প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর, ২০১৮
প্রকাশক: অভিযান পাবলিশার্স
উৎসর্গ
দারিন দ্বীপের বাসিন্দাদের
শহরের কোলাহল থেকে খানিক দূরেই দারিন দ্বীপ।
গাছ-গাছালি-নদী-পশু-পাখি আর চমৎকার কিছু মানুষ মিলে এক মায়াভুবন।
সে ভুবনে ভালোবাসা-বন্ধুত্ব-মাদক ও যৌনতা নিয়ে এক রঙিন বেঁচে থাকা; হলেও বা কাল্পনিক।
এখানে গল্পের ছলে বলে ফেললাম সেই কল্পকাহিনী।
প্রথম পর্ব
জাগুয়ারল্যান্ড ট্রিপ
বুয়েনস আইরেসে প্রায় সাড়ে চার বছর হয়ে গেল। এর মধ্যে দুবার চাকরি ও চারবার ঠিকানা বদলেছি। একটা প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে ফেলেছি। আর একটা ফ্রেন্ডস্ উইথ বেনিফিট সম্পর্কে ইতি পড়ল সম্প্রতি।
যাই হোক, মাস কয়েক টানা অফিস করে হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। আসছে হপ্তায় পরপর দু-দিন পাবলিক হলিডে। তাও আবার উইকএন্ড-এর ঠিক পরই। একটা শর্টট্রিপ প্ল্যান করে ফেললাম। দু-দিনের ট্রিপ। দু-দিনের বিশ্রাম। তরতাজা শরীর ও মন নিয়ে ফের অফিস শুরু করব।
যাচ্ছি জাগুয়ারল্যান্ড। কাছেই। এখান থেকে ট্রেনে ঘণ্টাখানেক। জাগুয়ারল্যান্ড আসলে এক ডেল্টা-টাউন। তিনটে নদীর মোহানায়। শুনেছি, এককালে নাকি ওখানে জাগুয়ারের দেখা মিলত। তা মানুষের বসবাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাও বিলুপ্ত হয়েছে। স্মৃতি হিসেবে থেকে গেছে টাউনের নাম।
জাগুয়ারল্যান্ড ছাড়াও ডেল্টায় আরও কিছু টাউন আছে। আর আছে ছোটো-বড়ো কিছু দ্বীপ। কোনোটায় মানুষ থাকে, কোনোটায় থাকে না। জাগুয়ারল্যান্ডের ফেরিঘাট থেকে দ্বীপগুলোতে বোট-ট্রিপ হয়। এটাই প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া আছে রোয়িং ক্লাব, মিউজিয়াম, ন্যাচারাল পার্ক এবং একটা আর্টিজান মার্কেট। এই মার্কেট খুব বিখ্যাত।
শনিবার সকালে বেরিয়ে পড়লাম। সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ট্রেন। শনি-রবি থেকে সোমবার দুপুরে ফিরব। সোম-মঙ্গল বাড়িতে বিশ্রাম। বুধবার থেকে অফিস। এই আমার প্ল্যান। অনলাইনে একটা হোস্টেল বুক করে নিয়েছি। টাউনের সেন্টারে। লাগেজ বলতে একটা ছোটো ট্র্যাভেল ব্যাগ। তাতে জামাকাপড় ও অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে নিয়েছি একটা স্কচের বোতল। ট্রেনে ভিড় ছিল না। ঘণ্টাখানেকেই পৌঁছে গেলাম।
জাগুয়ারল্যান্ড স্টেশনটা খুব সুন্দর। লালচে ইটের বাড়ি। সিলিং-এ কাঠের কারুকাজ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বাইরে চওড়া রাস্তা। সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। তার দু-পাশে লন আর পাম গাছের সারি। সামনে একটা চারমাথার ক্রসিং। তার ঠিক মাঝখানে একটা স্ট্যাচু। উলটোদিকে সমান্তরালে বয়ে চলেছে মেদেলিনা নদী। নদীর ধারের রাস্তাটা ধরে একটু এগোলেই ফেরিঘাট।
স্টেশন থেকে হোস্টেল মিনিট দশেকের রাস্তা। হেঁটে। নদীর ধারের রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে শরীর-মন চাঙ্গা হয়ে গেল। ছিমছাম সাজানো টাউন। গাড়ি-ঘোড়া কম। বিজ্ঞাপনও। ফলত কান ও চোখ দুয়েরই আরাম। ফুরফুরে হাওয়া।
হোস্টেল যাওয়ার পথে একটা মল আর মাল্টিপ্লেক্স পড়ল। একটা থিয়েটার। তাতে একটা কমেডি নাটক চলছে। বাইরে পোস্টার দেখে বুঝলাম। দু-তিনটে এটিএম, একটা পেট্রোল পাম্প, একটা ইউনিভার্সিটি আর বেশ কিছু ব্র্যান্ডেড পোশাকের শো-রুম চোখে পড়ল। হোস্টেলের একটু আগেই একটা স্টেশনারি দোকান থেকে আমি চার প্যাকেট নুডলস্, একটা কফির জার, সুগার কিউবের বক্স আর একটা ঠান্ডা জলের বোতল কিনলাম।
হোস্টেল খুব বড়ো নয়। ঢুকেই একটা কমন হল আর তার একপাশে রিসেপশন। রিসেপশনের ছেলে-মেয়ে দুটি বেশ আমুদে। রুমে ঢুকে দেখলাম দু-পাশে দুটো বাঙ্ক বেডের একটার নীচের বেড আমায় দেওয়া হয়েছে। একজনই রুমমেট। বাকি বেড দুটো খালি। রুমমেট বিদেশি। গতকাল এসেছে। আগামীকাল চলে যাবে। এদেশের আরও কিছু জায়গায় ট্রিপের প্ল্যান আছে বলল।
স্নান করে ফ্রেশ হয়েই আমি কাছের রেস্তোরাঁটাতে লাঞ্চ করলাম। খিদে পেয়ে গেছিল। লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়লাম ফেরিঘাটের দিকে। কাল সকালের বোট ট্রিপের টিকিট কাটতে হবে।
স্টেশনের মতোই ফেরিঘাট। একটা বড়ো ইটের বাড়ি। সামনে বাঁধানো রাস্তা। দু-পাশে সরু লনে কেয়ারি করা গাছ। রাস্তার ধারে ধারে লোহার বেঞ্চ। জেটি অবধি রাস্তাটা জুড়ে একটা দারুণ কাঠের শেড। দুটো ট্র্যাভেল কোম্পানি ঘুরে আমি তিন নম্বর কোম্পানির টিকিট কাটলাম। এদের ট্রিপ প্ল্যানটাই আমার বেশি মনে ধরল। ফেরিঘাটের বাইরে এলাম। এবার আর্টিজান মার্কেট। ডিরেকশনটা জানব বলে সামনের পেপার স্টলটার দিকে এগোলাম।
আর্টিজান মার্কেটের দোকানটা
ফেরিঘাটের কাছেই একটা ওল্ড মার্কেট প্লেস। তাকে ঘিরেই এই আর্টিজান মার্কেট। অনেকগুলো ছোটো-বড়ো দোকান। আজ ছুটির দিন। তাই ভিড় বেশি। জিনিসপত্র বলতে উইকার আর কাঠের আসবাবপত্র, নানান ডেকোরেটিভ হ্যান্ডিক্র্যাফ্ট, হাতে আঁকা ছবি এইসব। সঙ্গে কোনো কোনো দোকানে চিজ-অলিভ আর হোমমেইড জ্যাম।
হাঁটতে হাঁটতে একটা বড়ো দোকানের সামনে দেখলাম এক বুড়ো ভদ্রলোক চেয়ার পেতে বসে আছে। একগাল সাদা দাড়ি। পেটানো চেহারা। হলদে-কালোর চকরাবকরা বিচ্ শার্ট। জলপাই রঙের বারমুডা। পায়ে স্নিকার্স। আর মাথার একটা হ্যাট। ঠোঁটে একটা মিটিমিটি হাসি নিয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। এই দোকানটা মূলত ছবি আর মুখোশের। সেই কারণেই আমায় খুব আকর্ষণ করল।
সামনাসামনি যেতেই ভদ্রলোক আমায় 'হ্যালো' বলে জিজ্ঞেস করল, টুরিস্ট তো? তা কোন দেশ?
আমি বললাম, হ্যাঁ। বলে দেশের নাম বললাম।
ও প্রশ্নটা ইংরেজিতেই করেছিল। আমি স্থানীয় ভাষায় উত্তর দিতেই একটু অবাক হল। বললাম যে আমি বিদেশি হলেও বুয়েনস আইরেসে চার বছর হল আছি। আজই প্রথম জাগুয়ারল্যান্ড এলাম। শুনে খুব খুশি হল।
আমি মাউজার। বলে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল। আমিও নাম বলে হ্যান্ডশেক করলাম। খাতির করে পাশের চেয়ারটায় বসাল। দোকানের কাউন্টারে একটা ছেলে বসে একটা ছবিতে ফিনিশিং টাচ দিচ্ছিল। তার দিকে দেখিয়ে মাউজার বলল, ও হল মাতে। খুব ভালো ছবি আঁকে।
ছেলেটি হেসে 'হ্যালো' বলল। তারপর আবার নিজের কাজ করতে থাকল। রোগাটে গড়ন। হালকা দাড়ি-গোঁফ। বয়স আন্দাজ তিরিশের কোঠায়।
মাউজার: কেমন লাগছে এখানে?
আমি: দারুণ! চমৎকার জায়গা।
মাউজার: তা কতদিনের প্ল্যান?
আমি: এই তো আজ আর কাল। সোমবার সকালে কী দুপুরে ট্রেনে ফিরে যাব। তা তুমি এখানেই থাকো?
মাউজার : না, এখান থেকে একটু দূরে একটা দ্বীপে থাকি। আমি, মাতে আরও কেউ কেউ। ফেরি করে এই মিনিট কুড়ি।
আমি: দারুণ ব্যাপার তো। কী নাম দ্বীপের?
মাউজার: দারিন দ্বীপ। খুব সুন্দর। অনেক গাছপালা আছে। পাখি আছে। শান্ত। এখানকার মতো এত ভিড়ভাট্টা-হইচই নেই। আমার তো ওখানেই ভালো লাগে বেশি।
কথাবার্তার মাঝেই দোকানের পেছনের পর্দাটা সরিয়ে একটা মেয়ে বেরিয়ে এল। গমরঙা। কাঁধ অবধি ঘন চুল। কালো। চওড়া কপাল। নাক টিকালো। পাতলা ঠোঁট। চিবুক কঠিন। বেশ লম্বা। টানটান চেহারা। সব থেকে বেশি নজর কাড়ে ওর চাহনি। কেমন যেন হিপনোটিক। বয়স ওই তিরিশের কোঠায়-ই হবে।
মাউজার: আমার মেয়ে আননোনা। ও পেইন্টার। এই মুখোশগুলো সব ওরই বানানো। এই ছেলেটি এখানে বেড়াতে এসেছে, আজই। শেষের কথাটা আমায় দেখিয়ে বলল।
মেয়েটি দ্রুত চাহনি বদলে একটা হালকা হাসি ফুটিয়ে আমায় 'হ্যালো' বলল। আমিও প্রত্যুত্তর দিলাম। মেয়েটি আবার পর্দার ওপারে চলে গেল। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম ওটা একটা স্টোররুম মতো। ভেতরেও অনেক ছবি ও মুখোশ সাজানো আছে।
আমি: যাই একবার ভেতরটা দেখে আসি।
মাউজার: তা বেশ, যাও। উঠে পড়লাম। দোকানের ভেতর ঢুকে জিনিসপত্র দেখতে লাগলাম। দেখে শুনে আমি একটা মুখোশ নিলাম। মুখোশটা একটা মেয়ের। পাকা হাতের কাজ। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হল চোখের কাজ। একদম জীবন্ত মনে হয়। মুখোশটা কিনব বলে কাউন্টারে এলাম।
মাতে যে ছবিটাতে ফিনিশিং টাচ্ দিচ্ছিল সেটা একটা ছোটো ক্যানভাসে আঁকা। মাঝখানে একটা চোখ। বড়ো করে আঁকা। তার ওপর বিভিন্ন রঙের আকাশ। আর চোখের চারপাশ দিয়ে রেললাইন-ব্রিজ-মাস্তুল এবড়ো খেবড়োভাবে ছড়ানো। সবই বিচিত্র রঙের। ছবিটা আমার বেশ পছন্দ হল।
আমি: এটা কবে শেষ হতে পারে?
মাতে: আজই এটা শেষ করব। কাজ করতে করতেই জবাব দিল।
আমি: বেশ, তবে কাল এসে এটা আমি কিনে নিয়ে যাব।
মাতে: তোমার পছন্দ?
আমি: হ্যাঁ, খুব। আমি কি অ্যাডভান্স করে যাব?
মাতে: না, তার দরকার নেই। আমি রেখে দেব।
আমি: বেশ; ধন্যবাদ।
দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। বেরোতেই আমার হাতে প্যাকেট দেখে মাউজার জিজ্ঞেস করল: কী কিনলে?
আমি: এই একটা মুখোশ। কাল এসে একটা ছবিও নিয়ে যাব।
মাউজার: বাঃ! তা তোমার এগ্জ্যাক্ট প্ল্যানটা কী?
আমি : কাল সকালে বোটে করে আইল্যান্ড ট্রিপ। দুপুরে ফিরে আবার এখানে আসব। বিকেলে ভাবছি একবার আর্ট মিউজিয়ামটা ঢুঁ মারব। তারপর সোমবার হোস্টেলে চেক-আউট করে ফিরে যাব বুয়েনস আইরেস।
মাউজার: বেশ, বেশ। তা তুমি পারলে আমাদের দ্বীপটাও ঘুরে যেয়ো। একবার। খুব ভালো লাগবে আমাদের।
খুবই আন্তরিক অনুরোধ।
আমি: বেশ। সোমবার না হয় সকাল-দুপুর দারিন দ্বীপে ঘুরে বিকেলের ট্রেনে ফিরে যাব।
মাউজার: বাঃ চমৎকার! খুব খুশি হয়ে বলল কথাটা। তারপরই বলল, তা তুমি কিন্তু ইচ্ছে করলে একদিন থেকেও যেতে পারো। মঙ্গলবারও তো ছুটি। আমার গেস্টহাউস আছে। দেখবে কোনো অসুবিধা হবে না।
খানিক দোনোমনো করে আমি বললাম: বেশ, আজকে একটু ভেবেনি। কাল এসে জানিয়ে যাব। তবে সোমবার সকাল আর দুপুরের জন্য আমি যাচ্ছি, পাক্কা।
মাউজার: বেশ। চলে এসো। ভালো লাগবে।
আমি: বেশ। এখন আসি।
মাতেকেও বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আননোনা পর্দার ওপারেই ছিল। আর দেখা হল না।
ফিরতে ফিরতে ভাবলাম আমি বিদেশি বলেই বোধহয় এত খাতির। যদিও এখানকার মানুষজন এমনিতেই বড়ো উষ্ণ ও আন্তরিক। মনে মনে বড়ো লোভ হল। দ্বীপে গিয়ে একরাত কাটানো মন্দ কী! সত্যিই তো মঙ্গলবার ছুটি। বাড়িতে কাটানোর চেয়ে দ্বীপে গিয়ে থাকা বেশি ভালো। না হয় গেস্টহাউসের ভাড়া বাবদ ওকে কিছু অফার করব। খামোখা অতিথি হওয়ার কী দরকার!
পরদিন অর্থাৎ রোববার বোট-ট্রিপ সেরেই গেলাম আর্টিজান মার্কেট। এখান থেকে হোস্টেলে ফিরব। মিউজিয়াম দেখে সন্ধেবেলা।
বোট-ট্রিপ চমৎকার ছিল। চার ঘণ্টার ট্রিপ। দেশি-বিদেশি অনেক টুরিস্ট নিয়ে বিশাল বোট। সামনে খোলা ডেক। ডেল্টার বেশ কয়েকটা অঞ্চল আর দ্বীপ ঘুরে শেষমেশ একটা দ্বীপের রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ। নদীর হাওয়া - চারিদিকে সবুজ জঙ্গল - পাখির ডাক সব মিলিয়ে দুর্দান্ত। লাঞ্চে খেলাম এই নদীর মাছ। গ্রিল করা। সঙ্গে স্যালাড আর একটি চিলড্ বিয়ার।
এর মধ্যে গতরাতে ডিনারের পর হোস্টেলের পেছনের লনটায় ড্রিংক করতে করতে আমি ঠিক করেই নিয়েছিলাম যে দারিন দ্বীপ যাব। রাতে স্বপ্নেও আমি একটা দ্বীপ দেখেছি। মাউজার, মাতে, আননোনা, মুখোশ, ছবি সবই দেখেছি। আসলে মনে হয় মাথার ভেতর যা যা ঘোরে সে সবই আসে স্বপ্নে। এলোমেলো খাপছাড়া ভাবে।
যাই হোক দোকানে পৌঁছোলাম। মাউজার গতকালের মতোই বাইরে চেয়ার পেতে বসে আছে। একগাল হাসি দিল। আমি ওকে 'হ্যালো' বলেই আগে ভেতরে গেলাম। আজ মাতের সঙ্গে আননোনাও আছে কাউন্টারে। আননোনা 'হ্যালো' বলল। ছবিটা রেডিই ছিল। মাতে প্যাক করে দিল। ছবিটা নিচ্ছি এমন সময় আননোনা বলল: তা, তুমি কী ঠিক করলে?
আমি একটু অবাক হয়েই সামলে নিলাম। বুঝলাম মাউজার নির্ঘাত বলেছে যে ও আমায় দারিন দ্বীপ যেতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
আমি: তুমি কি দ্বীপে যাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছ?
আননোনা: হ্যাঁ। বলেই আবার সেই চাহনিটা দিল।
আমি: আমি যাব। ওর চোখে চোখ রেখেই বললাম। হাসির একটা ঝিলিক খেলে গেল ওর চোখে-মুখে।
বাইরে বেরিয়ে মাউজারকে কনফার্ম করলাম যে আমি দারিন দ্বীপ যাব এবং রাতেও থাকব। ও খুব খুশি হল।
বলল: বেশ, বেশ, চমৎকার! এই দু-দিন তুমি আমাদের দ্বীপে অতিথি। আমি ওর নম্বরটা নিলাম। নিজের নম্বরটাও ওকে দিলাম।
মাউজার: কাল তো পাবলিক হলিডে, আমরা কিন্তু এখানে আসব না। মার্কেট বন্ধ থাকবে। তুমি ফেরিঘাট থেকে আজুল পয়েন্টের ফেরি ধরবে। ড্রাইভারকে বলবে দারিন দ্বীপ। ঠিক নামিয়ে দেবে। দ্বীপে নেমে প্রথম বাড়িটাই আমার। আরও ও হ্যাঁ, তুমি রাতের কিছু খাবার এনো। ওখানে কিছু পাওয়া যায় না কিন্তু। গেস্টহাউসে ওভেন, ফ্রিজ, মাইক্রোওভেন সবই আছে। আর লাঞ্চটা তুমি আমার ওখানেই করবে। আমি ইনভাইট করছি।
আমি: বেশ, তাই হবে। ধন্যবাদ। এখন আসি।
মাউজার: বেশ, এসো। খুব ভালো লাগছে যে তুমি আমাদের দ্বীপে আসবে।
আননোনা আর মাতেকেও বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মার্কেট ছেড়ে। ফেরার পথে মিউজিয়ামটা আর দেখলাম না। মনে এক অন্য উত্তেজনা। অভাবনীয়ভাবে ট্রিপে একটা অ্যাডভেঞ্চার ঢুকে গেল!
দ্বীপে প্রথমবার
সোমবার সকাল নটায় ব্রেকফাস্ট করে বেলা দশটায় চেক-আউট করলাম। আজ পাবলিক হলিডে। তাই অধিকাংশ দোকান-পাট বন্ধ। ফেরিঘাটে পৌঁছে দেখলাম খুব কম যাত্রী। ফেরিও বেশ কম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বেলা এগারোটার ফেরিতে রওনা দিলাম দারিন দ্বীপ।
মিনিট পনেরো চলার পর দুটো দ্বীপ দেখতে পেলাম। একটা কাছে, আর একটা বেশ দূরে। ফেরির অভিমুখ দেখে বুঝলাম কাছেরটাই দারিন দ্বীপ। ফেরি জেটির নীচে সিঁড়িটার কাছে ভিড়তেই নেমে পড়লাম।
লম্বা জেটিটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সামনের বড়ো বাড়িটার বারান্দায় মাউজারকে দেখতে পেলাম। একটা ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে ছিল। আমায় দেখেই উঠে পড়ে হাত নাড়ল। আমিও হাত নাড়লাম। জেটির শেষে বেশ চওড়া নদীর পাড়। তারপর মাউজারের বাড়িটা মাটি থেকে উঁচুতে। পিলারের ওপর। সামনে সিঁড়ি। নদীর পাড়ে দুটো স্পিডবোট দেখলাম।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই মাউজার একগাল হেসে সাদর অভ্যর্থনা করল: এসো, এসো, আননোনা তোমার গেস্ট-হাউসটা রেডি করছে। এই হয়ে এল বলে। ততক্ষণ আমার এখানেই বসো। ফ্রেশ হয়ে নাও। কফি-টফি খাও। তোমায় দেখে খুব আনন্দ হচ্ছে।
আমি বললাম: বেশ; বেশ, ঠিক আছে।
বারান্দা পেরিয়ে বসার ঘরে ঢুকলাম। বেশ বড়ো ঘরটা। প্রথমেই চোখ পড়ল উলটোদিকের দেওয়ালে তেলরঙে আঁকা বেশ বড়ো একটা ছবি। তার দু-পাশে দুটো মাঝারি মাপের মুখোশ। ছবির নীচে আননোনার সই দেখলাম। আর এসবের নীচে একটা সোফা। অনেকগুলো কুশন ছড়ানো। তার ওপর বসে আছে এক পেল্লায় বেড়াল।
ওর নাম মাটিম। মাউজার মিটিমিটি হেসে বলল।
সেটার ঠিক সামনে একটা সেন্টার টেবিল আর তাকে ঘিরে কুশন দেওয়া তিনটে বেতের চেয়ার। টেবিল ও চেয়ার এক দুর্দান্ত কার্পেটের ওপর। পরে জেনেছিলাম ওটা মিশর থেকে আনা। সোফার দু-পাশে দুটো স্ট্যান্ডল্যাম্প।
আমাকে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিয়েই ও কফি করতে চলে গেল। আমি ফ্রেশ হয়ে এসে দেখতে লাগলাম ওর বই আর ডিভিডির কালেকশন। একটা পুরো দেওয়াল জুড়ে মেঝে থেকে ছাদ অবধি বুকর্যাক। তাতে অজস্র বই আর ডিভিডি। তারিফ না করে পারলাম না। ও রান্নাঘর থেকে শুধু একটু হাসল।
কফি খেতে খেতেই আননোনা এসে পড়ল। আমায় দেখে হেসে জিজ্ঞেস করল: কতক্ষণ? কেমন লাগছে এখানে?
আমি: এই তো খানিকক্ষণ। দারুণ লাগছে।
আননোনা: তোমার গেস্টহাউস একদম রেডি করে দিয়েছি। কিছু লাগলে বোলো। এই নাও চাবি।
আমি: ধন্যবাদ।
আমায় গেস্টহাউসের চাবিটা দিয়ে ও ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। আর যেতে যেতে বলে গেল: লাঞ্চের কিন্তু দেরি হবে একটু। অসুবিধা নেই তো?
আমি: না না, কোনো অসুবিধা নেই।
কফি খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মাউজার বলল: চলো তোমায় গেস্টহাউসটা দেখিয়ে দি।
আমরা উঠে পড়লাম। মাউজারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওর বাড়ির পেছন দিকটায় এলাম। বাড়ির ঠিক পেছনেই একটা বড়ো সুইমিং পুল। তার দু-পাশে মুখোমুখি দুটো বাড়ি। একইরকম দেখতে। ডান হাতেরটা দেখিয়ে বলল: এটাতে মাতে থাকে। আর ওইটা হল তোমার।
আমরা বাঁ-হাতে পুলের ধার ধরে গেস্টহাউসের দিকে চললাম। সুইমিং পুলের পর একটা বড়ো মাঠ। তার একপাশে একটা কোর্ট করা। নেট টাঙানো। মাঠের পর ডানহাতে একটা মাঝারি বাড়ি। আর তার উলটোদিকে একটা লগকেবিন। বাড়িগুলো ও কেবিন সবই মাউজারের বাড়ির মতো মাটি থেকে উঁচুতে। পিলারের ওপর। সামনে সিঁড়ি। আমার গেস্টহাউস আর মাতের বাড়ির থেকে ওই বাড়ি ও কেবিন অবধি দু-পাশে বড়ো বড়ো গাছের সারি। বাড়ি আর কেবিন দেখিয়ে বলল। ওটা হল ব্যাঞ্জো-বম্বিশার বাড়ি। তোমায় বিকেলে নিয়ে যাব।
ব্যাঞ্জো-বম্বিশার বাড়ি ও কেবিনের একটু পর থেকেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। না, খুব ঘন নয়। চোখের আন্দাজে মনে হল একরখানেক জমির ওপর এই ঘরবাড়ি। আর ফেরি থেকে দেখে মনে হয়েছিল জঙ্গলও ওই একরখানেকই হবে। গেস্টহাউসের দিকে যাওয়ার পথে মাউজারের বাড়ি আর পুলের মাঝে একজায়গায় দেখলাম একটা শেডের নীচে একটা স্ট্যান্ড-গ্রিল। আর তার পাশে কিছু কাঠের চেয়ার-টেবিল ফোল্ড করে রাখা। বলল: এখানে আমরা পিকনিক করি।
গেস্টহাউসের কাছাকাছি এসে বলল: নাও তুমি রেস্ট নাও। লাঞ্চ টাইমে আমি মেসেজ করে দেব। বলে ও চলে গেল। আমি সিঁড়ি ভেঙে গেস্টহাউসের বারান্দাটায় উঠলাম। গেস্টহাউসটা এককথায় দারুণ। বসার ঘরে একটা দেওয়ালজোড়া জানালা। সামনে নদী। একপাশে একটা সোফাবেড। তার সামনে একটা সেন্টার টেবিল। একটা গোল টেবিল আর তাকে ঘিরে তিনটে চেয়ার। টেবিল-চেয়ার মজবুত কাঠের। আর দারুণ তার পালিশ। লাগোয়া রান্নাঘর পরিপাটি করে সাজানো। শোয়ার ঘরে একটা বড়ো খাট। একটা কাঠের ডেস্ক আর চেয়ার। এক দেওয়ালে মস্ত কাবার্ড। জানলা খুলে দিলে গাছ-পালার ফাঁক দিয়ে দূরে নদী। সুন্দর হাওয়া খেলে ঘরে।
লাঞ্চের পর মাউজারের বাড়ি থেকে যখন বেরোচ্ছি, তখন আননোনাও আমার সঙ্গে বেরোল। বলল, মাতের বাড়ি যাবে। আমি গেস্টহাউসে ফিরে একটা চমৎকার ঘুম দিয়ে নিলাম। লাঞ্চটা বেশ ভারীই হয়েছিল। রান্নার হাত আননোনার আঁকার হাতের মতোই অনবদ্য।
বিকেলে মাউজার এসে নিয়ে গেল ব্যাঞ্জো-বম্বিশার বাড়ি। যাওয়ার পথে বলল, ব্যাঞ্জো ফেরিঘাটে ফেরি চালায়। আর বম্বিশা হল ওর মা। ওরা খুব ভালোমানুষ।
বম্বিশার বাড়ির সামনেটায় এসেই বারান্দায় দেখলাম একটা গোল্ডেন রিট্রিভার। আমাদের আওয়াজ পেয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখছে। চ্যাঁচাল না একবারও। কুকুরে আমার বেজায় ভয়। মাউজার ডাকতেই বম্বিশা বেরিয়ে এল। আমাদের ওপরে আসতে বলল। আমি একটু ইতস্তত করছি দেখে বলল, ও কিছু করবে না। ডোডো খুব ভালো। বুঝলাম এর নাম হল ডোডো। যাই হোক ওপরে উঠতেই ডোডো একেবারে আমার গায়ের কাছে চলে এসে শুঁকতে থাকল। আমি ভয়ে দু-পা পিছিয়ে যেতে মাউজার কাঁধে হাত রেখে বলল, ভয় পেয়ো না, কিছু করবে না। সত্যিই কিছু করল না। জুলজুল করে চেয়ে ল্যাজ নাড়তে লাগল। আমিও সাহস করে ডোডোর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলাম।
বম্বিশা কফি বানাল। সঙ্গে কেক আর কুকিস্। কফি খেতে খেতে ও নিজেদের কথা বলছিল। মাঝে খানিক আমার কথাও জিজ্ঞেস করল। এই কোথা থেকে এসেছি, কী করি এইসব। ব্যাঞ্জো বাড়ি ছিল না। কথায় কথায় জানলাম যে বছর আটেক আগে এই দ্বীপে জমি কিনে এই বাড়ি ও লগকেবিনটা বানায় ব্যাঞ্জোর বাবা। প্রায় একই সময় মাউজারও বানায় তার বাড়ি-গেস্টহাউস-পুল। ব্যাঞ্জোর বাবা এটা বানিয়েছিল ছুটির ঠিকানা হিসেবে। সে মারা যায় আজ পাঁচ বছর হল। আর ব্যাঞ্জো দু-বছর আগে ফেরিঘাটে চাকরি পায়। তারপরই ওরা পাকাপাকি দ্বীপে চলে আসে। ওদের আসল বাড়ি ডেল্টার অন্য টাউনে। সেখান থেকে ফেরিঘাট বেশ দূর। ব্যাঞ্জোর বাবা বড়ো সরকারি কর্মচারী ছিল। আর বম্বিশা স্কুলটিচার। রিটায়ার করেছে বছর তিনেক আগেই।
কথাবার্তার মাঝে ব্যাঞ্জো চলে এল। এসেই আলাপ করে বলল, চলো, তোমায় আমার লগকেবিনটা দেখিয়ে আনি।
বললাম, বেশ, চলো।
মাউজারও উঠে পড়ল। বিকেল পড়ে আসছিল। মাউজার বলল, একটু হেঁটে নাকি বাড়ি ফিরে যাবে। আমিও ওকে বলে দিলাম যে লগকেবিন দেখে আমিও ফিরে যাব গেস্টহাউসে।
লগকেবিনটা ছোটো। ঘর আর লাগোয়া ওয়াশরুম। ঘরের জানালাটা খুলে দিলে সামনে জঙ্গল। ঢুকেই দেখলাম এককোণে একটা গিটার রাখা। বললাম, বাঃ! তুমি গিটার বাজাও?
ব্যাঞ্জো: হ্যাঁ। তুমি গাঁজা খাও?
আমি: নিশ্চয়ই খাই। কেন তোমার কাছে আছে?
ব্যাঞ্জো: হ্যাঁ। বলেই পকেট থেকে একটা জয়েন্ট বের করে ধরাল। আমি বললাম এ তো ষোলোকলা পূর্ণ হল। দ্বীপের এমন মনোরম পরিবেশে গাঁজার এক আলাদা মাহাত্ম্য আছে বই কি। জয়েন্টটা পাস্ স্করে ব্যাঞ্জো জিজ্ঞেস করল : তুমি মাউজারকে কী করে চিনলে?
একটা লম্বা টান দিয়ে বললাম: আর্টিজান মার্কেটে ওর দোকানে আলাপ হল। দ্বীপে ঘুরে যেতে বলল। তো চলে এলাম। আর একটা লম্বা টান দিয়ে জয়েন্টটা ওকে পাস্ করে দিলাম।
ব্যাঞ্জো: ভালোই করেছ। নতুন লোকজন এলে বেশ ভালো লাগে।
আমি: আচ্ছা, মাউজার কি এখানে বরাবরই থাকে?
ব্যাঞ্জো: না, না, আগে এমনি ঘুরতে আসত। আমি বাবা-মার সঙ্গে পিকনিকে এসে দেখেছি ওকে অনেকবার। এই বছর তিনেক হল পাকাপাকি থাকে। ব্যাঞ্জো জয়েন্টটা পাস্ করল।
আমি: তা ও কী করত কিছু জানো?
ব্যাঞ্জো: মস্ত বড়ো আর্কিটেক্ট ছিল। জাগুয়ারল্যান্ডের অনেক সরকারি-বেসরকারি বিল্ডিংই ওর ডিজাইন করা। জাগুয়ারল্যান্ডে ওর দারুণ সুন্দর একটা বাড়ি আছে। বাংলো, বাগান আর গেস্টহাউস নিয়ে বেশ বড়ো। আমি একবার গেছিও। বাংলোটা ভাড়া নিয়ে ওর এক ভাই থাকে। আর ও আর আননোনা টাউনে গেলে গেস্টহাউসটাতে ওঠে। জয়েন্টটা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। ওকে পাস্ করে বললাম: নাও তুমিই ফিনিশ করো।
গেস্টহাউসে ফেরার পথে দেখলাম আননোনা আর মাতে নদীর দিকে যাচ্ছে। আমায় দেখে এগিয়ে এল। খানিক কথাবার্তাও হল। জম্পেশ একটা ধুনকি দিয়েছিল। ওরা নদীর ধারে চলে গেল। আমি গেস্টহাউসে ফিরে গেলাম। সন্ধে হয়ে আসছিল।
জাগুয়ারল্যান্ড থেকে কেনা নুডলসের একটা দিয়ে ডিনার সারলাম। আর একটা দিয়ে সকালের ব্রেকফাস্ট হয়ে যাবে। ডিনারের পর একটি ড্রিংক নিয়ে সোফাটায় বসলাম। নদীর হাওয়ায় আস্তে আস্তে ঘুম পেয়ে গেল। ড্রিংকটা শেষ করে শোয়ার ঘরে চলে গেলাম।
ফিরে আসার দিনটা
মঙ্গলবার সকাল সকাল উঠে পড়লাম। কতদিন পর যে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল মনে পড়ে না। একটা কফি বানিয়ে বারান্দাটায় এসে দাঁড়ালাম। কিচিরমিচির শুনতে শুনতে কফিতে চুমুক দিলাম। নদীর দিক থেকে একটা ঠান্ডা মিষ্টি হাওয়ায় কেটে গেল বাসি ঘুমের রেশ।
স্নান আর ব্রেকফাস্ট সেরে গেস্টহাউস ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম ট্র্যাভেল ব্যাগটা সঙ্গে নিয়ে। এবার ফেরার পালা। প্রথমেই গেলাম বম্বিশার বাড়ি। বিদায় জানাতে। বম্বিশা বলল: আবার এসো কিন্তু। পরের বার এলে আমার এখানে খাবে। ব্যাঞ্জো বলল: মা কিন্তু দারুণ রান্না করে, না খেলে মিস্ করে যাবে।
আমি বললাম: নিশ্চয়ই আসব।
আমি ফেরিতেই ফিরব ভেবেছিলাম। কিন্তু ব্যাঞ্জো বলল, দাঁড়াও, আমিও জাগুয়ারল্যান্ড যাব। তোমায় স্পিডবোটে ছেড়ে দেব। পনেরো মিনিটে পৌঁছে যাবে। আজ এমনিতেই ফেরি কম।
ব্যাঞ্জো রেডি হলে বেরিয়ে পড়লাম। ডোডো চলল পিছু পিছু। মাউজারের বাড়ি পৌঁছে দেখলাম বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছে।
আমায় দেখেই বলল, সুপ্রভাত! ঘুম কেমন হল?
আমি: তোফা! সুপ্রভাত! আননোনাও চলে এসেছিল আমাদের গলা পেয়ে। ডোডো ছুটে গেল ওর কাছে।
আমি বললাম : এবার আসি।
মাউজার: বেশ, এসো; তা কেমন লাগল আমাদের দ্বীপে?
আমি: অসাধারণ। মনমেজাজ অন্যরকম হয়ে গেল।
মাউজার: তবে এসো কিন্তু মাঝে মাঝে।
আমি: নিশ্চয়ই আসব।
আননোনা ডোডোকে আদর করতে করতে বলল! দাঁড়াও, চট্ করে মাতেকে ডেকে আনি।
ওরা সবাই জেটির মুখ পর্যন্ত এল। মাটিম আর ডোডোও। প্রত্যেকেই বারবার বলল, আবার আসতে। আননোনা চেয়ে ছিল একদৃষ্টে। ব্যাঞ্জো বোট ছেড়ে দিল।
বোট ছেড়েই ব্যাঞ্জো জিজ্ঞেস করল: তাড়া নেই তো কোনো?
আমি: না, কেন?
ব্যাঞ্জো: বেশ চলো তাহলে দ্বীপটা একবার চক্কর মেরে যাই। দারুণ লাগবে।
আমি: বেশ চলো।
বোটে করে পুরো দ্বীপটা চক্কর মেরে এসে পড়লাম জাগুয়ারল্যান্ডের রাস্তায়। মানে জলে। সত্যিই দারুণ লাগল। বেশ হাওয়া খাওয়া হল। সকাল সকাল।
মিনিট পনেরোয় পৌঁছে গেলাম। ফেরিঘাটের বাইরে এসে ব্যাঞ্জো বলল: এই নাও। তোমায় গিফট করলাম। বলেই পকেট থেকে ছোটো প্যাকেট বের করে আমার হাতে দিল। দেখলাম একটা বড়োসড়ো গাঁজার কলি। আমি ধন্যবাদ ও বিদায় জানিয়ে চললাম স্টেশনের দিকে।
ট্রেনে ফিরতে ফিরতে বারবার মনে পড়তে থাকল দারিন দ্বীপের কথা। মাউজারের বাড়ি, সেই মস্ত বুকর্যাক, আননোনার চাহনি, ব্যাঞ্জোর সঙ্গে লগকেবিনের ধুনকি, মাটিমের গোল গোল চোখ করে চেয়ে থাকা, বম্বিশার মায়ামাখা মুখ, ডোডোর জেটি অবধি পিছু পিছু আসা, মাতের নিস্তব্ধতা এইসব। আরও কত কী!
অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হল বটে। জাগুয়ারল্যান্ডে নেমেও ভাবতে পারিনি এমন দুর্দান্ত এক ট্রিপ করে ফিরব। হঠাৎ করে আলাপ হয়ে যাবে এমন চমৎকার সব মানুষের সঙ্গে। মনের ভেতর একটা ভীষণ খুশি টের পেতে থাকলাম। হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া ঘটনার মজাই আলাদা।
একজন বাদক উঠেছিল ট্রেনে। একমনে বেহালা বাজিয়ে চলেছিল সে। জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম বাইরে। একটার পর একটা স্টেশন চলে যাচ্ছিল। আর আরও বেশি করে মনে পড়ছিল দূরে ফেলে আসা দারিন দ্বীপের কথা।
দ্বিতীয় পর্ব
বুয়েনস আইরেস রোজকার
ট্রিপ থেকে ফিরে অফিস জয়েন করেছি। সব কিছু আবার আগের মতো শুরু হয়ে গেছে। রোজকার দিনরাত। নিয়মিত। একইরকম। মনমেজাজ বেশ তরতাজা। ট্রিপের ইমপ্যাক্ট আর কী!
একটা দু-কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকি বুয়েনস আইরেসের এক পশ্ এলাকায়। একটা বসার ঘর। অন্যটা শোয়ার। এই ফ্ল্যাটে আড়াই বছরের ওপর হয়ে গেল। এবার একঘেয়ে হয়ে গেছে। বদলাব ঠিক করেছি। কনট্র্যাক্ট পিরিয়ড শেষ হতে এখনও ছ-মাস। এই ফ্ল্যাট আর অফিস থেকে বাড়ি ফেরা নিয়ে বছর প্রায় দেড়েক আগে একটা কবিতা লিখেছিলাম। প্রতিদিনের জীবন আজও একইরকম আছে। কবিতাটি ছিল এইরকম :
পরিপাটি গুছিয়ে রাখা ঘরদোর
নরম আলোর সাজগোজ
যেন এক্ষুনি এসে পড়বে
আবার কেউ...
না-ভাঙা নতুন বোতল
ঝকঝক করছে পুরোনো সুরার উজ্জ্বল
মাজাধোয়া গেলাসেও
ভিড় করে আছে হলদেটে আলো
না, আজ আর কেউ আসবে না
আমিই কাজ সেরে ফিরে যাব
সাজানো ড্রইংরুমে
খুশি খুশি খোলতাই মেজাজে
বলেছিলাম, ফিরে যাব
ফ্লোরিডা স্ট্রিট ধরে
গমগমে গানে-বাজনায়
মুদ্রা বিনিময়ের ছড়া কাটা ডাকে
যুগলের চুম্বনে
পুলিশের সতর্কতায়
গোপনে মাদক বেচার চেনা ইশারায়
কিছুটা ধোঁয়া ছেড়ে আর ক্লান্তি মিশিয়ে
তিনটে স্টেশন পেরিয়ে ...
হলদে আলোর এই ড্রইংরুম
ঠিক যতটা প্রয়োজন আমার
ততটাই পরিপাটি
এখানে মায়াবী ফুলের মুগ্ধতায়
অস্থির আয়নায় নয়
বরং স্থির শার্শিতে দেখি
কতটা শিখেছি আমি
নির্লিপ্ত থাকার কৌশল
আনন্দ-বিষাদের মনোরম দরজায়
রোজকার রুটিন বলতে সকালে উঠে প্রথমেই একটা কালো কফি। তারপর সামান্য ব্রেকফাস্ট করে অফিস। ফিরে এসে ঘরদোর একটু গুছিয়ে নিয়েই রান্নার আয়োজন। সবজি-ডিম-মাছ কী মাংস যাই রাঁধি না কেন একবার রাঁধলে তিনবারের ডিনার রেডি। লাঞ্চ আমি বাইরে করি বরাবর। রান্না শুরু করতে করতে একটা ড্রিংক নি। রান্না হতে হতে দ্বিতীয় পেগ শেষ হয়। তারপর স্নান সেরে এসে সোফাটায় বসে রিল্যাক্স করে শেষ পেগ। একটু জ্যাজ চালিয়ে রাখি। যেদিন রান্না করি না, সিনেমা দেখে কেটে যায় সন্ধেটা।
বন্ধুবান্ধব বলতে নোটেম হল রেগুলার। হপ্তায় অন্তত তিনদিন আসে। নোটেমের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এক পার্টিতে। ছেড়ে আসা কোম্পানির অনেকেই ছিল তাতে। নোটেমই ছিল সবচেয়ে নতুন। এদেশে। এ শহরে। আলাপ হল। পরে একদিন আড্ডা। আমার ফ্ল্যাটে। তো, জমে গেল। তারপর থেকে ওই হল রেগুলারের পার্টনার। দারু ও ডিনার একসঙ্গে। উইকএন্ডে আরও জনা দুই জড়ো হয়। আড্ডা বসে আমার নয় তো অন্য কারও ফ্ল্যাটে। অথবা ছোটো কোনো পাবে। খানাপিনা। গল্পগুজব। এই আর কী!
যাইহোক, হলদে আলো, বোতল, গেলাসের সঙ্গে এখন বসার ঘরে যোগ হয়েছে আর্টিজান মার্কেট থেকে কেনা সেই ছবি আর মুখোশ। সোফার উলটোদিকের দেওয়ালটায় মুখোশটা টাঙিয়ে দিয়েছি। আর ছবিটা রেখেছি বাঁহাতে টেবিলের ওপর দেওয়ালে হ্যালান দিয়ে। ছোট্ট ক্যানভাস দিব্যি ধরে আছে।
এখন নোটেমের কোনো চশমা নেই
নোটেম এসেছিল। আমি জাগুয়ারল্যান্ড থেকে ফেরার পর এই প্রথম এল। চোখে অপারেশন হয়েছিল, তাই দিনকয়েক বেরোচ্ছিল না বাড়ি থেকে। অপারেশনের পর এখন ভালো আছে। আর সব থেকে বড়ো কথা ওকে আর চশমা পরতে হবে না। পাওয়ারের সমস্যা একেবারে মিটে গেল। তাই মহা খুশি হয়ে একটা টেনেসি হুইস্কি নিয়ে এসে পড়েছিল। আমিও ল্যাম্ব আর বাসমতী চাল দিয়ে রাঁধছিলাম বিরিয়ানি।
বসার ঘরে এসে বসতে বসতেই ওর চোখ গেল মুখোশ আর ছবিটার দিকে। বলে উঠল, বাঃ! হেব্বি হয়েছে তো মাল দুটো! আমি বললাম, কেমন? দারুণ না? জাগুয়ারল্যান্ড থেকে কিনলাম। ছবিটা হাতে তুলে নেড়েচেড়ে দেখল। তারপর গম্ভীরভাবে বলল, হুম্। সাইকেডালিক।
মুখোশটাও সামনাসামনি গিয়ে ভালো করে দেখে এল। চেয়ার টেনে বসে বলল: তা কেমন ঘুরলে বলো?
আমি রান্না করতে করতে বললাম: বলব, বলব, অনেক গল্প আছে। তুই, আগে ক্রিস্টাল গ্লাস দুটো বের কর। আর আইসজারে ফ্রিজ থেকে আইস ভর। ভালো মদ এনেছিস, তা আয়োজনটাও তো ভালো হতে হবে নাকি!
একগাল হেসে গ্লাস-টলাস ধুয়ে জারে আইসকিউব ভরে নিয়ে গেল রান্নাঘরে এসে।
বললাম: তুই পেগটা বানা, আমি বিরিয়ানিটা বসিয়ে দিয়েই আসছি।
আমি পাক্কি বিরিয়ানি করি। তাই মাংস হয়ে গেছিল। চালও আধসেদ্ধ রেডি। মাংস আর চালের লেয়ার করে বিরিস্তা করা পেঁয়াজ, আদার কুচি, তেজপাতা, কাঁচালঙ্কা, গোটা গরম মশলা, বিরিয়ানি মশলা, ঘি আর আন্দাজ মতো নুন ছড়িয়ে অল্প আঁচে বসিয়ে দিয়ে চলে এলাম বসার ঘরে। মিনিট পনেরোয় হয়ে যাবে। তারপর মিক্সিং। বসার ঘরে এসে দেখলাম ততক্ষণে নোটেম একদম জমিয়ে বসেছে। আইস দিয়ে পেগ বানিয়ে, চাট সাজিয়ে একদম জমজমাট। চিয়ার্স করে ওকে ট্রিপের গল্পটা বলতে শুরু করলাম। জাগুয়ারল্যান্ড আর আর্টিজান মার্কেট অবধি বলে আমি গল্প থামিয়ে মিক্সিংটা সেরে এলাম। ব্যস্, বিরিয়ানি রেডি। এবার আয়েশ করে মালটা খাওয়া যাবে।
এর মধ্যে নোটেম দ্বিতীয় পেগটা বানিয়ে রেখেছিল। সেটা খেতে খেতে ওকে দারিন দ্বীপের গল্পটা বলতে লাগলাম। ও তো গোল গোল চোখ করে শুনে যাচ্ছিল। শেষ হতে বলল: এ তো দারুণ ট্রিপ মেরে এলে কাকা! ইশ! যদি আমার চোখের অপারেশনটা না থাকত এ সময় আমিও যেতে পারতাম তোমার সঙ্গে।
আমি বললাম: সে তুই যাবি না হয় কখনও; এ তো কাছেই। আমার পেগটা শেষ হয়ে গেছিল। ওর তখনও অল্প তলানি বাকি। আর একটা বানাতে বানাতে বললাম: জানিস তো, ভাবছি দারিন দ্বীপে পাকাপাকি থাকলে কিন্তু দারুণ হয়।
নোটেম: তা হতে পারে। কিন্তু ওখান থেকে অফিসটা দূর হয়ে যাবে না?
আমি: তা হয়তো হবে, কিন্তু থাকাটা হবে এক চমৎকার জায়গায়। এখানে শালা এবার বোর হয়ে গেছি। অনেকদিন তো হল।
নোটেম: তা তুমি বোর হতে পারো। চার বছরের ওপর হয়ে গেল তোমার এখানে। আমি তো সবে এলাম। আমার তো হেব্বি লাগছে এখানে।
আমি: সেই জন্যই একটা চেঞ্জ খুব দরকার। একঘেয়ে জীবনের কোনো মস্তি নেই। লোকেশনটা বদলালে বেশ হত।
নোটেম: দেখো, ভেবে। তবে তুমি দারিন দ্বীপ চলে গেলে কাকা আমার কিন্তু বেশ ভালো হবে।
আমি: কেন? পেগটা শেষ করে জিজ্ঞেস করলাম।
নোটেম: না, আমার একটা ঘোরার জায়গা হবে পারমানেন্ট। বলেই একটা চ্যাংড়া হাসি দিল। নিজের পেগটা বানাতে থাকল।
আমি: সে আমি ওখানে চলে গেলে তুই আসিস না হয় মাঝে মাঝে ঘুরতে।
নোটেম: হুম্। যাব তো বটেই।
আমি: সে যাকগে; বাদ দে, তুই তোর কথা বল কেমন লাগছে এখন চশমা ছাড়া?
নোটেম: ওঃ দারুণ, কাকা, দারুণ। মনে হচ্ছে একটা প্রতিবন্ধকতা কেটে গেল। আর কোনো সাপোর্টের দরকার পড়বে না।
আমি: বাঃ, তাহলে তো তোর একটা সমস্যা মিটেই গেল।
নোটেম: একশোবার। হেব্বি কনফিডেন্ট লাগছে জানো।
রাত দেড়টা নাগাদ নোটেম চলে গিয়েছিল। ততক্ষণে দারু খতম। ওকে গিয়ে নীচে ছেড়ে এসেছিলাম। জব্বর নেশা হয়েছিল। বিরিয়ানিটাও দারুণ হয়েছিল। অন্তত নোটেম তো সেরকমই বলে গিয়েছিল। একটু জল খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। আর শুতে শুতেই ঘুম ...
মুখোশ, ছবি এবং অ্যাসিডের খেলা
একটা জিনিস দিনকয়েক হল লক্ষ করছি। রাতের দিকে একা একা ড্রিংক করার সময় মুখোশের দিকে চোখ পড়লে কেমন যেন আননোনার সেই চাহনিটা মনে আসে। আর ছবিটা দেখলে মনে হয় দারিন দ্বীপের বাসিন্দারা যেন এই বড়ো চোখটা দিয়ে আমার ওপর নজর রাখছে সর্বক্ষণ। একটু অস্বস্তি হয় বই কি। কিন্তু কাজ দুটো ভীষণ সুন্দর। আমার ভারী পছন্দ। সকালের দিকে যখন দেখি তখন কিন্তু এইসব উলটোপালটা মনে হয় না।
এর মধ্যে কাল রাতে যেটা হল সেটাই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। শুধু ছবি বা মুখোশের কারণে নয়। বরং তারা ছিল পার্শ্বচরিত্র। এই প্রথম অ্যাসিড, মানে এল.এস.ডি নিলাম। এক বন্ধুর থেকে একটাই স্ট্রিপ জোগাড় করেছিলাম। বহুদিনের লোভ একবার অন্তত এক্সপেরিমেন্ট করব। তো কালই এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নিয়ে কী কী হল তাই বলছি। মজা-ভয় সবমিলিয়ে সে এক দারুণ ব্যাপার।
রান্নাবান্না কিছু করার ছিল না। ফ্রিজেই ছিল রাতের খাবার। তো অফিস থেকে ফিরে স্নানটান করে একদম ফ্রেশ মুডে সোফাটায় বসে স্ট্রিপটা জিভের নীচে দিলাম। একটা জুসের বোতল রেখেছিলাম হাতের কাছে। গলা শুকিয়ে যেতে পারে। অল্প অল্প চুমুক মারব। তা বসে ছিলাম। প্রথম কিছুক্ষণ কিছুই বোঝা যাবে না। বন্ধু বলেছিল। মনটা খুশিতে ডগমগ হয়েছিল। একটু বাদেই শুরু হবে অ্যাসিডের খেলা।
স্ট্রিপটা গলে গিয়েছিল। কাগজটাও মৌরির দানার মতো হয়ে গিয়েছিল। ফেলে দিলাম। একটু জুস খেয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। সময়ের অত হিসাব ছিল না। মনে মনে হাসছিলাম। মজার মজার সব কথা মনে পড়ছিল। ছোটোবেলার, বড়োবেলার। আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলাম হাসি আমার মন ছেড়ে ঠোঁটে-গালে ছড়িয়ে পড়ছে। বিন্দাস লাগছিল। সিগারেটটা শেষ হয়ে গেছিল। অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলাম।
ঘরে আলো আমার বরাবরই কম। হলদেটে একটা ল্যাম্প। তা আলো অন্য দিনের চেয়ে বেশি মনে হতে থাকল। ল্যাম্পটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। হ্যাঁ, ঠিক, অনেক উজ্জ্বল। দেওয়ালও খটখটে সাদা। দিব্যি লাগছিল ঘরবাড়ি। যেন নতুন রং করা হয়েছে। রঙের গন্ধও নাকে আসতে লাগল। তার্পিন মেশানো সেই গন্ধটা। টেবিলের ওপর পা দুটো তুলে আয়েশ করে বসলাম।
মুখোশটা ঠিক চোখের সামনে। চোখদুটো ঝকঝক করছে। স্পষ্ট মনে হল। এক ঝলকে যেন মুখোশটায় আননোনার মুখের আদল খেলে গেল। না থেকেই গেল ওর মুখের আদল। চোখের পাতাও পড়ল দেখলাম। একদম আননোনা হুবহু। সেই চাহনি। চোখ তুলে তাকিয়ে আছে। এবার একটু ঘাবড়ে গেলাম। উঠে কাছে গেলাম। মানে যেন ডেকেই নিয়ে গেল। হুম, আননোনাই তো! মনে মনে বলতে থাকলাম হুঁ হুঁ, আমায় হিপনোটাইজ করা অত সহজ নয়। ফট করে হাত দিয়ে দিলাম। মুখোশটার ওপর। দিতেই সরিয়ে দিলাম, ঠিক যেন চামড়া ঢাকা নরম কোনো মুখে হাত পড়েছিল। সোফায় গিয়ে বসে পড়লাম। ঢকঢক করে বাকি জুসটা শেষ করে দিলাম। বুঝতে পারলাম বুকের কাছটা অল্প অল্প ঘেমে গেছে। কপাল আর নাকের ওপরটাও। না, মুখোশটার দিকে আর তাকাব না। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। তো মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
তো চোখ পড়ল গিয়ে মাতের আঁকা ছবিটার দিকে। বাব্বা! যেন রঙের খেলা চলছে ক্যানভাসে। একদম টাটকা কাঁচা রং। এত রং, যেন চোখে বিঁধে যাচ্ছে। সেই বড়ো চোখটা থেকে স্পষ্ট দেখলাম রং গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। টেবিলটার ওপর। টসটস করে। ঠিক চোখের জলের মতো। আবার উঠে গেলাম। রং চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল। আঙুল দিয়ে দেখলাম। চটচট করছে রং। বেসিনে গিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে এলাম। ঘাড়ে-মাথায় ভালো করে জল দিলাম। ঘেমে গেছিলাম বেশ। মাথাটাও টনটন করছিল। বসার ঘরে অস্বাভাবিক আলো। তার মধ্যে ওইরকম উজ্জ্বল রঙিন ক্যানভাস। দেওয়াল থেকে চেয়ে আছে আননোনা। সোফাটাও কি দুলে উঠল একটু। সেই খুশি খুশি ভাবটা গায়েব হয়ে কেমন একটা ভয় টের পেলাম। আজ নোটেমকে ডেকে নিলেই ভালো হত। না, বসার ঘরে আর থাকব না। টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা তুলে দিয়ে দৌড়ে শোয়ার ঘরে ঢুকে গেলাম। দরজাটাও টেনে দিলাম। ব্যস, এবার অন্ধকার। শুধু দরজার ফাঁক দিয়েই যা অল্প আলো আসছিল। বিছানায় শুয়ে একটা সিগারেট ধরালাম।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। আজ সকালে উঠে দেখলাম ছবি-মুখোশ একদম স্বাভাবিক। আগের মতোই। হাত দিয়েও দেখলাম। না, রং কাঁচা নয়। মুখোশটাও খসখসে, কঠিন। খুশি মনে অফিস চলে গেলাম।
দ্বীপযাত্রা পাকাপাকি
সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলাম। কাল আমি পাকাপাকি দারিন দ্বীপ চলে যাচ্ছি। প্যাকিং হয়ে গেছে। সামান্যই জিনিস আমার। দুটো ছোটো ট্রলি, একটা ট্র্যাভেল ব্যাগ আর একটা পিঠের ব্যাগ। ল্যাপটপ। ছবি আর মুখোশটা নিয়েছি সঙ্গে।
এর মধ্যে ছ-মাস কেটে গেছে। প্রথমবার দারিন দ্বীপ যাওয়ার পর। বেশ কয়েকবার স্বপ্নে দেখেছি দারিন দ্বীপ ও তার বাসিন্দাদের। নিজেকেও দেখেছি তাদের সঙ্গে। নানা বিচিত্র ঘটনা। এই যেমন--
আমি একটা স্পিডবোটে চেপে দারিন দ্বীপের সামনে দিয়ে যাচ্ছি। আর জেটি থেকে মাউজার হাত তুলে আমায় ডাকছে: 'এই যে, এদিকে, এদিকে'! আমি কী করব বুঝতে পারছি না।
আননোনা সোজা হেঁটে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে আর ওর পেছনে পেছনে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চলেছি।
আমি একটা টুলে বসে আছি আর সামনে দাঁড়িয়ে মাতে আমার পোর্ট্রেট আঁকছে।
এইসব ভুলভাল। এছাড়া এই ছবি আর মুখোশ এই ছ-মাস ধরে ক্রমাগত আমায় মনে করিয়ে গেছে দারিন দ্বীপের কথা।
আমি তিনবার গেছি দারিন দ্বীপ। এই ছ-মাসের মধ্যে। দ্বিতীয়বার যাওয়ায় মাউজার বলেছিল: কী; আসতে হল তো আবার?
আননোনা বলেছিল : জানতাম, তুমি আবার আসবে।
বম্বিশা আমায় নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছিল সেবার। আর ব্যাঞ্জো একটা গান শুনিয়েছিল গিটার বাজিয়ে। বেশ বুঝতে পারছিলাম দারিন দ্বীপের বাসিন্দাদের আমি অনেকটা ভালোবেসে ফেলেছি। তারাও আমাকে। কেমন একটা বন্ডিং তৈরি হয়ে গেছে। চতুর্থবার গিয়ে আমি মাউজারকে সরাসরি বলেই দিয়েছিলাম যে, আমি দারিন দ্বীপে পাকাপাকি থাকতে চাই। ওর গেস্টহাউসটা ভাড়া নেওয়া সম্ভব কিনা। শুনে ও বেজায় খুশি। বলেছিল: চমৎকার। এ তো সাধু প্রস্তাব। নিশ্চয়ই থাকবে। একশোবার থাকবে। দেখলে তো দারিন দ্বীপ তোমায় কেমন ভালোবেসে ফেলল? এই দ্বীপের মজাই হল এই।
অপেক্ষা করছিলাম ফ্ল্যাটের কনট্রাক্ট পিরিয়ডটা শেষ হওয়া পর্যন্ত। কালই শেষ। বাড়ির মালিককে বলে দিয়েছি যে কেয়ারটেকারের হাতে চাবি দিয়ে চলে যাব আমি। নোটেম বলেছে আসবে। স্টেশন অবধি যাবে বলেছিল। বারণ করে দিয়েছি। ট্যাক্সি নিয়ে একাই যাব।
গত দশ বছর ধরে নিজের শহর, হায়দ্রাবাদ শহর আর বুয়েনস আইরেস ঘুরে অনেকগুলো চাকরি করলাম। কত মানুষের সঙ্গে আলাপ হল। এতবার প্রেমে পড়লাম। শহরে শহরেই থেকে গেলাম। এবার একটু শহর থেকে দূরে গেলে ক্ষতি কী! আর একদম সব ছেড়েছুড়ে তো চলে যাচ্ছি না। রোজই তো আসব বুয়েনস আইরেস অফিস করতে। মাঝে মাঝে থেকেও যাব নোটেমের ফ্ল্যাটে। আর দ্বীপে যেদিন থাকতে ভালো লাগবে না ফিরে আসব না হয় বুয়েনস আইরেস। নয়তো চলে যাব অন্য কোনো শহরে। এখন, আপাতত, থাকব শহরের বাইরে। নিরিবিলি পরিবেশ, মেদেলিনা নদীর ধারে, দারিন দ্বীপে।
কিছু কিছু স্মৃতি মনে পড়ছে। এই পুরোনো পাড়া-ফ্ল্যাট-আড্ডা এইসব। এভাবে কত পাড়া, কত ফ্ল্যাটই তো পুরোনো হল। সব আড্ডাই বাসি হয়ে যায় একদিন। কত প্রিয়মুখ তো আজ মনেই আসে না। কত পুরোনো বন্ধু তো সব কিছু ছেড়ে চলে গেছে আমাদের দুনিয়ার বাইরে। সেখানে বুয়েনস আইরেস থেকে ঘণ্টা দেড়েকের এই রাস্তা আর এমন কী! যে-কোনো শহর ছেড়ে যাওয়ার সময়ই এরকম সব স্মৃতি ভিড় করে আসে। অল্প অল্প মন খারাপ হয়। তবে তার ওপারেই কিন্তু অপেক্ষা করে থাকে নতুন কোনো জায়গা, নতুন কোনো মানুষ। নতুন করে ভালোবাসা হয়ে যায় আবার। এমনই দেখেছি আমি বারবার।
দুপুর থেকে সন্ধে হয়ে গেল। গেস্টহাউসটা নিজের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে। লাঞ্চ করেছিলাম মাউজারের বাড়ি। সেই প্রথমবারের মতো। আজ মাউজার আর আননোনার চোখে মুখে এমন এক খুশির ঝিলিক যা আগে কখনও দেখিনি। যেন ওরা অপেক্ষায় ছিল যে সত্যি সত্যি আমি একদিন দারিন দ্বীপে চলে আসব। পাকাপাকি। এই গেস্টহাউসটা যেন আমার জন্যই ফাঁকা পড়ে ছিল এতদিন। আমারও এরকমই মনে হতে লাগল।
তৃতীয় পর্ব
দ্বীপের দিনরাত
দ্বীপে মহানন্দে দিন কেটে যাচ্ছে। মনমেজাজ অনেক সতেজ এবং টাটকা। শরীরেও একটা তরতাজা ভাব। এমনটাই হবে আশা করেছিলাম।
সকাল আটটার ফেরিতে আমি জাগুয়ারল্যান্ড যাই। সেখান থেকে ট্রেনে বুয়েনস আইরেস। সেন্ট্রাল স্টেশনে নেমে কানেক্টিং মেট্রোতে অফিস। ঘণ্টা দেড়েক। রাত আটটা কী সাড়ে আটটার ফেরি ধরে ফিরে আসি দারিন দ্বীপ। শেষ ফেরি ছাড়ে রাত ৯টায়।
উইকএন্ডগুলো কাটছে চমৎকার। নানা কাজেকর্মে। শনি-রবি সকালে সুইমিং করি। শনিবার বিকেলে হেঁটে আসি মাউজারের সঙ্গে। ডোডোও থাকে সঙ্গে। সন্ধেবেলা মাউজারের বাড়িতে সিনেমা দেখি, ওর জায়ান্ট স্ক্রিনে। বিয়ার খেতে খেতে নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। অনেক কিছু জানে ও। বই পড়েও কেটে যায় অনেকটা সময়। মাউজারের থেকে ধার করে আনি। রবিবার বিকেলে কখনও-সখনও আমি, মাতে, ব্যাঞ্জো আর আননোনা মিলে ব্যাডমিন্টন খেলি। মাউজার আর বম্বিশা বসে গল্প করে। মাঝে মাঝে তালি মেরে উৎসাহ দিতে থাকে আমাদের। এই তো সেদিন আমরা এই চারজনে মিলে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একদম নদীর ধার অবধি হেঁটে এলাম। অ্যাডভেঞ্চার হল খানিক। রবিবার দুপুরে পিকনিক করি পুলের ধারে।
ব্যাঞ্জোই আমার সবচেয়ে বন্ধু এখানে। মাতে খুব কম কথা বলে। নিজের মতো থাকে। আননোনা ছুটির দিনে অনেকক্ষণ থাকে মাতের বাড়ি। আননোনার ঘাড়ে আর কাঁধে আমি বেশ ক-বার লাভ বাইট দেখেছি। আর গাঁজা খেতে গিয়ে নদীর পাড়ে একবার চুমু খেতে দেখেছি ওদের।
রোজই সকালে দ্বীপের সামনে দিয়ে ঘুরে যায় গ্রসারি বোট। বোটের মধ্যে আস্ত এক মুদিখানা। আমি শুধু শনিবার বাজার করি বোট থেকে। এই মাসকাবারি চাল-ডাল-তেল-নুন-মরিচ-চিনি-কফি আর টয়লেট প্রোডাক্টস্। সাপ্তাহিক, সবজি আর জলের জার। বিশ লিটারের দুটো। হপ্তা কেটে যায় একটাতেই। আর একটা স্টকে রাখি। অফিস ফেরত জাগুয়ারল্যান্ড থেকে কিনি ব্রেড-চিজ-হ্যাম-মদ আর মাংস, ব্যস র্যাশন মজুত।
গ্রসারি বোট ছাড়াও দিনের মধ্যে বারকয়েক ঘুরে যায় মেডিকেল বোট। স্ট্রেচার, ফার্স্ট এইড বক্স, অক্সিজেন সিলিন্ডার, স্যালাইন বোতল সবই থাকে তাতে। এমার্জেন্সিতে খবর দিলে চলেও আসে জাগুয়ারল্যান্ড থেকে। রাতে ঘোরে পুলিশের টহলদারি বোট।
আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির সামনে ওপরের দিকে বড়ো বড়ো আলো। রাতে জ্বালিয়ে দি। অনেকটা অংশ আলো হয়ে যায় তাতে। এছাড়া টর্চ থাকে সঙ্গে। যদিও এখানে সাপখোপ নেই কোনো। মাঠও উঁচুনীচু নয়। সমান।
রাতের দিকে ডিনার সেরে বারান্দাটায় বসি একটা ড্রিংক নিয়ে। নদীর হাওয়ায় সব ক্লান্তি যেন জল হয়ে যায়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই গাছ-পালা- নদী-পশু-পাখি আর চমৎকার মানুষগুলোর সঙ্গে এক দারুণ রঙিন জীবন কাটিয়ে চলেছি।
বম্বিশার রান্নাঘর
শনিবার সকাল থেকে সন্ধে দ্বীপে শুধু আমি, মাউজার আর বম্বিশা থাকি। মাতে আর আননোনা যায় আর্টিজান মার্কেটে। ব্যাঞ্জো যায় ফেরিঘাটে। মাউজার হপ্তায় খালি দুবার যায় আর্টিজান মার্কেট। বাকি দিনগুলো দ্বীপেই থাকে। শনিবারের লাঞ্চ আমরা করি বম্বিশার বাড়ি।
বম্বিশা ঠিক যেন মায়ের মতো। শান্ত ও কোমল। খুব ভালোবাসে আমায়। কত রকমের রান্না যে ও জানে তার কোনো হিসাব নেই। রান্নায় আমার প্রবল আগ্রহ। বরাবর। আমি একে এক সৃষ্টিশীল কাজ বলেই মনে করি। রন্ধনশিল্প। এক-এক দিন এক-এক রকম পদ রান্না করে বম্বিশা। নানান দেশের। আমি একটু আগেভাগেই চলে যাই। রান্নায় হাত লাগাব বলে। আসলে লক্ষ করি ঠিক কী কী করে ও। কিছু কিছু রান্না চলে অনেকক্ষণ। কিছু কিছু আবার নিমেষেই হয়ে যায়। রান্না হয়ে গেলে স্নান সেরে আসে ও। তারপর পরিবেশন। এত সুন্দর করে পরিবেশন করে ও যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি। পরপর পদগুলো যখন সাজিয়ে দেয় টেবিলে মনে হয় ছবি তুলে রাখি। ওর পরিবেশনই আলাদা। আর স্বাদ তো অতুলনীয়। ওই আমায় শিখিয়েছে যে খাবারের শুধু স্বাদ নয়, খাবার পরিবেশনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুয়ে মিলেই নাকি আসল তৃপ্তি।
এত রান্না কোথায় শিখলে? একদিন জিজ্ঞেস করতে বলেছিল: বেশিরভাগই আমার শাশুড়ির কাছে। ইউরোপের নানা দেশের রান্না জানতেন উনি। বাকি নিজে নিজে। রেসিপি পড়ে।
সেদিনও চলে গেছি আগেভাগেই। দেখলাম নানা রকম বিনস্ ভিজিয়ে রেখেছে। গতরাত থেকে। আমায় পেঁয়াজ আর আলু কাটতে বসিয়ে দিল। আমি খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বললাম আজকের পদটা কিন্তু আমি শিখব।
বলল: বেশ, আলু-পেঁয়াজ কাটা হয়ে গেলে এসো, দেখো আমি কী কী করি।
দেখতে থাকলাম। খুশি মনে ওর পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলল রন্ধনপ্রণালী। তারপর তৈরি হল এক ঘরোয়া স্ট্যু। কর্ন-বিন-আলু-মাংসের সমন্বয়ে। তার ওপর ও ছড়িয়ে দিল লালচে রঙের একটা সস্। অপূর্ব তার স্বাদ। তেমনই সুঘ্রাণ।
নকশাকাটা এক পোর্সিলিনের রেকাবিতে পরিবেশন করেছিল ও। সঙ্গে ছোটো ঝুরি করে গরম গার্লিক ব্রেড। মাউজার দুবার চেয়ে খেল। বম্বিশা বলেছিল উৎসবের দিনে আগে ঘরে ঘরেই নাকি হত এই স্ট্যু।
শিখে নিয়েছিলাম। পরে করেছিলাম একদিন, কিন্তু বম্বিশার স্ট্যুয়ের মতো স্বাদ বা ঘ্রাণ কোনোটাই ঠিক আসেনি।
মাউজারের জন্মদিন
গত পরশু ছিল মাউজারের জন্মদিন। পঁয়ষট্টিতে পড়ল। বুড়োর উৎসাহ দেখে কে! একগাদা মাংস এনেছিল কিনে। জাগুয়ারল্যান্ড থেকে। মাতে আর ব্যাঞ্জো গিয়েছিল সঙ্গে। আমি দিয়েছিলাম একটা শ্যাম্পেন। বম্বিশা বানিয়েছিল বার্থডে কেক। আর আননোনা দারুণ একটা ডেসার্ট।
পুলের ধারে সন্ধে থেকে জড়ো হয়েছিলাম সব। মাটিম আর ডোডোও ছিল সঙ্গে। মাটিম ছিল একটা টুলের ওপর বসে। ডোডো ছিল মাটিতে ঠিক তার পাশে। মাংসগুলো গ্রিলে বসিয়েই খোলা হল দারু। খানিক পরেই গান ধরল ব্যাঞ্জো। গিটার বাজিয়ে নেশা ধরতে থাকল। একের পর এক পুপুলার সং বাজিয়ে গেল ও। সঙ্গে গলা ছেড়ে গান। আননোনাও গলা মেলাল। বারব-বি-কিউ হয়ে এলে একটু বিরতি। তারপর আবার শুরু হল গান। সঙ্গে নাচ। আননোনা আর মাতে ঘুরে ঘুরে নাচতে থাকল। ব্যাঞ্জোর গিটারের তালে তালে। চলল বেশ কিছুক্ষণ।
চমৎকার এক চাঁদ উঠেছিল। মাঠময় ছড়িয়ে ছিল তার আলো। মাংসের গন্ধ ম-ম করছিল। সঙ্গে নানান দারুর ফোয়ারা।
ঠিক ১২টায় কাটা হল কেক। আমার আনা শ্যাম্পেনটাও হল খোলা। ততক্ষণে মাউজারের বেশ নেশা হয়েছিল। হঠাৎ করে একটা বিয়ারের খালি বোতল তুলে চামচ দিয়ে টুংটুং করে বাজাতে বাজাতে উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। তারপর দুলে দুলে শুরু করল নাচ। আমরা টেবিল বাজিয়ে তো তালি দিয়ে তাল দিতে থাকলাম। প্রথমে নাচল আননোনার সঙ্গে। তারপর জোর করে তুলে বম্বিশাকে নিয়ে নাচতে শুরু করল। আমরা জোরে জোরে তালি বাজিয়ে তাল দিতে থাকলাম দুই রঙিন বুড়ো-বুড়িকে। হাসির রোল উঠে গেল। সব শেষে বম্বিশা এঁকে দিল বার্থডে কিস্ মাউজারের গালে। আমরা হো হো করে উঠলাম।
রাত তিনটে অবধি চলেছিল হুল্লোড়। তুমুল। পরদিন হ্যাংওভার।
ব্যাঞ্জোর সঙ্গে ঘুঘুদ্বীপে
আমাদের মধ্যে ব্যাঞ্জোই সবচেয়ে ছোটো। বয়স পঁচিশ কী ছাব্বিশ হবে। বড়ো বড়ো চুল। একটা ক্যাপ পরে। উলটো করে। সবসময় হাসিখুশি। চনমনে। দুর্দান্ত হাত গিটারের। চমৎকার লিরিক লেখে। সুর করে। নতুন কোনো গান বানালেই আমাকে ডেকে শোনায় ওর লগকেবিনে। মাঝে মাঝে আননোনাও থাকে সঙ্গে।
আমায় ও বোট চালানো শেখাচ্ছে। এখন আমায় চালাতে দিয়ে পাশে বসে থাকে। আর ভুলচুক হলেই বকা দেয়। শিখেও নিয়েছি অনেকটা। শুধু বোট ঘোরাতেই যা একটু অসুবিধা হয়।
চমৎকার এক গাঁজা থাকে ওর কাছে। ফুলের কলি সব। প্রবল নেশা হয় তাতে। বলেছে ফেরিঘাটের একজন নাকি নিজেই প্ল্যান্ট করে। বন্ধুবান্ধব ছাড়া আর কাউকে দেয় না।
ব্যাঞ্জোর লগকেবিনে মাঝে মাঝে রাতের দিকে আড্ডা বসাই। বিশেষত শনিবার। খোলা জানলাটা দিয়ে জঙ্গলের দিক থেকে একটা বুনো হাওয়া আসে। গভীর রাত পর্যন্ত চলে আড্ডা। কখনও মদ কখনও গাঁজা। সঙ্গে গিটার। বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। এটা শুধু আমার আর ওর আড্ডা। কেবিনে দুটো ম্যাট্রেস আছে। ভোররাতে শুয়ে পড়ি। বেলা করে উঠি। ব্যাঞ্জোর হাতের কালো কড়া কফিতে নিমেষেই কেটে যায় রাতের খোঁয়ারি।
সবমিলিয়ে ব্যাঞ্জোর সঙ্গে বেশ জমে গেছে আমার। ও আমাকে মাছ ধরতে শিখিয়েছে। হুইল ছিপে। মাঝে মাঝে রোববার দুপুরে বেরিয়ে পড়ি দুজনে মাছ ধরতে বা অন্য কোনো অ্যাডভেঞ্চারে। ব্যাঞ্জো মাছ খায় না। তাই যার ছিপেই মাছ উঠুক না কেন খাই আমি। নদীর জলের টাটকা মাছ গ্রিল করে লেবু দিয়ে অনবদ্য। কিছুদিন হল ওর দুটো ছিপের একটা আমায় দিয়ে দিয়েছে। উপহারস্বরূপ। তাই আজকাল ব্যাঞ্জো না থাকলেও অলস কোনো ছুটির দুপুরে জলে ছিপ ফেলে বসে থাকি। নদীর ধারে কোথাও না কোথাও।
মাছ ধরতে যাওয়া ছাড়াও রোববার কখনও-কখনও লাঞ্চের পর বেরিয়ে পড়ি এদিক-সেদিক দুজনে বোটে করে। অনেক নতুন নতুন সব দ্বীপ। দূরে দূরে। বোট ট্রিপে এসব দ্বীপ পড়ে না।
সেদিন এমন একটা ছোট্ট দ্বীপে নিয়ে গিয়েছিল। বেশ দূর। কোনো মানুষজন নেই। দ্বীপ অবধি বোট যায় না। জল কম। হাঁটুজলে নেমে দুজনে ঠেলে তুললাম বোট। দ্বীপে এক ধরনের ঘুঘু দেখলাম। গলায় নীল বর্ডার। অজস্র। ঘুঘুর ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না।
একটা জয়েন্ট শেয়ার করে বুঁদ হয়ে বসে ছিলাম। কতক্ষণ তা জানি না। হঠাৎ ব্যাঞ্জো বলে উঠল: একটা গান শুনবে? কালই কম্পোজ করেছি।
আমি: নিশ্চয়ই। শোনাও।
ও গিটারটা টেনে নিয়ে বাজাতে শুরু করল। কেমন ঘোর লাগা একটা সুর। তারপর গাইতে শুরু করল। গান শেষ হতেই হেসে জিজ্ঞেস করল: কেমন?
আমি: দারুণ! ফাটাফাটি হয়েছে।
জনমানবশূন্য দ্বীপে একমাথা ধুনকিতে শোনা সেই গান আর গিটার আজও যেন কানে বাজে।
দ্বীপের নাম ঘুঘু দ্বীপ। ব্যাঞ্জো দিয়েছে।
আননোনার স্টুডিয়োতে সেদিন
সেদিন বিকেলে একটা জয়েন্ট রোল করে গেস্টহাউস থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম। নদীর পাড়ে গিয়ে ধরাব। পাড়ে যেতে গিয়ে মাউজারের বাড়ির বারান্দায় দেখলাম আননোনা ইজিচেয়ারটায় বসে বই পড়ছে। আমায় দেখতে পেয়ে বইটা মুড়ে রেখে হাসল। আমি হাসলাম। বলল: ওপরে আসবে?
আমি: যেতেই পারি। কিন্তু কেন?
আননোনা: সেদিন তুমি স্টুডিয়োেটা দেখতে চাইলে না? তো সেদিন তো সময় হল না। আজ এলে দেখাতে পারি।
ওর স্টুডিয়োটা দেখার লোভ আমার ষোলোআনা ছিল। কারণ ওখানেই ও মুখোশগুলো বানায় আর স্টক করে রাখে। বাইরে বের করে শুধুমাত্র দোকানের স্টক শেষ হয়ে গেলে। তো কথা না বাড়িয়ে ওপরে গেলাম।
স্টুডিয়ো খুব বড়ো নয়। একধারে একটা ইজেল। চোখ পড়তেই দেখলাম তাতে আমারই একটা পোর্ট্রেট। শেষ হয়নি এখনও। আমি তাজ্জব বনে জিজ্ঞেস করতে যাব তখনই বলে উঠল: এখানে যারা যারা থাকে তাদের সবারই পোর্ট্রেট এঁকেছি আমি। মাটিম আর ডোডোরও।
আমি: তা অন্যদের পোর্ট্রেট কই? দেখাও।
ওকে বিশ্বাস করিনি দেখে একটা ঠান্ডা চাহনি দিয়ে দেওয়ালের কাছে রাখা ক্যানভাসগুলো থেকে খুঁজে খুঁজে বের করে দেখাল। সত্যিই সবারই পোর্ট্রেট আছে। একদম হুবহু। পাকা শিল্পীর কাজ। আমি পোট্রেটগুলো দেখতে দেখতে বললাম: পোর্ট্রেট তো অনেকেই আঁকে, কিন্তু তারা যার পোর্ট্রেট আঁকে তাকে তো সামনে বসিয়ে আঁকে।
আননোনা: আমার দরকার পড়ে না। রোজই তো এদের দেখি। বাকিটা মন থেকে হয়ে যায়।
দরজা আর জানলা বাদ দিলে সব দেওয়াল জুড়ে সাজানো আছে নানা মাপের মুখোশ। সাধারণ ও বিচিত্র আদলের। আগেও বলেছি ওর বানানো মুখোশগুলো কেমন যেন জীবন্ত মনে হয়। বেশিক্ষণ চেয়ে থাকলে অস্বস্তি হয়। তাও একবার আলতো করে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। কাজগুলো এককথায় অনবদ্য।
ওর দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। সেই হিপনোটিক চাহনি। এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব হয়। আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ও আমার একদম কাছাকাছি চলে এল। এত কাছে সে শ্বাস পড়ছে গায়ের ওপর। হিস্হিস্ করে জিজ্ঞেস করল: কী দেখছ?
আমি: না, মানে এই মুখোশগুলো আর ...
কথা শেষ হল না। সজোরে চেপে ধরল আমার ঠোঁট দুটো ওর ঠোঁট দিয়ে। আমি একটু অবাক হয়েই সামলে নিলাম। ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকলাম। ও হাতের আঙুলগুলো দিয়ে আমার পেছনের চুলগুলো খামচে ধরে চুমু খেতে লাগল। আমিও ওর পাছা চেপে ধরে ঠোঁট-জিভ মুখের ভেতরে ভরে নিতে থাকলাম। ও আমার টি-শার্টটা টেনে খুলে দিল। আমিও এত দ্রুত ওর পোশাক খুলতে থাকলাম যেন ছিঁড়েই ফেলব। ওকে নগ্ন করে দিলাম। এর পর এক তীব্র খিদে নিয়ে দুজনে যেন দুজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। পিঠের ওপর থেকে নীচ অবধি স্পষ্ট টের পেতে থাকলাম ওর তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়। জ্বালা-জ্বালা করতে লাগল বিন্দু বিন্দু ঘামে। বুকের কাছে এখানে-ওখানে ওর দাঁতের চাপ। আমিও ওর ঘাড়ে, গলায়, স্তনে দাঁত বসিয়ে দিতে থাকলাম। আস্তে আস্তে ও নীচের দিকে নেমে গেল। আমার জিনস্-এর বোতাম ও জিপার টেনে খুলে নামিয়ে দিল। জাঙিয়াটাও। তারপর অনেকক্ষণ... আমার পারদ ক্রমে চড়তে থাকল। শক্ত করে ধরে রাখলাম ওর চুলের মুঠি।
বেশ খানিকক্ষণ পর ওর মুঠি ধরে টেনে তুললাম। পায়ের নীচ থেকে জিনস্ আর জাঙিয়াটা ছাড়িয়ে ফেলে ওকে উলটো করে ঠেসে ধরলাম দেওয়ালের সঙ্গে। ওর ঘাড় আর গালের ওপর একটা হাত চেপে রেখে করতে থাকলাম পেছন থেকে। দেওয়ালে ভর দিয়ে একের পর এক নিতে থাকল ও। শীৎকারে গমগমিয়ে উঠল স্টুডিয়ো।
ওকে অন্যদিকে টেবিলটার কাছে নিয়ে যেতে গিয়ে আমি ধাক্কা মেরে ইজেলটা প্রায় ফেলেই দিচ্ছিলাম। হাত দিয়ে ধরে কোনোমতে সামলে নিলাম। কিন্তু টেবিলটার ওপর ওকে উলটো করে ফেলতে গিয়ে ওরই হাতে লেগে একটা রঙের শিশি মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। এসব সময়ে কেই বা আর এসবে মাথা ঘামায়। ও বলে উঠল: থাক, থাক, ছেড়ে দাও। তুমি করো।
আমিও পেছন থেকে দু-হাতে ওর কোমরটা চেপে ধরে করতে থাকলাম। শব্দ হতে থাকল শরীরে শরীর ঠোকার। করতে করতে হঠাৎই আমার চোখ পড়ল সামনের দেওয়াল জোড়া মুখোশগুলোর ওপর। আমি কেমন যেন থমকে গেলাম। মনে হল ওগুলো যেন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে আমাদের এই প্রবল রমণ। আমি থমকে যেতেই - আননোনা বলে উঠল: ওঃ কী হল? থামলে কেন? করো, করো! আমার হয়ে যাবে এখুনি। বলে ও নিজেই শরীরটাকে আগুপিছু করে করতে থাকল। আমি ওর একটা হাত টেনে ধরে ফের করতে শুরু করলাম। ও বলতে থাকল জোরে, জোরে, আরও ভেতরে। আমিও জোর বাড়াতে থাকলাম। কিছুক্ষণেই ওর হয়ে গেল। প্রবল শীৎকারের সঙ্গে কেঁপে কেঁপে উঠল ওর শরীর।
ও শান্ত হলে আমি ওর দুটো কাঁধ দু-হাতে চেপে ধরে প্রায় দম না ফেলে একের পর এক দিতে থাকলাম। 'করো, করো' বলতে থাকল ও। খানিকবাদে আমিও বিন্দু বিন্দু হয়ে ঝরে গেলাম ওর পিঠে-কোমরে-পাছায়।
আননোনা পোশাক পরতে পরতে স্টুডিয়োর জানলাটা দিয়ে দেখলাম মাউজার জঙ্গলের ধার থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরছে। জিনস্ আর টি-শার্টটা পরে নিয়ে ওকে একটা চুমু খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
নদীর পাড়ে গিয়ে জয়েন্টটা ধরালাম। ওঃ, এক চূড়ান্ত সঙ্গমের পর ফুরফুরে হাওয়ায় আর মায়াবী ধোঁয়ায় শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল।
মাতের উপহার
মাতের মতো মানুষেরা এরকমই হয়। চুপচাপ, শান্ত। যেন নিজের ভেতর কোথাও হারিয়ে গেছে। অনেকবার দেখেছি বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন যেন অন্যমনস্ক। চোখাচোখি হলে ওই অল্প হাসি, ব্যস। ছুটির দিনেও খুব বেশি বেরোয় না বাড়ি থেকে। ওই আননোনার সঙ্গেই যা একটু নদীর ধারে যায়। আর মাঝে মাঝে ব্যাডমিন্টন খেলতে আসে। বেশ ভালো খেলে ও। আমাদের মধ্যে ওই সেরা। এখানে ওর সঙ্গেই আমার সবচেয়ে কম কথা হয়েছে। প্রায় হয়নি বললেই চলে। সামান্য কুশল বিনিময়। খানিক সৌজন্য।
তো, সেদিন মাউজারের বাড়ি থেকে একটা অসাধারণ ফিল্ম দেখে ফিরছি। দেখলাম ও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আমায় দেখে ডাকল। বলল: এসো, ওপরে এসো, আমার বাড়ি তো তুমি কখনও আসনি।
আমি হেসে বললাম: সে তো তুমিও কখনও আসনি আমার বাড়ি। পালটা হেসে বলল, বেশ, আমি যাব না হয় একদিন। আজ তুমি এসো।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওপরে গেলাম। মাতের বাড়িটা হুবহু আমার গেস্টহাউসের মতোই। বসার ঘরের পুরোটা জুড়েই স্টুডিয়ো। ইজেল, রং, তুলি, ক্যানভাস ছড়ানো-ছিটানো। এদিক-ওদিক। সাবধানে চলাফেরা করতে হয়। কোণের দিকে একটা সোফা কাম বেড।
বলল: বসো। একটা ভালো ওয়াইন আছে, খুলব?
আমি: বেশ খোলো। বসতে বসতে বললাম।
দেওয়ালে একটা সুন্দর পোর্ট্রেট। এক বয়স্ক মহিলার। হাসিমাখা মুখ। নীচে মাতের সই। ওটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম: এই পোট্রেটটা কার?
মাতে আমার দিকে পেগটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল: ওটা, আমার মায়ের। মা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগেই ওটা আঁকি।
আমি: ওঃ সরি, আমি জানতাম না। মাতে: না না, ঠিক আছে। আসলে জানো তো মায়ের কাছেই বড়ো হয়েছি আমি।
আমি: তোমার বাবা?
কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে বলল: বাবার কথা আমি অনেকটা বড়ো হয়ে জানতে পেরেছিলাম। বাবার সঙ্গে মায়ের কখনও বিয়ে হয়নি। ওরা একসঙ্গে থাকত না। বাবার অন্য সংসার আছে। আমি বিশেষ যোগাযোগ রাখি না।
ঘরের এদিক-ওদিক দুর্দান্ত সব ছবি ছড়িয়ে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম: এসব ছবিই কি মার্কেটে নিয়ে যাবে?
মাতে: না, সব নিয়ে যাব না। কিছু ছবি শুধু আঁকার জন্যই আঁকা।
আমি: তা তুমি এগজিবিশন করো না কেন?
মাতে: ধুর! কী লাভ? ছবি এঁকে যা আনন্দ, এগজিবিশন করে সে আনন্দ কোথায়?
আমি: তাও ছবিগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার। মার্কেটে দোকান না হয় আছে। কিন্তু এগজিবিশন হলে আরও অন্য সব মানুষ দেখতে পাবে তোমার আঁকা ছবি। ভেবে দেখো।
মাতে: বেশ, ভেবে দেখব কখনও।
পেগ শেষ হয়ে গেছিল। ও আবার ভরে দিল। আমি একটা কথা অনেকদিন ধরেই ওকে জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম। আজ মওকা বুঝে করেই দিলাম: তুমি দারিন দ্বীপে কতদিন আছ?
মাতে: এই ধরো বছর দেড়েক।
আমি: তা তুমি এই দ্বীপের কথা জানতে পারলে কেমন করে?
মাতে: ওঃ! তুমি জানো না, না? আননোনাকে আমি বহুদিন চিনি। আমি আর ও একই আর্টস্কুলে আঁকা শিখেছি। মা মারা যাওয়ার পর ওই একদিন বলল এখানে চলে আসতে। তা চলে এলাম। পেইন্টারের আর শহরে থেকে কী লাভ বলো? এখানেই দিব্যি আছি।
কথায় কথায় বোতল শেষ হলে উঠে পড়লাম। বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম: আজ চলি, আর তোমায় কিন্তু এবার একবার আসতে হবে আমার বাড়ি।
হেসে উত্তর দিল: বেশ আসব একদিন। তোমার হাতের রান্না খেয়ে আসব।
আমি: নিশ্চয়ই। চলে এসো সময় করে।
মাতে: এক মিনিট দাঁড়াও। বলে ও ছবিগুলোর মধ্যে থেকে একটা তুলে এনে আমার দিকে বাড়িয়ে বলল: এই নাও। এটা তোমায় দিলাম।
ছবিটা হাতে নিয়ে আমি অভিভূত হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম: হঠাৎ?
মৃদু হেসে বলল: এমনিই। রেখে দিয়ো তোমার কাছে।
ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেস্টহাউসে ফিরতে ফিরতে ভাবলাম আজই প্রথম ওকে চিনতে পারলাম। অন্যরকম মানুষ একজন। প্রকৃত শিল্পীর মতোই নির্জন ও উদাসীন।
এক বছর কেটে গেল
দেখতে দেখতে একবছর কেটে গেল। দ্বীপের দৈনন্দিন জীবনযাপনে বিশেষ হেরফের নেই।
মাঝে শুধু মাউজারের শরীর খারাপ হয়েছিল। মেডিকেল বোট ডেকে জাগুয়ারল্যান্ডে নিয়ে যেতে হয়েছিল। নিজের বাড়ির গেস্টহাউসেই ছিল। আননোনাও ছিল সঙ্গে। দিন কয়েক থেকে একটু সুস্থবোধ করতেই আবার ফিরে এসেছিল দ্বীপে। দ্বীপ ছেড়ে ও বেশিদিন কোথাও থাকতে পারে না।
মাতের একটা এগজিবিশন হয়ে গেল জাগুয়ারল্যান্ডে। ওর পুরোনো আর্ট স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে। দুটো ছবিও বিক্রি হয়েছে ওর। এর পেছনে আমারও খানিক উদ্যোগ ছিল।
আমি আবার চাকরি বদলেছি। নতুন অফিস জাগুয়ারল্যান্ড আর বুয়েনস আইরেস ট্রেনরুটের ঠিক মাঝামাঝি। ফলে ঘণ্টাখানেকেই পৌঁছে যাচ্ছি। উইকএন্ডগুলো চমৎকার কেটে যাচ্ছে। নোটেম এসে তিনবার ঘুরে গেছে। আমিও দুবার বুয়েনস আইরেস গিয়ে দিনকয়েক করে থেকে এসেছি ওর ফ্ল্যাটে।
আননোনার সঙ্গে প্রায়ই আমার সঙ্গম হয়। যোনি-পায়ু উভয়ই। সেই ওর স্টুডিয়োতে হওয়ার পর থেকেই। মাউজার না থাকলে ওদের বাড়িতেই, না হলে আমার গেস্টহাউসে। মাতের সঙ্গে ওর সম্পর্ক যেমন ছিল তেমনই আছে। কোনো পরিবর্তন লক্ষ করিনি। দুজনের কারওর মধ্যেই না। আমি আর মাতে এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে কখনওই কোনো কথা বলিনি। আর আননোনার সঙ্গে কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। পুরো বিষয়টাই আননোনার ওপর নির্ভরশীল। ওর চাহনি আর এক্সপ্রেশনে বলে দেয় আমাদের দুজনের মধ্যে ও কখন কাকে কীভাবে চাইছে। মুখে বলার প্রয়োজন পড়ে না। চাওয়া-পাওয়া প্রবল শারীরিক হলেও এর পেছনে মননের অস্তিত্ব তীব্র। তাই বোধহয় এভাবেই চলে আসছে। ভালোই তো অধিকারশূন্য এক সহাবস্থান।
বম্বিশার থেকে আমি আরও দুটো রেসিপি শিখেছি। নিজে নিজে ট্রাইও করেছিলাম। মন্দ হয়নি।
ব্যাঞ্জোর একটা গার্লফ্রেন্ড হয়েছে। সে আমাদের দ্বীপে প্রায়ই আসে। আমাদের সকলের সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। তবে মেয়েটি খুবই বাচ্চা।
এর মধ্যে সকলেরই জন্মদিন সেলিব্রেট করা হয়েছে। আরও বার-বি-কিউ। নাচাগানা। দারু-হুল্লোড়।
ডোডো আর মাটিম ভালো আছে। খুনশুটি আর দুষ্টুমি নিয়ে।
নদীর পাড়ে সূর্যাস্ত
সূর্যাস্তের সময়ই দ্বীপটাকে সব থেকে সুন্দর লাগে। চারদিক যেন আরও শান্ত হয়ে আসে। পাখির ডাক কমে আসে। আর নদীর ধারে এক অপূর্ব সূর্যাস্ত। আকাশ-নদী জুড়ে আশ্চর্য রঙের খেলা। কমলা-লাল-হলুদ আর আকাশের নীল। বিকেলের ফুরিয়ে আসা। পাখিদের বাসায় ফিরে যাওয়া। বড়ো বড়ো মেঘেদের সরে সরে যাওয়া। রোজ দেখেও পুরোনো হয় না।
মাতে, আননোনা আর আমি নদীর পাড়ে বসে আছি। একটু পরেই সূর্যাস্ত হবে। দুটো ঘুঘু নদীর পাড় ধরে হেঁটে যাচ্ছে। একসঙ্গে। পাশাপাশি। তিরের ফলার মতো একদল পাখি উড়ে গেল।
খানিক আগেই তিনজনে একটা জয়েন্ট শেয়ার করেছি। চারদিক কেমন মায়াবী মনে হচ্ছে। আকাশের রং একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। নদী জুড়ে তার প্রতিচ্ছবি। আমরা চুপ করে বসে আছি। আশেপাশে কোনো শব্দ নেই।
আননোনা পা-দুটো ছড়িয়ে বসে আছে। আকাশের দিকে চেয়ে আছে ও। ওর দু-পাশে আমি আর মাতে। আমি নদীর দিকে তাকিয়ে আছি। মাতে যেন একটু আনমনা।
একটা ডিঙি নৌকা চলে যাচ্ছে। গোধূলির আলোমাখা জলে ছলাৎ তুলে। হৃদয়েও যেন। ডিঙিটা ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে। ছলাৎ ছলাৎ শব্দটা কমে আসছে। ডিঙিটা মিলিয়ে গেল।
আননোনা মাতেকে একটা চুমু খেল। তারপর আমাকে একটা চুমু খেল।
সূর্যাস্ত হয়ে গেল।

No comments:
Post a Comment