গোপাল গোঁসাই # জুন, ২০২২




প্রথম প্রকাশ: জানুযারি, ২০২৫

প্রকাশক: হপ্তাক কাচরা


মুখবন্ধ

আমার শিশু-কিশোর-যুবাবেলা কেটেছে এক মফস্বলি পাড়ায়। 

সেই পাড়া ও সংলগ্ন অঞ্চলের বাস্তবতার স্মৃতি ও আমার কল্পনা মিলেমিশে এই আখ্যান।

কল্পিত এই চরিত্র ও তার কাল্পনিক স্থান-কাল।

হয়ত, তেমন কোনো বিশেষত্বই নেই এদের মতো চরিত্রদের। 

তবুও অলীক কোনো না কোনো পাড়ায় এরা নিজেদের মতো বেঁচে থাকে। মারা যায়।


উৎসর্গ

রিকশাচালক কার্তিক'কে

এই আখ্যানের একটি চরিত্র খানিকটা তার আদলে গড়া


  

এক


গোপাল খাটিয়ার ওপর নতুন কেনা তোষকে ঘাড়গুঁজে বসে সামনের খবরের কাগজে গাঁজা কুটতে কুটতে ভাবলঃ সত্যিই! লাস্ট তিন-সাড়ে তিন বছরে তার জীবনটা কেমন আমূল বদলে গেল!


দুপুর আড়াইটে হবে। মোড়ের মাথায় 'তারা মা ভাতের হোটেল' থেকে ডিম-ভাত খেয়ে বাড়ি ফিরে কলতলায় স্নান সেরে এই বসেছে। এবার এক ছিলিম সেজে খাবে। তারপর ঘুম দেবে একচোট। 


সেই ২০১৯-র গোড়ায় লোকসভা ভোটের কিছুটা আগ দিয়েই খুন হয়ে গেল তার বাবা। তোলাবাজ ছিল। পাড়া লাগোয়া ঝিলপাড়ের বাজারটা সেই দেখত। পালাবদলের পরপরই বুদ্ধি করে পাল্টি খেয়েছিল। ফলে ঝামেলাও ছিল না আবার সংসারে কোনো অভাব-অনটনও ছিল না। সেই তার বাবাই খুন হয়ে গেল গোষ্ঠীবাজিতে! যাক গে।


তার বাবার ডাকনাম নন্দ হওয়ায় এবং সেই নামেই অধিক পরিচিত থাকার কারণেই সম্ভবত সে ছেলের নাম রেখেছিল গোপাল। মায় আবার তার মা ঘটা করে জন্মাষ্টমী পালন করতেন ফি বছর। যাইহোক, ডাক ও ভালো মিলিয়ে এই একটাই নাম তার। 


পাশেই যতীন কলোনীতে একটা বাড়ির একতলায় দুটো ঘর-রান্নাঘর-বাথরুম নিয়ে ভাড়া থাকত তারা। তারা বলতে বাপে-মায়ে-ছেলেতে। ওই বাড়িতেই গোপালের জন্ম।


গাঁজাটা মিহি করে কুটে নিয়ে বিড়ির মশলা ঢেলে হাত দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিল গোপাল। মেঝেতে রাখা জলের বোতলটা তুলে নিয়ে কালচে হয়ে যাওয়া লাল কাপড়ের সাফিটা ভিজিয়ে নিংড়ে নিল। তারপর ছোট্ট কালো ছিলিমে সাফি জড়িয়ে মালটা ভরে নিল। বাঁহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ফাঁকে ছিলিমটা ধরে ওস্তাদের মতো ঠোঁটের ওপর রাখল। সাফি আর ঠোঁটের মাঝে সামান্য গ্যাপ। 


মাঝারি হাইটে গাট্টাগোট্টা চেহারা গোপালের। বাঁহাতের বাইসেপটা তাই ফুলে উঠেছে। গাঢ় ও উজ্জ্বল শ্যামলা রং। নাক-মুখ-চোখ কাটাকাটা। দাড়ি-গোঁফ পরিষ্কার করে কামানো। কদমছাঁট চুল। 


ডানহাতে লাইটার জ্বেলে আলতো আলতো টানে ধরিয়ে ফেলল ছিলিমটা। তারপর একটা লম্বা টান মেরে একটু ধরে রেখে অনেখানি নীলচে ধোঁয়া ছেড়ে দিল।


বেলুড়ের একটা পলিটেকনিক কলেজ থেকে ডিপ্লোমা করেছিল। সিভিলে। তারপর বছর দুয়েক আড্ডা মেরে, গেঁজিয়ে, ক্লাবে টিটি-ক্যারম খেলে, গাঁজা টেনে, প্রেম করে, ঘুরে বেরিয়ে শেষমেষ দুই বন্ধুর সাথে পার্টনারশিপে ইট-বালি-চুন-সুরকি সাপ্লায়ের বিজনেস শুরু করেছিল। ইচ্ছে ছিল আস্তে আস্তে কন্সট্রাকশনে যাবে।


যাইহোক, বাবার বাৎসরিক কাটিয়ে দীর্ঘদিনের প্রেমিকা চন্দনাকে বিয়ে করেছিল গোপাল। তখন সে সদ্য পঁচিশে পড়েছে। আর চন্দনা একুশে। অনেকদিনের প্রেম। আর ফেলে রাখতে চায়নি বিয়েটা।


কিছুদিন আনন্দে কাটানোর পরই আবার শোক। করোনায় মারা গেল তার মা। ২০২০-র মাঝামাঝি। সে ও তার বউ দুজনেই ভুগল।


বড় বড় টানে ছিলিম টানতে থাকল গোপাল। কিছুক্ষণ পর ছিলিম শেষ হলে একটা মাঝারি সাইজের ভাঁড়ে, যেটাকে ছাইদান বানিয়েছে, ঢেলে দিল ছাইটুকু। ছিলিমটা তেলোতে জোরে ঠুকে গিট্টিটা বার করে আনল। নখ দিয়ে গিট্টি ও একটা ঝাঁটার কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে ছিলিমটা পরিষ্কার করল। তারপর গিট্টিটা আবার ভরে দিল। আঙুল ঢুকিয়ে চেপে টাইট করে দিল একটু। 


খাটিয়ার ওপরেই ছিল আলুমিনিয়ামের ছোট্ট বাক্সটা। যেমনটা ছেলেবেলায় স্কুলে নিয়ে যেত। ওটার ডালা খুলে সাফি মোড়ানো ছিলিম-কাঠি ভরে রাখল। শুধু ছিলিম-কাঠি নয় ওই বাক্সে থাকেঃ


গাঁজার প্যাকেট

একটা বাবুল টুথপেস্টের ছোট টিউব 

সস্তার টুথব্রাশ

স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়ানো লাক্স সাবান

গার্ডার মারা ছোট টাইড ডিটারজেন্টের পাউচ

কালো রঙের একটা পকেট চিরুনি

একটা প্যারসুট নারকেল তেলের মাঝারি বোতল

সেলো ব্র্যান্ডের একটা দশ টাকার বলপেন 

মাঝারি সাইজের নেইল কাটার 


এইরকম টুকিটাকি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিশ।


এরপর আরও বড় দুর্বিপাক তার জন্য অপেক্ষা করেছিল। ২০২১-র গোড়ায় বন্ধুরা, বন্ধু না বলে পার্টনার বলাই ভালো, চিট করল। শধু চিট করেই ক্ষান্ত হল না। মিথ্যে চুরির দায়ে জেলেও পুরল তাকে। রক্ষে যে তারা তখনও বাচ্চা-কাচ্চার কাথা ভাবেনি!


জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় জামা-কাপড়ের সাথে সেলফোন আর ওয়ালেটটা ফেরত পেয়েছিল। এসবিআই-এর ডেবিট কার্ড, প্যান কার্ড আর ভোটার কার্ডটা ওয়ালেটেই ছিল। এখনও ওখানেই রাখে। ফাইলটা তার মামার কাছে রেখেছে।


একটু জল খেয়ে গলা ভিজিয়ে গোপাল একটা বিড়ি ধরাল। বিড়ি টানতে টানতে আবার নানান ভাবনা ও স্মৃতিতে ডুবে গেল...


বিড়িটা শেষ করে ভাঁড়ে গুঁজে দিয়ে আর একটু জল খেয়ে খাটিয়ায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল গোপাল। মাথার বালিশটাও নতুন। পায়ের কাছে মুড়ে রাখা মশারিটাও। 


বৃষ্টি-বাদলা হয়ে ওয়েদারটা একটু ঠান্ডা এই যা বাঁচোয়া। একটু হ্যাল খেতে খেতে ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে এল তার।


দুই



একবছর জেল খেটে এই মাস দেড়েক হল ফিরেছে। জেল এক দুর্বিসহ ব্যাপার। সে যে কদিনেরই হোক। গোপাল তো মনে মনে ভাবে আর যাই হোক না কেন আর কখনও যেন জেল না হয় তার। 


ওফঃ বাবা! সেই হুব্বা কাঁসাই, বুড়ো থলথলে মাল, যার স্বভাব ছিল, হয়তো এখনও তাই আছে, নতুন কোনো কয়েদি এলে সুযোগ বুঝে দলবল সমেত চড়াও হয়ে যুত করে তার পেছনমারা। 


ভাগ্যিস! 'বাসুদেবনদা' ছিল। সেই বাঁচিয়ে নিয়েছিল গোপালকে। ফলপট্টিতে জোড়াখুনের দায়ে যাবজ্জীবন। দক্ষিণের লোক কিন্তু জন্মকম্মো এখানেই। চমৎকার বাংলা বলে। জেলে বসেও অপারেট করত বলে অন্য কয়েদিরা সবাই তাকে সমঝে চলত। হুব্বা কাঁসাইয়ের বান্টু থেকে নিজের পেছন বাঁচাতে আমেয়াদ জেলে বাসুদেবনের পোঁদেপোঁদে ঘুরত গোপাল। 


জেল থেকে ফিরে দেখে সব শেষ। নিজের পাড়ায় ঢুকে তাদের ভাড়া বাড়ির কাছে এসে দেখে কোথায় বাড়ি? কনস্ট্রাকশন হচ্ছে! দুটো তলা গাঁথাও হয়ে গেছে! এদিকে তার কনস্ট্রাকশন তোলার স্বপ্ন প্রায় চুরমার তখন।


নিচেই একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন ঘরে তার সেই দুই বন্ধু বা পার্টনার বসে ছিল। সাথে কয়েকটা লেবার। গোপালকে দেখেই একজন ‘কি রে, বাঞ্চোত আবার চুরি করতে এসেছিস!’ অন্যজন ‘মেরে তাড়া, বোকচোদকে’ বলেই লাফ মেরে বেরিয়ে তেড়ে এল। 

সাথে লেবারগুলোও। 

‘ভাগ এখান থেকে শালা, আর কোনোদিন যেন পাড়ায় না দেখি।’ 

তাকে গালে-ঘাড়ে চড় তো মারলই আরও মারতে যাচ্ছিল। সে কোনোমতে হাত দিয়ে আটকাতে আটকাতে জিজ্ঞেস করল ও বললঃ চন্দনা কোথায়? ওকে নিয়েই আমি চলে যাব, ভাই। মারিস না।

‘ওসব চন্দনা-ফন্দনা কোথায় আমরা জানি না। তুই বেরো পাড়া থেকে। শালা চোর।’ বলে উঠল এক পার্টনার। 

আর একজন ধাক্কা মারল বুকে। টাল সামলাতে না পেরে রাস্তার ওপর পড়ে গেল গোপাল। 


বাড়ি ভাড়ার এগ্রিমেন্টও ছিল না। তার বাবা বেঁচে থাকতে দরকারই পড়েনি কখনও। আর গোপালও করায়নি। এতদিনের চেনা বাড়িওয়ালা। মাস গেলে ভাড়া বাবদ একটা দিয়ে দিত। অগত্যা গোপাল পাড়া ছাড়তে বাধ্য হল। 


লেখাপড়ায় তেমন মন না থাকলেও রবি ঠাকুরের লেখা বলেই হয়তো তার ওই দুই লাইন মনে পড়েছিলঃ তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে! 


রাস্তা থেকে উঠে গায়ের ধুলো ঝেড়ে মুখ ঘুরিয়ে এগোতে থাকল মোড়ের দিকে। 


হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকল কে চোর! তাকে বিজনেসে চিট করে দিল! মিথ্যে মামলায় তাকে ফাঁসাল! তারা এতদিন ভাড়া ছিল এই বাড়িতে তখন প্রোমোটিং করল না! এখন যেই তারা একে একে মরেছে বা সরেছে অমনি প্রোমোটিং করে দিল! ভাগের ন্যায্য ফ্ল্যাটটাও দিল না! বউটাকে কে কী বুঝিয়েছে কে জানে! কোথায় গেল তাই বা কে জানে! 


তার শ্বশুরবাড়ি এ পাড়াতেই। বেরিয়ে যেতে যেতে তাই একবার ঢুঁ মেরে খোঁজ নিল চন্দনা আছে কিনা। না, নেই, কোথায় গেছে তাও নাকি জানে না শ্বশুর! সদর দরজা থেকেই বিদেয় দিল তাকে! 

‘দেখ, তুমি এখানে আর এস না। বুঝতেই পারছ, আমার ছোট মেয়েটারও তো বিয়ে দিতে হবে।’ শ্বশুরের শেষকথা ছিল এটাই। 

আর হ্যাঁ, 'এইটা চন্দনা তোমার জন্য রেখে গেছে' বলে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল তার ফাইলখানা। তার ভেতর তার সব সার্টিফিকেট, পাশবই, চেকবই আর আধার কার্ডটা ছিল।


পরে জেনেছিল চন্দনা কোথায় আছে। যদিও সত্যি-মিথ্যা জানে না। মোড়ের মাথায় রিকশাস্ট্যান্ডের ভোম্বল বলেছিল তাকে। ভোম্বল হল সেইরকম মাল যার কাছে আশেপাশের সব পাড়ার খবর থাকে এবং প্রত্যেক বাড়িরই কাউকে না কাউকে  চেনে। এপাড়া-সেপাড়া ঘুরে রিকশা চালানোর জন্যই হয়তো।  


সেই গোপালকে বলেছিল যে বুবাই ফুঁসলেছে চন্দনাকে। এই বুবাই আর পিকলু ছিল তার বিজনেস পার্টনার। যতীন কলোনীরই ছেলে। ওদের ভাড়া বাড়ির প্রোমোটিং দিয়ে এখন বুবাই-পিকলু কনস্ট্রাকশনে পা রাখছে!


তো বুবাই সেয়ানা মাল। এখনও বিয়ে-শাদি করেনি। দক্ষিনেশ্বরে একটা ফ্ল্যাট কিনে সেখানেই নাকি রেখেছে চন্দনাকে! গোপাল বেশ কয়েকবার পুরনো নম্বরে ট্রাই করে দেখেছে চন্দনাকে। নট রিচেবল। কি আর করা যাবে!


এককালে নন্দ মস্তানের ভয়ে যে গোপালের দিকে চোখ তোলার সাহস হত না কারও সেই গোপাল মার খেয়ে চোখ মুছতে মুছতে পাড়া ছেড়েছিল। রাগ তো তার হয়েই ছিল কিন্তু দুঃখটা হয়েছিল আরও অনেক বেশি। 


নিজেকে তার মনে হয়েছিল ‘সর্বহারা’। আগেকার সেই লালপার্টির জামানায় অনেকবার শুনেছিল আর কয়েকবার দেওয়ালেও দেখেছিল শব্দটা। তখন মানেটা ঠিক বঝেনি। 


তিন


কোথায় আর যাবে? ভাবতে ভাবতে গোপাল চলে এসেছিল বড়রাস্তা টপকে পাশের পাড়ায়। তার অয়নমামার বাড়ি। অয়ন অর্থাৎ অয়ন ঘোষ তার দূর সম্পর্কের মামা। কাছাকাছি বাড়ি হওয়ায় ভালোই যোগাযোগ ছিল। আর অয়ন তার বাবা নন্দরও ঘনিষ্ঠ ছিল খুব। 


পালাবদলের আগে অব্ধি তার অয়নমামাও এন্তার রংবাজি করেছে তার বাপের সাথে মিলে। তারপর ঘরে ঢুকে গেছে। ইদানিং আবার ধম্মে-কম্মে মতি দিয়েছে। কোন এক গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছে। গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা পরে। সেটা আসল কিনা গোপাল অবশ্য তা জানে না। পুরোপুরি নিরামিষ আহার। হপ্তায় এক-দু বেলা আবার উপোসও রাখে। গলির মুখে শিবমন্দিরটায় সকাল-সন্ধে বসে থাকে। গত বছর বাইপাস হওয়ার পর বিড়ি ছেড়েছে। মদটাই যা ছাড়তে পারেনি। তবে সামান্যই। শনিবার করে একটা ছোট বাংলার বোতল কেনে। সাথে ছোলা সেদ্ধ। অয়নের বয়স বাহান্ন-তিপ্পান্ন হলেও একটু বেশিই বুড়োটে দেখায়। ইদানিং আবার মৃত্যুচিন্তায় পেয়েছে। নতুন একটা পাথরও ধারণ করেছে। 


অয়নের বাড়িটা পাড়ার একদম ধার ঘেঁষে। একটা কানাগলির ভেতর। বাড়ি শেষ হয়ে পেছনে একটা হাইড্রেন। তারপর রেলের জমি। কিছুটা ছড়িয়ে, ঢালু হয়ে ওপরে উঠে গেছে। সেখানে এখন এক্সপ্রেস হাইওয়ে। আর হাইওয়ে ক্রশ করে আবার ঢালু হয়ে ওপরে উঠে রেললাইন। 


ছোট্ট বাড়ি অয়নের। সদর দরজা থেকে একপাশে কোমর সমান বাউন্ডারির পাঁচিল আর অন্যপাশে ঘরের দেওয়ালের মাঝখান দিয়ে ইট বাঁধানো একটা সরু রাস্তা। পাশাপাশি দুজন ঢোকা যাবে না। এই রাস্তা দিয়ে এসে একটা ছোট উঠোন ঘিরে বাঁদিক থেকে প্রথমে গোয়ালঘরের দরজা। কাঠের ফ্রেমে টিনের পাত বসানো। গোয়ালঘরের দেওয়াল বরাবর কিছুটা নিয়ে কলতলা আর তারপর কয়েক ফুট ফাঁকা জায়গা ছাড়া। ডানহাতে ঘুরে বাথরুম। এরও টিন-কাঠের দরজা। অ্যাসবেস্টসের ছাদ। তারপাশে সিঁড়ি। সিঁড়ির খাঁজে হেঁশেল। আবার ডানদিকে ঘুরে দুটো ঘর। একটা আট বাই সাত। আর একটা দশ বাই দশ কি এগারো হবে। ঘর দুটোর দরজার সামনে একটা করে সিঁড়ি। অন্য দেওয়ালের সাথে রাস্তার দিকেও একটা করে জানলা আছে।  পাকা ছাদ। উঠোন-সিঁড়ি-ঘরের মেঝে নিট সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। ছাদটা ন্যাড়া। কেউ ওঠে না। কাপড়-জামা শুকানোর জন্য উঠোন। 


গোপালকে নিয়ে বাড়িতে লোক বলতে চারজন। অয়ন, তার দ্বিতীয় পক্ষের বউ মাধবী আর তাদের বছর চোদ্দোর মেয়ে টুসু। প্রথম পক্ষের মেয়ে কুহুর বিয়ে হয়ে গেছে গত বছর। কুহুর যখন আট বছর বয়স তখন অয়নের প্রথম পক্ষের বউ কাবেরী মারা যায়। ছোট্ট মেয়েটাকে কে দেখবে ভেবেই দ্বিতীয় বিয়েটা করা। 


বড় ঘরে শোয় তার অয়নমামা আর মাধবীমামী। ছোট ঘরে মামাতো বোন টুসু। এবার থাকতে গেলে থাকতে হয় উঠোনে কিংবা ছাদে। খোলা আকাশের নিচে। অগত্যা গোপাল ঢুকে গেছে পেছনের গোয়ালঘরে। 


গোয়ালঘরটা লম্বায় পনেরো ফুট আর চওড়ায় প্রায় বারো ফুট হবে। ইটের দেওয়াল। অ্যাসবেস্টসের ছাদ। পরিষ্কার করারা সুবিধা হবে বলেই মেঝেটা নিট সিমেন্টে বাঁধানো। ঘরের দরজা থেকে ভেতরে তাকালেই উল্টোদিকে আর একটা দরজা। এটাও ওই টিন-কাঠেরই। তারপর পাশাপাশি বাঁধা দুটো দেশী গোরু। একটা বাদামি। নাম লালি। আর একটা কালো-সাদা। নাম দুলি। পেছনের ওই দরজা খুলে লালি-দুলিকে চড়াতে নিয়ে যাওয়া হয়। ড্রেনের ওপর কাঠের পাটাতন পাতা। তারপর রেলের জমির জঙ্গল কেটে কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করেছে অয়ন। ওখানেই খানিক চড়ায় গোরু দুটোকে। পেছনদিকে আর ডান দিকের দেওয়ালে একটা করে জানলা আছে। যদিও সেগুলোয় ফ্রেম-গরাদ-পাল্লা কিছুই নেই। দুপাশের দেওয়ালে পেরেক মেরে দড়ি টাঙিয়ে ভুষির খালি বস্তা ঝোলানো। তার ফাঁক দিয়ে আলো-হাওয়া আসে। মেঝে থেকে ছাদ মেরেকেটে সাড়ে ছফুট। একটা বাল্ব আছে। 


ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে জানলার কাছে একটা খাটিয়া পাতা। আপাতত তাতেই নতুন তোষক-বালিশ-মশারি নিয়ে গোপাল। দুটো পুরনো চাদর তাকে দিয়েছে তার মাধবীমামী। গোপালের কাছে একমাত্র মুশকিল হল যে গোয়ালঘরে কোনো সিলিং ফ্যান নেই। প্লাগ পয়েন্টও নেই। প্লাস্টিকের টুলের ওপর রাখা চার্জেবল কচি ফ্যানই যা ভরসা। 


এই দুটো গোরুর দুধের আয়েই মূলত সংসার চলে অয়নের। পাড়ার মিষ্টির দোকানে চুক্তি আছে। সকাল সকাল সাইকেলে চেপে অয়ন দোকানে দুধ দিয়ে আসে। এর সাথে সামান্য ফ্ল্যাটবাড়ির দালালি। সেও কালেভদ্রে। এই লাইনে এখন পাড়ায় অন্য উঠতিদের ভীড়। পুরো স্বচ্ছল বলা চলে না। বাড়িতে টিভি, ফ্রিজ, রান্নার গ্যাস থাকলেও মাইক্রোওয়েভ কিংবা মিক্সি নেই। 


গোপাল ভাবে তার অয়নমামার মন আছে না হলে তাকে থাকতে দিত না। অবশ্য অয়ন সেই দলে পড়ে যারা বিশ্বাস করে যে গোপাল চুরি করতে পারে না। প্রতিদানে গোপালও রোজ গোয়াল পরিষ্কার করে আর লালি-দুলিকে খেতে দেয়। মাঝে মধ্যে গা ধুইয়েও দেয়। 


অয়ন খালি লালি-দুলির দুধ দোয় আর মাঝে মধ্যে তাদের চড়াতে নিয়ে যায় পেছনের জমিতে। অয়নের বেশ ভালোই লাগে গোরু দুইতে আর চড়াতে। সেই কবের থেকে করে আসছে!


গাঁজা খাওয়ার সময় আর রাতে শোওয়ার সময় গোপাল গোয়ালঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। না হলে খোলাই থাকে সারাদিন। 


চার


ঘুম থেকে যখন গোপাল উঠল তখন পাঁচটা বেজে গেছে। বিছানা ছেড়ে স্যান্ডো গেঞ্জিটা একটু তুলে লুঙ্গিটা টাইট করে বেঁধে দেওয়ালে দড়িতে ঝোলানো গামছাটা টেনে নিল। 


দড়িতে গামছা ছাড়াও দুটো জিন্স, দুটো টি-শার্ট, একটা স্যান্ডো গেঞ্জি, একটা লুঙ্গি আর গোটা দুয়েক জাঙ্গিয়া ঝুলছে। জেলে যাওয়ার সময় একটা জিন্স-টি-শার্ট-জাঙ্গিয়া পরা ছিল। বাকি সব নতুন কেনা।


কলতলায় এসে দেখল মাধবীমামী চা বসিয়েছে। তার দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করলঃ ঘুম হল?

‘হ্যাঁ, দিব্যি, বৃষ্টিটা হয়ে ঠান্ডা হয়েছে একটু’ বলে গোপাল মুখ-হাত ধুয়ে নিল। গামছায় মুখ মুছতে মুছতে হেঁশেলের সামনেটায় গিয়ে দাঁড়াল। মাধবীমামী হাত বাড়িয়ে চা দিল তাকে। 


মাধবীর বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ। ভরাট চেহারায় একটা বেশ বাঁধুনি আছে। লালিত্যের সাথে খানিক চটক। গোপাল মনে করে মোহিনী শক্তি আছে 'মাধবীমামীর'।


সকালে-বিকেলে দুকাপ চা ছাড়া গোপাল এখানে আর কিছু খায় না। মামা-মামী বলেছিল যদিও বার দুয়েক কিন্তু সে রাজি হয়নি। তারা যে তাকে থাকতে দিয়েছে, সাইকেল ধার দিচ্ছে, এই অনেক। 


দুপুরে 'তারা মা ভাতের হোটেল'। সব্জি-ভাত কিংবা ডিম-ভাত। কচ্চিৎ মুরগি-ভাত। মাছে তার তেমন রুচি নেই। ব্রেকফাস্ট-স্ন্যাক্সের জন্য তার পাশেই 'বাপি টি স্টল'। ওই লুচি-তরকারি কিংবা বাটার টোস্ট। আর দুকাপ দুধ চা। রাতে ঝিলপাড়ে রঘুনন্দনের দোকানে রুটি-তড়কা কিংবা আলুমটর। 


এই বাড়িতে দুধ বেশি দিয়ে একটু ঘন চা হয়। সিঁড়িতে বসে চা খেয়ে গোপাল উঠে গেল দেড়তলার ছোট চাতালটায়। আবার ডানদিকে ঘুরে সিঁড়ি চলে গেছে ছাদের দরজায়। চাতালে বসে গোপাল ধুপকাঠি রেডি করতে শুরু করল। বড়বাজার থেকে কিলো দরে সাধারণ ধুপকাঠি কিনে আনে আর সাথে সুগন্ধি। 


জেলে থাকতে থাকতেই সে ঠিক করেছিল যে ছাড়া পেয়ে পুরোপুরি নিজের একটা ব্যবসা শুরু করবে। আর কোনো পার্টনারশিপে সে যাবে না। তবে পুঁজি যৎসামান্য। পৈতৃক কিছু তো পায়নি। তোলাবাজি করে সংসার টেনে দিলেও তার বাবার সঞ্চয় ছিল না বলাই ভালো। যেটুকু ছিল তার মায়ের অসুখেই বেরিয়ে গিয়েছিল। টানা বারো দিন নার্সিংহোমে রেখেও সে মাকে বাঁচাতে পারেনি। ভাবলেই তার মনটা কেমন খারাপ হয়ে যায়। 


কিছুদিন বসে থেকে এই আইডিয়াটা মাথায় আসে। ইউটিউবে বেশ কয়েকটা ভিডিও দেখে আর কয়েকটা সাইটে পড়ে একদিন বড়বাজারে গিয়ে হাজির হয়। সেখানেও দিন দুয়েক ঘুরে, ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞেস করে, একটু জেনে-বুঝে শুরু করেছে এই ব্যবসা।


দুটো বড় অ্যালুমিনিয়ামের জারে ভরা তরল সুগন্ধি। একটা চন্দনের আর অন্যটা গোলাপের। আপাতত এই দুটো ভ্যারাইটিই রেখেছে।ধুপকাঠির বেশ কয়েকটা বান্ডিল খবরের কাগজের ওপর খাড়া করে দাঁড় করানো। সবগুলোই এক কিলোর। বেশ কয়েকটা শক্ত কাগজের বাক্স থাকে থাকে সাজানো একপাশে। একটা প্যাকেট সিল করার মেশিন। আর কয়েকটা চটের বড় সাইজের ব্যাগ।


একটা একটা করে ধুপকাঠির বান্ডিল নিয়ে কিছু চন্দনের আর কিছু গোলাপের সুগন্ধিতে চুবিয়ে, একসেস ঝরিয়ে, উল্টো করে, খাড়া দাঁড় করিয়ে রেখে দিতে থাকল দুটো আলাদা আলাদা অ্যালুমিনিয়ামের ট্রেতে। সুগন্ধি নিয়ে আরও রিসার্চ করতে হবে। তারপর নিজেই বানাবে তার সুগন্ধি। 


হয়ে গেলে একবার নিচে নেমে বাথরুম হয়ে এল। তারপর সিঁড়ির ছোট জানলাটা দিয়ে বাইরে মরা আলো দেখতে দেখতে একটা বিড়ি ধরাল। 


বাক্স-প্যাকেট বড়বাজারের এক দোকান থেকেই অর্ডারে কেনে। ডিজাইন-লোগো-ক্যালিগ্রাফি করিয়েছে টবিন রোডের একটা প্রেস থেকে। ক্যালিগ্রাফিটা তারই পছন্দ করা। অনেক ভেবেচিন্তে, পূজা, উপাসনা, আরাধনা, প্রার্থনা ইত্যাদি নাম ঠিক করে ও বাতিল করে অবশেষে তার মায়ের নামে কোম্পানির নাম রেখেছে ‘বন্দনা ফ্র্যাগ্র্যান্স’।


আধঘন্টা পর বান্ডিলগুলো খুলে ধুপকাঠিগুলো খবরের কাগজের ওপর সমান ভাবে ছড়িয়ে দিল। একটা একটা করে বাক্স খুলে তার ভেতর থেকে পাতলা প্যাকেট বার করে প্রতিটায় তিরিশটা করে ধুপকাঠি ভরল। প্যাকেটের ওপর একপিঠে বাংলায় অন্যপিঠে ইংরেজিতে লেখা চন্দন কিংবা Sandal ও গোলাপ কিংবা Rose। তারপর ধুপভরা প্যাকেটগুলো মেশিনে সিল করে ঠিকঠিক বাক্সগুলোতে ভরতে থাকল। 


ওপর থেকে গাঢ় গেরুয়া নিচে নামতে নামতে ক্রমশঃ ফিকে হয়ে হলু্দ। বাক্সের রং। দুদিকেই ওপরে ঠিক মাঝামাঝি ছোট্ট করে লাল-কালো-সাদায় লাইন ড্রইংয়ে আঁকা ধুপদানি, চারটে জ্বলন্ত ধুপ, ও ধোঁয়া। ওটাই গোপালের কোম্পানির লোগো। লোগোটা এঁকেছে প্রেসের ডিজাইনার রাজীব।


লোগোটার ঠিক নিচেই একদিকে হলুদের তিনটে শেডে বাংলায় লেখাঃ 


বন্দনা 

শুদ্ধ ধুপকাঠি


ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় কিছু বাক্সের ওপর লেখা চন্দন আর কিছুর ওপর লেখা গোলাপ।


অন্যদিকে ইংরেজিতে হলুদের তিনটে শেডে লেখাঃ


BANDANA

PURE AGARBATHIES


আর ঠিক একইরকম মাঝামাঝি লেখা Sandal কিংবা Rose।


এর নিচে দুপিঠেই আবার ঠিক মাঝামাঝি একটু বড় করে লোগোটা আঁকা।


বাক্সের একপাশে লোগো ও বারকোডের সাথে বাংলা-ইংরেজি দুভাষাতেই মূল্য, কোম্পানির নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদির সাথে লেখা আছে প্রোপাইটারঃ গোপাল গোস্বামী।


সবশেষে প্রতিটা বাক্সের দুমুখে সেলোটেপ মেরে দিল। ব্যাস, আজকের মতো তার কাজ শেষ।


ব্যাঙ্কে কিছু টাকা ছিল। সেই দিয়েই তোষক, বালিশ, মশারি, জামাকাপড়, ফ্যান, টুল ও অন্যান্য টুকিটাকি জিনিশ কিনেছে। আর ঢেলেছে এই ব্যবসায়। সিলিং মেশিন, উপকরণ, ট্রে, জার, চটের ব্যাগ, লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন এইসব। তাতেই অ্যাকাউন্ট ফাঁকা।


রোজ সকাল সাতটা নাগাদ তার অয়নমামা দুধ দুইতে এলে গোপালের ঘুম ভাঙে। উঠে চা খেয়ে লালি-দুলিকে খেতে দেয়। তারপর তারপর হাফ ছিলিম খেয়ে কলতলা থেকে বড় বালতিতে দুবার জল ভরে এনে  গোয়ালঘর পরিষ্কার করে।


সাড়ে আটটা নাগাদ অয়ন মিষ্টির দোকানে দুধ দিয়ে ফিরে আসে। নটা-সাড়ে নটার মধ্যেই গোপাল ওয়ালেট, সেলফোন আর দুটো বড় চটের ব্যাগে ধুপকাঠির প্যাকেট ভরে তার মামার সাইকেলে চেপে বেরিয়ে যায়। 


প্রথমে বাপির দোকানে ব্রেকফাস্ট করে। তারপর দোকানে দোকানে ধুপকাঠি ফিরি করে। পাইকারি দরে। প্রায় দেড়-দু কিলোমিটার রেডিয়াসে ছোট-বড় মুদির দোকান, দশকর্মা ভান্ডার, স্টেশনারি দোকান চষে ফেলে সে। কোনোদিন যায় বেলঘরিয়ার দিকে, কোনো দিন টবিন রোড অব্ধি আবার কোনোদিন দক্ষিনেশ্বর। যতীন কলোনীটাই যা মাড়ায় না, আর কী! 


কম্পিটিটর তো কম নেই। তবে গোপাল খুবই ভালো সুগন্ধি, ভালো কোয়ালিটির ধুপকাঠি এবং সর্বোপরি একটু কম দামে দেওয়ায় বলতে নেই এই এক মাসেই ব্যবসাটা দিব্যি ধরেছে মনে হচ্ছে। আরও বাড়বে। মানে গোপালের সেরকমই আশা ও উদ্যম।  


কাজ শেষ করে নিচে নেমে উঠোনের তারে মেলা জাঙ্গিয়াটা আর কালো রঙের স্যান্ডো গেঞ্জিটা তুলে নিয়ে গোয়ালঘরে ঢুকে গেল। ওদুটো শুকিয়ে গেছে। 


গোয়ালঘরে গিয়ে লুঙ্গি ছেড়ে জিন্স-টি-শার্ট পরে-চুল আঁচড়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে এল গোপাল।


কলতলা থেকে উঠোন পেরিয়ে সদর দরজার দিকে যেতে যেতে দেখল মাধবীমামী সিঁড়ির সামনেটায় উঠোনের দিকে মুখ করে বসে কুটনো কুটছে। বাঁহাত তুলে কপালের ঘাম মুছল। গোপাল লক্ষ্য করেছে মাধবীমামী সবসময় স্লিভলেস ব্লাউজ পরে। 


গোপাল সদর দরজা টপকে গলির রাস্তায় এসে পড়ল। সন্ধে তখন সাতটা হবে। 


পাঁচ


অয়নের বাড়ির গলিতে ঢোকার আগে ডানহাতে ঘুরে হাইড্রেন ঘেঁষে শিবমন্দিরটা পড়ে। তার পেছনে যথারীতি রেলজমি। শিবমন্দিরের চাতালটায় বসে অয়ন আর আনন্দ শাস্ত্রী আড্ডা দিচ্ছিল। সন্ধের পুজো সেরে ততক্ষণে পুরুত কেশব ভটচায চলে গেছে। গোপাল তাদের দেখে এগিয়ে মন্দিরের দিকে গেল।


আনন্দ শাস্ত্রীর বয়স পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ। জোতিষী। একটু মডার্ন টাইপ। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। মোড়ের মাথায় সাইনবোর্ডে যে বিজ্ঞাপন আছে তাতে দেখা যায় আনন্দ নিজের চেম্বারে ল্যাপটপ খুলে বসে আছে। মাথার পেছনে কালীঠাকুরের মস্ত একখানা ছবি। অন্যান্য অধিকাংশ জোতিষীর মতোই আনন্দও তারাপীঠসিদ্ধ। বিজ্ঞাপনে সেটা লেখা আছে। আরও অনেক কিছুর পাশাপাশি সে যে রত্নবিশারদ এবং তার যে এমএ ডিগ্রি আছে তাও লেখা আছে বিজ্ঞাপনে। 


খুব নামকরা না হলেও পসার ভালোই। সকাল-বিকেল ক্লায়েন্ট মিট করে। সন্ধে থেকে কোনো কাজ করে না। প্রথমে শিবমন্দিরে আড্ডা মারে তারপর রাত বাড়লে নাকি বাড়িতে শক্তির আরাধরানায় বসে। কে জানে!


আগে সাইনবোর্ডে ছবি কিংবা কখনও রাস্তাঘাটে দেখে থাকলেও এ পাড়ায় আসার পর তার অয়নমামার সূত্রেই আলাপ-পরিচয়। গোপাল ডাকে 'আনন্দদা' বলে। সে গোপালের ব্যাপারে সবই জানে। সিম্পাথাইজও করে। জ্যোতিষী মানুষ। বলা তো যায়না, হয়তো এক নজরেই বুঝে ফেলেছিল গোপালের কপাল ও নাড়ি-নক্ষত্র!


কিছুদিন আগেই গোপাল হাত দেখিয়েছে আনন্দ শাস্ত্রীকে। যা যাচ্ছে তার বছরগুলো! আগে এসবে তেমন বিশ্বাস ছিল না তার। 


গোপাল দেখেছিল আনন্দদা স্পষ্ট কথার লোক। ক্লায়েন্টের মন জুগিয়ে কিছু বলে না। যেমন তাকে বলেই দিল যে তার গ্রহের দশা কেটে গেছে ঠিকই তবে জীবনে সমৃদ্ধি কোনোদিনই আসবে না। স্বচ্ছলতা থাকবে। বিবাহযোগও নাকি একটাই ছিল এবং তা চলেও গেছে। তবে ব্রহ্মচারী জীবনও তার হবে না। কোনো না কোনো ভাবে সঙ্গিনী হবে তার। একাধিকও হতে পারে। তবে জীবনের ঠিক কোন কোন বয়সে বা সময়ে তারা আসবে, থাকবে বা চলে যাবে তা বলতে গেলে নাকি আরও রিসার্চ করতে হবে এবং তা একটু খরচ সাপেক্ষ। আগামী দশ বছরে কোনো বড় ক্ষতি, জীবনের ঝুঁকি, সংঘাত ইত্যাদি নেই। 


গোপালের জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। এমনিতে আনন্দ শাস্ত্রী হাত দেখলে পাঁচশো টাকা ফিজ নেয়। গোপালের থেকে তিনশো নিয়েছিল। দুটো পাথর ধারণ করতে বলেছে। গোপাল পরে নেবে বলেছে। কাছাকাছি একটা সুপার মার্কেট আছে। সেখানে অজন্তা জুয়েলার্সে হপ্তায় দুদিন দুঘন্টা করে বসে আনন্দ শাস্ত্রী। পাথর ও আংটি সেখান থেকেই ব্যবস্থা করে দেবে সে। সব জায়গায় নাকি গ্রহরত্ন খাঁটি হয় না। 


গলির মুখে ডানহাতের প্রথম বাড়িটাই আনন্দ শাস্ত্রীর। তারপরই অয়নদের বাড়ি। আক্ষরিক অর্থেই আনন্দ শাস্ত্রী গোপালদের প্রতিবেশী। গলির দিকে বড় বারান্দা লাগোয়া দুটো ঘরের একটাতে তার চেম্বার অন্যটা ওয়েটিং রুম। দোতলায় বাবা-মা-বউ-ছেলে নিয়ে আনন্দর সংসার। রান্নাবান্না-খাওয়াদাওয়া একতলায়। বাড়ির সদর দরজাটা শিবমন্দিরের দিকে। তার পাশে বাড়ির বাইরে মন্দির লাগোয়া একটা ছোট ঘর। পাকা দেওয়াল। টিনের চাল। পেছনে লাগোয়া বাথরুম। আগে রাতদিনের একজন কাজের লোক ছিল। ওই ঘরে সেই থাকত। কাজ ছেড়ে চলে গেছে বহুদিন। তারপর থেকে ফাঁকাই পড়ে আছে। 


কথাবার্তা পাকা। মাসে তিন হাজার টাকায় গোপাল ওটা ভাড়া নেবে। এক মাসের ডিপোজিট। এগ্রিমেন্টটা আনন্দ করতে দিয়েছে। এবার থেকে গোপাল আর কোনো মুখের মাথায় রিস্ক নেবে না। ঘরটা চওড়ায় মাত্র সাত-আট ফুট হলেও লম্বায় প্রায় দশ। বাথরুমটা খুব ছোট্ট হলেও গোপালের স্নানের কোনো অসুবিধে হবে না।


গোপাল আনন্দ শাস্ত্রীর ও তার অয়নমামার সাথে একটু গল্পগাছা করে উল্টোমুখে রওনা দিল পাড়ার মোড়ের দিকে। কিছুটা এগিয়ে বিড়ি ধরাল। এখন যাবে বাপির দোকানে। 


ঠিক করেছে ব্যবসাটা জমে গেলে আগের মতো সিগারেটে ফিরে যাবে। গোল্ডফ্লেক মিডিয়াম। ইদানিং বিড়িটা খাচ্ছে কিংবা খাওয়াদাওয়া সস্তায় সারছে কারণ টাকা জমাচ্ছে। ডিপোজিট আর ভাড়া মিলিয়ে কয়েকদিনেই ছহাজার দিতে হবে আনন্দ শাস্ত্রীকে। বলতে নেই জমেই গেছে। এখন শুধু উকিল এগ্রিমেন্টটা পাঠালেই হয়ে যায়। 


হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভাবল আঃ! আর মাত্র কয়েকদিন। ব্যাস, তারপরই সে গোয়ালঘর ছেড়ে উঠে যাবে নতুন ভাড়া ঘরে। একটা স্ট্যান্ড ফ্যান কিনবে প্রথমেই। 


ছয়


ঝিলপাড়ে পাকা বাজার হওয়ার আগে বড়রাস্তার পাশে যতীন কলোনী ঘেঁষে এলাকার বাজারটা বসত। তখন গোপাল কচি। তখন থেকেই দু-তিনজন শাগরেদ নিয়ে নন্দ বাজারে তোলা তুলত। নিজের ওয়ার্ড-পাশের ওয়ার্ড দুই ওয়ার্ডের কাউন্সিলরেরই স্নেহধন্য ছিল। 


একটা ছোট্ট মফস্বলি বাজারের খুচরো বিক্রেতাদের থেকে তোলা আদায় করে তো কেউ বড়লোক হয় না। আবার যা তুলছে তার সবটাই তো আর একার নয়। নানান হিস্যায় ভাগ-বাটোয়ারা করে হাতে যা আসত তা দিয়ে বউ-ছেলে নিয়ে চলে যেত মোটামুটি।


তার বাবার খুন হওয়া ছাড়াও আর একটা গুরতর ঘটনার কথা গোপালের মনে আছে। সেটা ঘটেছিল পালাবদলের কিছু আগ দিয়ে। বছর বারো-তেরো আগে। তাদের কলোনী থেকে কিছু দূরে আসলামবাজার বলে একটা এলাকা আছে। সেখানে একটা জুটমিল ছিল। বন্ধ হয়ে গেছে বহুকাল। এই বন্ধ হওয়া ঘিরেই সেই ঘটনা। 


জুটমিলে তখন লেবাররা ঘেরাও করেছে। দু-তিন ঘেরাও চলছে। ইউনিয়ন তাদের দাবীতে অনড়। লেবাররা প্রবল প্রত্যয়ে গেট ঘিরে বসে আছে। কারও কারও হাতে লালঝান্ডা। তবে মালিককে আর কোথায় পাবে! ওই ম্যনেজার আর কিছু কর্মচারী ঘেরাও হয়ে আটকে আছে। পুলিশ তেমন সুবিধে করতে পারেনি।


সে যাইহোক, নন্দর মতো লোকেরা এইসব ঘেরাও-বিক্ষোভ সমাবেশে যেত টেত। পার্টির লেবার ইউনিয়নের হয়ে ভীড়-হল্লা বাড়াতে। মানে যেতে হত, আর কী! সেবারেও ব্যাতিক্রম হয়নি। আশেপাশের তৎকালীন আরও নানান সব হুব্বা যেমন বাজারের মুরগি-শ্যাম, রূপালী সিনেমা হলের টিকিট ব্ল্যাকার নারায়ণ ওরফে নাড়ু, সাট্টা-কানাই, ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের স্টার্টার গোবিন্দ নস্কর প্রমুখদের জুটিয়ে রোজই সেখানে নন্দ হাজিরা দিচ্ছিল। আন্দোলন জোরদার করার উদ্দেশ্যে। স্থানীয় নেতাদের নির্দেশে। 


এরপরই ঘটে সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনা কিংবা অপরাধ। কে বা কারা ছিল তার নেপথ্যে তা গোপাল জানে না। এমনকি নন্দও ঠিক জানত না। সবসময় তো ভীড়ের ওপর, সে যতই সংগঠিত হোক, পার্টির কন্ট্রোল থাকে না। আর কন্ট্রোল হারিয়েই ঘটে যায় এইসব অঘটন।


তিনদিনের দিন দুপুরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় জুটমিলে। অন্যান্য কর্মচারীরা প্রাণ বাঁচিয়ে পাঁচিল টপকে কোনোভাবে পালালেও বেচারা বুড়ো ম্যানেজারটা আগুনে পুড়ে মারা যায়।


এই ঘটনার পর বছর দুয়েক নন্দ ফেরার ছিল। গোপালের মনে আছে তখন তার অয়নমামা তাদের বাড়িতে এসে মাঝে মাঝে কিছু টাকা তার মায়ের হাতে দিয়ে যেত। মা নিতে না চাইলে বলত ‘আরে রাখ তো, নন্দদা ফিরলে তখন শোধ দিয়ে দিস, না হয়। এখন সংসার চালাবি কি করে? 


যাইহোক, পালাবদলের পরপরই তার বাবা নন্দ ফিরে এল এলাকায়। এলাকার বাইরে থেকেই সবকিছু ফিক্স করে এসেছে সে। পুরনো অভিযোগও পাতলা হয়ে গেছে। দেখা গেল নন্দ লাল ছেড়ে ভোল বদলে সবুজে গেছে। তারপর আবার যে কে সেই। বাজার, লুঙ্গি-শার্টে নন্দ, শাগরেদবৃন্দ ও তোলাবাজি। দিব্যি সংসার চলতে থাকল।


গোপাল আর তার মাকে নন্দ বলেছিল যে যখন আগুন লাগানো হয় তখন সে সেখানে ছিল না। একটু দূরে একটা হোটেলে গোবিন্দকে নিয়ে দুপুরের খাওয়া সারছিল। জুটমিলে ফিরে দেখে এই কান্ড! সবাই হুড়োহুড়ি করে পালাচ্ছে। তাই নন্দ-গোবিন্দও সেখান থেকে চম্পট দেয়। 


খুন হওয়ার দিন সাতেক আগে নন্দ তার দুই শাগরেদ মুরগি-শ্যাম আর বলরামকে নিয়ে মোটরসাইকেলে চেপে গিয়েছিল শ্রীপল্লী। দুটো পেটো ফেলেছিল আর কয়েক রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে এসেছিল। 


শ্রীপল্লী সন্তোষের এলাকা। সন্তোষ তার বিরোধীগোষ্ঠীর। তাই তাকে খানিক চমকে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। যাইহোক, সেই সময় সন্তোষ বা তার দলবল এলাকায় ছিল না। থাকলে কি হত বলা যায় না। হয়তো আরও বড় কিচাইন হয়ে যেত। যাইহোক, নিরাপদে কাজ সেরে ফিরে এসেছিল নন্দ। 


খুনের দিন বাজারের সামনেটায় নন্দ দাঁড়িয়ে ছিল। সকাল সাড়ে দশটা-এগারোটা হবে। সাথে ঠিক কে কে ছিল সেটা গোপাল জানে না। মোটরসাইকেলে করে দুজন এসেছিল। পেছনের জন পরপর দুটো গুলি ছুঁড়েছিল। একটা লেগেছিল নন্দর গলায় আর একটা বুকে। স্পটডেড। 


কিছুদিন পর পাপ্পু, যে গুলি ছুঁড়েছিল আর রাকেশ, যে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল ধরা পড়ে ছিল। তারা এখন জেলও খাটছে। তবে তারা ছিল ভাড়াটে। জেরায় জানিয়েছিল কে কোথাকার এক বাব্বান নাকি তাদের নন্দর সুপারি দিয়েছিল। স্কেচও নাকি করানো হয়েছিল তার। তবুও সেই বাব্বান এখনও অধরা। তাই সরাসরি সন্তোষের দিকে আঙুল তোলা যায় না।


নন্দ খুন হওয়ার পর থেকে গোপাল লক্ষ্য করেছিল যে তার আশেপাশের লোকজনের ব্যবহারের পার্থক্য। যারা আগে যথেষ্ট সমীহ করে চলত তারাই কেমন কাঁধে হাত রাখতে শুরু করল। সেটাই  হয়তো স্বভাবিক ছিল। সে মেনেও নিয়েছিল তা।


বিয়ের পরপর প্রোমোটিং শুরু করবে ভেবে বাড়িওয়ালা 'তড়িৎজেঠু'র সাথে কথা বলেছিল কিন্তু সে রাজি হয়নি। আসলে ওখানে একটা গল্প ছিল। 'তড়িৎজেঠু' অর্থাৎ তড়িৎ হালদারের দুই বোন ছিল। আর তারা বাড়ির ক্লেইম ছাড়েনি এবং তারা দুজনেই ফ্ল্যাট চায়। তো জি প্লাস থ্রি কনস্ট্রাকশন হলে একতলায় সামনের দিকে দুটো গ্যারাজ-দোকান ছেড়ে পেছনদিকে একটা ফ্ল্যাট হয় এবং সেটা গোপালদের দিতে হয় কারণ তারা প্রায় সাতাশ বছর ভাড়া আছে। আর তিনটে তলায় ছটা ফ্ল্যাটের তিনটে তারা তিন ভাই-বোনে নেবে। বোনেদের না দিলে তো প্রোমোটিং করতেই দেবে না তারা। তা হলে বিল্ডারের হাতে রইল মাত্র তিনটে ফ্ল্যাট। তাতে কোনো বিল্ডার রাজি হবে না। গোপালকে অবশ্য তড়িৎ এটা খুলে বলেনি। ইচ্ছে করেই। 


ওদিকে বুবাই-পিকলুর সাথে আলাদা করে কথায় তড়িৎ সেই সমস্যার কথা জানিয়েছিল। আসলে তড়িৎ ছিল মহা ধুরন্ধর। সে মনে মনে ফ্ল্যাট চেয়েছিল কিন্তু দেখেছিল যে বিল্ডার, দুই বোন ও ভাড়াটে সবাইকেই খুশি করা অসম্ভব। একজন কে না একজনকে বাদ দিতেই হবে। 


ইনিয়ে বিনিয়ে বুবাই-পিকলুকে সে বুঝিয়েছিল যে আসলে গোপালই হল এই প্রোমোটিংটার কাঁটা। তাকে সরাতে পারলেই আর কোনো সমস্যা থাকবে  না। তারা তিন ভাই-বোন খুশি খুশি তিনটে ফ্ল্যাট নিয়ে নেবে। আর বুবাই-পিকলুর শেয়ারে থাকবে চারটে ফ্ল্যাট। যাকে বলে এক কথায় আইডিয়াল ডিল। 


বুবাই-পিকলু পড়াশুনা একটু কম করলেও যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিল। তারা সারার্থ বুঝে যায় অতি সহজেই। প্রথম কনস্ট্রাকশন তোলার সুবর্ন সুযোগ তাদের দুর্নিবার আকর্ষন করে। তারা বড়ই উদ্বেল ও প্রবল উৎসাহী হয়ে ওঠে।


সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে এরপরই গোপাল-উৎখাত ষড়যন্ত্রের অবতারণা। হ্যাঁ, আর একটা কথাও এখানে বলে রাখতে হবে তা হল চন্দনার ওপর প্রথম থেকেই বুবাইয়ের নজর ছিল। গোপাল নন্দর ছেলে বলেই পাঙ্গা নেয়নি আগে।


সাত


-পুন্নিমা রাতে মোচ্ছব হবে। অমাবস্যাতে হবে তান্ডব। হবেই। কেউ আটকাতে পারবে না। হাহাহাহা…

'এই সেরেছে, ননী পাগলা' গোপাল মনে মনে বলে উঠে হনহন করে হাঁটা দিল। 


ননী পাগলাও ছাড়বার পাত্র নয়। রাস্তাটা যেখানে ঝিলপাড়ের দিকে ঘুরেছে সেখানেই একটা রকে বসে ছিল। গোপালকে দেখেই সুর করে চিৎকার ছুঁড়েছে। এবার উঠে গোপালের পিছু নিল। লাফাতে লাফাতে ওকে ধরেও ফেলল। গোপালের প্রায় ঘাড়ের কাছে গিয়ে হিসহিস করে বললঃ অ্যাই বাঁড়া, দশটা টাকা দে। দে, বলছি। 

গোপাল অগত্যা পিছু ছাড়াবার জন্য দশটা টাকা তাকে দিল।


দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। মাথার মাঝখানে টাক পড়েছে। দুপাশে কাঁধ অব্ধি লম্বা চুল। সবই কাঁচাপাকা মেশানো। রুক্ষ ও অবিন্যস্ত। নোংরা একটা ফুলহাতা শার্ট। এই গরমেও গলা ও হাতার বোতাম আটকানো। পরনে অতি নোংরা পায়জামা। ডান হাঁটুর কাছে খানিকটা ছেঁড়া।


মালটা প্রায়দিনই এই সময় এখানটায় বসে থাকে। আর গোপালের থেকে দশ টাকা চায়। দিতেও হয়। নইলে পিছুপিছু খিস্তি খিস্তি করতে করতে চলে। হয়তো অন্যদেরও পিছু করে টাকা তোলে। কে জানে! 


মোড়ের মাথায় পৌঁছে বাপির দোকানে গোপাল চা আর টোস্ট বলল। ভোম্বল স্ট্যান্ডেই ছিল। তাকে দেখেই ‘কি রে পাগলা, কি খবর?’ বলে চেচিয়ে উঠল। গলা শুনেই গোপাল বুঝল অলরেডি ভোম্বল চড়িয়ে আছে। চায়ে নিতে নিতেই ‘ভালোই রে’ বলে আলগোছে উত্তর দিল। আর পাত্তা দিল না। ভোম্বলটা খুবই বদ ও ফিচেল। এক্ষুনি বউ-টউ নিয়ে পিনিক দেওয়া শুরু করবে। 


রিকশা থেকে নেমে টেরিকাটা চুল নিয়ে ভোম্বল চায়ের দোকানে তার কাছে এসে দাঁত কেলিয়ে দাঁড়াল। ওপর-নিচ মিলিয়ে সব দাঁতেই পানমশলার গাঢ় ছোপ ধরেছে। একটা বিড়ি চাইল। গোপাল বুঝেছে এইবার শুরু করবে খোঁচাখুঁচি করা আর থেকে থেকে পিনিক মারা। 


ভোম্বল বিড়িটা ধরাতে ধরাতেই বললঃ বুবাই মালটা কি হারামি জানিস? ওই মথুরগড়ের রবি সাহার মেয়েটাকে ছক করচে। খবর আচে। বিড়ি ধরিয়ে দেশলাইটা জামার পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে গোপালের দিকে তাকিয়ে বললঃ ওদিকে আবার তোর বউটাকে নিয়ে, ভাব, কেমন ঢ্যামনা! 


ভোম্বল আগে তাকে 'তুমি' করে বলত গোপালের স্পষ্ট মনে আছে। তুই-তোকারিটা ইদানিং শুরু করেছে। সে জেল থেকে ফেরার পর।  


গোপাল জানে যে ইনিয়ে-বিনিয়ে ভোম্বল তাকে তার বউ নিয়েই খোঁচাবে। ও কোনো উত্তর দিল না। চা-টোস্ট জলদি শেষ করে, মানে টোস্টের শেষটুকু চিবোতে চিবোতেই ‘একটু তাড়া আছে, ভাই’ বলে হাঁটা দিল। বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলে উঠলঃ অসহ্য মাল একটা! 


চায়ের দোকান ছেড়ে গোপাল এগোল ঝিলটার দিকে। ঝিলপাড়ের উল্টোদিকে ‘বলদা’ অর্থাৎ বলরামের বাড়ি।


বলরাম, যে সর্বত্র শুধু ‘বল’ বলেই পরিচিত কি তারপর ‘দা’ কিংবা ‘কাকু’, ছিল শেষদিকে গোপালের বাবার ডানহাত। গোপালের বাবা খুন হওয়ার পর কয়েকমাস এলাকাছাড়া ছিল। প্রাণভয়ে। সন্তোষের শাসানিতে। তারপর কাউন্সিলর বিশ্বরূপ পোদ্দারের মধ্যস্থতায় ফিরে মুচলেখা দিয়ে তোলাবাজি ছেড়ে একতলা বাড়ির সামনের ঘরে মুদিখানা খুলেছে। 


গোপালের থেকে বছর দশেকের বড়। বাড়ির পেছনের ঘরে ছেলে-বউ নিয়ে থাকে। সকাল-দুপুর-বিকেল নিজেই বসে দোকানে। আর সন্ধে সাতটা নাগাদ ছেড়ে দেয় বউয়ের হাতে। নটায় দোকান বন্ধ করে তার বউ।


আট


বলর বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে গোপাল দেখতে পেল ‘বল-বৌদি’ দোকানে বসে আছে। রোজই থাকে। 


ইচ্ছে করেই দেখায় কিনা গোপাল তা জানে না তবে এটা সত্যি যে আজ অব্ধি সে যতবারই ‘বল-বৌদি’কে দেখেছে দোকানে ততবারই দেখেছে তার খাঁজ। শাড়িটা সামান্য একটু সরে থাকে বা হয়তো সরিয়ে রাখে সাথে আঁটো ব্লাউজে গভীর খাঁজ স্পষ্ট দেখা যায়। এটা অবশ্য একটা বিজনেস স্ট্র্যাটিজিও হতে পারে। মানে গোপাল সময় সময় সেরকমও ভেবেছে আর কি। যাক গে।


হাসিমুখে হাত তুলে গোপালের সম্ভাষণে একটা আলগা হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। গোপাল বাড়ির ভেতর ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে সোজা ছাদে উঠে গেল।


এই ছাদেই বসে তাদের তিনজনের আড্ডা। গাঁজা-ছিলিম নিয়ে মাদুর পেতে বসা। সাথে জলের দুটো বোতল আর ভবতারিণী মিষ্টান্ন ভান্ডারের গুজিয়া। বলর হাতেই ছিলিম-গাঁজায় হাতেখড়ি গোপালের। আগে অবশ্য শুধু সন্ধেবেলা বলর এখানে এসে খেত। তাও প্রতিদিন নয়। জেলফেরত রোজই আসছে। নিজে হাতেও গোয়ালঘরে দুছিলিম সেজে খাচ্ছে। 


আড্ডার আর এক পান্টার হল বৃন্দাবন। স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটির ক্লার্ক। আর বছর তিনেক চাকরি আছে। গোপালের ’বৃন্দাবনকাকা’। বলর ’বৃন্দাবনদা’। বিয়ে-শাদি করেনি। বলর বাড়ির দুটো বাড়ি আগে পৈতৃক বাড়ির তিনতলায় একলাই থাকে। হাঁড়ি আলাদা। 

এই ’বৃন্দাবনকাকা’ গোপালের ধুপকাঠি কোম্পানির লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি করতে গোপালকে খুবই সাহায্য করেছে। আড্ডায় গুজিয়াটা নিয়ে আসে বৃন্দাবনই।


তারা প্রত্যকেই অসমবয়সি হলেও সবাই বন্ধুর মতো মেশে। ছোট-বড় বিচার নেই। ঘন্টাদুয়েক বসা হয়। মাঝারি সাইজের ছিলিমে দুবার সাজে বল। 


এখানে বলে রাখা দরকার গোপাল তার খোরাকের মালটা বলর থেকেই নেয়। নিজে ঠেকে যায় না কখনও। বল তুলে রাখে ও টাকা দিয়ে নিয়ে নেয়। গোপাল কখনও মাল স্টক করে না। প্রতিরাতেই মাল নেয়। রাতে শুতে যাওয়ার আগে আর পরদিন সকাল-দুপুর তাতে তার হয়ে যায়। 


-আয় বোস, আজ নতুন বাঁশিটা উদ্বোধন করব। গোপালকে ছাদের দরজা থেকে দেখতে পেয়েই বলল বল।

বল-বৃন্দাবন ছিলিমকে বলে বাঁশি। গতকাল পুরনোটা ফেটে গেছিল।

ছিলিম সাজানোই ছিল। গোপাল হাসিমুখে মাদুরে বসতে না বসতেই তোলা হল। বৃন্দাবনই তুলল আজ। 


-যে বাঁশি শুনে মন ভরে যায় তাকে কি বলে বল তো? গলগল করে ধোঁয়া ছেড়ে ওদের দুজনকেই জিজ্ঞেস করল বৃন্দাবন। একমুখ মিটিমিটি হাসি।

ওরা জানে না। দুজনেই মুখ চাওয়চাওয়ি করে সেটা বলতেই ‘মোহন বাঁশি’ বলে গোপালকে ছিলিমটা পাস করে দিল।

তারপর বললঃ আমাদের এ বাঁশিও মোহন, কি বল? 

বল আর গোপাল একটু হেসে উঠল। গোপাল ছিলিমে টান দিতে গেল।

বলর হাসি আর গোপালের টানের মাঝেই বৃন্দাবন বলে উঠলঃ তবে এ বাঁশি শোনার নয়। টানার। টানলেই মন ভরে যায়। তাই না?

বল হেসে ‘ঠিক’ এবং গোপাল টানটা দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ‘ঠিককথা’ বলে হেসে উঠল। ওদিকে বৃন্দাবনও কান অব্ধি ছড়িয়ে হাসছে, নিশব্দ। 

বল টেনে পাস করে দিল তাকে।


রাত সাড়ে নটা নাগাদ গোপাল বলর বাড়ি থেকে বেরিয়ে উল্টোদিকে রঘুনন্দনের দোকানে ঢুকে পড়ল। সাথে বৃন্দাবন।


রঘুনন্দনের দোকানে বসে তেমন কেউ খায় না। রাতের রুটি-তড়কা কাউন্টার থেকে তুলে নিয়ে চলে যায় আধিকাংশ লোক। গোপাল অবশ্য বসেই খায়। 


পেছনে একটাই প্লাস্টিকের টেবিল আর চারটে চেয়ার পাতা আছে। রান্না করে বুড়ো রঘুনন্দন। আর ওর বছর তিরিশের জোয়ান ছেলে পবন হেল্পার ও ওয়েটার। ওরা বিহারি। তবে এখানে তিনপুরুষের বাস। বাংলাই বলে। আইটেম বেশি নয়। তড়কা (প্লেইন/এগ/চিকেন), আলুমটর, চিকেন কষা আর রুটি।


গোপাল টেবিলে বসতে না বসতেই পবন বললঃ আজ চিকেন কষা দিই। কি রোজ রোজ ভেজ মারছ। 

'দে' বলে গোপাল জাগ থেকে গ্লাসে জল ঢালতে লাগল। 


বৃন্দাবন রোজকার মতো রুটি-তড়কা নিয়ে 'চলি রে, গোপলা, কাল দেখা হবে' বলে চলে গেল।


চারটে রুটি-চিকেন কষা পেঁয়াজ-লঙ্কা দিয়ে খেয়ে দোকানের বাইরে এসে একটা বিড়ি ধরাল গোপাল। তারপর বাড়ির দিকে হাঁটা লাগাল।


নয়


হাঁটতে হাঁটতে গোপাল ভাবতে থাকল যে সে পুরোপুরি সুবোধ বালক না হলেও কতগুলো গুণ ছিল তার। যেমন কোনোদিন পার্টি-পলিটিক্সের ধার সে মাড়ায়নি। মারামারি-লাফড়াবাজিতে ছিল না কখনও। টিটিটা দারুন খেলত। ফুটবলটাও ভালোই খেলত। স্টপার ছিল। স্কুল-টিমের হয়ে নার্সারি লীগ-জোনাল খেলেছে। তবে এইচএসের পর আর খেলেনি। ডানপায়ের পাশাপাশি বাঁপাটাও দিব্যি চলত তার। বিরক্তিতে মনে মনে খিস্তি করে উঠলেও খুব একটা মুখে আনত না। চন্দনা ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে ছক করেনি। বেশ্যাবাড়িও যায়নি কখনও। অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার লোকও সে নয়।  


সেই কিনা মিথ্যে চুরির দায়ে জেল খাটল! এরপর হয়তো চন্দনা তার ফেরার খবর পেয়ে ডিভোর্স নোটিশ পাঠাবে। জেলখাটা আসামীর সাথে কি আর ঘর করা যায়! 


হ্যাঁ, দোষের মধ্যে হল নেশা। ইলেভেন থেকে নিয়মিত সিগারেট। বেশি নয় সারাদিনে ওই বড়জোর এক প্যাকেট। ডিপ্লোমাতে ঢুকে গাঁজা। তাও আগে নিয়মিত খেত না। হপ্তায় বারকয়েক যেত ‘বলদা’র বাড়ি। মদে কোনোকালেই তেমন রুচি ছিল না। ওই পুজো, দোল, ইত্যাদিতে বন্ধু-বান্ধবের সাথে বসলে একটা প্রিমিয়াম বিয়ার, ব্যাস। তবে তার সব থেকে বড় দোষ বোধহয় লোককে অতিরিক্ত বিশ্বাস করা। যার মাশুল সে আজ হাড়ে হাড়ে গুনছে।


কোনোদিন ফেল-টেল না করলেও পড়াশুনায় তার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। তবে মাথা ভালো ছিল। সায়েন্স নিয়ে এইচএসে ফার্স্ট ডিভিশনেই উতরে ছিল। চাকরি যে করবে না সেটা ভেবেই রেখেছিল। ছোট থেকেই তার স্বধীনভাবে বিজনেস করার ইচ্ছে। ক্লাশ টুয়েল্ভে পড়তে পড়তেই বাবার যোগাযোগ ও পরিচিতি দেখে বুঝেছিল কনস্ট্রাকশন লাইনটাই হবে রাইট চয়েস। 


টেকনিক্যাল নলেজ অবশ্যই একটা প্লাস পয়েন্ট। বিজনেসে গ্রিপ থাকবে। রান করাতে সুবিধা হবে। এসব ভেবেই সিভিলে ডিপ্লোমাটা করা। ডিপ্লোমা করে ক্লাসমেটদের বেশির ভাগই এদিক সেদিক নানান প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ঢুকলেও। সে ঢোকেনি। একে অনেক খরচার ব্যাপার। তও আবার তার কোনো দরকারই নেই ডিগ্রির। তার যা প্ল্যান তার জন্য ডিপ্লোমাই  যথেষ্ট। আলাদা কোনো পুঁজি তো ছিল না তাই সাপ্লায়ার্সের বিজনেস দিয়ে হাত পাকানো শুরু। ভেবেছিল একদিন বড় বিল্ডার হবে সে। কিন্তু কপাল!


বিয়েটা একটু তাড়াতাড়ি করেছিল সে। তার কারণও ছিল সঙ্গত। যখন চন্দনাকে সেবার দোলের দিন সে প্রপোজ করে তখন গোপাল ক্লাশ ইলেভেনে পড়ে আর চন্দনা এইটে। 


তখন সন্ধে। মুখের হাফ ওঠা রং নিয়ে পাড়ার রকে গোপাল ও তার তিন বন্ধু মিলে গুলতানি করছিল। আর তেল-সাবানে রং খানিক উঠে, যেন মেঘ সরে আবার জ্যোৎস্না ফুটেছে, এমন মুখে চন্দনা চপ কিনতে বেরিয়েছিল। গোপাল সেদিন সেই তিন ক্যালানে বন্ধু সাক্ষী রেখে, মুঠোয় লাল আবির নিয়ে, স্যাট করে খোলা রামপুরী ছুরির মতো উঠে, চন্দনার গাল রাঙিয়ে করেছিল প্রপোজ। 


গোপালের 'আই লাভ ইউ' এর কোনো উত্তর না দিয়ে রাস্তা থেকে চন্দনা খিলখিলিয়ে দৌড়ে সোজা বাড়িতে। তার গাল থেকে তখন গুঁড়ো গুঁড়ো ঝরে পড়ছিল গোপালের সহসা সোহাগ! চপ কেনা আর হয়নি সেদিন। 


ওদিকে প্রত্যয়ী গোপাল চওড়া হাসি নিয়ে বন্ধুদের বিস্মিত চাহনি ও চন্দনার সলজ্জ প্রস্থানের মাঝে। টানটান ঋজু কঞ্চির মতো।


আট বছরের প্রেম। ওফঃ এখনও বেশ মনে আছে লেকের ধারে টিউশন কেটে খাওয়া প্রথম চুমুটা। নিজে কলেজ কেটে ও চন্দনাকে স্কুল কাটিয়ে কুটীঘাট থেকে বেলুড়ের সেই নৌকা পারাপার। কচুরি-আলুর দম আর থেকে থেকেই হাতে-কাঁধে-কোমরে আলতো করে ছুঁয়ে যাওয়ার আকুতি ও অনুভূতি। তারপর, সেই মোনালিসা ক্যাফের দুপুর-কেবিনগুলো। আঙুলের ডগায় ফিশ ফ্রাই-স্যালাডের সাথে চন্দনার গন্ধ মিশে থাকত।


বুবাই-পিকলুর সাথে মিলে বিজনেসটাও ধরে গিয়েছিল মোটামুটি। দুপয়সা আসছিল হাতে। তাই আর দেরি করতে চায়নি। ঠিক করেছিল এইবার চন্দনাকে সিঁদুর দিয়ে ঘরে তুলবে। চন্দনাও রাজি ছিল। 


বিয়েটা আরও এক বছর আগেই হয়তো সে করত কিন্তু ওই যে তার বাবা খুন হয়ে গেল। এরপর আবার আর এক গাওনা শুরু করল তার শ্বশুর। শ্বশুরের একটা রোল সেন্টার আছে যতীন কলোনীর মোড়ে। যশোদা রোল সেন্টার। গোপালের শ্বাশুড়ির নামে নাম। 


সে যাক গে, গাওনাটা আর কিছুই নয়, ক্রিমিনালের ঘরে মেয়ের বিয়ে দেবে! অথচ এমন নয় যে তার শ্বশুর জানত না তাদের প্রেমের কথা। আবার এটাও জানত যে গোপাল এসব ধান্দায় নেই। সে সৎ ভাবে খেটে খাচ্ছে। কিন্তু ওই যে তার বাবা সদ্য সদ্য খুন হয়েছে সেটাই তখন বড় হয়ে উঠল! 


গোপাল জানত যে তার বাবা বেঁচে থাকলে এসব ভাবার সাহসও পেত না শ্বশুর। চুপচাপ সম্প্রদান করে দিত। তাই আর সাতপাঁচ না ভেবে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করে নিল গোপাল-চন্দনা। বলা তো যায় না হয়তো মেয়ের মাথা খেয়ে কেঁচিয়েই দেবে সম্পর্কটা।


তার মায়ের ইচ্ছেতেই সাজানো হয়েছিল ফুলশয্যার খাট। আর আগে করে থাকলেও সেরাতে পাগলামি করেছিল স্রেফ। দুজনেই। পরে ভেবে হেসেছেও দুজনে কতবার এই নিয়ে। পাশের ঘর থেকে মা কিছু টের পেয়েছিল কিনা কে জানে!


তার বাবার দিকে ছিল এক পিসি তবে তাদের সাথে সে কোনো যোগাযোগ রাখত না। আর মায়ের দিকে ছিল দুই মাসি। সেক্ষেত্রেও যোগাযোগ তথৈবচ। নিজের কোনো মামা ছিল না। তো তার অয়নমামা ও তার পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী-বন্ধু আর শ্বশুর বাড়ির জনা পনেরো লোক মিলিয়ে তিরিশ-পয়ঁতিরিশ অতিথি ডেকে ছাদে প্যান্ডেল করে একটা ছোট খানাপিনার আয়োজনও করেছিল। রেজিস্ট্রির পর। পাড়ার রমেন ঠাকুরকে দিয়ে কেটারিং করিয়েছিল। 


আপ্যায়নে পেপসি-মিরিন্ডার সাথে ছিল পনীর পকোরা আর ফিশ ফিঙ্গার। 


রাতের মেনুতে ছিলঃ 


লেবু-লঙ্কা

বাসমতী চালের ভাত

কড়াইশুটি দিয়ে মুগ ডাল

বেগুনি

ধোকার ডালনা 

ছানার কালিয়া

দই কাতলা

কচি পাঁঠার ঝোল

খেজুর-আমসত্বের চাটনি

মশলা পাপড়

পান্তুয়া (ভবতারিণী মিষ্টান্ন ভান্ডার, এই মিষ্টান্ন বানানোয় তাদের আঞ্চলিক প্রসিদ্ধি আছে) 

বাটার স্কচ আইস্ক্রিম


আঁচানোর পর হাতে হাতে যুবরাজের দোকানের মিষ্টি পান। সুপার মার্কেটের এই দোকানেই এলকার সেরা পানটা পাওয়া যায়। 


ধুর, সব কিছু বেকার গেল! 


একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিভে যাওয়া বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলে দিল গোপাল। বাড়ি প্রায় এসেই গেছে।


গোপাল আর কয়েক পা হেঁটে বাঁহাতে ঘুরে তাদের বাড়ির গলিটায় ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই ভোম্বল গলির ভেতর থেকে  রিকশা নিয়ে বেরিয়ে এল। তাদেরই গলিতে একটা ভাড়া নামিয়ে ফিরছে। 


গোপাল মনে মনে বলে উঠলঃ ওফঃ বাঞ্চোতটাকে যতবার অ্যাভয়েড করতে চাই ততবারই মুখোমুখি হই। 

ওদিকে তাকে দেখে ভোম্বল রিকশা থামিয়ে দিয়েছে। 

রিকশার ওপর থেকে পান মশলা চিবোতে চিবোতে ছদ্ম গাম্ভীর্যে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলঃ দক্ষিণেশ্বরে কোন ফ্যালাটে চন্দনা আচে, খোঁজ নেব একবার?  

তারপরই বললঃ আমার চেনা আচে ওদিকে, কিন্তু।

'বোকচোদটা, দেখছি, কেচ্ছাটা এবার ফুল পাব্লিক না করে ছাড়বে না!' মনে মনে বলল গোপাল। 

তারপর বললঃ না, কোনো দরকার নেই। দরকার হলে বলব।

-না, মানে, তোর বউটাকে কিভাবে রেখেচে, কী করচে, সেটা তো জানতে হবে, না?

গোপাল আবার মনে মনেঃ উফঃ, আমার বউয়ের জন্য হারামীটার চিন্তাটা দেখ একবার! 

নিজেকে বেশি সেয়ানা ভাবছে। ওর পিনিকটা কি আর গোপাল বুঝছে না! 

-এখন দরকার নেই। রাত হল। পরে কথা হবে। বলে গোপাল হনহন করে গলির ভেতর ঢুকে গেল। 

'শুয়োরের বাচ্চা, ঝাঁট জ্বালিয়ে দিল পুরো। ধুনকিটাই চটকে দিল, বাঁড়া।' এই কথাটাও মনে মনেই বলল গোপাল। 


বলতে বলতেই সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ল।


দশ


বাড়ি ঢুকে উঠোনে এসে গোপাল দেখল মাধবীমামী হেঁশেল থেকে রাতের খাবার নিয়ে ঘরের দিকে যাচ্ছে। রাত সাড়ে দশটার মধ্যে খেয়ে বাড়ির সবাই এগারোটার মধ্যে শুয়ে পড়ে। গোপাল একটু দেরি করে শোয়। 


কলতলায় গিয়ে ভালো করে মুখ হাত ধুয়ে বাথরুম হয়ে ঢুকে গেল গোয়ালঘরে। ঝোলানো সুইচটা টিপে আলো জ্বালল। লালি-দুলি দুজনেই পা মুড়ে বসে আছে। ঘুমিয়ে পড়বে কিছুক্ষণেই। 


জিন্স-টি-শার্ট ছেড়ে গাঢ় সবুজ লুঙ্গি আর কমলা রঙের স্যান্ডো গেঞ্জিটা পরে খালি বোতলটা নিয়ে বেরিয়ে এল। হেঁশেল থেকে রাতের জলটা ভরে নিল। তারপর আবার ঢুকে গেল গোয়ালঘরে। এইবার এক ছিলিম সাজবে, খাবে ও হ্যাল খাবে ঘন্টাখানেক। তারপর ঘুম।


মশারির একটা দড়ি বেশ লম্বা। সামনের দেওয়ালে গাঁথা পেরেকে অব্ধি। গোপাল আগে মশারিটা টাঙিয়ে তার ভেতর ঢুকে ভালো করে মশারিরটা তোষকের নিচে গুঁজে দিল। তারপর একটুখানি ফাঁক করে বেরিয়ে এল। 


খাটিয়ায় হ্যালান দিয়ে মেঝেতে বসল। প্লাস্টিকের টুলটার কাছ ঘেঁষে। ফ্যানটা চালিয়ে দিল। ঠিক মুখের হাইটে। মাধবী প্রতিদিন চার্জ দিয়ে রাখে। 


মশার ধুপটা আর সাথে তার নিজের বানানো একটা ধুপ জ্বালাল। মশার ধুপের গন্ধটা তার একেবারে সহ্য হয় না। আর সন্ধে নামার সাথে সাথেই গোয়ালঘরে যা মশার উপদ্রব। তখন হয় মশারির ভেতর থাক না হয় মশার ধুপ জ্বেলে বসে থাক। 


গোপাল ছিলিম সাজতে লাগল। ছিলিম সাজা হয়ে গেলে উঠে গিয়ে আলো নিভিয়ে এসে বসল। তারপর আস্তে আস্তে তুলল ছিলিম। নীলচে ধোঁয়ার ওপর চাঁদের আলো খেলে বেড়াতে লাগল। দেখতে দেখতে গোপাল ছিলিম টানতে থাকল।


বেশ সুন্দর একটা ধুনকি নিয়ে বসে গোপাল বিড়ি ধরাল। ছিলিমটা হাফ খেয়েছে। বাকি হাফ পরদিন সকালের। বাক্সর মধ্যে সব গুছিয়ে খাটিয়ার নিচে রেখে দিয়েছে। 


পা দুটো ছড়িয়ে দিল সামনের দিকে। আকাশে বড় করে চাঁদ উঠেছে। আসছে মঙ্গলবার পূর্ণিমা। ওইদিন বাড়িতে সত্যনারায়ণ পুজো। 


দুজানালা দিয়ে আলো এসে পড়ছে। গোয়ালঘরে গোবর-গোমূত্র-মশার ধুপ-তার নিজের তৈরী ধুপ-গাঁজা-ভুষির জাব সব মিশিয়ে কেমন একটা মায়াময় গন্ধ তৈরী হয়। ঝিমঝিমে একটা ভাব ধরে যায় তাতে। নেশায় ধূর হয়ে গোপাল সেই গন্ধে বুঁদ হয়ে বিড়ি টানতে থাকল। 


এইভাবে রোজই গোপাল বসে বসে ভাবে। আজও তার ব্যতিক্রম নেই। সে অনেক রকম ভাবনা। অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় গাঁজার নেশায়। তবে চলতেই থাকে এই খাপছাড়া ভাবনাপ্রবাহ…


হুঁ, হুঁ, বাবা, কোর্টে যাই প্রমাণ হয়ে থাকুক, যতই সে জেল খেটে থাকুক, ছোট থেকে যারা তাকে চেনে তাদের মধ্যে অন্তত ফিফ্টি পারসেন্ট লোক বিশ্বাস করে যে সে চুরি করেনি, করতে পারে না…


বুবাই-পিকলু দুটোই তো টুয়েল্ভ পাশ, কিন্তু সে? সে কিন্তু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা হোল্ডার। যদিও সেটা কাজে লাগল না। তাতে কি? তার নিজের দোষে তো আর নয়…


ধুপকাঠির ব্যবসটা ঠিক দাঁড় করাবে। করে দেখিয়ে দেবে সে। মন্দ চলবে না তার একার সংসার…


গ্রহর দশা তো কেটে গেছে, আগামী দশ বছরে নেই কোনো ফাঁড়া, মানে আনন্দ শস্ত্রী তো তাই বলেছে। হ্যাঁ, পাথর দুটো নিতে হবে…


আর কয়েকদিনেই নতুন ঘর হবে। একটা রট আয়রনের সিঙ্গল খাট কিনবে। জামাকাপড় রাখার জন্য একটা ট্রলিও কি কিনবে? না থাক, ওটা বরং পরে হবে, আপাতত দড়ি টাঙিয়েই কাজ চালিয়ে দেবে। আরও কয়েকটা জিনিশ কিনতে হবে। নোট করে রাখতে হবে সব…


গোপাল হাতের প্রায় শেষ হয়ে আসা বিড়িটা ভাঁড়ে গুঁজে দিয়ে আর একটা ধরাল। চোখ ছোট্ট হয়ে এসেছে তার। লালিটা ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়। দুলি তখনও জেগে। 


তার মায়ের কথা মনে পড়ল। বাপের লাইন ধরেনি বলে মা তাকে খুব ভালোবাসত। ডিপ্লোমা পাশ করেছিল বলে তাকে নিয়ে মায়ের একটা আলাদা গর্বও ছিল। তাদের ওপর কোনোদিনও অত্যাচার না করলেও তার বাবা এত মেজাজী ছিল যে মা আস্তে আস্তে কথা বলাই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল তার বাবার সাথে। গোপালের সাথেই হত যত কথা। ইশ! মাকে তো সে আর বাঁচাতে পারল না। জলের মত টাকা খরচ করেও শেষরক্ষা হল না! 


তবে একদিকে ভালো হয়েছে যে তার মা আগে ভাগেই মারা গেছে। গোপালের ঘাড়ে চুরির দায় ও হাজতবাস সে মেনে নিতে পারত না। হয়তো সুইসাইড-ফুইসাইড করে বসত।


ফ্যানটা বিছানার দিকে ঘুরিয়ে দিল গোপাল। মশার ধুপটা নিভিয়ে জলের বোতলটা নিয়ে উঠে মশারির মধ্যে ঢুকে গেল। তার সুগন্ধি ধুপ ততক্ষণে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। মশারি গুঁজে নিয়ে একটু জল খেল তারপর বালিশের পাশে জলের বোতলটা রেখে শুয়ে পড়ল। একবার সেলফোনে দেখে নিল কটা বাজে। এগারোটা চল্লিশ বেজে গেছে। 


না, আজ শনিবার সুতরাং এখনই ঘুমাবে না। আরও কিছুক্ষণ জেগে থাকবে। আসলে গোপাল অপেক্ষা করবে…


এগারো


গোয়ালঘরের দরজাটা শব্দ না করে আস্তে আস্তে খুলে ভেতরে ঢুকে এল মাধবী। আবার একইভাবে বন্ধ করে দিল। গোপাল জেগেই ছিল। 


এই নিয়ে তিন নম্বর শনিবার তার কাছে মাধবী এল। বাংলার নেশায় অয়ন তখন গভীর ঘুমে। টুসুও।


প্রথম দিন গোপাল ঘুমাচ্ছিল। মশারি তুলে তার বুকে হাত বুলিয়ে তাকে তুলে দিয়েছিল মাধবীমামী। ঘুম ভেঙে চমকে উঠে ছিল গোপাল। তারপর যখন তার মাধবীমামী একটা হাত নিজের বুকে টেনে নিয়েছিল তাতে আরও বেশি চমক ছিল। বুঝেছিল মামী ব্রা পরেনি। 


গোপাল বিশেষ দেরি করেনি আর। মশারি তুলে খাটিয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। মাধবীমামী কিছুক্ষণ বসেই ছিল। খানিক জড়ামড়ির পর উঠে দাঁড়িয়েছিল। তার মামীর কোমরটা জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ ঘষতে ঘষতেই আবছা দেখেছিল মামী নাইটিটা নিজে থেকেই ওপর দিকে গুটিয়ে আনছে। বাকিটা গোপাল নিজে হাতেই। নাইটি গুটিয়ে কোমরের ওপর তুলে দিয়ে দেখেছিল রাতে শোয়ার সময় তার মামী প্যান্টি পরে না। 


উঠে দাঁড়িয়ে লুঙ্গি খুলে গোপাল এরপর করতে শুরু করেছিল। দেওয়ালে দুহাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তার মাধবীমামী। আর পেছনে দাঁড়িয়ে গোপাল। মামীর কোমরটা দুহাতে চেপে ধরে একমাথা ধুনকিতে করেছিল কিছুক্ষণ। 


আজ সাহস করে গোপাল মাধবীর নাইটিটা খুলে দিল। মাধবী বিন্দুমাত্র বাধা দিল না বরং এতটা সহযোগিতা করল যেন অপেক্ষায় ছিল কখন গোপাল সম্পূর্ন উলঙ্গ করে নেবে তাকে। তারপর ওই একই ভঙ্গিতে, যেভাবে দাঁড়িয়ে করে তারা। 


ভুষির খালি বস্তার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো মাধবীর মসৃণ পিঠে-পাছায় বাউন্স করে এলোপাথাড়ি পিছলে যাচ্ছিল। আর সেটা দেখতে দেখতে ঘামতে ঘামতে পরপর না থেমে গোপাল যেন শাবল চালাচ্ছিল। পায়ের পাতায় লুঙ্গি। স্যান্ডো গেঞ্জিটা পেটের ওপর টেনে তুলে ভাঁজ করা। 


প্রথম দুদিন তার মামী নাইটির ওপরের কিছুটা মুখে ঢুকিয়ে চাপা শীৎকার করেছে। আজ বেশ স্পষ্ট। করুক ক্ষতি নেই তাতে। গোপাল জানে মাল খেয়ে তার মামা অঘোরে ঘুমায়। রাতে হিসু করতে উঠে উঠোন থেকেই সে পেয়েছে তার প্রবল নাকডাকার শব্দ। তা ছাপিয়ে এই শীৎকার তার কিংবা টুসুর কর্ণগোচর হওয়া নিতান্তই দুর্ভাগ্যের। 


অতএব এই শীৎকার তরঙ্গে গোয়ালঘরে আজ অবিরত ভালোবাসা। একদম ক্ষরণের ঠিক আগ অব্ধি। কে যেন গমগম করে বারবার বলে চলেছিল তাকে ও মাধবীকে যুগপৎঃ চালাও হে, শরীর। নাও হে, যতটুকু আছে ক্ষুধামুখ, ভরে নাও। আজ স্রেফ ভালোবাসা হবে বেনিয়ম। 


বেশিক্ষণ নয়। আগের দুবারের মতোই ওই মিনিট দশ-বারো। সব মিলিয়ে। 


গোপাল দড়ি থেকে গামছা টেনে মুছে নিল তারটা। তারপর মাধবীকে মুছিয়ে দিল। গামছাটা কেচে দেবে  কাল সকালে।


লালি-দুলি কেউ জেগে ছিল বা গিয়েছিল কি? গোপাল কিংবা মাধবী তা লক্ষ্যই করেনি। 


তবে জেগে থাকলে বা গেলে গোপাল-মাধবীর এই মিলনের সাক্ষী পূজ্যা গোমাতা। হয়তোবা গোমাতাদ্বয়।


মাধবী চলে যওয়ার পর গোপাল বাথরুমে গেল। ফিরে এসে জল খেল। একটা বিড়ি ধরিয়ে মশারির ভেতর ঢুকে খাটিয়ায় আরাম করে বসল। বেশ ক্লান্ত লাগছে। বিড়িটা শেষ করেই ঘুম দেবে গোপাল। 


গোয়ালঘরের গন্ধে এখন তার মাধবীমামীর গন্ধটাও মিশে আছে। গোপাল সেটা স্পষ্ট টের পাচ্ছে। সে একটা জোরে শ্বাস নিল। তারপর আস্তে আস্তে ছেড়ে দিল। বিড়িতে টান দি‍য়ে ভাবতে লাগল আবার…


হ্যাঁ, মামীর সাথে করছে। মানে মামীই তো চেয়েছে! সে তো আর হামলে পড়েনি। ভাবেওনি। সত্যি বলতে কি ভালোই লাগছে কিন্তু করতে…


বউ তো ভেগে গেল। জেলে থাকতে তো আর করাও হয়নি। উফঃ সে কতদিন! কিন্তু কোনো উপায় ছিল না সে কামনা গিলে নেওয়া ছাড়া। বউ সুখ না দিলেও আজ মামী দিচ্ছে। ক্ষতি কি! সেও তো দিচ্ছে সুখ তার মামীকে…


অয়নমামার কথাই যদি ভাবতে হয় তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক যে মামী ও সে দুজনেই তার বিশ্বাসের সুযোগ নিচ্ছে। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে মামাকে দিয়ে মামীর পুরো সুখ হচ্ছে না বলেই মামীর তার কাছে আসা। একে মামার বয়স বেশি তায় আবার আজকাল কেমন স্বাত্তিক গোছের হয়ে গেছে। হয়তো সেক্স-টেক্স করে না তেমন। তো মামী কেন চেপে থাকবে তার কামনা! শরীরের খিদে কার না থাকে…


যা হচ্ছে হোক। সে তো চলেই যাবে আর কদিন পরে…


তখনও যে একেবারে চান্স থাকবে না তা নয় অবশ্য। পাশের বাড়িতেই তো যাবে সে। সময় করে চলে আসবে না হয় একবার দুপুরের দিকে। অয়নমামা তো তখন ঘুমায়…


আনন্দ শাস্ত্রীও তো বলেছে তার জীবনে অনেক সঙ্গিনী হবে। তো এ তো হাতের লিখন কিংবা কপালের সে আর আটকাবে কিভাবে…


হাজতবাস যেমন তার কপালে ছিল, বউ পালানো ছিল, পাড়াছাড়া হওয়া ছিল, তেমনই মামীসম্ভোগও আসলে তার ভাগ্যে লেখা ছিল। নিশ্চয়ই…


চাঁদের আলোয় ধুনকি, তৃপ্তি আর ক্লান্তি নিয়ে বিড়ি টানতে টানতে গোপালের মধ্যে এমনই সব ভাবনার চোরাস্রোত খেলতে থাকল…


একটু বাদে ঘোর কাটল। বিড়িটা নিভে গিয়েছিল। আর নতুন করে ধরাল না গোপাল। মশারি তুলে খাটিয়ার নিচে রাখা ভাঁড়ে ফেলে দিল। 


ব্যাস, আর কিচ্ছু ভাববে না। লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপর তুলে দিয়ে ডানপাশ ফিরে শুয়ে চোখ বুঁজল।


বারো


জলঘট                                                           

প্রদীপ, গাছা, ধূনোচী                                       

সিন্দুর                                                             

পৈতা                                                               

লালচী  (বড়)                                                    

লালসুতা                                                           

তিল, হরিত্বকী                                                   

পঞ্চশস্য                                                           

পঞ্চগুড়ি                                                          

পিট ও অঙ্গুড়ী                                                  

ঘৃত, মধু, কপূর, ধূনো                                         

ধুপবাতী, মোমবাতী                                           

-------------------                                                            

জল চৌকি                                                        

তোয়ালে, গামছা, ধুতী কাপড়                            

থালা, গেলাস, বাটি                                            

আতপ চাউল                                                    

পাকাকলা, পাঁচ ফল, ভোগের ফল                     

আটা/ ময়দা/ সুজি/ চাউলের গুড়া                    

গুড়, চিনি, বাতসা,কদমা, সিংগে                      

দুধ, দই, মিষ্টি, জিলেপি                                    

ফুল, তুলসি, দূর্ব্বা, বেলপাতা                          

—----------------

ভোজ্য, দক্ষিণা     


ওপরের ফর্দটা ধরিয়েছিল পুরুত কেশব ভটচাজ। বাজারে-দোকানে ঘুরে সব কটা উপকরণই জোগাড় করেছে মামা-ভাগ্নেতে। আজ বাড়িতে সত্যনারায়ণ পুজো। উঠোনেই আয়োজন করা হয়েছে। 


কেশব ভটচাজের চেহারায় একটা গাম্ভীর্য আছে। দেখলেই একটা সম্ভ্রম হয়। বয়স ষাটের ওপর। লম্বা দোহারা শরীর। গায়ের রং কালোর দিকেই। কাঁধ দুটো বেশ চওড়া। কব্জি দুটোও। গায়ে নামাবলী আর নতুন পৈতে। পরনে ধপধপে ধুতি। 


বেলা এগারোটা-সাড়ে এগারোটা হবে। কথাপাঠ শুরু করে দিয়েছে কেশব ভটচাজ। বাড়ির লোক বাদে নিমন্ত্রিত বলতে আনন্দ শাস্ত্রী আর তার বউ-ছেলে। আনন্দ শাস্ত্রীর বাবার শরীর ভালো নয় বলে তার মা-বাবা আসেনি। প্রসাদ নিয়ে যাবে। 


গোপাল বসে আছে টুসুর পাশে। আজ সে ধুপকাঠি নিয়ে বেরোয়নি আর। সকালেই স্নান সেরে নিয়েছে। তার মামার একটা ধুতি পরে বসেছে। গায়ে কাচা টি-শার্ট। মনটা বেশ ভালো লাগছে। পূজোর ধুপকাঠি সেই দিয়েছে। নিজের হাতে তৈরী বলেই বোধহয় গন্ধটা এত বেশি ভালো লাগছে! হ্যাঁ, মিষ্টিটাও এনেছে গোপাল। 


আনন্দ শাস্ত্রীর ছেলেটা টুসুর চেয়ে সামান্য বড়ই হবে বয়েসে। বার কয়েক ঘাড় ঘুরিয়ে টুসুকে সে ঝাড়ি মেরেছে। গোপাল সেটা লক্ষ্য করেছে। টুসুটাও বেশ পাকা। চোরা চোখে রঙ্গভরা হাসিতে বিঁধেছে ছেলেটাকে। গোপালের মন্দ লাগেনি বিষয়টা বরং তার আর চন্দনার সেই ছেলেবেলায় দেখা হয়ে যাওয়ার দৈবাৎ সুযোগগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল।


ভোজ্যের আয়োজনে আছে গোবিন্দভোগ চাল ও মুগ ডালের খিচুড়ি, আলু-কুমড়ো-বেগুন ইত্যাদি ভাজা আর অবশ্যই সিন্নি। 


গোপাল জানে যে তার অয়নমামার কাছে ভক্তি ও নিষ্ঠাই হল এখন জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। তার উদ্যগেই এই পুজোর আয়োজন। প্রসন্ন মুখে বসে সে বিভোর হয়ে পাঠ শুনছে। হাতদুটো জড়ো করে কোলের ওপর রাখা। 


তবে গোপালের কাছে পুজো-ভোজ্য এসবের উর্ধে যেটা আজ সব থেকে বড় ও খুশির ব্যাপার তা হল আজ আনন্দ শাস্ত্রী এগ্রিমেন্টটা নিয়ে এসেছে। উকিল গতকাল রাতেই দিয়ে দিয়েছিল। আনন্দর বাবা আর গোপালের নামে এগ্রিমেন্ট। বাড়ির মালিক তো আনন্দর বাবা। 


আনন্দই তার বাবাকে রাজি করিয়ে গোপালকে বিশ্বাস করে থাকতে দিচ্ছে। গোপাল তাকে ঠকাবে না এটা সে নিশ্চিত করে বলতে পারে। আসলে কোনোদিনই গোপাল কাউকে ঠকায়নি। সে নিজেই ঠকেছে। মহা ঠকা।


পুজো শেষ হলেই সইসাবুদ হবে। গোপাল ভেতরে ভতরে ছটফট করছে। আহঃ আগামিকালই নতুন ঘরে যাবে সে! কি যে একটা আনন্দ হচ্ছে তার! 


গতকাল আনন্দ তাদের ঠিকে কাজের লোক গঙ্গাকে দিয়ে সেই ঘর-বাথরুম ভালো করে সাফ করিয়েছে। গোপাল নিজে গিয়ে দেখেও এসেছে তা। পরিষ্কার করার পর ঘরটার শোভা  যেন দ্বিগুন বেড়েছে!


পুজো শেষ হল। দক্ষিণা ও ভোজ্য নিয়ে কেশব ভটচাজ চলে গেল। 


তারপরই এল সেই বহু প্রতিক্ষীত মাহেন্দ্রক্ষণ। গোপাল সই করল এগ্রিমেন্টে। সাক্ষী অয়ন এবং আনন্দ। 


হোক না ছোট্ট একটা আধপাকা ঘর। তবুও তো ঘর। নিজের আয়ে ভাড়া দিয়ে থাকবে। খুশিতে ডগমগ গোপাল মনে মনে ভাবে ঘরছাড়া-পাড়াছাড়া ‘গোপাল’ এই মাস দেড়েকের মেহনতেই আবার পাড়া ও ঘর হাসিল করে নিল। 


হ্যাঁ, এটা ঠিক যে অয়নমামা-আনন্দ শাস্ত্রী তাকে বিশ্বাস করে সুযোগ দিল একটা। এর সদ্ব্যবহার গোপাল করেই ছাড়বে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে সে।


আনন্দ শাস্ত্রীও খানিক আগে সপরিবারে খেয়ে বাড়ির জন্য প্রসাদ নিয়ে চলে গেছে। অয়ন-টুসু ঘরে খেতে বসেছে। উৎফুল্ল গোপাল গোয়ালঘরে গিয়ে একটা ছিলিম সেজে হাফ খেল। আজ একটু বেশিই হয়ে যাবে হয়তো। হোক গে যাক। খুশিটাকে তো সেলিব্রেট করতে হবে, নাকি!


সিঁড়িতে বসে হাতে থালা ধরে পরম তৃপ্তিতে গোপাল পুজোর ভোগ খাচ্ছে। আজই প্রথম কিছু খেল সে এই বাড়িতে। 

খেতে খেতে গোপাল বলে উঠলঃ আহঃ মাধবীমামী, তুমি কি চমৎকার খিচুড়ি রাঁধো, গো!


শুনেই হেঁশেলে খুশির সাথে খানিক লজ্জামেশা হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল মাধবীর মুখ। সামান্য টোল খেলল গালে। 


গোপাল অবশ্য দুটোর কোনোটাই দেখতে পেল না। 


হেঁশেল থেকেই আদরভরা গলায় মাধবী বললঃ দাঁড়াও, আর একটু খিচুড়ি দিই, তোমায়।


‘দাও’ বলে গোপাল কুমড়োভাজা দিয়ে একগ্রাস খিচুড়ি মুখে পুরে দিল।


গোপালের অগোচরেই চিরায়ত ভঙ্গিতে ডানহাত তুলে কপালের ঘাম মুছে মাধবী খিচুড়ির ডেকচি নিয়ে উঠতে গেল...


গোয়ালঘর থেকে লালি-দুলির মধ্যে কেউ একটা ডেকে উঠল: হাম্বাআআআ... 


No comments:

Post a Comment