কালীর বাড়ি # ২০২২


অতনু আজ প্রায় বিশ বছর পরও সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার কথা ভুলতে পারে না। আলাদা করে আনন্দ-বিস্ময়-উত্তেজনা নয় বরং সেসব মিলেমিশে সেদিন আলাদা একটা অনুভুতি তৈরী হয়েছিল তার মনে। তবে তা যে ঠিক কেমন তা আজও ধরতে পারেনা। তখন সে কুড়ি-একুশের যুবক।

এখনও মনে হয় যেন এক অলীক সন্ধ্যায় কাল্পনিক সব চরিত্র ঘিরে বসে ছিল তাকে। না, ইন্দ্র অবশ্যই কাল্পনিক কোনো চরিত্র হতে পারে না। সে তার পাড়ারই ছেলে। তার থেকে বছর চারেকের বড়। ইয়ার্দোস্ত তারা তাই নাম ধরেই ডাকা। কী ঘটেছিল সেদিন?

 

সেই সন্ধ্যায় অতনুর প্রথমবার বেশ্যাবাড়ি যাওয়া। ইন্দ্রর হাত ধরে। সন্ধে তখন সাতটা কি সাড়ে সাতটা হবে। কোম্পানি বাগানের কাছে সেই বাড়িটা। দোতলার সেই ঘর, ঝুলবারান্দা আর সেইসব মানুষেরা। ইন্দ্র বলেছিল এটা সবাই ‘কালীর বাড়ি’ নামে চেনে।

 

সদর দরজা ঠেলে প্রায়োন্ধকার একতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠেই অল্প পাওয়ারের হলুদ আলোয় অতনু দেখল ডানহাতের দেওয়ালে একটা প্রকান্ড কালী ঠাকুরের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি আর তার সামনে টুলের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের দিকে পেছন করে একজন আরতি করছে। খালি গায়ে একটা নোংরা পৈতে আর পরনে লাল গামছা। বেঁটে, মোটা ও শ্যামবর্ণ চেহারা তার। 

 

‘ওই যে, পুজো করছে দেখলি, ওইটাই কালী’ বাঁদিকে ঘুরে একটা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ফিসফিস করে বলল ইন্দ্র।

 

-শুয়্রোরের বাচ্চারা তো জানে না, আমি কি জিনিষ, এবার কেলিয়ে যেদিন গাঁড় হিলিয়ে দেব সেদিন বুঝবে। আসুক বাঞ্চোতরা আবার। লোকটা মালে চুমুক দিয়ে গ্লাশটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল।

-আরে জামাই, ছাড়ো তো ওসব। বলে উঠল অন্য লোকটা।

-না, না ছাড়ব কেন, মধুদা, আমি কি ভয় পাই নাকি? বলে জামাই গ্লাশটা তুলে পুরো মালটা শেষ করে ঠক করে নামিয়ে রাখল পাশের দেওয়ালের গায়ে খাঁজ কেটে বানানো তাকে। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপ মেরে গেল।

 

কিছুক্ষন হল ইন্দ্র আর অতনু এসে ঘরে ঢুকেছে। একটা বড় তক্তপোশের ওপর দুজন মেয়ে আর অতনু। দেওয়ালের ধারে একটা সিঙ্গল পুরনো কাঠের খাটে খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে একজন বসে মাল খাচ্ছে। তারই নাম জামাই। হাট্টাগোট্টা চেহারা। চাড়া দেওয়া কালো গোঁফ আর ব্যাকব্রাশ করা কুচকুচে কালো চুল। গালে দু-তিন দিনের বাসি দাড়ি। এইট পিএমের একটা পাঁইট টু-থার্ড প্রায় খাওয়া হয়ে গেছে। ওরা আসার আগে থেকেই খাচ্ছিল। জড়ানো গলায় শাসানি শুনে অতনুর তাইই মনে হল। একটা চেয়ারে বসে আছে মধু। অন্যটায় ইন্দ্র। অতনু তক্তপোশের ওপর বসতেই একটা মেয়ে চোখ নাচিয়ে মুচকি হেসেছিল। তবে অতনু কিছু করবে না। অল্প হেসে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। তার কেমন বাধো-বাধো ঠেকছিল। বেশ্যাবাড়ি যে কেমন হয় তা দেখতেই তার আসা। ইন্দ্র অপেক্ষা করছিল কিরণের জন্য। তার টানেই ইন্দ্র আসে এই বাড়িতে। 

 

‘এই নে মীনা, এটা তোর, আর এই নে রানী, এইটা তোর জন্য’ বলে মধু ব্যাগ থেকে একটা একটা করে শাড়ী বার করে মেয়ে দুজনকে দিল। সামনেই পুজো। মীনা-রানী ‘আরিব্বাস, হেব্বি হয়েছে’, ‘খুব সোন্দর’ বলে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। ‘পছন্দ তো?’ বলে হাসিমুখে দুজনের দিকেই তাকাল মধু। ওরা ঘাড় নেড়ে সায় দিল। মধুর বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। বেশির ভাগ চুল পেকে গেছে। মোটা ঝোলা গোঁফেও পাক ধরেছে। রোগা ডিগডিগে চেহারা। দুহাতের আঙুলে অনেকগুলো আংটি। পরনে হাল্কা নীল শার্ট ফরমাল প্যান্টে গোঁজা। 

 

কিরণ চলে এল। স্লিভলেস ব্লাউজ আর নাভির কাছে পরা শাড়ি। কাধে ভ্যানিটি ব্যাগ। চোখে কাজল। চুলটা আলগা করে ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। আর বিশেষ কোনো মেক-আপ নেই। এমন টানটান চপল ভঙ্গি যেন একটা তাজা বাতাস নিয়ে এল ঘরে। বয়স তিরিশের কোঠায়। অন্য মেয়ে দুজনের চেয়ে বয়সে বড় তবে এর অ্যাপীলই আলাদা। চোখ-ঠোঁট জুড়ে একটা দুষ্টুমির হাসি যে কাউকেই ফাঁদে ফেলবে। অতনুর সেরকমই মনে হল।

-আরে, তুমি কতক্ষণ? হাসিমুখে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল কিরণ ইন্দ্রর দিকে। কি হাস্কি গলা! অতনুর মধ্যেও কেমন একটা ইচ্ছে চাগাড় দিয়ে উঠল। 

-এই তো খানিক্ষণ। অল্প হাসি নিয়ে ইন্দ্র বলল। তারপরই বললঃ এইটা আমার বন্ধু অতনু, আজ করবে না তবে ওকে আর একদিন আনছি। 

কিরণ হাসি হাসি মুখে সরুচোখে অতনুকে দেখে বললঃ আমি কিরণ। তারপর ইন্দ্রর দিকে ঘুরে বললঃ চল, আর বসছি না, ওঘরে চল। 

-'এই দাঁড়া, এক মিনিট' বলে মধু ব্যাগ থেকে আর একটা শাড়ী বার করে কিরণকে দিয়ে জিজ্ঞেস করলঃ কেমন? পছন্দ?

-খুব ভালো হয়েছে গো! খুশি খুশি মুখে কিরণ বলল।

কিরণ আদর করে অতনুর গালে একটা ছোট্ট টোকা মেরে চুলে আলতো হাত বুলিয়ে ইন্দ্রকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। অতনু যেন তড়িৎপৃষ্ট হল।

 

ইন্দ্র আর কিরণ চলে যেতেই কালী এসে ঘরে ঢুকল। হাতে একটা থালায় প্রদীপ আর একটা পাত্রে লাল সিঁদুর-চন্দন গোলা। সবই কাঁসার। এই প্রথম অতনু কালীর মুখটা দেখল। এরকম অনুভুতিশূন্য মুখ অতনু এর আগে কখনো দেখেনি। বয়স আন্দাজ চল্লিশ-বিয়াল্লিশ। গোঁফ আছে তবে দাড়ি পরিপাটি করে কামানো। মনে হয় কলপ করে। প্রথমে মীনা তারপর অতনু এবং তারপর বাকিদের সবার সামনে একে একে গিয়ে আগুনের তাপ দিল আর কপালে এঁকে দিল লালটিকা। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল। কোনো কথা বলল না। 

 

না, অতনু মন বদলালো। যে মেয়েটা আগে তাকে হেসে ইশারা করেছিল মানে রানীকে জিজ্ঞেস করলঃ তুমি যাবে আমার সাথে? 

-হ্যাঁ, খুব যাব, চলো। বলে হাসতে হাসতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল রানী। অতনুও।

দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে রানী ওর হাতটা ধরে রঙ্গভরা গলায় বলে উঠলঃ হুমম, করবে আবার না!

কালী যেখানে পুজো করছিল তার পাশ দিয়ে বারান্দা ধরে এগিয়ে একটা ঘরে রানী তাকে নিয়ে গেল। কালী অবশ্য তখন সেখানে ছিল না। 

 

খুব বেশিক্ষণ নয়। প্রথমবার। কিছুক্ষণ করেই অতনু ঝরে গেল। তবে প্রথমবারের উদ্দীপনা আর উন্মাদনাই আলাদা! আর সেটা সে পেশীতে-শিরায় টের পাচ্ছে। আহ, এক ধাক্কায় যেন একটা ঘেরাটোপ ভেঙে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে সে! বুকের ভেতর হৈ-হুল্লোড়ের মতো একটা বাজনা বাজছে! অতনুর তেমনই মনে হতে থাকল।

 

আবার বসার ঘরে ফিরে এল ওরা। দেখল জামাই ততক্ষণে শুয়ে পড়েছে। পাঁইটটাতে তলানি এক পেগ মতো পড়ে আছে। মধু চেয়ারে বসে সিগারেট টানছে। মীনা ঘরে নেই। হয়ত খদ্দের এসেছিল এর মধ্যে। তাকে নিয়ে অন্য কোনো ঘরে গেছে। ইন্দ্র আর কিরণ তখনও করছে। কালী কোথায় কে জানে? ওই হোম-টিকার পর আর তাকে দেখেনি অতনু। 

 

-ছোটভাই, তামাক খাও? প্রশ্নটা তাকে উদ্দেশ্য করেই করা মধুর। সবে তক্তপোশের ওপর বসেছে ওরা দুজন। শুনেই অতনুর চোখমুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলে উঠলঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ, খাই তো বটেই। আছে নাকি?

পকেট থেকে সিগারেটের প্লাস্টিকে মোড়া একটা বড়সড় কলি বার করে তার দিকে তাকিয়ে মধু হেসে বললঃ খাঁটি মনিপুরি মাল। চল বারান্দায় গিয়ে ছিলিম সাজিয়ে দুইভাইতে খাই।

 

ছিলিম শেষ হয়ে গেছে। প্রবল ধুনকি হয়েছে অতনুর। ওরা দুজনেই বারান্দায় বসে সিগারেট টানছে। সে মধুকে জিজ্ঞেস করলঃ তুমি কি এখানে অনেকদিন আসছ, মধুদা? সবাইকে শাড়ী দিলে দেখলাম।

অল্প হেসে মধু বললঃ আমি এই বাড়িতে আসছি আজ প্রায় চল্লিশ বছর হল। কালী তখন তিন বছরের বাচ্চা। ওর মায়ের কাছে আসতাম। মহুয়া। সেই থেকে আসতেই থাকলাম। মহুয়া মারা গেল বছর পাঁচেক হল। বিয়েশাদির চক্করে যাইনি। এখানেই আমার জীবন-যৌবন কেটে গেল, ছোটভাই। 

-ও, বাবা সে তো অনেকদিন! আচ্ছা, জামাই কে? একটু গলা নামিয়ে অতনু জিজ্ঞেস করল।

-ও তো আমাদের রানীর বর। ওই তো যার সাথে তুমি করলে।

অতনু একটু হতভম্ব হয়ে গেল! তারপর গলটা আরও নামিয়ে জিজ্ঞেস করলঃ তা জামাই কি খুব বড় মস্তান-টস্তান কেউ?

-ধুর, না, না, বাল! রানীর পয়সায় মদ গেলে আর এদিক সেদিক বাওয়ালি করে বেড়ায়। নেহাত কালী আছে তাই ক্যাল খায় না। বাজার-দোকানটা অবশ্য কালী ওকে ঘাড় ধরে করায়। মধু তাচ্ছিল্য ভরে বলল।

-ও, তা মেয়েরা কি এখানেই থাকে? কিরণ অবশ্য এল দেখলাম।

-আরে না, না এখানকার সব মেয়েদের আলদা ঘর-সংসার আছে। বিকেল-সন্ধে থেকে এখানে ধান্দা করতে আসে আবার সকালে বাড়ি ফিরে যায়। এই তো কিরণের ছেলে এবার ক্লাস থ্রিতে উঠল রানী অবশ্য জামাইকে বিয়ে করার পর কখনো এখানে কখনো ওর মায়ের কাছে থাকে। 

এরপর ওরা দুজনেই চুপ মেরে যায়। সিগারেট টানতে টানতে ধুনকিটা নিতে থাকে।

 

একটা বারান্দা দিয়ে সাত-আট বছরের বাচ্চা কালী ছুটে গিয়ে দড়াম করে একটা দরজা ঠেলে ঢুকে গেল। ঢুকেই ‘এই আমার সবুজ জামাটা কোথায় রেখেছিস?’ বলে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। খাটের ওপর মধুর নিচ থেকে তার মা আঙুল তুলে ‘ওই তো ওই আনলায় দেখ, পাবি’ বলতে বলতে ফের শীৎকারে ফিরে গেল।

 

সতেরো-আঠারোর কালী, ভেজা চুল টেনে ব্যাকব্রাশ করা, মাথায় লালটিকা, মুখে পান ‘এই তো সামনের বাড়িটাই’ বলে আধবুড়ো এক খদ্দের নিয়ে এগিয়ে আসছে এই বাড়িটার দিকে। 

 

বছর পঁচিশের কালী, চল্লিশোর্ধ মধু আর কালীর মা ওই বসার ঘরে মাল খেতে খেতে রঙ্গ-তামাশায় গড়িয়ে পড়ছে। আশেপাশে বসে থাকা আরও সব মেয়েরা তাতে তাল দিচ্ছে। 

 

জামাই মাল খাচ্ছে আর অতনু তার সামনে বসে আছে। সিগারেটটা ধরিয়ে জামাই ঢুলুঢুলু চোখে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলঃ কিইই, কেমন লাগল আমার রানীকে?

 

-এই, অতনু, চল। অতনুর চটকা ভাঙল ইন্দ্রর ডাকে। এতক্ষণ এইসব দৃশ্যকল্প বা কল্পদৃশ্যের মধ্যে তলিয়ে গিয়েছিল সে। পাশ থেকে মধু কখন উঠে গেছে খেয়ালই করেনি। অতনু চুপচাপ উঠে ইন্দ্রর সাথে সিঁড়ির দিকে এগোল। 

 

যাওয়ার সময় দেখল ঘরের ভেতর জামাই তখনও ঘুমাচ্ছে। কিরণ তক্তপোশে আয়েশ করে আধশোয়া হয়ে, রানী তক্তপোশে বসে দেওয়ালে হালান দিয়ে আর মধু আগের মতোই চেয়ারে বসে খিল্লি করছে। ওদের বেরিয়ে যেতে দেখে কিরণ মিষ্টি করে হেসে হাত নেড়ে বললঃ আবার এসো কিন্তু। মধু আর রাণীও হাসিমুখে হাত তুলে বিদায় দিল। অতনু শুধু হাত তুলল একবার। আশ্চর্য কালীকে দেখতে পেল না আর!

 

একমাথা ধুনকি, শরীরে-মনে এক লাগামছাড়া তৃপ্তি আর কেমন একটা ঘোর নিয়ে অতনু সিঁড়ি দিয়ে নেমে সদর দরজা টপকে রাস্তায় এসে পড়ল…

No comments:

Post a Comment