অলকবাবুর অসুখ # ২০২২


জেলার ভিত্তিতে দেখলে উত্তর চব্বিশ পরগনা। তবে কলকাতার একদম গা ঘেঁষা। পিনকোডে কলকাতাই লেখা হয়। এরকমই এক অঞ্চলে রাজ্য পুলিশের থানা। বড় রাস্তার ওপরেই

অলকবাবু মাস তিনেক হল বদলি হয়ে এসেছেন। হেড কনস্টেবল। আলাপি মানুষ। একলাই এসেছেন। পরিবার রেখে এসেছেন আগের পোস্টিং রানাঘাটে। সামনের বছর মেয়েটার মাধ্যমিক। তারপর মেয়ে-বউকে এখানে নিয়ে আসবেন। 

থানার পাশে একটু এগিয়েই গোপালের চায়ের দোকান। ছোট্ট চায়ের দোকান যেমন হয় আর কি। ওই চা-বিস্কুট-টোস্ট-অমলেট। সামনে কাউন্টার টেবিল আর পেছনে মুখোমুখি দুটো বেঞ্চ। গোপালের মাঝেসাঝে বসার জন্য একটা প্লাস্টিকের টুল। স্টোভে রান্না হয়।


গোপাল থানার পিছনের পাড়ারই ছেলে। পড়শুনা বিশেষ করেনি। একটু সহজ সরল। মুখচোরা আর ভীতু। পাড়ার একদম শেষে একটা আধপাকা একতলা বাড়িতে থাকে। টেনেটুনে সংসার চালিয়ে ছেলেটাকে পড়াচ্ছে। এবার এইটে উঠল। মাস্টারমশাইরা বলে লেখাপড়ায় নাকি তার ছেলে বেশ ভালই। এইটাই যা গোপালের ভরসা। ছেলেটা বড় কিছু করবে। 


অলকবাবু রোজ সকাল-সন্ধে গোপালের দোকানে আসেন। সকালে চিনি ছাড়া লিকার আর নুন-মরিচ দিয়ে বাটার টোস্ট। সন্ধেবেলা ওই চিনি ছাড়া লিকার আর অমলেট। পুলিশের কাছে প্রায় কোনো দোকানিই পয়সা চায় না। গোপালও তার ব্যতিক্রম নয়। আবার বেশির ভাগ পুলিশই এটাই দস্তুর মনে করেন। অলকবাবুও তার ব্যতিক্রম নন।


গোপালের দোকানে নিয়মিত বলতে শুভ, রানা আর সুমন। এরাও পাড়ারই ছেলে। বয়স তেইশ-চব্বিশ। গোপালকে ‘গোপালদা' বলে ডাকেl। শুভ-রানা ব্যাঙ্ক আর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুমন এম.এ. পড়ে। শুভ-রানা সকালেও আসে। ঘন্টখানেক আড্ডা মেরে চলে যায়। সুমন আসে সন্ধের আড্ডায়। সন্ধে ছটা সাড়ে ছটা থেকে আটট পর্যন্ত আড্ডা চলে। চা তো চলেই সাথে অমলেট-টোস্ট। আর আসেন পাড়ার মাস্টার আনন্দবাবু। বাংলা-ইংলিশ টিউশন পড়ান। আনন্দবাবু অবশ্য একদিন দুদিন ছাড়া ছাড়া আসেন। গোপালের ছেলেটা তো ওনার কাছে পড়েই, শুভ-রানা-সুমনও ওনার প্রাক্তন ছাত্র।


আজ অলকবাবু বেঞ্চে বসে আয়েশ করে অমলেটের টুকরোটা সবে মুখে পুরতে যাচ্ছেন এমন সময় শুভ বললঃ তোমার মুখ-চোখটা কিন্তু ভাল লাগছে না, অলককাকু। অসুখ-বিসুখ কিছু হয়নি তো?

এই নিয়ে পরপর তিনদিন হল এই কথাটা তাঁকে শুনতে হচ্ছে। কখনো সুমন কখলো শুভ কখনো গোপাল কখনো রানা তাকে সকাল কিংবা সন্ধে যখনই চায়ের দোকানে দেখা হছে এটাই বলছে। এই তো গতকাল আনন্দবাবু এসেছিলেন, উনিও বললেন। অথচ একটু চোঁয়া ঢেকুর ছাড়া অলকবাবু আর কোনো অস্বস্তি বোধ করছেন না। আজ তিনি একটু রেগেই গেলেন। অমলেটের টুকরোটা নামিয়ে রেখে বললেনঃ ভাল লাগছে না তো? লাগতেও হবে না, ভাই। আমার শরীর আমি বুঝে নেব।

সুমন বললঃ আহা! চটে যাচ্ছ কেন? ও তো ভাল ভেবেই বলছে। তোমাকে তো এতদিন দেখছি। সত্যি ইদানীং কিন্তু একটু সিক লাগছে তোমায়। 

রানা বললঃ দেখ ফেলে রেখ না, এই তো আমার বড় পিশেমশাই, ‘কিচ্ছু হয়নি-কিচ্ছু হয়নি’ করে পাত্তা দিল না আর তারপর যখন ধরা পড়ল তখন লাস্ট স্টেজ। তিনমাসে মারা গেল।

অলকবাবু আর কিছুই বললেন না। অমলেটটা গোগ্রাসে খেয়ে উঠে পড়লেন। 


থানায় ফিরতে ফিরতে এবং ফিরেও ভাবতে থাকলেন। ওরা সবাই যখন বলছে হয়ত সত্যি সত্যিই কিছু একটা সমস্যা তার হচ্ছে। বাড়িতে কিছু জানানো যাবে না। চিন্তা করবে। চোঁয়া ঢেকুরটা আজকাল একটু বেশিই উঠছে। বাড়ির খাবার পাচ্ছেন না। হাবিজাবি খাচ্ছেন। গত দুরাত ঘুমটাও হয়নি ঠিকমত। তার আগে নাইট ডিউটি। না, কাল ভাবছেন একবার স্থানীয় ডাক্তার, ডাঃ করের কাছে ঘুরেই আসবেন।


রাতে ছাড়া ছাড়া ঘুম হল। সাথে মদটাও একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিলেন। প্রচন্ড অ্যসিড হয়ে ভোর পাঁচটা নাগাদ বমি করলেন অলকবাবু।


ডাঃ কর সব শুনে আর ভাল করে চেক আপ করে জানালেন অলকবাবুর তেমন কিছুই হয়নি। কাজের চাপ, উল্টোপাল্টা খাওয়া, ঘুম না হওয়া এসব কারণে একটু গ্যাস হতে পারে। ওষুধ লিখে দিলেন একটা। আর বললেন তিন দিন পর আবার একবার চেক-আপ করবেন। অলকবাবু ফিজ গুনে দিয়ে বেশ নিশ্চিন্ত মনে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন।


সেদিন সন্ধেবেলা বেশ কনফিডেন্স নিয়ে তিনি গোপালের দোকানে গেলেন। গিয়ে ওদের সবাইকে দেখে ঘোষণা করার মত করে বললেনঃ ভাই, আর চিন্তা নেই, ডাঃ করকে আজ দেখিয়ে এলাম। কোনো পব্লেম নেই, একটু গ্যাস হয়েছিল আর কি। ওষুধ দিয়েছে।

কথাটা বলেই হাসি হাসি মুখে উনি অমলেটের একটা টুকরো মুখে পুরে চিবোতে লাগলেন।

সুমন বললঃ তুমি করকে দেখিয়ে এলে শেষ পর্যন্ত? অবশ্য তুমি তো নতুন, জানবে কেমন করে? বলে রানা-শুভ-গোপালের দিকে তাকিয়ে বললঃ আমাদের বলাইবাবুর কেসটা বল। বলে অলক বাবুর মুখের দিকে সোজা তাকিয়ে বললঃ ওই করেরর হাতেই ছিল, এটা সেটা করেই যাচ্ছিল মানুষটাকে নিয়ে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না, তারপর শেষমেষ বাড়ির লোক যখন কলকাতার বড় ডাক্তারের কাছে বলাইবাবুকে নিয়ে গেল, উনি দেখে বলেছিলেন এ তো শেষ করে এনেছেন, এখন আর কি করব? এই হল কর ডাক্তার, বুঝলে।

অলকবাবু আধখানা অমলেট না খেয়েই উঠে পড়লেন। 


থানায় ঢুকে বড়বাবুর মুখোমুখি পড়তেই তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কি ব্যাপার, অলক, তোমার চোখমুখটা এমন শুকনো লাগছে কেন? শরীর ঠিক আছে তো?

-হ্যাঁ, সার, সব ঠিক। অলকবাবু খুব স্বাভাবিক ভাবে বলার চেষ্টা করলেন কিন্তু ঠিক পেরে উঠলেন না।


কাজের ফাঁকে সারাক্ষণ ধরে অলকবাবু ভাবতে লাগলেনঃ তবে কি সত্যিই কোনো কঠিন অসুখ করেছে তার? ধরতে পারছেন না? সত্যি তো, রানাঘাটের সুশীলটাও তো এভাবেই মারা গেল। অলকবাবু খুব ভয় পেয়ে গেলেন। তার যদি কিছু একটা হয়ে যায় তবে মেয়ে-বউ ওদের কি হবে? প্রচন্ড একটা অস্বস্তি নিয়ে কোনোভাবে ডিউটি শেষ করে কোয়ার্টারে ফিরে গেলেন। মনে মনে ঠিক করলেন কলকাতার কোনো ভাল ডাক্তারের সাথে অ্যপয়েন্টমেন্ট করতে হবে। যত জলদি সম্ভব। আর এটাও ঠিক করলেন যে গোপালের দোকানে উনি আর যাবেন না। কাঁহাতক আর নিজের সম্পর্কে 'তোমার চোখ-মুখ কিন্তু ভাল লাগছে না, তোমার শরীর-টরীর খারাপ হয়নি তো, তোমায় একটু যেন সিক লাগছে, ইগনোর করো না কিন্তু' শুনতে ভাল লাগে!


এরপর দিন থেকে শুভ-রানা-সুমন-গোপাল-আনন্দবাবু দেখতে থাকলেন উল্টোফুটের তারকের দোকানে চা খাওয়া শুরু করেছেন অলকবাবু।


দিনকয়েক এরকম চলার পর একদিন সন্ধেবেলার আড্ডা। সেদিন আনন্দবাবুও ছিলেন। ওরা গোপালের দোকান থেকেই দেখতে পেল অলকবাবু বড় রাস্তা ক্রশ করে তারকের দোকানে যাচ্ছেন।


সুমন হাসতে হাসতে বলে উঠলঃ সত্যিই, আনন্দদা, তোমার জবাব নেই! কি একখানা ফন্দি আঁটলে, হ্যাঁ!

আনন্দবাবু কিছু বললেন না মিটিমিটি হাসি নিয়ে চায়ে চুমুক দিলেন। 

তারপর সুমন গোপালের দিকে তাকিয়ে বললঃ যাক, গোপালদা, আর তোমায় ওই সকাল-সন্ধে ফাউ খাওয়াতে হবে না।

গোপালদা ‘তা যা বলেছ’ বলে হাসিমুখে ওদের জন্য অমলেট ভাজতে শুরু করল। 

রানা হাসতে হাসতে বলল: তুইও কম যাস না কিছু! কোথাকার কোন বলাইবাবুকে নিয়ে যা গল্পটা ফাঁদলি!

শুভ হেসে বলল: মাঝখান থেকে খামোকা ডাক্তার করের ঘাড়ে একটা ফলস্ কেস চাপালি!

এবার আনন্দবাবু মৃদু হেসে বলে উঠলেন: কি আর করা যাবে? কোল্যাটারাল  ড্যামেজ।

ওরা সবাই হেসে উঠল।


আসলে গোপালের থেকে অলকবাবুর এই নিত্যদিনের ফ্রীতে খেয়ে যাওয়াটা ওরা কেউই মেনে নিতে পারেনি। গোপাল যে কিছুই বলতে পারবে না তা জানাই ছিল। তাই ওঁকে তাড়ানোর জন্যই এই অসুখের ফন্দিটা আঁটা। মূল চক্রী আনন্দবাবু আর বাকিরা যোগ্য সঙ্গত করেছে।


প্রকাশিত: অদ্বিতীয়া


No comments:

Post a Comment