রামমোহন # ডিসেম্বর, ২০১৯


প্রথম প্রকাশ: জানুযারি, ২০২৬

প্রকাশক: হপ্তাক কাচরা


মুখবন্ধ

আমার শিশু-কিশোর-যুবাবেলা কেটেছে এক মফস্বলি পাড়ায়। 

সেই পাড়া ও সংলগ্ন অঞ্চলের বাস্তবতার স্মৃতি ও আমার কল্পনা মিলেমিশে এই আখ্যান।

কল্পিত এই চরিত্র ও তার কাল্পনিক স্থান-কাল।

হয়তো, তেমন কোনো বিশেষত্বনেই এদের মতো চরিত্রদের। 

তবুও অলীক কোনো না কোনো পাড়ায় এরা নিজেদের মতো বেঁচে থাকে। মারা যায়।


উৎসর্গ

কমরেড সব্যসাচী (বাবাই) পাল'কে

এই আখ্যানের একটি চরিত্র খানিকটা তার আদলে গড়া



এক


আসলে তার ডাকনাম মোহন। অনেকদিন আগে ঘাটশিলা বেড়াতে গিয়ে পাড়ার বন্ধুরা সবাই ঠিক করেছিল হুইস্কি খাবে আর সে বলে উঠেছিল ‘ভাই, আমার জন্য কিন্তু রাম।’ শুনে সব্যদা হেসে বলেছিল ‘বেশ মোহনের জন্য রামই তুলিস। ও হল আমাদের রামমোহন।’ ব্যাস, সেই থেকে পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের কাছে সে হয়ে গেল ‘রামমোহন’। তার তখন ফার্স্ট ইয়ার। সবে মদ খেতে শিখেছে।


আস্তে আস্তে বন্ধুবান্ধবদের দেখাদেখি পাড়ার ছোটরাও বলতে শুরু করল রামমোহনদা। আজকাল তো তাকে রামমোহনকাকুও শুনতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার রামমোহনের বদলে বলে ‘রাম্মোন’। পাড়ার বয়স্করা অবশ্য তাকে মোহন বলেই ডাকে। এ নিয়ে রামমোহনের কোনও ক্ষোভ বা আপত্তি নেই কারণ নামকরণের পেছনে যে বৃত্তান্তই থাক না কেন নামটা তো আর মন্দ নয় বরং এক মনীষীর নাম।


রামমোহনের বয়স সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ। মাঝারি হাইট। রোগাটে গড়ন। শ্যামলা রঙ। চুল-দাড়ি-গোঁফ ছোট করে ছাঁটা। চোখে পাড়ারই তারানাথ অপটিক্যালস থেকে বানানো অর্ডিনারি ফ্রেমের চশমা। সস্তা জিন্স আর গোলগলা টি-শার্ট পরে। পায়ে সস্তা কিটো। আংটি-মাদুলি-তাগা-তাবিজ কিছু পরে না।


রামমোহনের নেশা বলতে সারাদিনে বার কয়েক লিকার চা, দু বান্ডিল বিড়ি আর একদিন অন্তর অল্প রাম। হপ্তায় একটা ওল্ড মঙ্কের বোতল কেনে তাতেই চলে যায়। রাম ছাড়া অন্য কোনো মদ সে খায় না।


পাড়ার ঠিক মাঝামাঝি রামমোহনের বাড়ি। ছোট একতলা বাড়িটা বানিয়েছিলেন তার বাবা। তিনি ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক। নৈহাটির একটা কলেজে পড়াতেন। রামমোহন যখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে তখন তিনি মারা যান। তার মা-ও মারা গেছেন আজ প্রায় সাত বছর হল। চমৎকার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। এপাড়ার অনেকেই ছোটবেলায় গান শিখেছে তার কাছে। 


বাড়ির সামনের দিকে গ্যারাজে রামমোহনের জেরক্সের দোকান। পুরনো অ্যাম্বাসাডর গাড়িটা তার বাবা মারা যাওয়ার পরপরই তারা বিক্রি করে দেয়​। গ্যারাজের পাশে লোহার সদর গেট। গেট খুলে ঢুকে একটা ছোট্ট চাতাল। সেখানে রামমোহন টবে কয়েকটা ফুলগাছ লাগিয়েছে। চাতাল পেরিয়ে দুটো সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভেতরে ঢোকার দরজা। দরজা খুলে একটা ছোট প্যাসেজ। তার ডানহাতে ছাদে ওঠার সিঁড়ি আর বাঁহাতে ঘুরে হল। হলের একদিকে কিচেন আর বাথরুম। অন্যদিকে দুটো বেডরুম। একটা বড় আর একটা ছোট। হলে আসবাব বলতে ভারী কাঠের একটা গোল ডাইনিং টেবিল, তাকে ঘিরে চারটে কাঠের চেয়ার, একটা পুরনো সোফা, তার সামনে একটা কাঠের সেন্টার টেবিল আর এককোণে একটা পাল্লা দেওয়া শোকেস। শোকেসের ওপরের দুটো তাকে তার বাবার বই, মাঝের দুটোতে নানা জায়গা থেকে কেনা বাহারি শোপিস আর একেবারে নিচেরটায় সাজানো ক্রকারি। এখন রামমোহন বড় বেডরুমটাতেই শোয়। সেখানে আছে তার বাবা-মার বিয়েতে পাওয়া সেগুন কাঠের খাট আর আয়না লাগানো আলমারি। এককোণে বাবার সেক্রেটারিয়েট টেবিল আর গদিআঁটা চেয়ার। দেওয়ালে তার বাবা-মার কমবয়সে একসাথে তোলা একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। তার নিচে দেওয়াল ঘেঁষে বাক্সবন্দী তার মায়ের সাধের হারমোনিয়াম​। ঘর লাগোয়া একটা ট​য়লেট আর গ্রিল দিয়ে ঘেরা এক চিলতে বারান্দা। ছোট ঘরটায় আছে রামমোহনের পুরনো সিঙ্গল খাট, একটা কাঠের চেয়ার আর পুরনো বইভর্তি মাঝারি হাইটের একটা বুকর‍্যাক। বেশ ধুলো পড়েছে বইগুলোতে। পুরনো প​ড়ার টেবিলটাকে নিয়ে গেছে দোকানে। যা যা ছিল তার সবই আছে। কোনোকিছুই রামমোহন বেচেনি। শুধু পুরনো টিভিটা দিয়ে দিয়েছে ঠিকে কাজের লোক ফুল্লরাদিকে। টিভি সে কোনোদিনই দেখত না। হলের পেছন দিকে দেওয়ালজোড়া জানলা। জানলার একধারে দেওয়ালের কোণে একটা বেসিন​। তার ওপরে একটা ডিম্বাকার আয়না। ছিটেছিটে জলের ছোপ ধরেছে তাতে। 


স্থানীয় কেশবচন্দ্র কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স বাঁচিয়ে রামমোহন বি.এ. পাশ করে। চাকরিতে তার তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। গ্যারাজটা খালি পড়ে ছিল ও দোকানটা করে নিয়েছে। এ. এস. এন্টারপ্রাইজ। জেরক্স, স্ক্যানিং, প্রিন্টিং করা ছাড়াও রামমোহন খাতা, পেন, পেনসিল, ইরেজার, গাম, স্টিকার, ব্রাউন পেপার, রং পেনসিল, ড্রইং বুক এসবও বেচে। পাড়ায় গার্লস হাইস্কুল আছে তাই ব্যবসা মন্দ হয় না। জেরক্স মেশিন ছাড়া দোকানে আছে দুটো হাতলওলা প্লাস্টিকের চেয়ার, একটা স্ট্যান্ড ফ্যান, দুপাশের দেওয়ালে কাঠের র‍্যাকে রাখা রকমারি বিক্রির জিনিস আর পাড়ার লাট্টুদার অ্যাসেম্বল করা একটা পুরনো ডেস্কটপ।


টাকা পয়সার খুব একটা চিন্তা তার  নেই। বাবা-মার জমানো টাকা সেই তো পেয়েছে। বিয়ে করেনি। একলার সংসার। যা রোজগারপাতি হয় তাতে তার দিব্যি চলে যায়।   


রামমোহন সহজ সরল লোক। কোনো কুটকাচালিতে সে থাকে না। তাই পাড়ার সকলেই তাকে ভালোবাসে। রোজই তার দোকানে চেনাশুনা লোকজন আসে। সে সকলের সাথেই হেসে কুশল বিনিময় করে। কেউ কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গল্প- টল্পও করে যায়।


রামমোহনের একটা বড় সুবিধা হল যে সে রান্নাবান্না ভালোই পারে। চা-ডিম সেদ্ধ-অমলেটের পাশাপাশি ভাত, ডাল, ভাজা, সব্জি আর মাছ-মুরগি-ডিমের ঝোলও বানাতে পারে। ইউটিউব দেখেই শেখা। প্রথম প্রথম অবশ্য একটু-আধটু ছড়িয়ে ফেলত কিন্তু ইদানিং অভ্যাস হয়ে গেছে। ঠেলায় পড়লে হয় বৈকি। চাল-ডাল-নুন-তেল-চিনি-মশলা-ডিম-পাঁপড় ও মাসকাবারি আর যা কিছু তার জন্য আছে ভোলার মুদির দোকান। রোজ সকালে ভ্যানরিকশা নিয়ে পাড়ায় আসে কানাই আর শ্রীপদ। কানাই বেচে সব্জি আর শ্রীপদ মাছ। মাছ বলতে রামমোহন কেনে তেলাপিয়া আর চারাপোনা। আনাজপাতিও তেমন বেশি কিছু না। পেঁয়াজ-রসুন-আদা-লঙ্কা-টমেটো আর আলু-বেগুন-পটল। রবিবার সকালে বড় রাস্তার ওপারে মন্টুর চিকেন শপ থেকে কেনে ছশো মত ব্রয়লার আর কোনো এক ফাঁকে কাছের কাউন্টার থেকে তুলে নেয় হপ্তার খোরাকি রামটুকু। ব্যাস।


মাসে একবার পাড়ার লোকনাথ সেলুনে কার্তিকের কাছে চুল-দাড়ি-গোঁফ ছাঁটে আর শখ করে মহামায়া মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে মাঝে মধ্যে সিঙারা-নিমকি খায়। মিষ্টিতে তার তেমন রুচি নেই। 


দুই 


রামমোহনের ঠাকুরদারা ছিলেন তিন ভাই-এক বোন। দেশভাগের পরপরই তাঁরা সপরিবারে রাজশাহী ছেড়ে চলে আসেন কলকাতায়। বড় ভাই ছিলেন উকিল। ছোটভাই যান ব্যবসায়। মেজ অর্থাৎ রামমোহনের ঠাকুরদা বেশ কিছুদিন অপেক্ষা ও ঘোরাঘুরি করার পর তার পুরনো ব্যাঙ্কের চাকরিতেই পুনর্বহাল হন। বেলঘড়িয়া ব্রাঞ্চে। ওখানেই একটা বাড়ির একতলা ভাড়া নিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন। ওই বাড়িতেই জন্ম হয় তাঁদের একমাত্র সন্তান রামমোহনের বাবার। তার ঠাকুমাকে রামমোহন চোখেই দেখেনি আর ঠাকুরদা যখন মারা যান তখন তার বয়স সাত। এর বছর দুয়েক পরই তার বাবা এপাড়ায় জমি কিনে বাড়ি করে তাকে আর তার মাকে নিয়ে চলে আসেন। বাবার দিকের জ্ঞাতিগুষ্টির সাথে রামমোহনের তেমন যোগাযোগ কোনওদিন ছিল না। ওই ছোটবেলায় কিছু অনুষ্ঠান বাড়িতেই যা দেখা-টেখা হয়েছে।


তার মায়ের দিকের আত্মীয় বলতে মামা-মামী-মামাতো ভাই আর স্মৃতিলোপ পাওয়া শয্যাশায়ী দিদিমা। মামা-মামী-দিদিমা থাকেন তাঁদের পৈতৃক বাড়ি মানিকতলায়। মামাতো ভাই পল্টু বিদেশে। তবে তার মা মারা যাওয়ার পর থেকে মামা-মামীর সাথে আর বিশেষ দেখা সাক্ষাৎ নেই। বিজয়ার পর পর রামমোহন ফোন করে প্রণাম জানায় খালি।


রামমোহনের বাবা-মা তাকে বিন্দুমাত্র সেবা শুশ্রুষা করার সুযোগ দেননি। তাকে শুধু মুখাগ্নি আর শ্রাদ্ধ-শান্তি করতে হয়েছিল। তার বাবা মারা যান কলেজেই। ক্লাস নিয়ে ফ্যাকাল্টি রুমে ফিরেই অসুস্থ বোধ করেন। ধপ্ করে বসে পড়েন চেয়ারে। তারপর বাঁহাত বুকে চেপে ঝুঁকে পড়েন সামনের টেবিলের ওপর। পড়েই যেতেন চেয়ার থেকে। এক সহকর্মী ধরে নেন। তক্ষুনি প্রিন্সিপালের গাড়ি করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের ডাক্তার পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করে। খবর পেয়ে তার মাকে নিয়ে রামমোহন যখন হাসপাতালে পৌঁছয় ততক্ষণে তার  বাবার নিষ্প্রাণ দেহ সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। স্বামীর মৃতদেহের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার মা এক আরিতকা চিৎকার দিয়েই অজ্ঞান হয়ে যান। আর রামমোহন সেই প্রথম ও শেষবারের মতো পরিণত বয়সে জনসমক্ষে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। 


রামমোহনের বাবার মরদেহ নিয়ে পাড়ায় ছোটখাটো মিছিল বেরিয়েছিল। মৃতদেহের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটা লাল রঙের কাপড়। তার ওপর সাদা দিয়ে আঁকা কাস্তে-হাতুড়ি। তার মাকে নিয়ে রামমোহন ছিল সামনের সারিতে। স্লোগান উঠেছিল: কমরেড অলক সরকার অমর রহে। তার মা নিশ্চুপ থাকলেও নিজের অজান্তেই কখন যেন রামমোহন বলে উঠেছিল: অমর রহে, অমর রহে। সেই প্রথম ও শেষবারের মতো রামমোহন মিছিলে হেঁটেছিল। স্লোগানে গলা মিলিয়ে ছিল।


তার মা চলে যান একদম নিঃশব্দে। ভোররাতে ঘুমের মধ্যে। সাধারণত সকালে চা-টা রামমোহনকে তার মা-ই করে দিতেন। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রামমোহন তার মায়ের কোনো সাড়াশব্দ পায়নি। ভেবেছিল শরীর টরীর খারাপ হয়তো। শুয়ে আছে, থাক। সে নিজেই দু-কাপ চা করে মায়ের ঘরে গিয়ে দুবার ‘মা মা’ করে ডাকল। কোনো সাড়া না পেয়ে সে ঠেলা দিয়ে ডাকল। আর গায়ে হাত দিতেই সে চমকে উঠল। বরফের মতো ঠান্ডা তার মায়ের শরীর। কিছুক্ষণ থম্ মেরে থেকে কল দিল পাড়ার আশু ডাক্তারকে। পরপরই ফুল্লরাদি চলে এল। এসেই হাউমাউ জুড়ে দিল। তার চিৎকারে একে একে জড়ো হল প্রতিবেশী কেউ কেউ। সবশেষে এলেন আশু ডাক্তার। নাড়ি টিপে দেখে জানিয়ে দিলেন অনেক আগেই সব শেষ। কিচ্ছু করার নেই আর। 


সব যে শেষ সেটা রামমোহন তার মায়ের গায়ে হাত দিয়েই বুঝেছিল। সে মুঠি-চোয়াল শক্ত করে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। প্রতিবেশীদের সান্ত্বনা বাক্য তার কানেও পৌঁছল না। সেদিন থেকে সে পুরোপুরি একা হয়ে গেল। তার দুচোখের কোনে চিকচিক করছিল জল।


তিন


রোজ সকালে আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ লিকার চা আর দুটো ডিম সেদ্ধ খেয়ে ঠিক নটায় রামমোহন দোকান খোলে। একটা নাগাদ বন্ধ করে স্নান খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নেয়। তারপর উঠে এককাপ লিকার চা খেয়ে আবার চারটেয় দোকান খোলে। দোকানে কাজের ফাঁকে পড়ে সাপ্তাহিক বর্তমান। সন্ধে সাতটায় সেদিনের মতো দোকান বন্ধ করে চলে আসে পাড়ার মোড়ে লেবুদার চায়ের দোকানে। এক গেলাস লিকার চা আর দুটো নোনতা বিস্কুট নিয়ে ঘণ্টাখানেক আড্ডা দেয়। লেবুদার দোকানের আড্ডায় থাকে পাড়ার জুনিয়ররা। কলেজ পড়ুয়া শঙ্খ, প্রদীপ্ত, বিতান, শীর্ষ-এরা। জুনিয়ররা তার সামনে বিড়ি-সিগারেট খেলে রামমোহন কিছু মাইন্ড করে না। নানান বিষয়ে আড্ডা হয়। খেলাধুলা-রাজনীতি নিয়ে হাল্কা তর্ক-বিতর্কও হয়। রামমোহন বিশেষ মন্তব্য করে না। মিটিমিটি হাসে আর চা-বিড়ি খায়। তারপর বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি ফিরে কোনো কোনো দিন রান্না করে। একা লোক তাই রোজ রান্না করার প্রয়োজন পড়ে না। একবার রাঁধলেই তিন-চারবেলার খাবার তৈরী। আর ফ্রিজ তো আছেই। রান্নাবান্না সেরে হলে হলদেটে ডিমলাইটটা জ্বেলে সোফায় বসে চুপচাপ বিড়ি টানে আর মোবাইলে ইউটিউব থেকে হেমন্ত-মান্না-কিশোরের গাওয়া বাংলা-হিন্দি গান শোনে। যেদিন রাম খায় সেদিন একটু পাঁপড় সেঁকে নেয়। তারপর রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে। এই তার রোজকার রুটিন। 


রবিবার রামমোহন দোকান খোলে না। সাড়ে আটটায় ফুল্লরাদির বেল শুনে বিছানা ছাড়ে। যথারীতি ফ্রেশ হয়ে চা-ডিম সেদ্ধ খায়। তারপর ফুল্লরাদি কাজ সেরে চলে গেলে ছোট্ট থলিটা নিয়ে চলে যায় মন্টুর চিকেন শপে। বাড়ি ফিরে যত্ন করে মাংসটা রাঁধে। তারপর স্নানটান সেরে জমিয়ে মুরগি-ভাত খেয়ে একচোট ভাতঘুম দেয়। বিকেল সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ উঠে এককাপ লিকার চা খেয়ে হাঁটতে বেরোয়। হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় পাড়ার পেছনে ঝিলপাড় অব্দি। এই ঝিলপাড়ে ছোটোবেলায় বাবার হাত ধরে সে বেড়াতে আসত ছুটির দিনে। ঝিলপাড় থেকে দেখা যায় এক্সপ্রেস হাইওয়ে। আগে ছিল রেলের ঢালু জমি। রামমোহনরা বলত ‘ঘ্যাষের মাঠ’। ঝিলপাড়ে একটা বেঞ্চে কিছুক্ষণ বসে বসে বিড়ি টানে। আগে এখানে একটা রাধাচূড়া গাছ ছিল। পাকা বাজার হওয়ায় সেটা কেটে ফেলা হয়েছে। সন্ধের মুখে রামমোহন উঠে পড়ে। হেঁটে হেঁটে পাড়ায় ফিরে আসে।


পাড়ায় ফিরে যায় সব্যদার বাড়ি। সব্যদার বাড়ির একতলার ঘরে বসে তাসের আড্ডা। সব্যদা-গগাই-বুল্টা আর রামমোহন। ওরা সবাই জড়ো হলে সব্যদা তাদের কাজের লোক অনিমাদিকে দিয়ে চপ-মুড়ি আনায়। চপ-মুড়ি আর লিকার চা নিয়ে জমে ওঠে তাসের আসর। বেশ কয়েক হাত খেলে রাত নটা নাগাদ রামমোহন বাড়ি ফিরে আসে। এই আড্ডা তাদের বহুদিনের। তারা সবাই ছোটবেলার বন্ধু। গগাই-বুল্টা তারই ব​য়সী। সব্যদা তাদের থেকে বছর চারেকের ব​ড়​। গগাই ব্যাঙ্কে চাকরি করে। বুল্টা একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। সব্যদার কেটারিং-এর ব্যবসা। রামমোহনের মতোই ব্যাচেলর। গগাই-বুল্টা হল যাকে বলে ফ্যামিলি ম্যান।


রবিবার রাতে বাড়ি ফিরে রোজকার মতোই রাম-বিড়ি-পুরনো বাংলা-হিন্দি গান আর তারপর খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুম। এককথায় একদম সাদামাটা জীবন তার। সহজভাবে দিন কেটে যায়। কোনো ঝক্কিও নেই। কোনো তরঙ্গও নেই।   


 চার


রামমোহনের বাড়ির উল্টোদিকে মিত্রবাড়ি। পেল্লায় দোতলা বাড়িটা হলদে রঙের। মিত্রকাকুর বনেদি শাড়ি ও লেডিজ্ গারমেন্টসের ব্যবসা। বড় রাস্তার ওপারে সুপার মার্কেটে মস্ত দোকান। নাম অন্নপূর্না বস্ত্রালয়। রামমোহন শুনেছে মিত্রকাকুর মায়ের নামেই নাকি দোকানের নাম। মিত্রকাকুর এক ছেলে, এক মেয়ে। নান্টুদা আর পারুল। মিত্রকাকুকে বড়লোকই বলা চলে। পাড়ার পুজোয় মোটা টাকা চাঁদা দেন।


রামমোহনের দোকান থেকে মিত্রবাড়ির মস্ত লোহার গেট আর গাড়িবারান্দাটা দেখা যায়। প্রতিদিনের মতো সকালে রামমোহন দোকান খুলে বসেছিল। দেখল একটা লাল হন্ডা গাড়ি এসে মিত্রবাড়ির গেটে দাঁড়াল। দুবার হর্ণ দিতেই পুরনো কাজের লোক নিত্যদা বেরিয়ে এসে গেট খুলে দিল। গাড়ি ভেতরে ঢুকে গাড়িবারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। পারুল তার ছেলেকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতর চলে গেল। পারুল প্রায়ই বাপের বাড়ি আসে। মিত্রকাকু নিজে দেখেশুনে বেশ বড় ঘরেই তার বিয়ে দিয়েছেন।


রামমোহন দোকানের বাইরে এসে একটা বিড়ি ধরাল। হন্ডা গাড়িটার দিকে তাকিয়ে বিড়িটা টানতে টানতে কেমন আনমনা হয়ে পড়ল।


ছোটবেলায় রামমোহন পারুলকে ভালোবাসত। তবে বলতে পারত না। এই নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের অনেক টিটকিরি তাকে হজম করতে হতো। কী আর করবে। সে বরাবরই একটু মুখচোরা। একদিন সব্যদার বাড়ির একতলার ঘরে বসে এরকমই টিটকিরি শুনতে শুনতে সে ক্যারম খেলছিল। হঠাৎই সব্যদা বলে ওঠে ‘আচ্ছা, তুই মুখে বলতে পারিস না তা না হয় হল। কিন্তু চিঠি লিখে তো জানাতে পারিস।’ আইডিয়াটা তার  বেশ মনে ধরে। সে তখন ইলেভেনে আর পারুল এইটে।


এর কিছুদিন পরই ছিল স্বরস্বতী পুজো। রামমোহন ঠিক করে ওইদিনই সে চিঠি দেবে পারুলকে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। তিন-চার বার লিখে ও ছিঁড়ে ফেলে শেষমেষ একটা সাত আট লাইনের চিঠি লিখে ফেলে। দুপুরবেলা বাড়িতে পুজোর ভোগ খেয়ে নতুন কেনা গাঢ় নীল পাঞ্জাবির পকেটে চিঠিটা পুরে বেরিয়ে পড়ে। সোজা চলে যায় গার্লস হাইস্কুলের সামনে। এই স্কুলেই পারুল পড়ে। রামমোহন বাড়ি থেকে দেখেওছে পারুলকে স্কুলে যেতে।  বাসন্তী রঙের শাড়িতে পারুলকে দেখে আজ তার  যেন চোখই সরছিল না।


রামমোহন দুরুদুরু বুকে পায়চারী করতে থাকে স্কুলের সামনে। দুপুর বলে লোকজন কম। ভালোই হয়েছে। একটু পর নিশ্চয়ই পারুল পুজোর ভোগ খেয়ে বাড়ি ফিরবে। সেই সুযোগটাই নিতে হবে তাকে। কিছুক্ষণ পায়চারী করে রামমোহন স্কুলের উল্টোদিকে ল্যাম্পপোস্টটার নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। উফ! সময় যেন কাটছেই না। সে ঘন ঘন আঙুল মটকাতে থাকে। চিঠিটা ঠিক মতো দিয়ে উঠতে পারবে তো? পারুল চিঠিটা নেবে তো? পড়বে তো? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে থাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আপনা থেকেই পকেটে হাত চলে যায়। না, চিঠিটা ঠিকই আছে।


রামমোহনকে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। দুই সহপাঠী সহ হাসির ফোয়ারা তুলে পারুল বেরিয়ে এল স্কুল থেকে।


-পারুল, একটু শুনবে? রামমোহন ডাকে। দূর থেকে মোটরবাইকের ভটভট শব্দ শোনা যায়।


- কি মোহনদা? পারুল এগিয়ে আসে। তার সহপাঠীরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে, খিলখিল করে হাসে, আড়চোখে তাদের দিকে দেখে।


-এইটা তোমায় দিতে… মানে… নার্ভাসভাবে রামমোহন চিঠিটা বার করে পারুলের দিকে এগিয়ে দেয়।


- কি এটা? পারুল চোখ সরু করে মিটিমিটি হাসি নিয়ে প্রশ্ন করে।


রামমোহনের আর উত্তর দেওয়া হয় না। সশব্দে একটা মোটরবাইক এসে তার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়।


- এই তুই কি বলছিলি রে আমার বোনকে? দেখি, এটা কি? বলেই নান্টুদা ছোঁ মেরে তার  হাত থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নেয়। রামমোহন লুকোতে গিয়েও পারে না। ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চিঠিটা খুলে চোখ বুলিয়েই ‘এইসব বাঁদরামি করছিস’ বলেই নান্টুদা ঠাস করে তার  গালে এক চড় কষায়।


পথচলতি দু-একজন ‘কী হয়েছে রে?’ বলে এগিয়ে আসে। নান্টুদা তাদের চিঠিটা দেখায়। একজন ফিচেল হাসি হাসে। নগেন কাকা বলেন​ ‘ বাঁদর হয়ে গেছে ছেলেটা’। বলব তোর বাবাকে?’ রামমোহন লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে যায়। চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। নান্টুদা ততক্ষণে মোটরবাইক স্ট্যান্ড করে নেমে পড়েছে। হয়তো তাকে আরো দু’ঘা দিত। এমন সময় হঠাৎই সব্যদা কোত্থেকে চলে আসে। কী হয়েছে শুনে ‘ও আর এইসব করবে না’ বলে নান্টুদাকে আশ্বস্ত করে রামমোহনকে টেনে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।


সেদিন বাড়ি ফিরে রামমোহন নিজের ঘরে গুম হয়ে বসে থাকে বাকি দিনটা। রাতে কিছু খায়ও না। লজ্জায় দুঃখে সে চুপ মেরে গিয়েছিল। রাতের দিকে তার  খুব কান্না পায়। সে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। তারপর চোখ মুছতে মুছতে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে যে সে আর কখনও কাউকে কোনো চিঠি লিখবে না।


এরপর থেকে রাস্তায় মুখোমুখি হলে সে চোখ নামিয়ে নিত।


এই ঘটনার অনেকদিন পর যখন পারুলের বিয়ে হয় তখন মিত্রকাকু তাকে আর তার মাকে নেমন্তন্ন করেছিলেন। রামমোহন যায়নি। তার মা নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে মিষ্টি খেয়ে এসেছিলেন। পরে গগাইদের​ মুখে শুনেছিল​ কেটারিং নাকি দারুণ হয়েছিল। গলদা চিংড়ি খাইয়েছিল​। 


কলেজে পারমিতাকে ভালোলাগলেও সেকথা রামমোহন তাকে জানায়নি। পরের দিকে পারমিতা কেমিস্ট্রির নির্বানের সাথে প্রেম করত​।


বিড়িটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফেলে দিয়ে পা দিয়ে ঘষে নিভিয়ে রামমোহন দোকানের ভেতর ঢুকে পড়ল।


 পাঁচ


সকালবেলা দোকানে বসে রামমোহন তার ছোট্ট নোটবুকটায় মাস খরচের হিসেব লিখছিল। তিন-চারমাস অন্তর একবার করে হিসেবটা করে রাখে।                                          

হিসেবটা শেষ করা হল না। ‘মোহন, এটা একটু জেরক্স করে দে তো’ শুনে তাকিয়ে দেখল মিন্টুদার বাবা। হাতে নাতনীর আধার কার্ড। এই ক’বছরে ভদ্রলোকের চেহারাটা যেন একদম দুরমুশ হয়ে গেছে। কার্ডটা নিয়ে রামমোহন মেশিনের দিকে চলে যায়।


রামমোহনের বাড়ির দুটো বাড়ির পরেই মিন্টূদার বাড়ি। বছর ছয়-সাত আগে মিন্টুদা সুইসাইড করে। সন্ধে নাগাদ মিন্টুদার মায়ের ‘ওরে, কি হল রে?’ বলে বিকট চিৎকার শুনে রামমোহন হুড়মুড়িয়ে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আশেপাশের লোকজন দুড়দাড় করে মিন্টুদার বাড়ি ঢুকে পড়ে। রামমোহন শুনতে পায় ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার করে বলে ওঠে ‘বিষ খেয়েছে। শিগগির অ্যাম্বুলেন্স ডাক।‘ অ্যাম্বুলেন্সে করে হসপিটাল নিয়ে যেতে যেতেই সব শেষ।


মিন্টুদা চিটফান্ডের কারবার করত। রামমোহনকে কয়েকবার বলেওছিল ইনভেস্ট করতে। রামমোহন রাজি হয়নি। এসব বিষয় সে বিশেষ বোঝে না। তাছাড়া কোনো শর্টকার্ট বা ফাটকাতে সে বিশ্বাসও করে না।


পাড়ায় স্টেট ব্যাংকের ব্রাঞ্চ আছে। সেখানে রামমোহনের অ্যাকাউন্ট। বাবা-মার সূত্রে পাওয়া টাকা সে ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়েছে। ক্রেডিট কার্ড তার নেই। আজকাল অনেকে সঙ্গে ক্যাশ রাখে না তাই লাট্টু-দা তার অ্যাকাউন্টটা পেটিএমে লিংক করে দিয়েছে। সে নিজে পেটিএম থেকে কাউকে পেমেন্ট করে না। শুধুমাত্র কাস্টমারের সুবিধা ভেবেই করা। অনেকেই পেটিএমে পে করে তাকে।


জেরক্স করিয়ে নিয়ে মিন্টুদার বাবা চলে গেলেন। রামমোহন ইচ্ছে করেই তাঁকে আর আর ‘কেমন আছেন?’ জিজ্ঞেস করল না।


ছয়


স্ক্যানিং-এর কাজটা শেষ করতে না করতেই রামমোহনের মোবাইল বেজে ওঠে। মামার ফোন। বাবা! মামা হঠাৎ এতদিন পর সকাল সকাল ফোন করল। কী ব্যাপার? কারোর শরীর টরীর খারাপ হল না তো? এইসব ভাবতে ভাবতে অরিজিনালটা কাস্টমারকে ফেরত দিয়ে টাকাটা নিতে নিতেই রামমোহন ফোন ধরল। ‘হ্যালো, মামা, বল’। ওপাশ থেকে মামা বলে, ‘শোন, পল্টুর বিয়ে, আগামী বৃহস্পতিবার রিসেপশন, চলে আসিস। কার্ড পাঠাচ্ছি হোয়াটসঅ্যাপে।’ ‘বাহ্​ খুব ভালো খবর। নিশ্চয়ই যাব।’ বলে ওঠে রামমোহন। ‘রাখলাম’ বলে মামা ফোন কেটে দেয়। হোয়াটসঅ্যাপে ইংলিশে লেখা ‘শতদ্রু ওয়েডস প্রিয়াঙ্কা’ ই-কার্ড চলে এল​ কিছুক্ষণেই।  


পল্টু রামমোহনের মামাতো ভাই। বিদেশে থাকে। ইঞ্জিনিয়ার। রামমোহন প্রথমে ভাবল ধুর! সে যাবে না। মামাদের সব বড়-বড় ব্যাপার। সে তো নিতান্তই ছাপোষা। কিছু একটা বলে দেবে বানিয়ে। তারপর ভাবল না, না যাওয়াটা খারাপ দেখায়। একটুক্ষণ থেকেই চলে আসবে না হয়।


নেমন্তন্ন করেছে মানে কিছু না কিছু তো গিফট নিয়ে যেতে হবে। এই ভেবে রামমোহন সুপার মার্কেটের মোমেন্টস্ গিফট হাউজ থেকে সাড়ে চারশো টাকা দিয়ে কিনে ফেলল​ একটা ফটোফ্রেম। রঙিন মার্বেলে পেপারে প্যাক করে সোনালি ফিতে বেঁধে স্টিকার মারল​ তাতে। তার ওপর গোটা গোটা হরফে লিখল​: শুভেচ্ছায়, মোহনদা।


বৃহস্পতিবার দুপুরে দোকান বন্ধ করে রামমোহন গেল লোকনাথ সেলুনে। বিয়েবাড়ি বলে কথা চুলটা ছাঁটিয়ে যাওয়াই ভালো। কার্তিক তাকে দেখে বলে উঠল ‘কী ব্যাপার?’ এমাসে আবার এলে?’ ‘এই একটা বিয়েবাড়ি আছে রে।’ রামমোহন বলল। বিয়েবাড়ি শুনে কার্তিক চুল ছাঁটার পাশাপাশি তার  দাড়ি-গোঁফও ট্রিম করে দিল। বাড়ি ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিয়ে যথারীতি রামমোহন বিকেলে দোকান খুলল। সাতটার একটু আগে দোকান বন্ধ করে সে গুনগুন করতে করতে পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া বুরুশ দিয়ে ঘষে ঘষে কিটোটা পরিষ্কার করতে লাগল। অনেকদিন পর কোনো বিয়েবাড়িতে যাবে এটা ভেবে বেশ খুশি খুশি লাগছে তার। লাস্ট সেই বুল্টার বোন টুসির বিয়েতে গিয়েছিল​। বছর তিনেক আগে। সব্যদা কেটারিং করেছিল​। 


ইস্তিরি করে তুলে রাখা দুটো পাঞ্জাবির মধ্যে থেকে সবুজটা পরে গিফটপ্যাক সাথে নিয়ে বেরিয়ে প​ড়ল​। রাস্তায় প্রবল জ্যাম। কী এক মিছিল বেরিয়েছে। রামমোহন বাসে বসে ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে গেল। অবশেষে পঁয়ত্রিশ মিনিটের রাস্তা প্রায় দেড়ঘন্টা কাবার করে বাস তাকে নামিয়ে দিল।


বিয়েবাড়ির এলাহি জাঁকজমক দেখে রামমোহনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। চারিদিকে লোকজন সব জমকালো পোশাকে সেজেগুজে হাতে কোল্ডড্রিংকস্ কিংবা কফির কাপ নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। সেখানে সে নিতান্তই সাদামাটা। একরঙা পাঞ্জাবি, সস্তা জিন্স আর পুরনো কিটোয় বড়ই বেমানান। মস্ত লনের দু’ধারে সাজানো নানান লোভনীয় সব পদ। ম ম করছে জিভে জল আনা গন্ধ। উর্দি পরা ওয়েটাররা ট্রেতে করে স্ন্যাক্স আর ড্রিংকস্ নিয়ে ঘুরে ঘুরে সার্ভ করছে। একজন এসে তার  সামনেও দাঁড়াল মাংসের কাবাব নিয়ে। রামমোহন কাঠিতে গেঁথে একটা মুখে দিল। আঃ জবাব নেই। বাটারের টুকরো যেন। জিভে ফেলতেই গলে গেল। সে ভাবল আগে দেখাটা সেরে নিয়ে গিফটটা দিয়ে আরো কয়েক পিস খাবে এই কাবাব।


লনের একদম পেছন দিকে এক বিশাল ডায়াসের ওপর নবদম্পতির সিংহাসন। রামমোহন পাশ কাটিয়ে সেদিকে এগোল। ডায়াসের কাছাকাছি গিয়ে মামাকে দেখতে পেল​। মামাও দেখেছে তাকে। ‘এসেছিস? আয়, আয়’ বলে ডায়াসে নিয়ে উঠে পল্টুর কাছে গিয়ে বলে ‘এই দ্যাখ মোহনদা এসেছে।’ পল্টু দামী ব্লেজার পড়ে সেজেগুজে নতুন বউকে পাশে নিয়ে বন্ধুদের সাথে গ্রুফি তোলায় ব্যস্ত। বাবার কথায় একবার হাল্কা রামমোহনকে দেখে নিয়ে আলগা হেসে ‘ভালো তো’ বলে আবার ছবি তোলায় মেতে গেল। এদিকে ‘ও জগুদা, একটু শুনুন তো’ বলে কে যেন একটা তার  মামাকেও ডেকে নিয়ে চলে গেল। রামমোহন বেশ অপ্রস্তুত বোধ করতে থাকল​। তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই পল্টুরা দাঁত কেলিয়ে দামী মোবাইলে ছবি তুলতে থাকল। আর সেগুলোই ‘দেখি দেখি’ করে দেখতে দেখতে নিজেদের মধ্যে খিল্লি করতে থাকল। রামমোহন বেশ অপমানিত বোধ করল। নতুন বউয়ের সাথে তাঁকে পরিচয় করানোর প্রয়োজনই বোধ করছেনা পল্টু! সে কি এতটাই ফ্যালনা নাকি। এর মধ্যে স্যুট-টাই পরা একজন হোমরা চোমরা গোছের লোক ডায়াসের দিকে এগিয়ে এল আর তাকে দেখেই পল্টু ছবি তোলা ছেড়ে ‘এসো এসো, রবিদা’ বলে বিগলিত হয়ে হাত বড়িয়ে এগিয়ে গেল। এই ফাঁকে রামমোহন খুব চেষ্টা করে একটু হাসি ফুটিয়ে নতুন বউয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে ‘আমি পল্টুর পিসতুতো দাদা’ বলে গিফটের প্যাকেটটা হাতে গুঁজে দিয়ে নেমে এল ডায়াস থেকে। গটমট করে গেটের দিকে এগোল। উর্দিপরা ওয়েটার আবার এল কাবাবের ট্রে নিয়ে। মুখোমুখি পড়ে গেলেও রামমোহন কাবাব নিল না। পাশ কাটিয়ে সোজা গেটের বাইরে বেরিয়ে এল।


বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একটা বাস পেল। বাসের পেছনের সীটে বসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার প্রথমে খুব দুঃখ হল। এতটা অপমানিত হবে ভাবলে সে আসতই না। বেকার চুল-দাড়ি ছাঁটানো হল। কাচা পাঞ্জাবিটা বের করে পরা হল। এতটা রাস্তা আসা হল। বাড়িতে রান্নাও নেই কিছু। তারপর তার দুঃখটা বদলে গেল রাগে। পল্টুটা মানুষকে সামান্য সম্মানটুকু দিতে জানে না। হতে পারে সে বড়লোক। বিদেশে থাকে। না হয় রামমোহন তেমন কেউ নয়। কিন্তু সে তো অপগণ্ডও নয়। বরং নিজের সামান্য ক্ষমতায় যেটুকু পারে সেটুকু করে সৎভাবে রোজগার করে। শুধু হ্যাংলার মত গিলতেও সে যায়নি। মামা নেমন্তন্ন করেছিল তাই সৌজন্য রাখতেই গিয়েছিল। অসভ্য কোথাকার! মনে মনে রামমোহন এইসব বলতে লাগল। বাসও ফাঁকা রাস্তা পেয়ে হু হু করে চলতে থাকল​।


‘বনহুগলী বনহুগলী’ বলে কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে ওঠে। রামমোহনের চটকা ভাঙল​। একটু পরই নামতে হবে তাকে।


বাড়ি ফিরে রামমোহন একটু চালে-ডালে বসিয়ে দিল। গান চালিয়ে চুপচাপ রাম খেতে থাকল। তারপর এক সম​য়​ খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ল। রাগ আর দুঃখ দুই মিলে মনটা খুব ভারী হয়েছিল তার।


সে রাতে রামমোহন স্বপ্ন দেখল। দেখল এক মস্ত বড় জামাকাপড়ের দোকানে ঢুকে পড়েছে সে। চারিদিকে ব্র্যান্ডেড দামী দামী সব জামাকাপড় সাজানো। একদিকে হ্যাঙার ঝুলছে নানান রঙের-মাপের-বাহারের সব ব্লেজার। সে সেদিকে এগিয়ে গেল। সুবেশ সেলস্ বয় এসে দাঁড়াল তার সামনে। মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘ব্লেজার দেখবেন, স্যার?’ রামমোহন গম্ভীর ভাবে ‘হ্যাঁ’ বলল। তারপর একটার পর একটা ব্লেজার পরে ট্রায়াল দিতে থাকল। কিন্তু কী আশ্চর্য! কোনওটাই তার গায়ে ফিট করল না। শেষমেষ কাঁচুমাচু মুখে রামমোহন বেরিয়ে আসল দোকান থেকে। দোকানের বাইরে রাস্তায় পা দিতেই হুশ করে একটা লাল হন্ডা গাড়ি তার সামনে দিয়ে চলে গেল। আর রাস্তায় জমে থাকা কাদাজল ছিটকে এসে তার টি-শার্ট-জিন্স ভিজিয়ে দিল। রাগে দুঃখে সে কী করবে ভেবে পেল না। হাত দুটো মুঠো করে ফ্যালফ্যাল করে শুধু এদিক ওদিক তাকাতে থাকল।


সাত


রামমোহনের সাথে গগাই-বুল্টা-সব্যদার দেখা-আড্ডা বলতে শুধু রবিবারই। সপ্তাহের অন্যান্য দিন তারা নিজের নিজের মতো ব্যস্ত থাকে। 


বুল্টার মর্নিং স্কুল। পাশেই যতীন কলোনীতে। রোজ সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ বুল্টা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যায়। সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফিরে আসে। তারপর স্নান-খাওয়া সেরে একচোট ভাতঘুম দিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ যায় পাড়ার ক্লাবে। সেখানে  কিছুক্ষণ ক্যরম-টিটি পিটিয়ে বাজার​-হাট সেরে সন্ধে সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরে আসে। তারপর বউ-ছেলের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটায়। বুল্টাদের পৈতৃক দোতলা বাড়ি। ওর ঠাকুরদার তৈরী। বাবা-মা-বউ-ছেলে-জ্যাঠা-জেঠিমা-অবিবাহিত কাকা নিয়ে একান্নবর্তী পরিবার। জ্যাঠতুতো দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। পাড়ার অনেকে বলে বুল্টার চাকরি নাকি তার বাবার সুপারিশে পাওয়া। বুল্টার বাবা অগেকার লালপার্টির জামানায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। এখন একদমই গুটিয়ে নিয়েছেন। তবে এটাও ঠিক যে বুল্টাও রামমোহনের মতোই গ্র্যাজুয়েট। ভুগোল অনার্স​। প্রাইমারি স্কুলে পড়াতে আর কী বা লাগে! 


গগাই আছে ইউবিআই ব্যাংকে। শ্যামবাজার ব্রাঞ্চে। রোজ সকাল সাড়ে নটা নাগাদ বেরিয়ে যায় আর সাড়ে পাঁচটা-ছটায় পাড়ায় ফেরে। মোড়ের মাথায় বিভুর পান​-বিড়ির দোকানের সামনের বেঞ্চে বসে কিছুক্ষণ গুলতানি করে বাজার​-হাট সেরে সে-ও ফিরে যায় বাড়ি। তারপর বউ-মেয়ে আর কোয়ালিটি টাইম​। গগাইদের বাড়িটা অনেকটা ফ্ল্যাটবাড়ির মতো​। সিঁড়িটা বাইরে কমন প্যাসেজে। একতলায় ওর বাবা-মা-ভাই থাকে আর দোতলাটা গগাই নিজের মতো করে নিয়েছে। গগাই বরাবরই বুদ্ধিমান ও বৈষ​য়িক। কমার্স গ্র্যাজুয়েট​। 


সব্যদা খুবই ব্যস্ত​। পার্ট ওয়ান ড্রপ দিয়ে লেখাপ​ড়া ছেড়েই নেমে পড়েছিল ব্যবসায়​। রুচি কেটারার। টবিন রোডে অফিস। স্কুটারে যাতায়াত করে। সকাল দশটা-সাড়ে দশটা থেকে রাত সাড়ে আটটা-নটা পর্যন্ত রোজ অফিসেই থাকে। আর কোথাও কেটারিং থাকলে তো কথাই নেই! রাতদুপুরে বাড়ি ফেরে। একতলায় দুটো ঘর নিয়ে থাকে সব্যদা​। দোতলায় থাকে তার বাবা-মা আর রাতদিনের কাজের লোক অনিমাদি। রান্নাবান্না ও খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা একতলাতেই। 


সুতরাং রামমোহনের রোজ সন্ধের ঠেক বলতে লেবুদার চায়ের দোকান। সোম থেকে শনি তো বটেই আবার কোনো রবিবার সব্যদার বাড়ি তাসের আসর না বসলে রামমোহন আড্ডা দিতে চলে যায় ওই লেবুদার দোকানেই।  


যাইহোক, আজ দুপুর থেকেই মেঘলা। রামমোহনের শরীরটাও বেশ ম্যাজম্যাজ রছে। সন্ধে নাগাদ দোকান বন্ধ করে ভাবল আজ আর লেবুদার দোকানে যাবে না। বাড়িতে মদ নেই তাই শুধু মদটা তুলে নিয়েই বাড়ি ফিরে আসবে। আলু-বেগুন দিয়ে তেলাপিয়ার ঝোলটা কাল করে রেখেছিল ভাগ্যিস!


ছোট থলিটা নিয়ে রামমোহন বেড়িয়ে পড়ল। মোড়ের দিকে যেতে যেতে দেখল রুনুদের বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই শুনছিল বাড়িটা প্রোমোটিং হবে। রুনুই ছিল এ পাড়ায় তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। দুজনে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়েছে। রুনু-সোনু পিঠোপিঠি দুই ভাই। জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো। রুনুর বাবা-কাকা মিলে মস্ত বিজনেস করতেন​। রামমোহনের মনে আছে প্রত্যেক বিশ্বকর্মা পুজোয় পাড়ার সব বন্ধুরা মিলে রুনুদের মস্ত ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর  ধুম পড়ে যেত। রামমোহন ঘুড়ি ওড়াতে পারে না। সে শুধু লাটাই ধরে থাকত। বন্ধুরা কেউ অন্য কারো ঘুড়ি কেটে দিলে সবার সাথে গলা মিলিয়ে সে-ও বলে উঠত ‘ভোওও কাট্টাআআ।’ রুনুদের বাড়িতে ঘটা করে কালীপুজো হত। পরদিন বন্ধুদের সবার নেমন্তন্ন থাকত। সেই খিচুরি আর নিরামিষ পাঁঠার ঝোল, আঃ! রুনুর বাবা মারা গেলেও সোনুর বাবা বেঁচে আছেন। তবে ব্যবসা লাটে উঠে গেছে। রুনু-সোনু কেউই ব্যবসায় যায়নি। তারা বড় চাকরি করে। রুনু থাকে কানাডায় আর সোনু পুনেতে। পুজো বন্ধ বহু বছর। এবার বাড়িটাও গেল।


তৃণমূলের পার্টি অফিসটা ক্রশ করে মোড়ের দিকে এগনোর সময় রামমোহন দেখল পার্টি অফিসের সামনে চেয়ার পেতে গুড্ডু বসে বসে সিগারেট টানছে। গুড্ডু ষণ্ডামার্কা জোয়ান। বয়সে তার থেকে কিছুটা ছোট। প্রোমোটিং করে। একটা লাল রঙের এনফিল্ড বুলেটে চড়ে কেত মেরে ঘুরে বেড়ায়। সোনার চেন পরে। শুনেছে রুণুদের বাড়ির প্রোমোটিং নাকি সেই করছে।


মোড়ের মাথায় রিক্সাস্ট্যান্ডের পাশে হনুমান মন্দিরের সামনে দেখল ঘটা করে হনুমান জয়ন্তী পালন করা হচ্ছে। লাইট-ফাইট দিয়ে সাজিয়ে ছোট প্যান্ডেল করে কতগুলো ফেট্টি বাঁধা ছেলে বসে গুলতানি করছে। কয়েকটা এপাড়ারই। বাকিগুলো বেপাড়ার। তারস্বরে মাইক বাজছে যার আওয়াজ সেই রুনুদের বাড়ির সামনে থেকে সে পাচ্ছিল।ছেলেগুলোকে দেখে মনে হল হাল্কা চড়িয়ে আছে সবকটা। পাড়ায় বরাবর দুর্গাপুজো-কালীপুজো আর জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। হনুমান জয়ন্তীটা এবারেই প্রায় পুজোর চেহারা নিয়েছে।


মন্দির ক্রশ করে রাস্তা টপকে রামমোহন ওপারে চলে গেল।


মদ কিনে ফেরার সময় দেখল হনুমান মন্দিরের সামনে পার্টি অফিসের ছেলেদের সাথে ওই ফেট্টিবাঁধা ছেলেদের প্রবল বচসা চলছে। মাইক ফাইক সব বন্ধ।  শুনতে পেল​ গুড্ডু একটা ছেলের কলার চেপে ধরে শাসাচ্ছে, ‘গাঁড় মেরে দেব, বোকাচোদা। এটা গুজরাট পাসনি।’


রামমোহন আর দাঁড়াল না। যুযুধান দুপক্ষকে অল্প তফাতে রেখে পাশ কাটিয়ে সে পাড়ায় ঢুকে পড়ল। পাড়ায় ঢুকে একটা বিড়ি ধরিয়ে সোজা হাঁটা দিল বাড়িমুখো।


 আট


বাপের দিকের প্রায় সব আত্মীয়দের সাথে একযোগে রামমোহনের শেষ দেখা তার নীলু জেঠুর মেয়ের বিয়েতে। নীলু জেঠু তার বাবার জ্যাঠতুতো দাদা। প্রতিষ্ঠিত উকিল। পৈতৃক বাড়ি বেলেঘাটায়। তাঁর ছেলে মানে রামমোহনের জ্যাঠতুতো দাদা তদ্দিনে স্পোর্টস কোটায় রেলের পাকা চাকরিতে। নীলু জেঠুর বাবা মানে রামমোহনের ব​ড়দাদু মারা গেলেও ব​ড়ঠাম্মি তখনও বেঁচে। নীলু জেঠুর বোন বুলু পিসির শ্বশুরবাড়ি মোতিঝিলে। পিসেমশাই লেক থানার এস. আই. আর পিসতুতো দাদা তখন পার্ট টু দেবে। তার ছোট্দাদু-ছোট্ঠাম্মিও এসেছিলেন। তাঁরা থাকেন বেলুড়ে​। দুই ছেলে নবকাকু-দিপুকাকু দুজনেই গেছেন বাপের ট্রান্সপোর্টের ব্যবসায়​। নবকাকুর মেয়ে সেবার এইটে উঠেছে আর ছেলে ক্লাশ টুয়ে। দিপুকাকু বিয়ে করেননি। সন্তোষপুর থেকে পিসিঠাম্মা-পিসেদাদু এসেছিলেন বটে তবে তাঁদের মেয়ে মালা পিসি আসেননি। ইঞ্জিনিয়ার পিসেমশাই এর সাথে তিনি বহুদিন সেট্ল সুদূর জার্মানিতে। তাঁদের যমজ দুই মেয়ে সেদেশেই জন্মেছে। পিসতুতো দাদাটা সেবার ইচ্ছে করে তার জামায় আইসক্রিম ফেলে দিয়েছিল​। সেই কবেকার কথা! রামমোহনের তখন ক্লাশ টুয়েল্ভ। 


যাইহোক​,গরমটা অনেকটাই কেটে গেছে। অসহ্য গরম প​ড়েছিল এবার​। বর্ষা আসবে আসবে করছে। রোজকার মতো দোকান বন্ধ করে রামমোহন চলল তার সান্ধ্য ঠেকের দিকে। লেবুদার চায়ের দোকানে।


লেবুদার দোকানে শঙ্খ-বিতানরা প্রবল আলোচনায় মেতেছে। বিষয়টা হল ওরা সব দল বেঁধে বেড়াতে যাবে। তা মন্দারমনি না তাজপুর কোথায় যাওয়া হবে সেই নিয়েই চলছে আলোচনা। ক্রমে আলোচনা ঘুরল। আরো নানান বিষয় গল্প-আড্ডা হল।


বাড়ি ফিরতে ফিরতে রামমোহন ভাবল যে সে অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যায়নি। ছোটবেলায় বাবা-মার সাথে সে দীঘা-পুরী-দার্জিলিং আর সিমলা গেছে। কলেজে পড়ার সময় পাড়ার বন্ধুদের সাথে গেছে ঘাটশিলা আর কলেজের বন্ধুদের সাথে সুন্দরবন। তারপর সেই মা মারা যাওয়ার আগের বছর মাকে নিয়ে গিয়েছিল বেনারস। ওই শেষ। বুল্টার​ বিয়েতে বরযাত্রী গিয়েছিল মালদা। তবে সে তো আর ঠিক বেড়াতে যাওয়া নয়। টুক করে কোথাও ঘুরে এলে কেমন হয়!


ওরা চায়ের দোকানে তাজপুর-মন্দারমনি নিয়ে আলোচনা করছিল বলেই বোধহয় রামমোহনের মাথায় এল শঙ্করপুর। জোরে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। হোটেল বুকিংটাই আসল। এসপ্ল্যানেড থেকে বাস তো আছেই পরপর।


যেমন ভাবা তেমন কাজ। বাড়ি ফিরে রামমোহন নেট ঘেঁটে একটা মোটামুটি সস্তা হোটেল খুঁজে বের করল। হোটেল আশোকা। রিসেপশনের নাম্বারটা ডায়াল করল। পেয়েও গেল। তার মন বলছিল রুম অ্যাভেলেবেল হবেই। উইকডেজ। হলও ঠিক তাই। একটা সিঙ্গল রুম সে দুদিনের জন্য বুক করে নিল।


শিষ দিতে দিতে রামমোহন আলমারি খুলে একটা বহু পুরনো খয়েরী রঙের কিট ব্যাগ বার করল। তারপর তাতে পরপর দুটো বারমুডা, দুটো টি-শার্ট, দুটো জাঙ্গিয়া আর একটা কাচা গামছা ভরে নিল। একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট আর সুপার মার্কেটের ফুট থেকে কেনা লাল-কালো ক্যাপটাও ভরল। ব্যাস গোছগাছ শেষ। 


ফ্রিজে একটু ডাল ছিল। রামমোহন আলু-পটলের তরকারিটা না করে শুধু আলু ভেজে নিল আর রাতের মতো ভাত করে নিল। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে মহানন্দে সোফায় বসে চুকচুক রাম খেতে থাকল। ভাতটা করতে করতেই দুটো মশলা পাঁপড় সেঁকে নিয়েছিল। আহ্! কদ্দিন বাদে সে বেড়াতে যাবে।


পরদিন সকালে ফুল্লরাদি কাজ করতে করতেই রামমোহন চা-ডিম সেদ্ধ​ খেয়ে তৈরী হয়ে নিল। ফুল্লরাদিকে বলে দিল যে আগামী দুদিন আসার দরকার নেই। তারপর ফুল্লরাদি চলে গেলে একটা ফাঁকা বিসলারির বোতলে জল ভরে কিটব্যাগে নিয়ে সে-ও বেরিয়ে পড়ল।


এসপ্ল্যানেডে নেমে রামমোহন একটা রামের পাঁইট, দু’প্যাকেট উইলস ফ্লেক আর এক বান্ডিল বড় বিড়ি কিনল। তারপর গেল বাস ডিপোয়। খানিক খোঁজাখুঁজি করে একটা নন এসি বাসের জানলার ধারের একটা সীটে চড়ে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস ছেড়ে দিল।


চোদ্দমাইলে বাস যখন রামমোহনকে নামিয়ে দিল তখন বিকেল প্রায় পাঁচটা। মাঝখানে হল্টে নেমে মাছভাত খেয়ে সে বেশ একচোট ঘুম দিয়ে নিয়েছে। চোদ্দমাইলের চায়ের দোকান থেকে এক গ্লাস কড়া লিকার চা খেয়ে একটা ফ্লেক ধরাল। তারপর উল্টোফুট থেকে একটা ভ্যানরিকশা ধরল। 


শঙ্করপুরের কাছাকাছি এসে পড়তেই সমুদ্রের লোনা ভারী হাওয়ায় রামমোহনের শরীরটা যেন তরতাজা হয়ে উঠল। হোটেলে ঢুকে চেক ইন করে প্রথমেই ভালো করে স্নান করল। রুম চলনসই। পরিষ্কারও মোটামুটি। স্নান সেরে রামমোহন বিসলারির বোতলটায় হাফ পাঁইট রাম পাইল করে প্লাস্টিকের প্যাকেটটায় ভরে নিল। তারপর চলল সমুদ্রের ধারে। সি বীচ হোটেল থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। তখন সন্ধে নেমে গেছে।


সমুদ্রের ধারে পৌঁছে সে একটা ছোট্ট ভাতের হোটেল দেখতে পেল। বাহ্! ভালোই হল। সে মনে মনে ভাবল। হোটেলে খাওয়ার বন্দোবস্ত থাকলেও সমুদ্রের ধারে বসে ঝুপড়ি হোটেলে খাওয়ার আনন্দই আলাদা। 


দোকানে একটা বুড়ো লোক রান্না চড়িয়েছে আর একটা এই সতেরো-আঠারো বছরের ছেলে সব্জি কাটছে। হোটেলের কাছাকাছি থেকেই বুড়োটা রামমোহনকে দেখে হেসে জিজ্ঞেস করল ‘বাবু, পমফ্রেট ফ্রাই খাবেন নাকি?’ রামমোহনের চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। বেঞ্চে বসতে বসতেই বলে দিল ‘ হ্যাঁ, দাও একটা।’ এখান থেকে সমুদ্রটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সামনে। পূর্নিমার চাঁদ যেন গলে ছড়িয়ে আছে জলে আর চারিদিকে। রামমোহন বোতলটা তুলে হাত আর চোখের ইশারায় বুড়োকে জিজ্ঞেস করল মাল খাওয়া যাবে কিনা।  ‘খান না, একটু ঢেকেঢুকে খান।' বুড়ো হেসে জবাব দিল।


পমফ্রেট ফ্রাই শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। রামও শেষ। সিগারেট ঠোটে রামমোহন তন্ময় হয়ে সমুদ্র দেখছিল। কতক্ষণ কেটে গেছে তার খেয়াল ছিল না। ‘বাবু, এইবার খাওয়া দাওয়া সেরে নিন। দোকান বন্ধ করে দেব।’ বুড়োর কথায় তার চটকা ভাঙল। সাড়ে আটটা বাজে। মোবাইলে রামমোহন দেখল। এখানে এমনিতেই দোকানপাট জলদি বন্ধ হয়ে যায়। তাও আবার উইকডেজ। টুরিস্ট থাকলেও না হয় কথা ছিল। সিগারেট শেষ করে রুটি-তড়কা খেয়ে রাত সোয়া নটা নাগাদ রামমোহন হোটেলে ফিরে গেল।


পরদিন সকালে উঠে রামমোহন হোটেলেই লুচি-আলুর তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়ল। মাথায় ক্যাপটা পরে নিয়েছে আর বিসলারির বোতলে জল ভরে নিয়েছে হোটেল থেকেই। বীচ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে অনেকখানি চলে গেল। একদম ফাঁকা। লোকজন নেই বললেই চলে। রামমোহন দারুণ খুশি আর শরীরটাও যেন চাঙ্গা লাগছিল একদম। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা ডাব খেল। মিষ্টি জল আর তুলতুলে শাঁস। তারপর ফেরার পথ ধরল। রোদ উঠতে শুরু করেছে। অনেক লাল কাঁকড়া দেখল সে। পায়ের শব্দে দুড়দাড় করে গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। একটা মরা স্টার ফিশ দেখল আর দেখল গাছের বড় বড় মরা ডাল এদিক সেদিকে বালির মধ্যে আটকে আছে। শঙ্করপুর ফিরে ওই বুড়োর হোটেলে মুরগির ঝোল-ভাত খেয়ে হোটেলে ফিরে স্নান করে একটা দারুণ ঘুম দিল সে।


সন্ধে নাগাদ যথারীতি আগের দিনের মতোই বুড়োর হোটেলে বেঞ্চে বসে কাটাল। আবারও রাম-সমুদ্র আর চাঁদের আলো। তবে আজ আর পমফ্রেট ফ্রাই ন​য়​ ডিম ভুজিয়া দিয়ে মালটা শেষ করে রুটি-তড়কা খেয়ে হোটেলে ফিরল।


পরদিন সকালে রামমোহনের ফেরার পালা। কিছুক্ষণ সমুদ্রের ধারে ঘোরাঘুরি করে এগারোটা নাগাদ হোটেলে ফিরে স্নান করে ব্যাগ গুছিয়ে চেক আউট করে দিল। বুড়োর হোটেল থেকে পমফ্রেট কারি আর ভাত খেয়ে একটা শেয়ারড ট্রেকারে চলে এল চোদ্দমাইল। মোড়ের চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করতে বলল একটু পরেই কলকাতার বাস আসবে।


অল্প কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই বাস এসে পড়ল। টিকিট কেটে প্রায় ফাঁকা বাসের পেছনের একটা সীটে বসে জানলা দিয়ে আশপাশ দেখতে দেখতে রামমোহন ঘুমিয়ে পড়ল।


 নয়


আজ রামমোহনের জন্মদিন। না, কোনো স্পেশাল প্ল্যান নেই। যথারীতি সকালবেলা দোকান খুলেছে। তার​ মা বেঁচে থাকতে এই দিন তাঁকে দিয়ে একটু খাসির মাংস আনাতেন​। রাতের বেলা গোবিন্দভোগ চালের পোলাও, মাখামাখা তুলতুলে কষা মাংস আর দু-চামচ পায়েস দিয়ে সে ভোজ সারত। এখন আর সেসব পাট নেই। আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতই সে জন্মদিন কাটায়।


দোকানে বসে বসে রামমোহন সাপ্তাহিক বর্তমান পড়ছিল। হঠাৎ ‘কি রে পাগলা, আছিস কেমন?’ শুনে চমকে মুখ তুলে তাকাল। দরাজ হাসি নিয়ে রুনু দাঁড়িয়ে আছে দোকানের বাইরে।


- আরে রুনু, কী আশ্চর্য! আয় আয়, ভেতরে আয়। বলে রামমোহন দোকানের সামনে কাঠের পাল্লাটা তুলে ধরল।


-   তারপর?  বলে রুণু তার কাঁধে একটা আন্তরিক চাপড় মেরে দোকানে ঢুকে পড়ল।


-  ওহ্! কদ্দিন পর দেখা! বলে রামমোহন চেয়ারে এসে বসল।


-    হ্যাঁ, তা চার বছর তো বটেই। রুনু বলল। ততক্ষণে সে গুছিয়ে বসেছে।


-     চা খাবি? রামমোহন জিজ্ঞেস করে।


-   না থাক। এই নে, এটা তোর জন্য। বলে রুনু একটা বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট বার করে রামমোহনের দিকে এগিয়ে ধরল।


-   থ্যাঙ্ক ইউ ভাই। বলে রামমোহন প্যাকেটটা নিয়ে ডেস্কটপের পাশে টেবিলের ওপর রাখল।


-    আবার থ্যাঙ্ক ইউ কিসের? মারব শালা। বলে রুনু হেসে উঠল​।


- হ্যাঁ রে, তোদের বাড়ি তো দেখলাম প্রোমোটিং হচ্ছে। তা তুই উঠেছিস কোথায়? রামমোহন জিজ্ঞেস করল​।


- আরে, ওই ব্যাপারেই তো এসেছি। গত মাসে সোনুও এসেছিল। ও এসে রথতলায় একটা বড় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মা তার কাকু-কাকিমাকে শিফট করাল। আমি ওখানেই উঠেছি। আর এবারে তো একলাই এসেছি। বউ- মেয়ে কানাডাতেই। রুনু থামল​​।


-   ও, তা থাকবি তো কদিন, নাকি? রামমোহন আবার জিজ্ঞেস করল​।


- না রে ভাই। ছুটিছাটা পাইনি তেমন। হপ্তাখানেকের জন্য এসেছি জাস্ট। সামনের শুক্রবারই বেরিয়ে যাচ্ছি। রুনু বলল।


রামমোহনের মনে পড়ে গেল​ ইলেভেন টুয়েলভে পড়ার সময় দু-তিনবার তারা দুজন স্কুল কেটে সিনেমায় গেছে। রুনু ছিল যাকে বলে তার পার্টনার ইন ক্রাইম। প্রথম সিগারেটও তারা দুজন একসাথেই টেনেছে। রুণু ওর কাকার প্যাকেট থেকে ঝেড়ে এনেছিল। ঘ্যাষের​ মাঠে গিয়ে দুজনে কাউন্টারে ফুঁকেছিল সেটা।


উচ্চমাধ্যমিকের পর রুনু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল জলপাইগুড়ি। তারপর চাকরি নিয়ে ব্যাঙ্গালোর আর আজ প্রায় দশ বছর সে তো বিদেশেই আছে। এই ছুটিছাটায় এলে তবেই তাঁদের দেখা হয়। যতবারই রুনু আসে পাড়ায় ততবারই সে দেখা করে রামমোহনের সাথে। যোগাযোগ কমে গেলেও রুনু তার ছেলেবেলার বন্ধুকে ভোলেনি। অবস্থার ফারাক বিস্তর হলেও তাদের বন্ধুত্ব অটুট। রামমোহন একটু আনমনা হয়ে পড়ল।


-  যাক গে বল কি খবর তোর? রুনুর প্রশ্নে রামমোহনের চটকা ভেঙ্গে বলে উঠল- হ্যাঁ ওই একইরকম, তোর? 


-চলছে, আর কি! রুনু হাল্কা হেসে জবাব দিল। 


আস্তে আস্তে দুই বন্ধু ডুবে গেল আড্ডায়। ছেলেবেলার টুকরো টুকরো গল্প আর মজার মজার সব স্মৃতি...


রুনু হাসতে হাসতে বলে- তোর মনে আছে সেই সব্যদা একবার পাড়ার মাঠে খেলতে খেলতে তোর প্যান্ট খুলে দিল। তুই টুক করে প্যান্টটা তুলে পরে নিয়ে রেগে মেগে ছুটলি সব্যদাকে ক্যালাতে। তা ছুটে ধরতে তো পারলি না। তখন কাঁদতে কাঁদতে খেলা ছেড়ে বাড়ি চলে এলি?


রামমোহন মৃদু হেসে মাথা নাড়ে, তারপর বলে- আর সেই একবার গুটখা খেয়ে সোনুর নতুন সাদা টি-শার্টে পিক ফেলে দিল, বল?


রুনু (হো হো করে হেসে উঠে)- ওফ! সে এক কান্ড! সোনু তো প্রথমে কিছু বোঝেনি। বাড়ি ফিরে টি-শার্ট খুলে তারপর দেখতে পেয়েছে। ও তো বুঝেইছে কার কাজ হতে পারে। তারপর ব্যাট নিয়ে বেরচ্ছে অতনুকে ক্যালাবে বলে। বাবা অনেক কষ্টে সেদিন শান্ত করে ওকে। আর একটা টি-শার্ট কিনে দেবে বলে টলে। কিনেও দিয়েছিল পরদিনই। তবে ও ওটা পরে আর কখনও খেলতে আসে নি।


-  আর আসে? বলে রামমোহনও হেসে উঠল জোরে।


ঘন্টাখানেক আড্ডা দিয়ে রুণু উঠে পড়ল। রুনু চলে গেলে রামমোহন হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা নিল। মনে মনে সে বেশ খুশি হয়ে উঠল। অভাবনীয় ভাবে জন্মদিনে কেমন একটা উপহার পেয়ে গেল! প্যাকেটটা খুলতে খুলতে তার মনে প​ড়ল​ যে তার বাবা বেঁচে থাকতে প্রতিবার এইদিনে তাকে বই উপহার দিতেন। তারপর থেকে আর কেউ কোনোদিন তাকে কোনো উপহার দেয়নি।


রামমোহন  দোকানের বাইরে এসে একটা কিং সাইজ সিগারেট ধরাল।


 দশ


দুদিন আগে মহালয়া চলে গেল। রামমোহনের মনটা বেশ খুশি খুশি। পুজো আসছে। সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী-দশমী রামমোহন বিকেলে দোকান খোলে না আর প্রতিদিন এক প্যাকেট করে সিগারেট কেনে। উইলস ফ্লেক। পাড়ার প্যান্ডেলে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় আর আশেপাশের ঠাকুর দেখে। কলকাতার দিকে এখন আর ঠাকুর দেখতে যায় না। ছোটবেলায় বাবা মার সাথে গেছে। কলেজের বন্ধুদের সাথে দুবার হোল নাইটও বেরিয়েছে। আগে বিজয়ার পর পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। পাড়ার ছেলেমেয়েরা নাচ-গান-আবৃত্তি-নাটক-নৃত্যনাট্য করত। সঞ্জয়কাকু নাটকের রিহার্সাল করাত। ছোটবেলায় রামমোহন বেশ কয়েকবার পার্ট করেছে নাটকে। এখন আর ওসব হয় না। পুজোর চারদিনই যা আনন্দ।


দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে রামমোহন ভাবল আজ আর ঘুমোবে না বরং এইবেলা পুজোর শপিংটা সেরে নেবে। একটা বিড়ি ধরিয়ে গুনগুন করতে করতে চলল সুপার মার্কেট।


সুপার মার্কেটে গিয়ে প্রথমেই সে এস. এন. ফুটওয়্যার থেকে একটা কিটো কিনল। সাড়ে তিনশো পড়ল। লাস্ট তিন বছর সে জুতো কেনেনি। তারপর নোভেল্টি গারমেন্টস্ থেকে কিনল বাই ওয়ান গেট ওয়ান অফারে দুটো দুটো চারটে টিশার্ট, সেলের একটা রেগুলার জিন্স আর লোকাল ব্র্যান্ডের টু ইন ওয়ান দু বক্স জাঙ্গিয়া। ফেরার পথে ফুটের একটা দোকান থেকে কিনে নিল লাল​-কালো আর নীল​-সবুজ প্রিন্টের দুটো বারমুডা। ব্যাস হয়ে গেল তার পুজোর শপিং। আসলে আগামী এক বছরের শপিং হয়ে গেল। বছরে এই একবারই জামাকাপড় কেনে সে।


বাড়ি ফিরে প্রথমেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টি-শার্ট জিন্স সব পরে ট্রায়াল দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিল নিজেকে। দিব্যি লাগছে। ফিটও করেছে দারুণ। তারপর চা খেয়ে দোকান খুলল।


ষষ্ঠীর দিন লেবুদার দোকানে যাওয়ার আগে রামমোহন পাড়ার ঠাকুরটা দেখতে গেল। প্যান্ডেলে গিয়ে দেখল সব্যদা আর গগাই বসে আড্ডা মারছে। রামমোহনকে দেখেই সব্যদা বলল, শোন অষ্টমীতে কোনো প্ল্যান রাখিস না। আমরা চারজন শেরাটনে বসব। বুল্টাকেও বলে দিয়েছি। ঠাকুর দেখে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে রামমোহন লেবুদার দোকানে চলে গেল।


সপ্তমীর দিন সন্ধেবেলা নতুন টিশার্ট-জিন্স আর কিটো পরে রামমোহন আশেপাশের ঠাকুর দেখতে বেরল। প্রথমে গেল পেয়ারাবাগান। সেখানে ঠাকুর দেখে পাপড়ি চাট খেল। এরপর গেল দেবগড়। দেবগড়ে প্যাণ্ডেলে ঢোকার মুখে বুল্টার সাথে দেখা হল। সাথে ওর বউ-ছেলেও ছিল। সব শেষে গেল যতীন কলোনী। ওখানে লোকগানের ব্যান্ড এসেছিল। রামমোহন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো প্রোগ্রামটা শুনল। ব্যান্ডের লিড সিঙ্গার মেয়েটির গলা খাসা লাগল তার। তারপর এক প্লেট চিকেন চাউমিন খেয়ে রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরে এল।


অষ্টমীর দিন সব্যদার প্ল্যান মতো তারা সব প্যান্ডেলে মিট করল। কিছুক্ষণ বসে আড্ডা-টাড্ডা দিয়ে রাত আটটা নাগাদ উঠে পড়ল। দুটো অটোয় ভাগাভাগি করে চলে এল শেরাটন বার কাম রেস্তোরাঁয়। একটু অপেক্ষা করেই টেবিল পেয়ে গেল। জমিয়ে বসল চার বন্ধুতে। ফিশ ফিঙ্গার আর বাদাম চাট দিয়ে মদ খেয়ে তন্দুরি রুটি-কিমা মটর-মাটন ভুনা আর গ্রিন স্যালাড দিয়ে ডিনার সেরে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ তারা পাড়ায় ফিরল। সব্যদা-গগাই-বুল্টা প্যান্ডেলে গিয়ে বসল গুলতানি করতে। রামমোহনের ঘুম পাচ্ছিল বলে সে বাড়ি ফিরে গেল।


নবমীর দিন সন্ধেবেলা রামমোহন প্যান্ডেলে গিয়ে দেখল সব্যদা বসে হিটু-বুড়ো-সুধীরের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। সব্যদা বলল যে গগাই-বুল্টা নাকি বউ-বাচ্চা নিয়ে ঠাকুর দেখতে গেছে। রামমোহন ওদের সাথে বসে আড্ডা মারতে থাকল। কিছুক্ষন আড্ডা মেরে হিটু-বুড়ো-সুবীর উঠে পড়ল। ওদের মালের প্রোগ্রাম আছে।


রামমোহন সব্যদাকে নিয়ে গেল সুপার মার্কেটের ঠাকুরটা দেখতে। ঠাকুর দেখে পাড়ায় ফিরে মোড়ের মাথায় ভুজিয়াওলার থেকে ছোলা-বাদাম মাখা আর রাজার হোটেল থেকে রুমালি রুটি-চিলি চিকেন তুলে রামমোহন সব্যদাকে নিয়ে বাড়ি এল। কিছুটা রাম আছে। হয়ে যাবে দুজনের। দুজন বসে জমাটি খানাপিনা করতে করতে মেতে উঠল ছেলেবেলার পুজোর সব মজার মজার গল্পে। অনেক রাতে সব্যদা বাড়ি ফিরে গেল। রামমোহন গিয়ে সটান বিছানায় শুয়ে পড়ল। বেশ নেশা হয়েছিল তার।


দশমীর দিন সন্ধেবেলা প্যান্ডেলের দিকে যেতে যেতে রামমোহন শুনতে পেল ঢাক-কাঁসর-চটপটির সাথে ব্যান্ডের বাজনা। মনটা তার খুশিতে চনমন করে উঠল। একটা সিগারেট ধরিয়ে জোরে হাঁটা দিল। অদ্যই শেষ রজনী। বাড়ি থেকে সে দু’পেগ চড়িয়েই বেড়িয়েছে।


প্যান্ডেলে পৌঁছে দেখল পাড়ার ছেলে-বুড়ো সব জড়ো হয়ে গেছে। লরিতে ঠাকুরও উঠে গেছে। দেবীবরণ-সিঁদুরখেলা সব শেষ। সব্যদাকে দেখতে পেল। ঢাকি আর ব্যান্ডের বাজনাদারদের সামনে দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করে তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। মাঝে মাঝে কোমরে হাত দিয়ে নেচে নেচে উঠছে। ভিড়ের মধ্যে চোখে পড়ল পারুলকে। পাড়ার অন্য​ মহিলাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করছে। কপালে-গালে-গলায় লেপা সিঁদুর।


হঠাৎ ‘এই রাম্মোন, এদিকে আয়’ ডাক শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখল প্যান্ডেলের পেছন থেকে বুল্টা ডাকছে। গগাইটাও অছে সাথে। রামমোহন চট করে চলে গেল প্যান্ডেলের পেছনে।​ ‘এই নে, মেরে দে’ বলে প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়া একটা জলের বোতল তার দিকে এগিয়ে দিল। বোতলটা হাতে নিতে নিতে রামমোহন জিজ্ঞেস করল ‘রাম তো?’ ‘হ্যাঁ রে বাবা, খা।‘ গগাই খেঁকিয়ে উঠল। দু’ঢোক মেরে বোতলটা গগাইয়ের হাতে চালান দিয়ে রামমোহন জিজ্ঞেস করল ‘সব্যদাকে ডাকলি না?’ বুল্টা চোখ টিপে হেসে বলল ‘সব্যদা অলরেডি চড়িয়ে আছে।’ তিন বন্ধুতে বোতল থেকে পাইল করা রাম মারতে থাকল।


লরি স্টার্ট দিল। ঢাক কাঁসরের বাজনা দ্বিগুন হয়ে উঠল। পুজোর সেক্রেটারি পরিমলদা চিৎকার করে উঠল ‘বলো দুগ্গা মাই কি’। সমস্বরে সমবেত জনতা বলে উঠল ‘জয়’ পরিমলদা আবার চিৎকার করে উঠল ‘আসছে বছর’, আবারও সমস্বর উঠল ‘আবার হবে’ ওরা তিনজন ঝটপট বোতল শেষ করে প্যান্ডেলের সামনে চলে এল।


বোম পটকা ফাটিয়ে শুরু হল ভাসান যাত্রা। ব্যান্ড পার্টি ট্র্যাক ধরল ‘মুন্নি বদনাম হুয়ি ডার্লিং তেরে লিয়ে’। ওহ্! রামমোহনের শরীরটা যেন আপনা থেকেই দুলে উঠল। পাশ থেকে গগাই-বুল্টা নাচতে শুরু করে দিয়েছে। তাকেও মারছে কনুইয়ের ঠেলা। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে সব্যদা নাচতে নাচতে তাদের দিকে এগিয়ে এল। আশপাশে হিটু-বুড়ো-সুবীর-পরিমলদা-সনাতনদা-ভোলা-কার্তিক-শুভ্র-প্রদীপ-গুরমীত-বিতান পাড়ার ছোট বড় সবাই নাচছে। রামমোহন আর স্থির থাকতে পারল না। ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে দুহাত মাথার ওপরে তুলে সে নাচতে শুরু করল। ভিড়ের মধ্যে আবার দেখতে পেল পারুলকে। চোখাচুখি হতে পারুল মিষ্টি করে হাসল। রামমোহনও ছুঁড়ে দিল আলগা হাসি। তার সব দুঃখ-রাগ-একাকিত্ব-না পাওয়া ভুলে রামমোহন নাচতে থাকল।


নাচতে নাচতে সে বুঝতে পারল যে পাশ থেকে ধুর্জটি জেঠু-নগেন কাকা এরা সব আড়চোখে তাকে দেখছে। দেখুক, কুছ পরোয়া নেহি। বছরে এই কটা দিনই সে দিল খুলে বাঁচে। আশপাশ থেকে ‘জিও রাম্মোন, জিও’, ‘পাগলা, পাগলা’ এইসব উৎসাহ ধ্বনি ভেসে আসতে থাকল আর মুঙ্গরা, দো ঘুট মুঝে ভি পিলা দে, বিড়ি জ্বালাইলে এইসব চটুল গানের ট্র্যাকের তালে তালে রামমোহন নাচতে নাচতে চলল।


মাঝে মাঝে নাচ থামায়। দম নেয়। সব্যদা কি গগাই-বুল্টার কাঁধে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে চলে। সিগারেট ধরায়। আবার নাচতে শুরু করে।


বেশ অনেকক্ষণ পর রামমোহন সম্বিৎ ফিরে পেল। অনেকটা দূর চলে এসেছে সে। নেচে-হেঁটে বেদম ক্লান্ত। নেশাও জমেছে ভালোই। সে ঘাট অব্দি যাবে না। এবার ফিরে যাওয়াই ভালো। এদিক ওদিক তাকিয়ে গগাইকে দেখতে পেল। সব্যদা আর বুল্টাকে দেখতে পেল না। হয় এগিয়ে গেছে নয় পিছিয়ে পড়েছে। সে গগাইকে বলল ‘আমি বাড়ি চললাম, সব্যদাদের বলে দিস।’ বলেই সে রাস্তা ক্রশ করে উল্টোফুটে চলে এল। গলাটা শুকিয়ে কাঠ। একটা পান-বিড়ির দোকান থেকে ছোট একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল কিনে ঢকঢক করে পুরোটা শেষ করে দিল। তারপর একটা অটো থামিয়ে উঠে পড়ল সামনের সীটে।


মোড়ের মাথায় নেমে সোজা ঢুকে গেল রাজার হোটেলে। খিদে পেয়েছিল বেশ​। এক প্লেট মাটন বিরিয়ানি অর্ডার করল। চেটেপুটে খেয়ে পনেরো টাকা টিপস দিয়ে মৌরি চিবোতে চিবোতে রামমোহন রেলাসে বেরিয়ে এল হোটেল থেকে।


পাড়ায় ঢুকে প্যাকেটের লাস্ট সিগারেটটা ধরিয়ে হাঁটতে থাকল বাড়ির দিকে।


 এগারো


পুজোর পর থেকে বৃষ্টি-বাদলা লেগেই আছে। দোকান বন্ধ করতে করতেই রামমোহন বুঝল ঝেঁপে বৃষ্টি আসছে। মেঘ গুড়গুড় করছে। জলদি জলদি বেরিয়ে কাউন্টার আর ভোলার দোকান ঘুরে যখন বাড়ি ফিরছে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আজ আর লেবুদার দোকানে যায়নি।


চারাপোনার ঝোলটা নামাতে নামাতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টি রামমোহনের খুব ভালো লাগে। বাইরে প্রবল বৃষ্টিতে ঘরে বসে গান শুনতে শুনতে রাম খাওয়ার আনন্দই আলাদা। রামমোহন যথেষ্ট আনন্দিত চিত্তেই রাম খাচ্ছিল। এমন সময় দরজার কাছ থেকে শুনতে পেল কুকুরছানার কুঁই-কুঁই। রামমোহন উঠে দরজার বাইরের আলোটা জ্বেলে দরজা খুলে দেখে একটা কুকুরছানা। একদম ভিজে গেছে। কুঁই-কুঁই করতে করতে সে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। সিঁড়ির পাশে ছানাটা গুটিসুটি মেরে বসে গেল। কোথা থেকে এল কে জানে। হয়তো পথ হারিয়ে ফেলেছে। মাকে খুঁজে পাচ্ছে না। রামমোহনের খুব মায়া হল। সে ঝুঁকে পড়ে বাচ্চাটার কপালে গলায় একটু হাত বুলিয়ে দিল। বাচ্চাটাও লেজ নেড়ে, জিভ দিয়ে তার হাত চেটে কৃতজ্ঞতা জানাল।


হাত দিয়ে রামমোহন বুঝল ভিজে গিয়ে কাঁপছে ছানাটা। সে ঘরে ঢুকে একটা পুরনো গামছা নিয়ে এসে ভালো করে ছানাটার গা মুছিয়ে দিল। ছানাটা যে বেশ আরাম পেল সেটা তার মুখ দেখে রামমোহন বুঝতে পারল। ওকে কোলে তুলে নিয়ে হলে চলে এল। সোফার পাশটায় বসিয়ে দিল। তার পর বেডরুমে গিয়ে আলমারি খুলে তার পুরনো ছেলেবেলার কাঁথাটা বার করে আনল। একে ভিজে গেছে তায় বাচ্চা যদি ঠান্ডা লেগে যায় এই ভেবে সে কাঁথাটাকে ফোল্ড করে সোফার পাশে মেঝেতে পেতে দিল। ছানাটা গুটিগুটি পায়ে সেখানে গিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ল। আরামে চোখ বুজে ফেলল। রামমোহন শিস দিতেই পিটপিট করে তাকিয়ে লেজ নাড়তে থাকল। রামমোহন আবার রামে চুমুক দিল।


রাম খেতে খেতে হঠাৎ রামমোহনের খেয়াল হল ছানাটার নিশ্চয়ই খিদে পাচ্ছে। তার নিজের জন্য মাছের ঝোল-ভাত​ আছে কিন্তু তা তো একে ঠিক দেওয়া যাব না।। বিস্কুট সে খায় না। তবে? সে বসে বসে একটু ভাবল। মনে পড়ল অনেকদিন আগে একবার গগাই বলেছিল কুকুর নুন খায় না। গগাইদের একটা অ্যালসেশিয়ান আছে। রামমোহন উঠে রান্না ঘরে গেল। ছানাটা শুয়ে শুয়ে জুলজুল চোখে তাকে দেখতে লাগল​।


রামমোহন গ্যাস জ্বেলে কুকারে একটু চাল-ডাল-আলু সামান্য হলুদ দিয়ে বসিয়ে দিল। তারপর আবার এসে সোফায় বসে ছানাটাকে কোলে নিয়ে আদর করতে থাকল। গোটা চারেক সিটি পড়ার পর রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিল।


নিজে খাওয়ার আগেই রামমোহন ওই চালে-ডালে বানানো খাবার একটু চটকে মেখে একটা মাঝারি বাটিতে করে ছানাটার সামনে এনে রাখল। গপগপ করে সবটা খেয়ে নিল। আহা রে! খুব খিদে পেয়েছিল। রামমোহনের মায়া বেড়ে গেল।​ খাওয়া দাওয়া সেরে রামমোহন শুয়ে পড়ল। 


ঘুম থেকে উঠে দেখল​ ছানাটা আগেই উঠে হলে ঘোরাঘুরি করছে। তাকে দেখে লেজ নেড়ে দৌড়ে এল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রামমোহন বাথরুমে চলে গেল। দাঁত মাজতে মাজতে যে ঠিক করল এই ছানাটাকে সে নিজের কাছে রাখবে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে চা-ডিম সেদ্ধ​ খেয়েই রামমোহন সোজা গেল ভোলার দোকান। গোটা দশেক পার্লে জি বিস্কুটের প্যাকেট আর সস্তা চাল কিনল এক কেজি। এই একই চালের ভাত সেও খায়​। কিনে ফিরে এল বাড়ি। ছানাটা লেজ নেড়ে ওয়েলকাম করল। রামমোহন খুব খুশি হল। ওকে সোফায় তুলে একটা একটা করে বিস্কুট খাওয়াতে থাকল।


ফুল্লরাদি এসে ছানাটাকে দেখে বলল, ‘একে আবার কোত্থেকে জোগাড় করলে?’ রামমোহন বলল​ ‘জোগাড় করিনি, নিজেই এসেছে।’ ফুল্লরাদি ছানাটার মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বলল​ ‘যাক, অ্যাদ্দিনে তোমার একটা সঙ্গী হল।’


রামমোহন কিছু না বলে অল্প হাসল​।


ফুল্লরাদিকে বাড়িতে থাকতে থাকতেই সে গেল মন্টুর চিকেন শপে। গিলে-মেটে কিনে বাড়ি ফিরল। আজ দোকান খুলতে তার খানিক দেরি হবে সে আগেভাগেই বুঝেছিল। ফুল্লরাদি কুকারটা মেজে দিয়ে গেছে। সে গিলে-মেটে ভালো করে ধুয়ে একটা বড় পাত্রে রেখে ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিল। শুধু ক​য়েক​ পিস বাইরে রাখল। তারপর চাল আর গিলে-মেটে অল্প হলুদ দিয়ে কুকারে বসিয়ে দিল। চারটে সিটির পর গ্যাস বন্ধ করে দোকান খুলল। সাড়ে নটা বেজে গেছে। তা যাক। ছানাটার দু-বেলার খাবার তো তৈরী।


গতকাল ছিল কালীপুজো। বাজির আওয়াজে বড্ড ভ​য় পেয়েছে ছানাটা। কী আর করা যাবে! 


ছানাটার নাম রেখেছে মাটু।


এরমধ্যে রামমোহন বেশ ক​য়েকটা বড় কাজ করেছে। গোপালকে ডেকে বাড়ির সদর গেটের নিচের দিকে অ্যালুমিনিয়ামের পাত লাগিয়েছে। এখন মাটু চাতালে খেলা করতে পারবে কিন্তু বাইরে যেতে পারবে না। বাইরে গাড়ি-টাড়ি যায়। রামমোহন ভয় পায়। ভেট ডেকে মাটুর চেক আপ করিয়েছে আর ওদিকে রথ​তলায় গিয়ে একটা পেট শপ থেকে ডগ শ্যাম্পু আর বকলস্ কিনে এনেছে। দোকানের লোকটা বলেছে দু’হপ্তায় একবার স্নান করালেই হবে। পেট শপের ঠিকানা আর ভেটের নাম্বার দিয়েছিল গগাই। 


রামমোহন নিয়ম করে দিয়েছে ঠিক সকাল আটটায় বিস্কুট, বারোটায় লাঞ্চ, চারটেয় আবার বিস্কুট আর সাড়ে আটটায় ডিনার। দুপুরে মুরগি-ভাত আর রাতে দুধ​-ভাত। সন্ধেবেলা লেবুদার চায়ের ঠেকে যাওয়ার আগে এখন রোজই মাটুকে নিয়ে পাড়ায় খানিক চক্কর মারে সে।


এতক্ষণ মাটু হলে ঘুরছিল। রামমোহন বেডরুমে বসে চা খাছিল​। এবার লেজ নাড়তে নাড়তে চলে এল বেডরুমে। রামমোহন টুক করে ওকে বিছানায় তুলে নিল। 


ডগ শ্যাম্পুর গন্ধটা কিন্তু বেশ! রামমোহনের মুখ হাসিতে ভরে উঠল। 


 বারো


শীত প​ড়ে গেছে​। রামমোহন পুরনো কম্বলটা আলমারি থেকে বার করে ছাদে দিয়ে এল​। রোদ খাক খানিক যদিও ন্যাপথলিন দেওয়াই​ ছিল​। 


দুপুরে রান্নাবান্না সেরে ভাবল বুকর‍্যাকটা একটু ঝাড়পোঁছ করবে। খুব ধুলো পড়েছে। আজ রবিবার। তার ছুটির দিন​।


র‍্যাক থেকে বইগুলো নামাতে নামাতে হঠাৎ সে খুঁজে পেল​ একটা পুরনো পত্রিকার তিনটে সংখ্যা। পেয়েই বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল​। 


এই পত্রিকা সে আর তার কলেজের বন্ধুরা মিলে করেছিল। সেই কবেকার কথা। সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। এক লহমায় সুতীর্থ-অম্লান-প্রণব-বোধিদের মুখগুলো ভেসে উঠল​ তার চোখের সামনে। তারা সবাই ছিল ব্যাচমেট, বাংলা ডিপার্টমেন্ট। এই তিনটে সংখ্যাই হয়েছিল। ফার্স্ট, সেকেন্ড আর থার্ড ইয়ার মিলিয়ে। ওহ্! সাহিত্য নিয়ে তাঁদের সেই আড্ডা-তর্ক-লেখা বাছাই-প্রেসে যাওয়া-প্রুফ দেখা সে এক আলাদা উন্মাদনা ছিল বটে!


ঝাড়পোঁছ তার মাথায় উঠল। হাত দিয়ে চাপড় মেরে ধুলো ঝেড়ে সংখ্যা তিনটে নিয়ে চলে এল হলে। সোফার ওপর বসে পত্রিকার একটা সংখ্যা তুলে নিল​। পত্রিকার নাম ‘কুটিঘাট’। নামটা তারই সাজেস্ট করা। তার মনে পড়ল সেই সময় গঙ্গার ধারে কুটিঘাটই ছিল তাঁদের প্রিয় হ্যাং-আউট। কলেজের পর তারা পাঁচ বন্ধুতে চলে যেত কুটিঘাট। তারপর সেখানে বসে মুখোরুচি থেকে কেনা চপ-মুড়ি দিয়ে চলত তাদের আড্ডা-তর্ক। সেই থেকেই নামটা তার মাথায় আসে।


পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা সম্পাদকমণ্ডলী। তার মধ্যে বন্ধুদের সাথে জ্বলজ্বল করছে তার-ও ভালো নাম: অগ্নিভ সরকার। ওহ্! কতকাল যে কেউ তাকে তার ভালো নামে ডাকেনি।


তিনটে সংখ্যায় তিনটে গল্প লিখেছিল রামমোহন। সে গল্পগুলো পরপর পড়তে থাকল… 


এতদিন পর গল্পগুলো পড়ে তার একটু কাঁচাই লাগল। তবে সে যে কখনও মৌলিক কিছু লিখেছে বা লেখার চেষ্টা করেছে এটা ভেবে বেশ খুশি হয়ে উঠল। অনেকদিন আগে হারিয়ে যাওয়া সেই অগ্নিভ সরকারকে যেন খুঁজে পেল আবার!


তারপর মনে মনে ভাবল: সে তো আবার কিছু লিখতে পারে। না, কোথাও ছাপানোর জন্য বা কাউকে প​ড়ানোর​ জন্য নয়। শুধুমাত্র নিজের জন্যই। লেখার মধ্যে যে এক অদ্ভুত আনন্দ আছে তা সে আগেই টের পেয়েছে।


রামমোহন উঠে পড়ল। স্নান করতে গেল। মাথায় জল ঢালতে ঢালতে ঠিক করল যে ছেলেবেলার মত বানিয়ে বানিয়ে গল্প সে আর লিখবে না বরং এবার সে তার নিজের কথা লিখবে। মাটুর কথা লিখবে। তার বন্ধুদের কথা লিখবে। এই পাড়া-প্রতিবেশীর কথা লিখবে। ক্রমাগত বদলে বদলে যাওয়া চারপাশের কথা লিখবে।


ছাদ থেকে কম্বলটা নামিয়ে এনে রামমোহন মাটুকে খাবার দিল। মাটুর খাওয়া হলে নিজেও মুরগি-ভাত মেরে আধশোয়া হ​য়ে শুয়ে প​ড়ল বিছানায়​। আয়েশ করে কম্বলটা টেনে নিল গায়ে। লেখার আইডিয়াটা মাথায় অসার পর থেকেই মনটা বেশ চনমন হ​য়ে আছে তার। বিড়ি ধরিয়ে লম্বা টান দিল​ একটা। ভাবতে হবে একটু বিষ​য়টা নিয়ে। 


বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে লেখাটা কীভাবে শুরু করবে তা মনে মনে সাজাতে থাকল। ঝিলের ধারে কিছুক্ষণ পায়চারী করে পাড়ায় ফিরে এল। আজ আর সে তাসের আড্ডায় যাবে না। মহামায়া মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে একটা সিঙারা আর​ একটা নিমকি খেয়ে বাড়ির পথ ধরল​। 


লেখার প্রথমটুকু মোটামুটি সাজিয়েই এনেছে সে। বাড়ি ঢোকার আগে দোকান খুলে একটা নতুন খাতা আর পেন নিল​। বাড়ি ঢুকে মাটুর গায়ে-মাথায় একটু হাত বুলিয়ে হাত​-মুখ ধুয়ে এককাপ লিকার চা নিয়ে সোজা চলে গেল বেডরুমে। 


খাটের ওপর গুছিয়ে বসে চায়ে একটা লম্বা চুমুক​ মেরে খাতার প্রথম পাতায়​ রামমোহন গোটা গোটা হরফে লিখল: অগ্নিভ আজকাল। 


তারপর পাতা উল্টে রামমোহন থুড়ি অগ্নিভ লিখতে শুরু করল…


No comments:

Post a Comment