পারমিন্দর, ভালো আছিস?
এই হল জনবিরল দিল্লি রোড। এর পিচে পিচে হা-হা হাসি, ঘুরে চলে বেদম হাসির দম দেওয়া বাঁশি। হ্যালোজেনগুলো জ্বলে উঠলে এক এক করে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ছায়াদের।
পারমিন্দর তার লম্বা-চওড়া চেহারাটা নিয়ে ব্রিজে হ্যালান দিয়ে দাঁড়ায়। হাত দিয়ে বড় বড় চুল ঠেলে মাথার পেছনে করে। পকেট থেকে গাঁজা বার করে ডলতে থাকে তালুতে আর এদিক ওদিক চোখ চালায় যদি কোনো মাঝবয়সী ‘বৌদি’ বা নিদেন পক্ষে কোনো ‘হিজড়ে’ জুটে যায়। তারপর ঝোপের ধারে…
হাওয়ায় হাওয়ায় ‘পারমিন্দর, ভালো আছিস?’ লোকাল ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যায়।
অবৈতনিক স্কুল ও মাসির ধান্দা
ছোট্ট স্টেশনটাকে ওপরে রেখে নিচ দিয়ে চলে গেছে দিল্লি রোড আর ওয়েটিং রুমের নিচে এই পরিত্যক্ত ঘর। এদিক সেদিক বুনো ঝোপ আর পুরু শ্যাওলার আস্তরণ। কাঠের একফালি জানলা। পেছনের দেওয়াল জুড়ে আবছা Street and Working Children School - SPAN। এর থেকে বোঝা যায় বহু বছর আগে এখানে এক অবৈতনিক স্কুল বসত। আয়োযক ছিল SPAN।
আজ এ ঘর মাসির দখলে। কখনও সখনও বৃষ্টি হলে পারমিন্দর আর তার দলবল এই ঘরেই মদ-সেক্স আর তুমুল জুয়া। নীল ঘন ধোঁয়া বেরিয়ে আসতে থাকে প্রায় ভেঙে পড়া জানলা দিয়ে।
মাসির বয়স হয়েছে। এখন মাসির আন্ডারে দুটো মেয়ে। নিজের মেয়ে ও তার বান্ধবী। এই ধান্দায় মাসির বেশ কিছু আয় হয়। স্টেশন সংলগ্ন অনেকেই রাত বাড়লে এখানে।
চাপা চাপা শীৎকার ও বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি।
রূপারানীর ড্রেসিংরুম
গোপালদার দোকানে রূপারানী ওর সন্ধ্যার বরাদ্দ চা খাচ্ছে। পাশে বসে আমি কাঁচি দিয়ে গাঁজা কাটছি। হঠাৎ গোপালদার চোখ পড়ল আমার ওপর। খেঁকিয়ে উঠল ‘যা, যা দোকানের বাইরে যা, ব্যবসার সময় এসব! বেরো, এখুনি, বেরো।’ অগত্যা আমি উঠে পড়লাম।
খানিক বাদে রূপারানী চা শেষ করে উঠে পড়ল আর আমার পাশ দিয়ে হনহন করে উঠে গেল স্টেশনের দিকে। আমি জানি ও কোথায় যাবে। স্টেশন হয়ে দিল্লি রোড। ব্যাগ থেকে শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ বের করে প্যান্ট-গেঞ্জি ছেড়ে পরবে, অল্প কিন্তু উগ্র প্রসাধন করে ও এবার পুরোপুরি মেয়ে হয়ে ভিক্ষেয় বেরোবে দোকানে দোকানে। ওর এই ‘হিজড়ে’ জীবনের এটাই একমাত্র ক্ষুন্নিবৃত্তি।
এভাবেই রূপারানী পোশাক বদলাতে থাকবে, বুকের প্যাড সেট করতে থাকবে আর মাঝখান দিয়ে দিল্লি রোড, এ এক আশ্চর্য ড্রেসিংরুম - এখানে অন্ধকার দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়! রূপারানীর একমাত্র নিজস্ব ড্রেসিংরুম।
ঠেকের গল্প
‘মেন ব্যাপারটা হল, কাল মা প্যান্টের পকেট থেকে একটা কন্ডোম পেয়েছে।’ অর্জুন বলল। অনেকক্ষণ ধরেই চাপা গলায় বলে যাচ্ছিল, বাড়িতে ঝামেলা হয়েছে। আমি ছিলিম হাতে, একটা বেদম দম দিয়ে তাকালাম।
এই অর্জুনই আমাকে কুয়েতের কান্ট্রি লিকার খাইয়েছিল। তাও এই দিল্লি রোডেই, এখন যেখানে বসে আছি। ইরাক, কুয়েত, জর্ডন ঘুরে নানা কাজ করে অর্জুন পাকাপাকি দেশে ফিরেছে।
ছিলিম ঘুরতে থাকল।
দেবা গত পাঁচ বছরে প্রায় কোটি টাকা মদ-মেয়েমানুষে উড়িয়ে এখন খালি হাত। দিল্লি রোডে সকাল-সন্ধে গাঁজা খায়। তবে গাঁজা ওর ততো প্রিয় নয়। ওর চাই ট্যাবলেট। স্প্যাজমো তো চলেই কিন্তু প্রিয় ট্যাবলেট হল অ্যাটিভান।
শবনম নেশা ধরিয়ে দেয় আজও দেবার চোখে। ছিলিমের পর ছিলিম চলে, নেশা হয় না। নেশা মজে আছে শবনমে। ওঃ শবনম! সেই সোনাগাছি-শবনম-আলাপ। প্রথমে কাস্টমার। তারপর ভালো লাগা। দেবার জিগর ছিল। ভাগিয়ে নিল শবনমকে। এরপর শুধু পালানো, পালানো আর পালানো। এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত ইভেন ‘বম্বে’ গিয়েও শেষরক্ষা হল না। শবনম ফিরে গেল সেই সোনাগাছিতেই। অকথ্য অত্যাচার হল। দেবার ওপর হুলিয়া জারি হল সোনাগাছির গলিতে গলিতে।
দেবা শবনমের গল্প বলে চলে…
এভাবেই দিল্লি রোডের হ্যালোজেনের নিচে গল্প-গাছা-মদ-গাঁজা-চরস-খিস্তি-রস নেওয়া নেওয়ি চলে। শীতের রাতগুলো হু হু করে নেমে আসে আর আমার এই লাথখোর-লম্পট চেহারাটা মাঝে মাঝেই হ্যালোজেনে ঝলসে ওঠে।
দিল্লি রোডের খিলাড়িরা
আজ গোপালদা বাঁচিয়ে দিল। ঠিক সন্ধে নামার মুখে আমি যখন গোপালদার দোকানে পৌঁছে সবে বলেছি ‘একটা গোল্ডফ্লেক।’ গোপালদা চাপা গলায় বলে দিল ‘দিল্লি রোডের ওপর যাস না। রেড হচ্ছে। একটু আগে বলর ঠেকে হপ্তা নিয়েছে।’
খানিক বাদে দিল্লি রোডের ওপর আমি যখন অর্জুনের টান থেকে অসাবধানে পড়ে যাওয়া বেশ খানিকটা না পোড়া জ্বলন্ত গাঁজা অবলীলায় হাত দিয়ে তুলে ছিলিমে ভরে দিলাম তখন শাক্য বলল ‘সাবাস, সুমন, তুই খিলাড়ি হয়ে গেছিস।’ হ্যাঁ, এই দিল্লি রোডে আমারাই খিলাড়ি। নেশা আর জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা, এই দুর্দান্ত জাগলিং করতে করতেই আমরা বেঁচে আছি এবং আরও বহু বছর বাঁচব।
আহ! দিল্লি রোড
মেঘে ঢাকা আকাশের মতো কুয়াশা পড়ে আছে দিল্লি রোডে। আমার সামনেই গড়ে ওঠা এই দিল্লি রোডের পিচের নিচে আমারই ছাল-রক্ত-বমি আর হুল্লাট বাওয়ালি। ঝোপঝার থেকে বেরিয়ে আসছে মৃদু মৃদু স্মৃতির কোয়া। আমার অসংখ্য বেহিসেবি পদক্ষেপ ও লাইন টপকে টপকে যাওয়া। চুরচুর মাতাল হয়ে হা-হা হাসি আর ফেলে আসা উপকথা।
এখানে অনেকের শ্বাস অনেক দীর্ঘ হয়ে ফিরে ফিরে আসে কুয়াশায়। এই পারমিন্দর-রূপারানী-অর্জুন-দেবা-শাক্য- এরাই নির্ধারিত বেগসীমা বেঁধে দেবে দিল্লি রোডের।
এ এক বিকার যেন আমার সকালের দিল্লি রোড, বিকেলের দিল্লি রোড আর দিল্লি রোডের ওপর গাঢ় হয়ে নেমে আসা সন্ধ্যা। ম্যাজিকের মতো রূপ বদলায় দিল্লি রোড। প্রতিটি মুহূর্ত জীবনের মতো এক অনায়াস গতিতে চলে এখানে। কী অপূর্ব সেই দ্যুতি!
এমন এই নির্মম সন্ধ্যায় আমার প্রতিটি স্খলন বাঙ্ময় হয়ে ওঠে, আর দিল্লি রোডের ওপর দাঁড়িয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে মুখ তুলে বলে উঠি: আহ! দিল্লি রোড।
উল্লেখ্য, সেদিনের সেই নির্মীয়মান ‘দিল্লি রোড’ই হল আজকের বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেসওয়ে আর সেখানে আরও অনেক খিলাড়ি ছিল, যাদের কথা বলা হল না।
রচনাকাল: ২০০৬, অগ্রন্থিত
প্রতিষেধক-৮, অগাষ্ট ২০০৬
No comments:
Post a Comment