এক. ধারাবাহিকের সেটে
ছেলেটি: আমার ওপর ভরসা আছে তো, নাকি?
মেয়েটি: নিজের থেকেও বেশি। তোমার ভরসাতেই তো ঘর ছেড়েছি। ঘর বেঁধেছি।
ছেলেটি মেয়েটিকে বুকে টেনে নিয়ে বলে: ব্যাস। তোমার ভরসার মর্যাদা আমি আজীবন রাখব।
কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে ‘কাট’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে ‘সিঁদুরে মেঘ’ ধারাবাহিকের এপিসোড ডিরেক্টার অম্লান সেন। তারপরই অভিনেতা-অভিনেত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলে: অনন্দিতা, আর একটু আবেগ চাইছিলাম। আর তৃণাঞ্জন, আর একটু সহজ হও। একটু আড়ষ্ট লাগছে। আর একটা যাব, ওকে? অনিন্দিতা-তৃণাঞ্জন সায় দেয়।
দ্বিতীয় টেকের পর ‘কাট’ ও তারপর 'পারফেক্ট' বলে সেদিনের মতো প্যাক আপ করে দেয় অম্লান। সেটের বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিগারেট টানতে থাকে। হঠাৎ সেলফোনটা বেজে ওঠে। অম্লান দেখে সৌগত। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে সৌগতর গলা শোনা যায়: কিরে প্যাক আপ হল?
অম্লান: এই জাস্ট।
সৌগত: শোন না, আমার বাড়ি চলে আয়।
অম্লান: কাল সকালে শ্যুট আছে।
সৌগত: আরে, অল্পক্ষণের জন্য আয়, এখানে ডিনার করে যাবি।
অম্লান: আচ্ছা, আসছি।
ফোন কেটে দিয়ে অম্লান ক্যাব বুক করতে থাকে।
দুই. গানওয়ালা বন্ধু
সৌগতর বাড়িতে স্কচ-তন্দুরি চিকেন আর গ্রীন স্যালাড নিয়ে গুছিয়ে বসতে না বসতেই সৌগত বললঃ রঞ্জনদার একটা ছবিতে মিউজিক করছি। নতুন একটা গান লিখলাম ছবিটার জন্য। সুরটাও মোটামুটি করেছি। তাই তোকে শোনাবো বলে হাঁকপাঁক করছি।
অম্লান সিগারেট ধরিয়ে একটা লম্বা টান মেরে বললঃ শোনা।
গিটার বাজিয়ে সৌগত গান ধরল।
গান শেষ হলে অম্লান উৎফুল্লভাবে বলে উঠলঃ কেয়াবাত! সত্যিই সৌগত, তোর কথা-সুরের কোনো জবাব নেই।
সৌগতঃ যাক, তোর ভালো লেগেছে।
অম্লানঃ সত্যিই ভালো লেগেছে। তো, কাকে দিয়ে গাওয়াবি কিছু ঠিক করেছিস?
সৌগতঃ মধুরিমাকে দিয়েই গাওয়াবো ভাবছি।
অম্লান: রাইট চয়েস্। ওহ্, আমার লাস্ট ছবিতে তোর 'ভাবিনি কখনো' গানটা কি গেয়েছিল ও! এখনো কানে বাজে।
সৌগত: হ্যাঁ, দুর্দান্ত গেয়েছিল। আমি নিজেও অতটা এক্সপেক্ট করিনি।
অম্লান: আমার সাথে বহুদিন কোনো যোগাযোগ নেই। কেমন আছে ও?
সৌগত: এমনি ভালোই আছে বাট ওর ডিভোর্স হয়ে গেছে, জানিস তো?
অম্লান: নিউজে পড়েছি।
সৌগত: দাঁড়া, তোকে ওর নাম্বারটা হোয়াট্স্য়াপ করছি।
অম্লান মধুরিমার নাম্বারটা সেভ করতে করতে জিগ্গেস করল: তা, ছবিটার প্রোডিউসার কে?
সৌগত ইতস্তত করে বলল: সে, ওই…
অম্লান ওর কথার মাঝেই হেসে বলে ওঠে: আরে, বল না, আমি ইনট্রোডিউস করাতে বলব না।
সৌগতঃ না, মানে ওই প্রতুলদা।
অম্লান সার্কাস্টিক হাসি হেসে বলে ওঠে: আরিব্বাস। প্রতুলদা উর্ফ প্রতুল ঘোষ। আমার প্রথম প্রোডিউসার ও প্রাক্তন প্রেমিকার বর্তমান হাজব্যান্ড।
সৌগত: ছাড় তো, অম্লান, ওসব পুরনো কথা।
অম্লান একটু ম্লান হেসে বলে: ছেড়েই তো দিয়েছি, ভাই। ধরে রাখতে আর পারলাম কই? নাকি, আমাকেই ছেড়ে গেছে সব। সম্পর্ক-লেখা-সিনেমা।
সৌগত: দেখ, তুই একজন ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া স্ক্রিপ্ট রাইটার। তিনটে ছবি ডিরেক্ট করেছিস। না হয়, তোর লাস্ট ছবিটা রিলিজ হয়নি। অত অধৈর্য হোস না তো।
অম্লান সশব্দে হেসে উঠে বলে: ছিলাম, সৌগত, ছিলাম। স্ক্রিপ্টরাইটার ছিলাম, ফিল্মমেকার ছিলাম। আর আজ আমি একজন ফাকিং এপিসোড ডিরেক্টর। রদ্দি মেগার সেটে গাঁড় মারাচ্ছি।
সৌগতঃ দেখ, আমি বিশ্বাস করি, ঠিক একটা না একটা নতুন আইডিয়া তোর মাথায় এসে যাবে।
অম্লান আবার সশব্দে সার্কাস্টিক হাসি তুলে বলে: ভাই, আজ দুবছর হয়ে গেল আমার রাইটার্স ব্লক কাটল না। একটা লাইনও লিখতে পারলাম না। কাউন্সেলিং-হ্যানা-ত্যানা সব হয়ে গেল। লাভের লাভ কিছুই হল না। মাথার দরজা খুলল না।
সৌগত: ধৈর্য ধর। শান্ত থাক। হবে।
অম্লান: যাক গে , বাদ দে। আমার লাস্ট স্ক্রিপ্টটার কথা মনে আছে? ‘বিরতির পর’।
সৌগতঃ ওই যেটা নিয়ে রণদার কাছে গিয়েছিলি?
অম্লানঃ হ্যাঁ, তা রণদা তো চারমাস ঘুরিয়ে শেষমেশ এখানে ‘চেঞ্জ করো, ওখানে চেঞ্জ করো’ বলেছিল। রাজি হইনি। তো, রণদাও পিছিয়ে গেল। ছবিটাও আর হল না।
সৌগতঃ হ্যাঁ, সে মনে আছে।
অম্লানঃ ইদানীং ওটাকে একটু রিভাইজ করার চেষ্টা করছি। দু বছর আগের লেখা তো।
সৌগতঃ গুড, করে নে। তারপর না হয় অন্য কোনো প্রোডিউসার ধরা যাবে। রণদা করেনি তো কি হয়েছে? অন্য কেউ করবে।
অম্লান করুণ হেসে বলে: দেখা যাক, ভাই। নতুন কোনো আইডিয়া যখন আসছেই না তখন এটাই শেষ ভরসা। অন্ধের যষ্ঠী।
আরো কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে অম্লান উঠে পড়ল। ক্যাব ধরে রওনা দিল বাড়িমুখো।
তিন. স্মৃতির সরণীতে একা
বাড়ি ফিরে অম্লান স্নানে চলে গেল। বাড়ি বলতে একটা রেন্টেড টু বি-এইচ-কে ফ্ল্যাট। একলাই থাকে।
স্নান সেরে চেঞ্জ করে ড্রইংরুমে এসে একটা ড্রিংক নিল। সোফায় শরীরটা এলিয়ে বসে মদ খেতে খেতে তার মনে পড়ে গেল শ্রীজার কথা।
শ্রীজাকে প্রথম দেখেছিল মঞ্চে। জ্ঞানমঞ্চে সেদিন শ্রীজাদের থিয়েটার গ্রুপের একটা শো ছিল। এক বন্ধুর সুবাদে অম্লান গিয়েছিল শো দেখতে। সেই বন্ধুই শোয়ের পর গ্রিনরুমে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল শ্রীজাতর সাথে। সে প্রায় ছবছর আগের কথা।
অম্লানের প্রথম ছবির চিত্রনাট্য তখন রেডি। ও ঘুরে বেড়াচ্ছিল প্রযোজকদের দরজায় দরজায় আর ঢুঁ মারছিল একের পর এক থিয়েটারের শোয়ে। আসলে একজন শক্তিশালী মানানসই অভিনেত্রী খুঁজছিল ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য। শ্রীজার অভিনয় দেখেই অম্লান বুঝে গিয়েছিল যে খ্যাপা পেয়ে গেছে পরশপাথর। আর খুঁজতে হবে না। ক্রমে আলাপ গড়ায় সখ্যতায়। তারপর প্রেম।
এরপর একদিন হঠাৎই রাস্তা খুলে যায়। আলাপ হয় প্রতুল ঘোষের সাথে। টলিপাড়ার নামকরা প্রযোজক। ১৫-২০টা ছবি করা হয়ে গেছে। নতুন প্রতিভাদের সুযোগ দিতে চান। অতএব আরো দু-তিনজনের সাথে বরাৎ খুলে যায় অম্লানেরও। তার চিত্রনাট্য মনে ধরে প্রতুলের। কথাবার্তা পাকা হয়ে যাওয়ার পর একদিন অম্লান প্রতুলকে মূল চরিত্রে শ্রীজাকে কাস্ট করার কথা বলে। অলাপও করায় শ্রীজার সাথে। রাজি হয়ে যায় প্রতুল।
প্রতুলের অফিসেই তার আলাপ হয় সৌগতর সাথে। নামে ও মুখে চিনলেও সৌগতর সাথে তার আলাপ ছিল না। সৌগত ততদিনে প্রতিষ্ঠিত গীতিকার- সুরকার। পর পর তিনটে ছবিতে তার লেখা সুর করা গান তখন মানুষের ঠোঁটে-কানে অবিরত। চিত্রনাট্য শুনে সৌগত সাগ্রহে রাজি হয়ে যায় তার ছবির মিউজিক করতে। সেই থেকে অম্লান-সৌগত যুগলবন্দী। অম্লানের সব ছবিরই মিউজিক করেছে সৌগত।
যাইহোক। প্রবল উদ্দীপনা আর নতুন প্রেমের উন্মাদনা নিয়ে অম্লান ঝাঁপিয়ে পড়ে ছবির কাজে। মন প্রাণ উজার করে ছবি বানায় সে। ছবিটা মোটের ওপর ভালোই চলেছিল। গানও হিট হয়। তবে এরপরই ঘটে আসল ঘটনা। অপ্রত্যাশিত ভাবে আসে বিশাল স্বীকৃতি। সেরা চিত্রনাট্যকার (মৌলিক চিত্রনাট্য) হিসাবে অম্লান পায় জাতীয় পুরষ্কার।
জীবনে ওরকম সুসময় অম্লানের জীবনে তার আগে পরে আর কখনোই আসেনি। প্রথম ছবির মহরৎ-শ্যুট-ডাবিং-প্রিমিয়ারের নানান টুকি-টাকি ঘটনা মনে পড়তে থাকে তার।
তবে সুখ বোধহয় কখনোই দীর্ঘস্থায়ী নয়। অম্লান আর একটা ড্রিংক্ নেয়। সিগারেট ধরিয়ে আবার ঝাঁপ দেয় স্মৃতির অতলে।
অল্প কিছু দিনের মধ্যেই অম্লান তার দ্বিতীয় ছবির কাজে হাত দেয়। মুখ্য ভূমিকায় শ্রীজার সাথে ছিল খ্যাতনামা নির্বাণ হাজরা। প্রযোজক প্রত্যাশিত ভাবেই প্রতুল ঘোষ। স্বপ্নের মত চলে আসা জীবনের তাল কাটে ছবির শ্যুটিং শেষ হওয়ার পরে। শ্রীজার ব্যবহার ক্রমশঃ বদলাতে শুরু করে অম্লানের প্রতি। যেন তার মন উঠে গেছে এই সিনেমাপাগল, লেখাপাগল তরুণ তুর্কীর থেকে। এদিকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইন্ডাস্ট্রি জুড়ে। নবাগতা নায়িকা শ্রীজা বন্দ্যোপাধ্যায় ডেট করছে মধ্য চল্লিশের ডিভোর্সি প্রতুলকে।
এরপর আর কি! নিজেকে গুটিয়ে নেয় অম্লান। ছবির পোস্ট প্রোডাকশন আর প্রিমিয়ার সারে বুকে পাথর চেপে। পেশাদারিত্ব নষ্ট করে না। ছবিটা বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছিল। শ্রীজার অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা হয়েছিল সমালোচক মহলে। তারপর একদিন আনন্দবাজার অনলাইনে এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে শ্রীজা স্বীকার করে নেয় তার ও প্রতুলের সম্পর্ক। এও জানিয়ে দেয় যে আপাতত লিভ-ইনে আছে তারা। সব কিছু ঠিকঠাক চললে বিয়ের পরিকল্পনাও করতে পারে আগামীতে।
এরপর একটা বছর অম্লান পুরোপুরি ব্রেক নেয়। ইন্ডাস্ট্রির কারো সাথেই কোনো যোগাযোগ রাখে না। পুরনো বন্ধুদের সাথে পার্টি-হুল্লোড়ে মেতে থাকে। এখানে সেখানে পাহাড়ে-জঙ্গলে ট্রিপ করে বেড়ায়। তাদের চোখে ততদিনে সে সেলিব্রিটি।
তিন পেগ খেয়ে ফেলেছে অম্লান। বেশ নেশা হয়ে গেছে তার। কোনোমতে সোফা ছেড়ে উঠে অম্লান বেডরুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
চার. প্রতিদিনের কষ্ট
শেষ আটমাস ধরে অম্লান শুধু বাড়ি থেকে মেগার সেট আর সেট থেকে বাড়ি এই করেছে। মাসের অধিকাংশ দিনই শ্যুটে থাকে। ছুটির দিনেও সে কোথাও যায় না। বাড়িতেই চুপচাপ বসে থাকে। আর পুরনো কথা ভাবে। শ্যুটিং ফ্লোরে চুপচাপই থাকে। আড্ডা গল্পে বিশেষ যায় না। শুধু কাজটুকু করে বাড়ি চলে আসে।
মাঝে মধ্যে বাড়ি ফেরার পথে যায় সৌগতর বাড়ি। ওর কাছে জমে থাকা হতাশা আর কষ্টটা উগরে দিয়ে অম্লান একটা রিলিফ পান। সৌগত সবসময়ই তাকে সেই পরিসর দিয়ে এসেছে। সৌগতর মত বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
তাঁর ইদানীং কালের জীবন যেন সেই একবুক দম নিয়ে শুরু হওয়া ডুব সাঁতার। কবে যে আবার জলের ওপর মাথা তুলে দম ছাড়বে, দম নেবে, সে জানে না। সব সময় একটা হতাশা তাকে কুরে কুরে খায়। ক্লান্ত অবসন্ন মনে হয়। ভেতরে ভেতরে গুমরে মরে খালি।
শ্রীজার চলে যাওয়া, ছবি রিলিজ না হওয়া, চিত্রনাট্য ওয়ার্ক আউট না করা এসব তাকে খাদের একেবারে কিনারায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল আর সজোরে ধাক্কায় তাকে খাদে ফেলে দিল তার রাইটার্স ব্লক। কোনো কিছুই যেন মাথায় আসে না আজ দু বছর। ভাবনাটা যেন হারিয়ে গেছে। একদম ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেছে মনে হয় মাথাটা।
সময় পেলেই ল্যাপটপ খুলে বসে। ওয়র্ড ডকে দু -এক লাইন লেখে। তারপর বসে থাকে তো থাকেই। কিছুই আর এগোয় না। শেষে লাইন দু-একটা ডিলিট করে দেয়।
প্রথম প্রথম নিয়মিত কাউন্সেলিং, নানান এক্সারসাইজ, ব্রেনস্টর্মিং এসব করে দেখেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো কোনো আইডিয়া এসে যায়নি।
লেখার ক্ষমতাটা যদি হারিয়ে না ফেলত তবে সে আরো একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারত। নতুন লেখা কোনো চিত্রনাট্য নিয়ে নতুনভাবে শুরু করতে পারত। কিন্তু ওখানেই গন্ডোগোল। আসল ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলেছে সে। অম্লান যেন নিজের ভেতরেই হারিয়ে গেছে আসলে।
প্রথমদিকে চুপচাপ বাড়িতে বসে থাকত, কিন্তু কর্মহীন-জনহীন হয়ে আর কতদিনই বা থাকা যায়। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই নেহাত রোজগারের তাগিদে আর সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার জন্যই এই ধারাবাহিকে এপিসোড ডিরেক্টরের কাজটা সে করে। রোজগার হয়ে যায়, জীবন চলে যায়। কিন্তু মন ভরে না। একরাশ বিরক্তি আর বিষণ্ণতা নিয়ে মেশিনের মতো কাজ করে চলে। কুঁজো হয়ে বেঁচে থাকে। মাঝে মাঝে কেঁদেও ফেলে ড্রইং রুমে একা একা। মনে হয় যেন সে আর বেঁচে নেই। তার লাশ ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কবে যে আবার সে লিখতে পারবে? কবে যে আবার গিয়ে দাঁড়াতে পারবে তাঁর নিজের ছবির সেটে? সবটুকু উজার করে দিয়ে বানিয়ে ফেলতে পারবে আর একটা নতুন ছবি, অম্লান জানে না।
হয়ত নিস্তার নেই। হয়ত আর কোনোদিনই হবে না লেখা। হবে না বানানো নতুন সিনেমা। একমাত্র মৃত্যু এসে একদিন তার সব যন্ত্রণা লাঘব করে দেবে। মুক্তি পেয়ে যাবে অম্লান, সবকিছু থেকে।
পাঁচ. বিনোদনের পাতায়
অন্যান্য দিনের মতই সকালে প্রোডাকশনের ক্যাবে সেটে যাওয়ার পথে অম্লান সেলফোনে আনন্দবাজার অনলাইনটা খুলল। চোখ বোলাতে বোলাতে বিনোদনের পাতায় দেখল রণদার নতুন ছবির রিভিউ বেরিয়েছে।
রণদা ওরফে রণদেব রায়, ২৫ বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রির স্টার। স্টারডম অক্ষুণ্ণ রেখে পরবর্তী দুই প্রজন্মের নায়কদের সাথে এখনো পাল্লা দিয়ে চলেছে।
ছবির মুখ্য ভূমিকায় ও প্রযোজনায় রণদা, স্বয়ং। একটুখানি পড়েই অম্লান বুঝতে পারল যে তার ‘বিরতির পর’ চিত্রনাট্যের মূল ভাবনাটা নিয়ে আলাদা একটা চিত্রনাট্যের ওপর ছবিটা বানানো হয়েছে। বজ্রাঘাত হল যেন অম্লানের ওপর। গুম মেরে গেল। অতি কষ্টে আটকে রাখল চোখের জল। ছবি বানানোর শেষ রাস্তাটাও বন্ধ হয়ে গেল।
পুরোটা পড়ে দেখল রিভিউয়ের শেষাংশে লিখেছে: রণদা জানিয়েছে যে গল্পের আইডিয়াটা তারই মস্তিষ্কপ্রসূত। তবে আসল ক্রেডিট চিত্রনাট্যকার পার্থ নন্দী এবং পরিচালক অরিজিৎ গাঙ্গুলীর।
সেটে পৌঁছে অম্লান কোনোমতে কাজ শুরু করল। গলার কাছে আটকে থাকা দলা পাকানো একটা কান্না চেপে নিয়ে গেল একের পর এক শট। তবে আজ আর কোনো রিটেক নিল না। লাঞ্চের পর এক ফাঁকে সানিকে ফোন করল। যথাসময় প্যাক আপ করে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেল। প্রোডাকশন ক্যাব নিল না। সকালেই প্র্রোডাকশনকে জানিয়ে দিয়েছিল যে আগামীকাল সে ছুটি নেবে।
ছয়. মহানির্বাণের আয়োজন
স্টুডিও থেকে বেরিয়ে একটু হেঁটে অম্লান একটা আধো অন্ধকার গলির ভেতর ঢুকে পড়ে। একটু দূরেই একটা ছোট্ট চা-সিগারেটের দোকানের সামনে একটা লোক দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে ফোনে কথা বলছে: স্যার, সানি বলছিলাম।
-
-একটা খবর ছিল, স্যার।
-
- বসিরের ওখানে প্রচুর মাল এস্টক হচ্চে, স্যার।
-
- হ্যাঁ, স্যার, একটু নজর রাখবেন।
-
অম্লান পেছন থেকে এগিয়ে এসে ডাকে, ‘সানি’। সানি ঘুরে হাতের ইশারায় একটু অপেক্ষা করতে বলে।
- না, না, স্যার, আমি এখন এক্কেবারে কিলিন।
ফোনে কথা শেষ করে সানি একগাল হেসে অম্লানকে বলে! কি খবর, বস্? অম্লান হেসে বলেঃ ভালো, মালটা দে। সানি একটা প্যাকেট এগিয়ে ধরে। অম্লান প্যাকেটটা নিয়ে ব্যাগে রাখে। তারপর এক প্যাকেট সিগারেট কেনে। সানিকে একটা দেয় আর নিজেও একটা ধরায়। সিগারেট টানতে টানতে বাড়ি ফেরার ক্যাব বুক করে। ক্যাবের অপেক্ষা করতে করতে সানির সঙ্গে খোশগল্প জোড়ে অম্লান।
সানিকে অম্লান কলেজ লাইফ থেকে চেনে। চেতলা-কালীঘাট-টালিগঞ্জ এলাকার নির্ভরযোগ্য পেডলার। গাঁজা-চরস-হেরোইন-ট্যাবস, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সানিই ভরসা। সব সময় তার স্টক মজুত।
সাতঃ আত্মহত্যা মুলতুবি রইল
রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। সোফায় বসে স্ট্রিপ ছিঁড়ে একটা একটা করে ট্যাবলেট ফেলছিল অম্লান সামনের টেবলে রাখা ফুল পেগ হুইস্কিতে। একটু আগে সানির থেকে কয়েক পাতা ভ্যালিয়ামই তুলেছিল সে।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। অম্লান দেখল সৌগত। শেষবারের মত কথা হবে ভেবেই বোধহয় অম্লান ফোনটা ধরল। ওপাশ থেকে সৌগতর উচ্ছ্বসিত গলা শোনা গেল! ভাই! সুসংবাদ তো?
অম্লান ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল, কি?
সৌগতঃ বিষ্ণুদা ফোন করেছিল।
অম্লানঃ কোন বিষ্ণুদা বল তো?
সৌগতঃ আরে, বিষ্ণু সিনহা, তোর লাস্ট ছবির প্রোডিউসার।
অম্লানঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ, কি বলছে,
সৌগতঃ বলল তোর ছবিটা নেক্সট শুক্রবারে রিলিজ করছে ওদের হুল্লোড় ডট কমে। কনফার্মড।
অম্লানঃ বলিস কি?
সৌগতঃ হ্যাঁ রে কাকা, চিয়ার্স। প্রথমে তোকেই ফোন করেছিল, পুরনো নাম্বারে। তাই পায়নি। নতুন নাম্বার দিয়ে দিয়েছি। বলেছে কাল সকালেই তোকে জানাবে। নে, এবার নিশ্চিন্তে ঘুমা, গুড নাইট।
অম্লান ‘গুড নাইটঽ বলে ফোন কেটে দিল। সেলফোনটা কান থেকে নামিয়ে রাখতে রাখতে একটা বড় হাঁফ ছাড়ল। এতক্ষণের দমবন্ধকর অবস্থাটা কেটে গেছে। বেশ হালকা লাগছে তার। নতুন ছবি নাই বা হল অপাতত। তার এতদিন আটকে থাকা ছবি অবশেষে মুক্তি পাবে। প্রেক্ষাগৃহে নাই বা হল, ওটিটিতেই হল, ক্ষতি কি? অনেকদিন পর মনের মধ্যে একটা দারুণ খুশি টের পেল অম্লান। আলতো একটা হাসির আভা ছড়িয়ে পড়ল চোখে মুখে। অনেকদিন পর মনের মধ্যে একটা দারুণ খুশি টের পেল অম্লান। আলতো একটা হাসির আভা ছড়িয়ে পড়ল চোখে মুখে।
সামনের টেবলে ভ্যালিয়াম মেশানো মদের দিকে তাকিয়ে ভাবল: ছি! আর একটু হলেই কি নিন্দনীয় বোকামিই না করতে যাচ্ছিল সে! ভাগ্যিস, সৌগত বাঁচিয়ে নিল!
গ্লাসটা তুলে নিয়ে অম্লান কিচেনে গেল। ড্রিংকটা ফেলে দিয়ে ভালো করে গ্লাসটা ধুয়ে নিয়ে আবার ড্রইংরুমে ফিরে এল। ভ্যালিয়াম ছাড়া নতুন একটা ড্রিংক বানিয়ে মনে মনে ‘চিয়ার্স, সৌগত’ বলে প্রগাঢ় শান্তির চুমুক দিল তাতে।
আটঃ মাথার দরজা খুলল
পরদিন সকালে কফি বানাতে বানাতে হঠাৎ অম্লানের মাথায় একটা আইডিয়া খেলে গেল। আরে! তার এই শেষ পাঁচ বছরের জীবন নিয়েই তো লেখা যায় একটা গল্প। একটা দেড়-দু ঘন্টার চিত্রনাট্য আরামসে নেমে যাবে এই পাঁচ বছরের চড়াই উৎরাই নিয়ে।
কফির কাপ নিয়ে অম্লান ডেস্কে এসে বসল। ল্যাপটপ অন করে ওয়ার্ড ডক খুলল। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর লিখতে শুরু করল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এক পাতা লিখে ফেলল সে। উত্তেজনায় কাঁপছে সে। সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে পুড়ে গেছে। কাঁপা হাতে কফির কাপটা তুলে প্রায় ঠান্ডা হয়ে আসা কফিতে চুমুক দিয়ে ঠক করে নামিয়ে রাখে কাপটা। উল্লসিত অম্লান চেয়ার ছেড়ে দুড়দাড় করে উঠে দাঁড়ায়। দুমুঠি সজোরে বন্ধ করে ‘ইয়াপ-ইয়াপ-ইয়াপ’ বলে প্রবলভাবে হাত মাথা ঝাঁকায়। তারপর আস্তে আস্তে চেয়ারে বসে পড়ে আবার। চোখে মুখে এক উজ্জ্বল দীপ্তি নিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে: খুলে গেছে, খুলে গেছে, মাথার দরজা খুলে গেছে।
একটা সিগারেট ধরিয়ে অম্লান আবার লিখতে শুরু করল।
সারাদিন ধরে খেপে খেপে অনেকখানি লিখে ফেলল অম্লান। লেখা যখন থামল তখন বিকেল প্রায় শেষ হয়ে আসছে। একটা কফি নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। তার শরীর মন সব যেন কেমন জুড়িয়ে গেছে। ভীষণ তৃপ্ত বোধ করছে।
কফিতে চুমুক দিয়ে অম্লান সৌগতকে ফোন করল। সুসংবাদ শুনে সৌগত তো উল্লাসে ফেটে পড়ল। বলল: পার্টি চাই ভাই, আজই, কোনো কথা শুনব না। অম্লান রাজী হয়ে গেল। সৌগত জিজ্ঞেস করল: মধুরিমাকেও ডেকে নেব? যদি ফাঁকা থাকে। অম্লান সানন্দে সম্মতি দিল।
মধুরিমা ফাঁকাই ছিল। সে রাতে অম্লানের ড্রইং রুমে জমাটি আসর বসল। কাজু-আপেল আর রকমারি কাবাবের সাথে ছিল দেদার স্কচের আয়োজন।
প্রথমেই সৌগতর অনুরোধে অম্লান তার নতুন আইডিয়াটা বলল ওদের। যতখানি লিখেছিল পড়ে শোনাল। শুনে ওদের বেশ ভালোই লাগল। মধুরিমা বললঃ দিব্যি এগোচ্ছে। সৌগত বললঃ মালটা জমবে। ওদের তারিফে অম্লান আরো বেশি উৎসাহ পেয়ে গেল।
খানাপিনা-গানবাজনার সাথে জমিয়ে আড্ডা চলল…
পুনশ্চ: মাস ছয়েক পর আনন্দবাজার অনলাইনে বেরল অগামী ছবি নিয়ে অম্লান সেনের ফ্লোরে যাওয়ার খবর। প্রোযোজনায় দাত্তানি ফিল্মস্। মুখ্য ভুমিকায় রুপক বসু, ইলোরা সান্যাল এবং অর্কপ্রভ জোয়ারদার। মিউজিকের দায়িত্বে সৌগত বাগচী। ছবির নাম ‘কিছুটা সত্যি’।
No comments:
Post a Comment