বুকশেল্ফের কথা # ২০১২

আমার কোনো লাইব্রেরি নেই। শুধু একটা বুকশেল্ফ। আজকাল কখনও হঠাৎ তাতে চোখ পড়ে গেলে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি। পুরোনো বইপত্রগুলো বার করে নাড়াচাড়া করি। বারবার। আবার সাজিয়ে তুলে রাখি। আমার একটা ভাষার পুরো হয়ে ওঠা অথবা একটা ভাষার জন্য আমার পুরো হয়ে ওঠাটা এই বুকশেল্ফে, বন্ধ। 


আমার নিজের সময় একবিংশ শতকের প্রথম দশক যা 'শূন্যদশক' নামে অভিহিত। তার আগের জাস্ট পঞ্চাশটা বছর একবার ব্যাকট্র্যাক করে ঘুরে এলে বাংলা সাহিত্যের যে মেজর জংশনগুলো পড়ে এই অংশে তারই রুটম্যাপ এবং কিছু মাইল ফলক। বুকশেল্ফ অনুসারে। আমার মতো করে। আজ আমি অনেকটাই পাঠাভ্যাসের বাইরে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিগতভাবে। তাই আশা রাখি আজ আর  কোনো পক্ষপাত বা মোহগ্রস্থতা ছায়া ফেলবে না। শুধুমাত্র একটা লেখার জন্য লেখাটা পড়ার-ভালো লাগার রেশটুকু থেকে যাবে। 



জংশন নব্বই 


নব্বই দশক আমার সময়ের ঠিক আগের দশক এবং একটি শতকের অন্তিম দশক। ফলতঃ এই দশক যে ট্রানজিশনের তা বলাইবাহুল্য। এই ট্রানজিশন সর্বপ্রকারের। এ দশক থেকেই বেঁচে থাকাগুলি ক্রমশঃ পরিবর্তিত হতে শুরু করে। আর ভাষা তো আর বেঁচে থাকার বাইরে নয়। তাই ভাষারও অভিমুখ বদল কারও কারও লেখায় স্পষ্ট ও অনুভবযোগ্য, এ সময়ের।  


এরকমই একজন রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়। কবি ও গদ্যকার। আমার লেখালিখির ও পড়াশুনার অনেকটাই জুড়ে আছে রাজর্ষি। প্রাথমিকভাবে রাজর্ষিই আমায় নব্বই ও তার পূর্ববর্তী সময়ের পথনির্দেশ দেয়। পরে আমি হয়তো আরও কোনো কোনো জংশন খুঁজে পাই যা তার পথনির্দেশে স্পষ্টত ছিল না। কিন্তু তেমন জংশন খুব অল্পই আছে। 'নাবিকজন্মের ভবিষ্য' রাজর্ষির প্রথম কবিতা সংকলন। পাঠ অভিজ্ঞতায় আমার অন্যতম। 

নব্বই দশকের খুব অল্প​ কজনকেই দেখেছি কবিতার পাশাপাশি একইভাবে মৌলিক গদ্য লিখে এসেছে, এত; যেমনটা রাজর্ষি। তার 'রমলাকান্তের উট' নব্বইয়ের গদ্য-গল্প পরিসরে একটি দুর্লভ বই। ভাষায় ও ভঙ্গিতে, দুই ভাবেই। বইটি পড়া না থাকলে, একটু খুঁজে নিতে হবে পাঠককে। রাজর্ষির গদ্য প্রসঙ্গে এটুকুই বলতে পারি আমি। 

বর্তমানে রাজর্ষির কবিতাভাষা অনেকটাই পরিবর্তিত। যা হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমার সাথে তা স্পষ্টত ভিন্ন। তথাপি তার কবিতার কথা আমি মনে রাখব শুধুমাত্র 'নাবিকজন্মের ভবিষ্যের' কারণেই। গদ্যেও রাজর্ষি অবশ্য অনেক পরিবর্তিত আর তা আমার কাছে পাঠক হিসাবে প্রয়োজনীয়। আজও, এখনও পর্যন্ত।   


নব্বই এর আর একজনের কথা আমায় বলতেই হবে। সে হল শর্মী পাণ্ডে। লিঙ্গভেদে নয় জীবনভেদেই শর্মী অনেকটা অনেকটা এবং বেশ অনেকটা আলাদা। তাই শুধু পুংবয়ান এর সাথেই তার কবিতার পার্থক্য ধরা পড়ে তা নয় বরং তার কবিতা অন্য কোনো ভিন্ন জীবনপ্রণালীর ইঙ্গিত রাখে, যা পুং-স্ত্রী কিংবা ক্লীবের ঊর্ধ্বে; যা হয়তো অপর। 

শর্মী 'গ্রাফিত্তি' বলে একটি ইনডিপেন্ডেন্ট আর্ট ফোরামের সাথে জড়িত। বহুদিন। প্রসঙ্গত শর্মী একজন স্বশিক্ষিত চিত্রকর, তার অন্য সবকিছুর মতোই। 



জংশন আশি 


একজন। মাত্র একজনই। আজ শুধুমাত্র একজনের কথাই আমি বলতে পারি, এই সময়ের। বারংবার পড়ার অভিজ্ঞতা (এবং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে) আমায় এই সিদ্ধান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। সেই একজন শুভঙ্কর। শুভঙ্কর দাশ। একটা জীবন। একটা অবহেলা। একটা তাচ্ছিল্য। সবকিছুর প্রতি। সমাজ-রাজনীতি-পরিবার এমনকি স্বয়ং 'অহং' এর প্রতিও। টুসকি দিয়ে সিগারেটের ছাই ঝাড়ার মতো করে উপেক্ষা করে গেছে। এতকিছু। এতটা উদাসীন হতে পেরেছে কীভাবে তা তার নিজস্ব ভুবন ছাড়া আর কেউই বলে দিতে পারবে না। আমি যা যা বললাম এ সবই যেমন একাধারে তার জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সত্যি তেমনি তার কবিতার ক্ষেত্রেও সত্যি। প্রায় সুদীর্ঘ তিরিশ বছরের যাত্রাপথে এতটা অবিচল থাকতে আমি আর কাউকে দেখিনি। 

শুভঙ্কর দাশের একটা কথা আমার মনে পড়ে যা ও একদিন বলেছিল 'আমি ভেবে দেখেছি যে আমি শুধু কবিতাটাই লিখতে পারি, আর কিস্যু পারি না।' ভাগ্যিস ও পারে না বা পারেনি। তাই সর্বোতভাবে আমার কাছে এতটা প্রাসঙ্গিক 'শুভঙ্কর দাশের কবিতা', ওর সাম্প্রতিক কবিতাসংগ্রহ। শুভঙ্কর নিজেকে বলে 'A Street Poet'। 

শুভঙ্কর অ্যান্টি এসটাব্লিশমেন্ট-এ আজীবন। সাথে তার 'গ্রাফিত্তি'। কেউ থাকুক না থাকুক। ও একা বসে থাকে মেলার মাঠে। কোনো রকম 'একলা চলো রে' শ্লোগান ছাড়াই। এটাই ওর 'শিক্ষা'। আমারও, ওর কাছ থেকে। 

শুভঙ্করের কাছে বাংলা সাহিত্য ঋণী দুটি কারণে। এক: ও কোনো তত্ত্ব দেয়নি; কবিতা বিষয়ক। স্রেফ কবিতা লিখেছে-পড়েছে-পড়ে শুনিয়েছে। আর দুই: 'গ্রাফিত্তি' থেকে হাংরি জেনারেশনের মৃত ও জীবিত কবি-লেখকের একাধিক বই ও ছেপেছে। সংরক্ষণ করেছে। যত্নসহকারে।



জংশন সত্তর 


বহির্বঙ্গ, বাংলাসাহিত্য এবং একটি দলগত প্রয়াস - 'কৌরব'। আদি ও সার্বজনীন; মান্যতায়-অমান্যতায়, যাই হোক না কেন। সত্তরের গোড়ায় পত্রিকা প্রকাশ। এরপর কবিতা ক্যাম্প, ভ্রমণ, প্রকাশনা ইত্যাদি প্রভৃতি। সেই জামশেদপুর থেকে। 'কৌরব' শুধুমাত্র একটি পত্রিকা বা প্রকাশনা সংস্থা নয়; আমার কাছে। 'কৌরব একটি অনিবার্য জীবন প্রবাহ'- এটুকুই আমার উত্তরাধিকার। 'কৌরব' গোষ্ঠীর নিজস্ব ভুবন 'ভালোপাহাড়'। বেঁচে থাকার-বাঁচিয়ে রাখার। কবিগ্রাম। মাত্র একবারই আমার ভ্রমণে। আমার অভিজ্ঞতায়। কমল-বারীন-স্বদেশ-শংকর (লাহিড়ী) চারজন; আদি কৌরবের। আমার পাঠশালায় একটি পিরিয়ড।  


কমল চক্রবর্তী বাংলা গদ্য সাহিত্যের অবিস্মরণীয় কথাপুরুষ। 'দণ্ডহীন যাদুকর' আখ্যায় ভূষিত। সামগ্রিক রচনায়-ভাবনায়-জীবনে তিনি ব্যতিক্রমী। কমল প্রণীত 'ব্রহ্মভার্গব পুরাণ' উপন্যাসটি আমি পড়েছি। এতটা ঘোর-এতটা অস্বস্তি আমার পাঠ অভিজ্ঞতায় বিশেষ নেই। বিশেষত বাংলায়। উপন্যাসে। কমলের লেখা সত্যিই বঙ্গদেশে গসপেল হয়েই থেকে গেছে। আর কমল পাপের মতই দগদগে জেগে থাকবেন। আজীবন। যতদিন না বাংলা ভাষা আর্কাইভে চলে যাচ্ছে। 

মনে পড়ে অনেক আগের একটা রাত। কমলসান্নিধ্য। ভালোপাহাড়েই। অনেক কথা সেদিন কমল বলেন। সবই অনেকটা আগের সময়ের কথা। অতটা শিহরিত ও মাতাল রাত খুব বেশি স্মরণে নেই। ওনার সম্পর্কে আমার না হয়ে ওঠা একটি লেখার নাম: বাবু কমল চক্রবর্তীর খড়ম। একদিন হয়তো হয়ে উঠবে।

 

বারীন ঘোষাল এর রচনার যতটুকু গদ্য তা আমার আজীবনের। সামান্য যেটুকু আমার গদ্যের ভুবন তাতে বারীন অপরিহার্য। মনে আছে 'জিন্দাবাদ খালকো' আর 'মাটাম'। প্রথমটি গল্প সংকলন। দ্বিতীয়টি উপন্যাস। 'জিন্দাবাদ খালকো' গ্রন্থে 'জগন্নাথের রথ' একটি গল্প। কোনো অতিমানবিক মেধা বা দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে লেখা অসম্ভব। আর এটা বলতে আমার লজ্জা নেই যে 'মাটাম' উপন্যাসটির ভাষার মারপ্যাঁচ ঠেলে সম্পূর্ণ পড়ে উঠতে আমি আজও পারিনি। চেষ্টা করেছি কয়েকবার। 


স্বদেশ সেন এমন একজন কবি যে যেকোনো মুহুর্তে আমার প্রিয় পাঁচজন কবির নাম বলতে বললে একমুহুর্ত না ভেবে আমি যাঁদের নাম বলব তাঁদের মধ্যে স্বদেশ সেনের নামটি থাকবেই। 'স্বদেশ সেনের স্বদেশ' গ্রন্থটিই এই 'স্বদেশ-বোধ' তৈরী করার জন্য যথেষ্ট। আর এতটা অল্প কবিতা সম্ভবত পঞ্চাশ দশকের অন্য কোনো কবি লেখেননি যিনি স্বদেশ সেনের মত একটি 'স্ব-দেশ' গড়ে তুলেছেন। বা তুলতে পেরেছেন, আস্ত। 


'মুখার্জীকুসুম' আর 'মোটরহোম' দুটি গ্রন্থ। প্রথমটি কবিতা। দ্বিতীয়টি গদ্য। প্রণেতা শঙ্কর লাহিড়ী। এতখানি নাগরিক টুকিটাকি-খুঁটিনাটি জীবনপ্রণালী খুব অল্প মানুষের লেখাতেই ধরা পড়ে। আর তার জন্য একটা ভাষার প্রয়োজন। অর্থাৎ নাগরিক ভাষাও জরুরি। এইসব খুঁটিনাটির সাইটোপ্লাজম হিসেবে। 'ভাষা' নামক ধাত্রটি শঙ্কর লাহিড়ীর আছে। প্রমাণস্বরূপ গ্রন্থ দুটি। নাগরিক কলরবে শ্বাশত।  



জংশন ষাট 


হাংরি জেনারেশন। বাংলা সাহিত্যে একমাত্র আন্দোলন। আমার বিচারে। ষাটের গোড়ায় যার সূত্রপাত। সাল-তারিখ আমি উল্লেখ করতেই পারি কিন্তু এটা তো ট্রায়ালরুম নয়। তাই…

অনেকের নাম এ আন্দোলনে জড়িত। আর আমি প্রায় সকলেরই নাম ও জন্মসন পেশ করতেই পারি সাথে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থও কিন্তু এটাতো রিসার্চ পেপার নয়। তাই...  

আমি শুধু আমার ভালোলাগা দুজনের কথা সংক্ষেপে বলতে পারি এবং তা শুধুমাত্র তাদের লেখার কারণেই। ফালগুনী রায় এবং বাসুদেব দাশগুপ্ত। প্রথমজন কবি এবং দ্বিতীয়জন গদ্যকার। এই জেনারেশনের। 


ফালগুনী মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন। 'নষ্ট আত্মার টেলিভিসন' কবির জীবিতকালে প্রকাশিত একমাত্র বই। কবিতার বলাই বাহুল্য। প্রকাশকালঃ ১৫ই অগাষ্ট, ১৯৭৩। প্রকাশক বাসুদেব দাশগুপ্ত। যাঁরা যাঁরা এখনো পর্যন্ত প্রেম ও পেচ্ছাব দুইই করতে পারেন বইটি তাঁদের কাছে আজও প্রয়োজনীয়। বাকিদের কাছে নয়। 


মাত্র গোটা বিশেক গদ্য। আচ্ছা, কুড়িয়ে বাড়িয়ে মানে বাক্স-প্যাঁটরা-তোষক হাতড়ে আরো খানতিনেক খশড়া না হয় পাওয়াই গেল। তাতে কী এল গেল! একজন বাসুদেব দাশগুপ্ত এমনই, ওই গোটা বিশেক গদ্য-গল্প আর বাংলা সাহিত্যে একটি নির্দিষ্ট স্থান। ধ্রুবক। চিরকাল। জীবিতকালে এনারও একটিই গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত। 'রন্ধনশালা'। প্রকাশকাল ১৯৬৫। প্রকাশক উৎপলকুমার বসু। যতদূর মনে পড়ে। প্রসঙ্গত বাসুদেব দুটি উপন্যাসও লিখেছিলেন। 'উৎপাত' ও 'খেলাধুলা'। 



জংশন পঞ্চাশ 


আমার ব্যাকট্র্যাকিং-এ শেষতম জংশন কৃত্তিবাস পত্রিকা গোষ্ঠী। আদি ও অবিনশ্বর। ওই সময়কালের দুজন এবং আগের মতোই একজন কবি ও অন্যজন গদ্যকার, আমার কাছে অপরিহার্য। উৎপলকুমার বসু ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। 


উৎপলকুমার বসুর কবিতা যতবার পড়েছি আমার একটি কথাই মনে হয়েছে। যে এতটা অবলীলায় কথা বলার মতো করেও তবে লেখা যায়! এবং তা এতটা কবিতা হয়ে ওঠে! এতটা নিজের! এতটা সুখ ও দুখের! উৎপল আমার 'সুখ-দুঃখের সাথী'। প্রসঙ্গত 'সুখ-দুঃখের সাথী' উৎপলের কবিতা সংগ্রহ। ঘিয়ে রঙের মলাট। ভেতরের পাতাগুলো হলদেটে। হার্ডবাউন্ড।


লেখালিখির হাতেখড়িতে থেকেই আমার ‘সন্দীপনপাঠ’ শুরু; তাই সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে বলতে পারি যে উনি গদ্য না লিখলে এবং আমি তা না পড়লে আমি রচনা-চিঠি-ভাবসম্প্রসারণ-সারসংক্ষেপ এসব লিখতাম; মাত্র। ওই মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরের। যদিও এমনটা হতেই পারে যে আমি আজও রচনা-চিঠি-ভাবসম্প্রসারণ-সারসংক্ষেপই লিখি, ইস্কুল পড়ুয়াদের মতো। সেটা নেহাতই আমার অপদার্থতা। সন্দীপন প্রণীত প্রিয় উপন্যাস 'স্বর্গের নির্জন উপকূলে' এবং 'ডাবলবেডে একা'। 


বুকশেল্ফের আরও কিছু প্রাসঙ্গিক বই:

  

শেষ নৌকা: তুষার রায় 

হারবার্ট: নবারুন ভট্টাচার্য 

চিলেকোঠার সেপাই: আখতারুজ্জমান ইলিয়াস 


পরিশেষে বইগুলি সাজিয়ে তুলে রেখে পুনরায় বন্ধ করে দেওয়া হল, বুকশেল্ফ। 



রচনাকাল: ২০১২

মিনিবুক: এই চলছে, জানুয়ারি, ২০১৩


No comments:

Post a Comment