজা বন্ধ। একটা ক্ষীণ গোঙানির শব্দ আসছে ঘরের ভেতর থেকে।
কল্লোলদা, ও কল্লোল দা। পান্না ডাকতে ডাকতে দরজায় ধাক্কা মারতে থাকল।
‘কল্লোল কাকা’,’কল্লোল কাকা’ করে ডেকে উঠল আনন্দ ও বিপ্লবও। কোনো উত্তর এল না ভেতর থেকে।
ক্ষীণ একটা গোঙানির শব্দ আসছে ঘরের ভেতর থেকে।
তাদের ডাকাডাকি ও দরজা ধাক্কানোর শব্দে ততক্ষণে বাড়ির অন্য লোকেরাও জেগে উঠে পড়েছে। শুধু মিতালির দরজা বন্ধ। সে অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
অবশেষে পান্না-বিপ্লব ধাক্কা দিয়ে দরজা ভেঙে ফেলল। বিদ্যুৎ চমকাল আর তারপরই বাজের কান ফাটানো শব্দ। ভেতরে তাকিয়ে বিদ্যুৎ ও মোবাইলের আলোয় যা দেখল তাতে ওদের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। মেঝের ওপর ভেঙে পড়ে আছে প্রায় অর্ধেক সিলিং আর তার নিচ থেকে ভেসে আসছে কল্লোলের গোঙানির শব্দ। তখন ক্ষীণতর।
পান্না, কাকে বা কোথায় ঠিক ফোন করা উচিৎ বুঝতে না পেরে, ফোন করল ছোটবাবু রজত সাঁতরাকে।
স্যার, পান্না বলছি। আমাদের বাড়ির ছাদ ভেঙে পড়েছে। একজন চাপা পড়েছে। জলদি আসুন। পান্না এক নিশ্বাসে বলে ফেলল।
বলিস কিরে, বাঁড়া? সিলিং ভেঙে মানুষ চাপা পড়েছে! বিস্মিত ও বিব্রত রজত।
হ্যাঁ, স্যার। ২৯ নম্বর মাধব রায় রোড। জলদি আসুন, প্লিজ। লোকটা এখনও বেঁচে আছে। পান্নার গলায় আকুতি ও উদ্বেগ। স্পষ্ট।
আরে, এটা তো ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার। আমরা কী করব? ওখানে ফোন কর, আগে।
স্যার, আপনি একটু কিছু করুন, না। আপনিই ওদের একবার ফোন করে দিন না, প্লিজ। হেব্বি আরজেন্ট। পান্নার কাতর অনুরোধ।
ঠিক আছে, দেখছি, অ্যাড্রেসটা বল আবার। কেন যে বাল থাকিস এসব বাড়িতে! রজত গজগজ করতে করতে অ্যাড্রেসটা নোট করে ফোন কেটে দিল।
বিপ্লব ততক্ষণে খুঁজে বার করেছে হেল্প লাইন নাম্বার, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের। সেও ফোন করল। এক ভাড়াটে ফোন করল দমকলে।
আসলে, হতচকিত ও ভয়ার্ত হয়ে, এরা যে যেখানে ও যাকে যাকে পারল ফোন করে দিল। বাকি রাতটুকু জেগে বসে রইল।
ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে
উদ্ধারকারী দলের অনেক চেষ্টার পর, ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে, কল্লোলকে যখন উদ্ধার করা হল তখন তার থ্যাঁতলানো দলা পাকানো শরীরটা দেখে, রুবি বমি করে ফেলল। পান্নার কান্না পেয়ে গেল।
যদিও পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলের লোকেরা বুঝেই গিয়েছিল যে কল্লোল মৃত তাও তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে প্রথমে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হল। কনফার্মড হওয়ার পর বডি মর্গে চালান করে দেওয়া হল। পান্না আর বিপ্লবও গিয়েছিল সাথে। তখন সকাল হয়ে গেছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে।
ওদিকে, পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল, দুপক্ষই, বাড়ির লোকেদের সাবধান করে বলে গেল, বাড়ি খালি করে দিতে। এটা এখন বিপজ্জনক বাড়ি।
হসপিটাল-মর্গ ঘুরে বাড়ি ফিরেই বিপ্লব বাড়ি ছাড়ার কথা ঘোষণা করল। সোমনাথ এইবার রাজি।
দেখেছ তো, কেন বারবার বলি? এবাড়ি আর থাকার মতো নেই। এবার বুঝলে? আর, না, তোমরা না গেলেও আমি চলে যাব। এই ভাঙা বাড়িতে আর নয়। বিপ্লব বেশ বিরক্ত ও শঙ্কিত।
না, না, তুই ঠিকই বলেছিস, বাবা। তুই বাড়ি দেখ। আসলে কি, বাড়ি ভাড়া নিলে তো তোর ওপরই চাপ পড়বে তাই আর কী… সোমনাথ মিনিমিন করে বলল।
সে দেখা যাবে। আমি কাল থেকেই বাড়ি দেখা শুরু করছি। বিপ্লব তার কথা শেষ করতে না দিয়েই বেশ জোরের সাথে বলল।
দেখ, তবে। নিচুস্বরে সোমনাথের সম্মতি।
বিকেলে প্রচন্ড মন খারাপ নিয়েও পান্না আর রুবি বাড়ি ছাড়ল। প্রথমে ভেবেছিল আগামিকাল শিফ্ট করবে, ধীরেসুস্থে, কিন্তু এই ঘটনার পর আর রিস্ক নেওয়া যায় না। সুদর্শনকে তো বলাই ছিল যে আজও ঢুকে যেতে পারে তারা। সুতরাং চাপ কি। তিনতলার ঘর-বাথরুম পরিষ্কার করাই ছিল। সেটা গতকালই দেখেছিল তারা। রুবিকে পান্না তার জিনিষত্র গুছিয়ে রাখতে বলেই বেরিয়েছিল, হসপিটালে। ফেরার পথে কিনে এনেছিল তালা-চাবি। পর্দাটা পরে রুবি পছন্দ করে কিনবে। আপাতত চাদর-গামছা ঝুলিয়ে দেবে জানলায়।
বিদায় নেওয়ার মতো পান্নার আর কেউ ছিল না এবাড়িতে। রুবি শুধু মিতালির কাছে বিদায় নিয়ে এল। প্রণাম করে। মিতালি তাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষোণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। রুবি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকল। চলে আসার সময় রুবি তাকে বলল যে সে যেন অবশ্যই এবাড়ি ছেড়ে চলে যায় তার বাপের বাড়ি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আর, হ্যাঁ, কিছু প্রয়োজন হলে অবশ্যই যেন তাকে জানায়।
বাড়ি ছাড়ার কথা পান্না বিপ্লবকে জানিয়েছিল। হসপিটালে। তখন ওরা অলরেডি জেনে গেছে যে কল্লোল মারা গেছে।
ও, দত্তবাগান, সে তো, কাছেই। আমি তোকে ফোন করে চলে যাব। টুক করে স্কোর করে নেব। পান্নার নতুন ঠিকান শুনে বিপ্লব আশ্বস্ত।
বেশ তো, এসো, না তুমি, আটকাচ্ছে কে? পান্না আলগা হেসে দিয়েছিল আশ্বাস।
সে যে অন্য জায়গায় ঘর দেখছে সেটা পান্না মহলায়ার দিনই জানিয়েছিল কল্লোলকে। সকালে, ঘর দেখতে বেরনোর ঠিক আগেই। রুবিও যে তার সাথে যাচ্ছে সেটা অবশ্য বলেনি। ভেবেছিল, পরে যাওয়ার আগে না হয় জানাবে। তার ‘কল্লোলদা’কে সে যতটুকু চেনে তাতে মনে তো হয় না যে কল্লোল কিছু মনে করবে। উল্টে হয়তো খুশিই হবে শুনে।
ও, অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছিস। বেশ। ভালো থাকিস। যাওয়ার আগে পারলে একবার দেখা করে যাস। কল্লোল বলেছিল।
নিশ্চয়ই দেখা করে যাব। সে আর বলতে হবে নাকি! এতদিন থাকলাম তোমার এখানে। তুমি আমার কাছে ভগবান মতো। তুমি না থাকলে আমি যে আজ কোথায় থাকতাম! পান্না বলেছিল।
যাঃ কী যে বলিস তুই। কল্লোল হেসে উঠেছিল।
পান্না একটা টেম্পো ডেকে এনেছিল। তাতে চৌকি, তোশক, বালিশ, ডিস্পেন্সার ইত্যাদি ও একটা প্লাস্টিকের পেল্লায় ব্যাগে তার নিজের কিছু জিনিষপত্র তুলে দিল প্রথমে। তারপর তুলল রুবির বড় ট্রলিটা। খোকন হেল্প করল। সবশেষে নিজে ব্যাগপিঠে টেম্পোয় চড়ে রুবিকে টেনে তুলল। তার কাঁধে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ। ওরা চড়ে বসতেই খোকন টেম্পোর ডালাটা বন্ধ করে দিল।
সব রেডি, তো? ছোপধরা দাঁত কেলিয়ে জিজ্ঞেস করল, খোকন।
হ্যাঁ, রেডি। তুই এস্টার্ট দে। পান্না গম্ভীর ভাবে বলল।
আচ্ছা। বলে ও সামনের দিকে চলে গেল।
খোকন ভাড়ার টেম্পো চালায়। পান্নার খদ্দের।
পান্না টেম্পোর ওপর থেকে একবার কল্লোলের ছাদভাঙা ঘরটার দিকে তাকাল। মনে মনে বলে উঠলঃ ওহঃ ভগবানের মতো মানুষ ছিল বটে একটা! ঠিক যেন ‘বাবার’ মতোই। যদিও ‘বাপ’ জিনিষটা যে ঠিক কী তা পান্না জানে না। পান্না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
খোকন টেম্পো ছেড়ে দিল।
নীরবে বাড়ির কান্না
এই যে আজ কল্লোল আমার অংশের নিচে চাপা পড়ে মারা গেল। আমার কাছে এ সাঙ্ঘাতিক বেদনার। নিদারুণ কষ্টের। আমি হাহাকার করছি। আমি চাই না এভাবে এদের খেতে। আমার পেটের ভেতর এরা জন্মেছে। বড় হয়েছে। আমিই তো এদের আশ্রয়। এদের মায়ের মতোই তো আমি কিংবা বাপের মতো। আমি কি এভাবে খেতে পারি আমার সন্তানদের? কিন্তু, কী করব? আমি যে সত্যিই আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। আমার এই দশার জন্য এরাই তো দায়ী। কিচ্ছু ভালো লাগছে না আর।
হয়তো, কল্লোল মরে গিয়ে বেঁচে গেল। কোনো সঞ্চয় ছিল না তার। না তো, দেখাশুনা করার মতো কোনো লোক। শেষ বয়েসে বিছানায় শুয়ে ছটফট করলে, জল-ওষুধ-পথ্য দেওয়ার মতো কেউ থাকত না তার। তাই, এই অকস্মাৎ মৃত্যু তাকে রোগশয্যার দুর্বিষহ যন্ত্রণা ও কষ্টের হাত থেকে হয়তো বাঁচিয়েই দিল।
তবুও, কারোর আশ্রয়দাত্রী হয়ে, তাকেই কি বধ করা উচিত?
এই যে, রুবি-পান্না আমায় ছেড়ে চলে গেল, আমি কিন্তু প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছি ওদের। আমি চাই বিপ্লবও যেন চলে যায়, তার বাবা মাকে নিয়ে। সব্বাই যেন চলে যায় আমায় ছেড়ে। অন্য কোথাও চলে গিয়ে আবার সুখে-শান্তিতে ঘর বাঁধে। সংসার করে।
আমি, একা জরাগ্রস্ত দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রত্যক্ষ করব আমার নিজেরই ধ্বংসযাত্রা।
আমি হয়তো শাপগ্রস্ত।
শেষকৃত্য
পরদিন, শবগাড়ি করে কল্লোলের ডেডবডি নিয়ে বাড়ি ফিরল পান্না আর বিপ্লব। তখন বিকেল হয়ে গেছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে।
পান্না বিপ্লবকে আগে থেকে বলে রেখেছিল যে সে বডি আনতে যাবে। নতুন বাড়ি থেকে ঠিক সময় মতো বেরিয়ে পড়েছিল। সেনবাড়ি থেকে বিপ্লবকে নিয়ে রওনা দিয়েছিল মর্গে।
বাড়ির কাছে এসে পান্না দেখতে পেল, অনেক লোক গেটের মুখে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কল্লোলকে শেষদেখা দেখবে বলে। ঝড়-জল উপেক্ষা করে তারা এসেছে। কল্লোলের ডেডবডি গাড়ি থেকে নামিয়ে এনে রাখা হল একতলার বারান্দায়।
আস্তে আস্তে আরও লোকজন চলে এল। পান্না দেখল, প্রায় জনা চল্লিশেক লোক উঠোন-বারান্দা জুড়ে কল্লোল সম্পর্কে নানান আলোচনায় মেতে উঠেছে। সেই ভিড়ের মধ্যে, যেমন আছে একুশ-বাইশ বছরের যুবক আবার তেমনই আছে বুড়ো-হাবড়া। এমন অনেকে এসেছে যারা কল্লোল বেঁচে থাকতে কোনোদিন এবাড়িতে আসেনি। যারা তার বাড়ি চিনত তাদের সাথে এসেছে। এরা সব কল্লোলের সুদীর্ঘ তেতাল্লিশ বছরের আড্ডাজীবনের কোনো না কোনো সময়ের সঙ্গী-সাথী। আড্ডার প্রিয় সাথীকে চির বিদায় জানাতে এসেছে, এরা সব।
রুবি এসে একবার দেখে গেল, শেষদেখা। মিতালিও দেখে ওপরে চলে গেল। সাথে ছিল তার দাদা। নিতে এসেছে বোনকে। লোকমুখে খবর পেয়ে কাকলি আর শৈবাল এসেছিল। ছোট ভাইয়ের মৃতদেহ দেখে কাকলির সে কী কান্না! শৈবালও বিহ্বল। স্বপন-রঞ্জনও এসেছিল। এতদিনের পুরনো বন্ধুর মরদেহ দেখে স্বপন ভেঙে পড়ল। এসব দেখতে দেখতে পান্নারও চোখেও জল চলে এল।
প্রায় কুড়ি-পঁচিশজন মিলে, চারিদিক মুখরিত করে হরিধ্বনি দিতে দিতে কল্লোলকে নিয়ে চলল তার শেষযাত্রায়। এবাড়ি থেকে গেল শুধু পান্না আর বিপ্লব। নিকটাত্মীয় বলতে কাকলি ও শৈবাল। একটা ছোটখাটো শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল শ্মশানঘাটের দিকে।
কাচঢাকা গাড়িতে শুয়ে কল্লোল চলল তার প্রিয় সব আড্ডা ছেড়ে, বরাবরের মতো। নিথর। হয়তো, কখনও সখনও সেইসব আড্ডায় ফিরে ফিরে আসবে তার স্মৃতি। মন ভারী হয়ে আসবে কারও কারও। ব্যাস, এইটুকুই। তারপর আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যাবে তার স্মৃতিটুকুও।
শ্মশানঘাট। রাত নেমে গেছে তখন। বৃষ্টি হয়েই চলেছে। একটানা। এইবার হবে দাহকাজ।
চুল্লিতে ঢোকানোর আগে শেষকাজ বিপ্লবই করল। পাশে দাঁড়িয়ে রইল পান্না। স্থবির ও মুহ্যমান। সে জোর করে চেপে রেখেছে কান্না।
একটা ধাতব শব্দ হল। কল্লোলের বডি ঢুকে গেল চুল্লির ভেতর। চুল্লির দরজাটা বন্ধ হতেই পান্না, হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে নিল।
জীবন থেকে, চিরকালের মতো, হারিয়ে গেল আরও একটা প্রিয় মানুষ তার।

No comments:
Post a Comment