গ্রামোফোন # ২০১৯


-তো, তোর প্রোমটারের সাথে সব কথা ফাইনাল? সিঙাড়ায় একটা কামড় মেরে চিবোতে চিবোতেই জিজ্ঞেস করল কুনাল।

চায়ে চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে সৈকত বললঃ হ্যাঁ, অল সেট। দেখ, বাবার জন্যই এতদিন এই বাড়িটা রাখা। না, হলে মা তো সেই কবেই মারা গেছেন, আমি বউ-বাচ্চা নিয়ে ইউএসেতে সেটেল্ড আর বোন ওর মতো শ্বশুরবাড়িতে। আর এবার তো বাবাও চলে গেলেন। এতবড় বাড়ি কে আর মেইন্টেইন করবে বল? আমি এখানে থাকলেও না হয় একটা কথা ছিল। তার থেকে একটা ফ্ল্যাট তালাবন্ধ করে রেখে দেব যখন আসব তখন থাকব। ঝামেলা কম।

-সেই, ঠিকই বলেছিস। বলে হাতে চায়ের কাপটা তুলে নিল কুনাল। একটা চুমুক দিয়ে নামিয়ে রেখে সিগারেট ধরাল। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জিজ্ঞেস করলঃ তা, এবার সোনালি আর টুবুকে আনলি না কেন?

সিঙাড়ার টুকরোটা চিবিয়ে গিলে নিয়ে সৈকত বললঃ দেখ, এবারে এসেছিই অল্পদিনের জন্য। জাস্ট, এই ফার্ণিচারগুলো একটা ফ্ল্যাটে শিফট করিয়ে বাড়ি খালি করে প্রোমোটারকে হ্যান্ডওভার করে চলে যাব। যতদিন না এখানকার ফ্ল্যাটদুটো পাচ্ছি আমি আর বোন ওই ফ্ল্যাটটার ভাড়া শেয়ার করে নেব। তারপর ফার্ণিচারগুলো ভাইবোনে ভাগাভাগি করে নেব।

-ও, আচ্ছা। তা তুই ফিরছিস কবে? কুনাল চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল।

-এই তো আগামী শনিবার। বলে সৈকত সিগারেট ধরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

সিগারেটটা ধরিয়ে জুত করে টানতে টানতে মিটিমিটি হাসি নিয়ে কুনালকে বললঃ তবে, তোকে আজ ডেকেছি একটা বিশেষ কারণে।

কুনাল হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলঃ কি রে?

সৈকতঃ তোকে একটা জিনিশ আজ গিফট করব।

-সত্যি!, কি রে ভাই? খুশিতে ডগমগ মুখে কুনাল জিজ্ঞেস করল।

চোখের ও আঙুলের ইশারা করে দেখিয়ে সৈকত বললঃ ওই গ্রামোফোনটা।

-আরিব্বাস, থ্যাংক ইউ ভাই। বলে আনন্দে কুনাল উঠে চলে গেল দেওয়ালের গায়ে একটা সুন্দর কাঠের উঁচু টুলের ওপর রাখা গ্রামোফোনটার কাছে।

-থ্যাংক ইউ আবার কিসের রে শালা? তুই আমার সেই কলেজলাইফ থেকে বন্ধু।


একথা ঠিকই যে সৈকত আর কুনালের বন্ধুত্ব শুরু সেই যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়। কুনাল বোলপুরের ছেলে। হস্টেলে থাকত। তখন থেকেই সৈকতের এই কসবার বাড়িতে তার যাতায়াত। সৈকত বি.ই. করে চাকরি নিয়ে চলে গেল ব্যাঙ্গালোর তারপর সেখান থেকে ইউএস। ওর বউ সোনালিও ওখানে একটা সফ্টওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করে। 

কুনাল খুব একটা উচ্চাকাঙ্খী ছিল না। আরও দুবছর পড়াশুনা করে এম.ই. করে গড়িয়ার কাছে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াতে ঢুকেছিল। আজও ওখানেই আছে। বিয়ে-থা করেনি। একলাই থাকে। আগে ভাড়া থাকত। এখন পাটুলিতে একটা ছোট ফ্ল্যাট কিনেছে। ওর বাবা-মা সহ পরিবারের অন্য সবাই থাকে বোলপুরে পৈতৃক বাড়িতে।


গ্রামোফোনটা ভাল করে হাত বুলিয়ে দেখেতে দেখতে জিজ্ঞেস করলঃ হ্যাঁরে, এখনো চলে এটা?

-দিব্যি। আশ্বাসের সুরে বলল সৈকত।

এরপর গ্রামোফোনটার ঠিক ওপরেই দেওয়ালে টাঙানো সৈকতের বাবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললঃ কাকুর এই ছবিটা কিন্তু খুব সুন্দর।

-ওটা আমিই তুলেছিলাম। কয়েক বছর আগে। সৈকত শুকনো হাসি দিয়ে বলল।


সৈকতের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কুনাল যখন তার পাটুলির ফ্ল্যাটে ফিরল তখন রাত প্রায়  সাড়ে আটটা। সৈকত অবশ্য ধরেছিল তার সাথে দুপাত্তর খেয়ে একেবারে ডিনার করে ফিরতে কিন্তু গ্রামোফোনটা নিজের বাড়িতে নিজের কাছে পাওয়ার আর তর সইছিল না তার।


ফ্ল্যাটে ঢুকে হলে স্টাডি টেবিলটাতে একটু জায়গা করে গ্রামোফোনটা রাখল সেখানে। তারপর পোশাক ছেড়ে বাথরুমে চলে গেল। খুশিতে গুনগুন করতে করতে শাওয়ারটা খুলে দিল। কালই একটা উপযুক্ত টেবিল বা টুল কিনতে হবে আর কিছু ভিনাইল রেকর্ড। অনেকক্ষন ধরে স্নান করল সে। তারপর রেডি হয়ে চলে এল হলে। একটা ডিম লইট জ্বালিয়ে বাকি লাইট অফ করে দিল। আরাম করে সফায় বসে সামনের টেবিলে রাখা রামের বোতল থেকে গ্লাশে অল্প ঢালল। অল্প জলও মেশাল। গ্রামোফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হাল্কা হাল্কা চুমুক দিতে থাকল। একটু পরে একটা সিগারেটও ধরিয়ে নিল।


বেশ অনেকক্ষন কেটে গেছে। নেশাটাও জমেছে বেশ। কুনালের চোখ লেগে আসছিল। ভাবল এবার উঠে খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়বে। কাল সকালে কলেজ আছে। এমন সময় ওর মনে হল কে যেন দরজার দিকটায় দাঁড়িয়ে আছে। আশ্চর্য ভেতরে ঢুকল কি করে! একটু ভয় পাওয়া গলায় কুনাল জিজ্ঞেস করে উঠলঃ কে?

ছায়ামুর্তি এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ঠিক গ্রামোফোনটার কাছে দাঁড়াল। আর সেই আলোয় কুনাল তার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেল। একি! ছায়ামুর্তি এবার ভারী অথচ শান্ত গলায় পালটা জিজ্ঞেস করলঃ আমায় তুমি চিনতে পারছ না?

খুব চিনেছে কুনাল আতঙ্কে তার হাত থেকে সিগারেটটা পড়ে গেছে মাটিতে। সে ভয়ার্ত গলায় অস্পষ্ট ভাবে বললঃ কা কাকু!!

ছায়ামুর্তিঃ হ্যাঁ, আমার গ্রামোফোনটা নিতে এসেছি।

ততক্ষনে কুনাল জ্ঞান হারিয়েছে।


পরদিন কাজের দিদির বেল শুনে ঘুম ভাঙল সৈকতের। বোনকে বলে একে ম্যানেজ করেছে এই কদিনের জন্য। সদর দরজা খুলবে বলে নিচে নেমে হলে এসে তার মাথাটা কেমন বোঁ করে ঘুরে গেল। পড়েই যেত যদি না পাশের দেওয়ালটা ধরে নিত। এ কী দেখছে সে! গ্রামোফোনটা ঠিক যথাস্থানেই রাখা।

No comments:

Post a Comment