অনেকগুলো বছর জেল খেটে
মতি মস্তান ছাড়া পেল। করোনার
জেরে দেশ জুড়ে তখন
আংশিক লকডাউন। মৃত্যুমিছিল অব্যাহত।
মতি দমদম সেন্ট্রাল
জেলের বাইরে এসে দাঁড়াল। মাঝারি
হাইট। ছিপছিপে চেহারা। জুলপি আর সামনের দিকে
কয়েকটা চুলে পাক ধরেছে।
কপালের বাঁদিকে একটা কাটা দাগ।
পাঞ্চারের পুরনো আঘাত। না, তার জন্য
কারোর অপেক্ষা করার কথা ছিল
না। একবার পিছু ফিরে সে
জেলের বিল্ডিংটা দেখল। এতগুলো বছর এখানেই নষ্ট
হয়ে গেল। যৌবন অতিক্রম
করে আজ সে মধ্য
তিরিশ।
পুরনো জামাকাপড়, চিরুনি, ঘরের চাবি, মোবাইল
আর মানিব্যাগটা ফেরত পেয়েছে। ধরা
পড়ার সময় মানিব্যাগে হাজার
দেড়েক মতো ছিল। নোটবন্দির
পর পাঁচশোর নোট দুটো অচল।
এখনকার মাস খরচ যে
কত তা পুরোপুরি আন্দাজ
করতে পারে না। জেলের
মজুরি বাবদ হাজার কয়েকই
যা সম্বল। তার মা বেঁচে
থাকতে মজুরির সামান্য কয়েকটা টাকা সে তাকেই
পাঠাত।
মাস্কটা জেল থেকেই দিয়েছে।
সেটা নামিয়ে মতি বুকভরে শ্বাস
নিল, ছাড়ল। তারপর হাঁটতে থাকল যদি অটো-ফটো কিছু পায়।
জেলের খুব বেশি দূরে
নয়। দশ কিলোমিটার হবে
বড় জোর। পি.ডাবলু.ডি. রোডের ধারে
মস্ত ঝিলটা ছড়িয়ে আছে রেললাইনের নিচ
অব্ধি। ঝিলপাড়ে রেললাইনের নিচে দশ-বারোটা
ঝুপড়ি নিয়ে একটা বস্তি।
ওখানেই মতির ঘর। বছর
তিনেক আগে তার মা
ডেঙ্গুতে মারা যাওয়ার পর
ঘাটকাজ সারতে এসেছিল। তালাবন্ধ করে চাবি নিয়ে
ফের জেলে ফিরে যায়।
তার দিদি এমনিতে তার
সাথে দেখা করতে না
আসলেও তার মায়ের মৃত্যুসংবাদ
দিতে এসেছিল। মতি মনে মনে
ভাবে দখল না হয়ে
যায় ঘরটা।
মতির বাবা রিকশা
চালাত। মা বাড়ি বাড়ি
কাজ করত। রোজ রাতে
চুল্লু খেয়ে তার বাবা
বাড়ি ফিরত। তারপর চিৎকার করে খিস্তি আর
বউ-বাচ্চা ক্যালানো। মানে আশেপাশের আর
পাঁঁচটা ঘরের মতই ছিল
তাদের ঘর। লিভার সিরোসিসে
ষখন মতির বাবা মারা
গেল মতি তখন নাইনে
পরপর দুবার ফেল করে পড়া
ছেড়েছে। দিদি দক্ষিনেশ্বরে গিয়ে
বিয়ে করেছে তার বছর কয়েক
আগে। জামাইবাবু গ্রিলের মিস্ত্রি। রেললাইনের ওপাড়ের বস্তিতে ঘর।
বস্তির কাছেই মোটর গ্যারাজে মতি
তখন মেকানিকের কাজ শেখা শুরু
করে। ডাকাবুকো ছিল। বছর দুয়েকের
মধ্যেই টুকটাক ক্যালাকেলি-ঝামেলা করে শ্যামলদার চোখে
পড়ে যায়। শ্যামলদা ছিল
স্থানীয় সিন্ডিকেটের চাঁই। গোটা এলাকায় কোথায়
কার থেকে ইমারতি মাল
যাবে সেসব ঠিক করে
দিত শ্যামলদা। সাথে ছিল বাজারের
তোলাবাজি। মতিদের বস্তির কিছু আগেই ঝিলপাড়ে
এলাকার পাকা বাজার। যাইহোক,
অতি অল্পদিনেই অনেক পুরনো খিলাড়িকে
টপকে মতি হয়ে উঠল
শ্যামলদার ডানহাত। সে তখন সবে
কুড়ি-একুশ।
ঘটনাটা যখন ঘটেছিল তখনও
রাজ্যে সরকার বদল হয়নি। তবে
তলায় তলায় ক্ষমতা ছিনিয়ে
নেওয়ার ছোট-বড় সংঘর্ষ
চলছিল অবিরাম। এমনই একটা সময়
বস্তির কাছে বুলবুলের চায়ের
দোকানে মতি তার সাগরেদ
পল্টনকে নিয়ে বসেছিল। রাত
তখন প্রায় সাড়ে নটা। লাইটপোস্টটা
একটু দূরে তাই এই
জায়গাটা অন্ধকার অন্ধকার থাকে। বুলবুল দোকানের কাউন্টার বন্ধ করে চলে
গেছে। ওরা বাংলার বোতলটা
সবে খুলবে খুলবে করছে। এমন সময় রাস্তার
উল্টোদিকে ছোটকার মুদির দোকানের পাশের সরু গলিটা দিয়ে
দুটো ছায়ামুর্তি বেরিয়ে এল। ছোটকাও দোকান
বন্ধ করে চলে গেছে
অনেকক্ষণ। ছায়ামুর্তি দুটো দ্রুত রাস্তা
ক্রশ করে বুলবুলের দোকানের
কাছাকাছি এসে আচমকা গুলি
চালাল। কিছু বুঝে ওঠার
আগেই মতি দেখল পল্টন
বেঞ থেকে গড়িয়ে পড়ল।
আর তার কানের পাশ
দিয়ে একটা বুলেট বেরিয়ে
গেল। মতি এক লাফে
কাউন্টারের আড়ালে চলে গেল। গুলি
চালিয়ে ওরা দৌড়ে পালিয়ে
যাছিল। মতিও খিলাড়ি। সে
বিদ্যুৎবেগে ওয়ান শাটারটা বার
করে উঠে দাঁড়িয়ে 'বাঞ্চোৎ'
বলে গুলি চালাল। একজন
পালাতে পারলেও অন্যজন রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়ল।
মতি পল্টনের কাছে গিয়ে ঝুঁকে
দেখল। রক্তে ভেসে যাচ্ছ। তার
মনে হলনা পল্টন বেঁচে
আছে। সে আর দেরি
করল না। ওর বডিটা
টপকে দোকান থেকে বেরিয়েই দৌড়
লাগাল।
প্রায় দশ মিনিট দৌড়ে-হেঁটে হাঁফাতে হাঁফাতে শ্যামলদার বাড়ি পৌঁছল। শ্যামলদা
সব শুনে তার হাতে
তিন হাজার টাকা দিয়ে ‘জলদি
কোথাও গাঢাকা দে, পরে মামলা
ঠান্ডা হলে আসিস’ বলে
দরজা থেকেই তাকে বিদায় করল।
না, বেশিদিন লুকিয়ে
থাকতে পারেনি মতি। দিন তিনেক
পর ডানকুনি থেকে ধরা পড়ে
যায়। ধরা পড়ার পর
জানতে পারে তার গুলিতে
টুবলু মরেছে। বাবুলালের দলের। বাজারের তোলাবাজি নিয়ে অনেকদিন ধরেই
চাপা লড়াই তার আর
বাবুলালের মধ্যে। আগে শাসানি-হাতাহাতিও
হয়েছিল বেশ কয়েকবার। ওদিকে
পল্টনও বাঁচেনি। পল্টনের মাথায় টুবলুর ছোঁড়া গুলি লেগেছিল। আর
টুবলুর ঘাড়ে লেগেছিল মতির
ছোঁড়া গুলি।
যথারীতি, শ্যামলদা থেকে শুরু করে
কাউন্সিলার রথীনদা মতি-পল্টনকে তাদের
পার্টির কেউ বলে স্বীকার
করল না। তারা নাকি
শুধুই স্থানীয় দুষ্কৃতী! অথচ কি 'পরিশ্রম'
করেই না সেবার রথীনদাকে
জিতিয়ে এনেছিল সে আর তার
দলবল! আর বিজয়-মিছিলে
তো মতি আর পল্টন
রথীনদার ঠিক পাশেই বাংলা
খেয়ে আবির মেখে ভুত
হয়ে নাচছিল! ভিকট্রি ল্যাপ দিতে না পারলেও
আঙুল তুলে সাইন তো
দেখাচ্ছিলই! শ্যামলদা খুশি হয়ে রাতে
অফিসার্স চয়েস হুইস্কি খাইয়েছিল
তাদের!
মামলা চলাকালীন সরকারী উকিল পেয়েছিল সে।
নিজে উকিল ধরার মতো
সাধ্য তার ছিল না।
মামলাও আর উঁচু কোর্টে
যায়নি।
মতি যখন তার
বস্তির কাছে এসে পৌঁছল
তখন বেলা প্রায় সাড়ে
এগারোটা। বুল্বুলের দোকান বন্ধ। পাশের মোটর গ্যারাজটাও। উল্টদিকে
ছোটকার দোকান খোলা। আর একটু এগিয়েই
বস্তির দিকে তাকিয়ে সে
থমকে গেল। এতো সব
নতুন ঘর হয়েছে! তাদের
ঘরটা গেল কই! ব্যাপারটা
জানতে হবে ভেবে মতি
ছোটকার দোকানে গেল। বিড়ি-সিগারেট
বাবদ তার কিছু ধারও
আছে ছোটকার দোকানে।
মতিকে দেখে ছোটকা প্রথমে
চমকে উঠল। তারপর কিছুটা
স্বাভাবিক হয়ে জিজ্ঞেস করলঃ
তুমি? কবে বেরুলে?মতি
গম্ভীরভাবে বললঃ আজই। লক্ষ্য
করল ওদের বস্তির নিমাইদার
বউ আড়চোখে ওর দিকে তাকিয়ে
আছে। সেও দোকানে এসেছে
কিছু কিনবে বলে।
মতি তাকে পাত্তা
না দিয়ে ছোটকাকে জিজ্ঞেস
করলঃ কি গো, ব্যাপার
কি? বস্তি তো পুরো বদলে
গেছে, দেখছি!ছোটকা বললঃ হ্যাঁ, গত
বছর আগুন লেগে সব
পুড়ে গেছল, সরকার থেকে নতুন ঘর
করার টাকা দিল, সেই
দিয়েই আবার সবাই নতুন
ঘর করেছে। তুমি তো ছিলে
না, মানে তোমাদের ঘরে
তো কেউই ছিল না…
মতি বুঝল না
থাকার জন্য ঘর বানানোর
টাকা শুধু নয় জমিটাও
হাতছাড়া হয়েছে তার। কপাল আর
কাকে বলে!
-তুমি বরং তোমার
দিদির ঘরে ওপাড়ে চলে
যাও না। ছোটকা ওর
শুকনো মুখটা দেখে বলল।
-দেখি। বলে মতি প্রশ্নটা
ছুঁড়ে দিলঃ আচ্ছা তোমার
কত বাকি আছে বল
তো?
নিমাইদার বউ জিনিশ নিয়ে
চলে গেছে।
-আরে, সে পরে
হবে খন। এই তো
এলে। ছোটকার হয়ত আজ মতিকে
দেখে একটু মায়াই হল।
লকডাউনে এমনিতেই লোকের কাজকর্ম নেই। তার ওপর
জেলখাটা আসামী। আবার মাথার ছাদটাও
গেছে। অথচ একদিন
এই মতির ভয়ে
কাঁটা হয়ে থাকত সবাই।
-না, তাও বল
না। মতি বলে ওঠে।
সে মনে মনে
ঠিক করেই নিয়েছে যে
এই এলাকা ছেড়ে সে চলে
যাবে। বারাবরের মতো। এখানে তার
ঘরবাড়িও নেই আর আশেপাশে
কেউ কোনো কাজও তাকে
দেবে না। তার ওপর
বাবুলাল আর দলবল এখন
ঠিক কি করছে তাও
সে জানে না। শ্যামলদা-রথীনদা তো আগেই হাত
ঝেড়ে ফেলেছিল আর এখন ক্ষমতাতেও
নেই। ঘরটা থাকলেও না
হয় একবার ভেবে দেখত।
খাতা দেখে ছোটকা
বললঃ দুহাজার তিনশো সাতান্ন হয়েছে তোমার।
মতি টাকাটা দিতে
দিতে অল্প হেসে বললঃ
জেলের রোজগার থেকে দিচ্ছি গো,
হারামের টাকা নয়।
মতি কোথায় যাবে
সেটা সে ভেবে নিয়েছে।
এটাই লাস্ট ভরসা। অবশ্য গাজনদা যদি তাকে মনে
রাখে আজও। গাজনদার সাথে
আলাপ জেলে। হাফ মার্ডারের চার্জে
কয়েক বছর ছিল। মালের
আড্ডায় ঝামেলা। তাই থেকে হাতাহাতি।
শেষমেষ বোতল ভেঙে গাজনদা
মালটার পেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
ভাগ্য ভাল মালটা মরেনি।
গাজনদা এলাকার শশ্মানে ডোমেদের সর্দার। বয়স প্রায় ষাটের
কাছাকাছি। মতি এলাকার বলেই
হয়ত সখ্যতা হয়েছিল। বছর দুই হল
গাজনদা ছাড়া পেয়েছে। জেল
থেকে বেরনোর সময় মতিকে বলেছিলঃ
এখান থেকে বেরনোর পর
কোনো দরকার পড়লে চলে আসিস।
তার আগে মতি
আর এক জায়গায় যাবে।
যদিও করোনার ভয় তবুও এতগুলো
বছরের খিদে তার ভেতর
পাক দিয়ে উঠছিল। না,
পেটের খিদে নয় অটো
থেকে নেমে মোড়ের মাথাতেই
ছোট একটা দোকান থেকে
কচুরি-আলুর তরকারি খেয়েছে
সে। এ খিদে শরীরের।
মতি হনহন করে হাঁটা
লাগাল।
লিচুবাগানে গিয়ে দেখল এই
বেলা বারোটা নাগাদ সেখানে সবকিছু শুনশান একদম। আগে বেলা বাড়লেই
গলির মুখে দু-ধারে
কল্পনা, ময়না, মোনিকারা সব সেজেগুজে দাঁড়িয়ে
পড়ত। এখন খাঁ খাঁ
করছে। একটা হাড় জিরজিরে
কুকুর চোখে পড়ল খালি।
এখানকার মেয়েদের ঘরে এখন আর
কোনো খদ্দের আসে না। করোনার
ভয়ে খদ্দেররা সব কামনা গিলে
বেঁচে আছে।
মতি মোনিকার ঘরে
নক করল। মনে মনে
ভাবল এতদিনের অনভ্যাস, সে কি পারবে?
দু-তিনবার নক করার পর
ভেতর থেকে মোনিকার প্রশ্ন
শোনা গেল। কে?
-আমি মতি, দরজা
খোল, বলে উঠল মতি।
মতির গলা পেয়ে
পাশের ঘরের দরজা খুলে
একটা মেয়ে মুখ বাড়িয়ে
মতিকে দেখে মোনিকার ওপর
রাগে ও ঈর্ষায় বলে
উঠলঃ ভাতারখাকীর কপাল দেক! এই
মড়কেও খদ্দের জুটচে! বলেই দড়াম করে
দরজাটা আবার বন্ধ করে
দিল।
মোনিকা দরজা খুলে চমকে
উঠল মতিকে দেখে। মতি পাত্তা না
দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। পুরনো
জামানায় হপ্তায় তিন-চারদিন করে
সে পড়ে থাকত মোনিকার
ঘরে। সে কি আর
আজকের কথা!
মোনিকা মতির পাশে চিৎ
হয়ে উলঙ্গ শুয়ে আছে। ওর
নাভির ওপর ছড়িয়ে আছে
মতির বীর্য। একটু মুটিয়ে গেলেও
মোনিকার শরীরটা আগের মতোই টানটান
আছে। মতিও শুয়ে আছে
মোনিকার পাশে। চিৎ ও উলঙ্গ।
বিড়িটা টানতে টানতে জিজ্ঞেস করলঃ হ্যাঁ রে,
আগের মতো করতে পারলাম?
মোনিকা হাসিমুখে বললঃ হুমমম, কেলান্ত
করে দিয়েচো একদম! আমার টাট্টু ঘোড়া।
মতি একটু হাসল।
মনে মনে ভাবল কপাল
ভাল হলে করোনায় সে
মরবে না। যেমন সেদিন
ওই ছেলেটার ছোঁড়া গুলি তার লাগেনি।
মতি উঠে জামাকাপড়
পরে মানিব্যাগটা খুলে কয়েক হাজার
টাকা বার করে মোনিকার
দিকে বাড়িয়ে বললঃ এই নে,
রাখ।
মোনিকা অবাক হয়ে বললঃ
এত্ত!
যদিও ও মতিকে
কন্ডোম ছাড়া করতে দিয়েছে।
সে তো বারাবররই দিত।
কিন্তু মতি আজ যা
দিচ্ছে তা মোনিকা কল্পনাও
করতে পারেনি।
মতি হেসে বললঃ
রাখ, আজকাল তো তোর খদ্দের
আসে না, কাজে লাগবে।
আবার কবে আসব জানিনা।
এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি
আমি।
মতি বেরিয়ে পড়ল।
দরজা থেকে মোনিকা
বললঃ সাবধানে যেও। আবার এসো।
মতি পিছু ফিরে
আর দেখল না। সোজা
হেঁটে গলির মুখে এসে
পড়ল।
প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে
শশ্মানে গিয়ে যখন মতি
পৌঁছল তখন বেলা আড়াইটে-তিনটে। গাজনদার খোঁজ লাগাল। গাজনদার
ছেলে পঞ্চু শশ্মানেই ছিল। মতি সব
বলতে কাছেই ডোমবস্তিতে তার বাপের কাছে
সে নিয়ে গেল মতিকে।
গাজনদা মতিকে দেখেই চিনল। ‘আরে, আয় আয়’
বলে দাওয়ায় বসাল।
গাজনদার সব শুনে প্রথমে
বললঃ যা, শালা! তোর
ঘরটাও গেল। তোর মাইরি
কপালটাই খারাপ! তারপর জিজ্ঞেস করলঃ তা এখন
কী করবি কিচু ভেবেচিস?
মতি মাথা নেড়ে
বললঃ কিছুই ঠিক করতে পারিনি,
কাজকম্ম তো কেউ দেবে
না, তার ওপর এই
করোনার টাইম।তুমি যা হোক কিছু
একটা জুটিয়ে দাও। না হলে
চুরি-চামারি করতে হবে আমায়।
গাজনদা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে
ভাবল। তারপর বললঃ দেখ, কাজ
একটা আছে তবে রিস্কি...
-হোক রিস্কি, তুমি
বল না। মতি অধৈর্য
হয়ে ওঠে।
গাজনদা আবার বলতে শুরু
করে: আসলে এখন তো
রোজ প্রচুর লোক মরচে, আমাদের
এখানে ডোমের কমতি আছে। তাও
আবার আমাদের দুজন, বিশে আর বদনা,
করোনায় মরে গেল। তা
তুই কি বডি পোড়ানোর
কাজ করবি? দেখ, করোনায় মরা
বডি কিন্তু।
মতির শরীররের ভেতরটা
একবার কেমন যেন গুলিয়ে
উঠল। তারপর আস্তে আস্তে বললঃ করব, তবে
একটু শিখিয়ে পড়িয়ে দিও, ফাস্ট টাইম
তো।
-বাঃ বাঃ খুব
খুশি হয়ে বলল গাজনদা
তারপর বললঃ ও নিয়ে
চিন্তা করিস না, পঞ্চুর
হেল্পার হয়ে থাক কটা
দিন, এমনই শিখে যাবি।
মতি কিছুটা নিশ্চিন্ত
হল।
-তা থাকবি কোথায়
তুই? গাজনদা জিজ্ঞেস করল
মতিও এটাই ভাবছিল।
বলে উঠলঃ এখানেই আশেপাশে
কোথাও …
ওর কথা শেষ
হওয়ার আগেই গাজনদা বললঃ
দাঁড়া দেখছি।
বিকেল থেকে মতি কাজে
লেগে গেছে। এখন রাত প্রায়
বারোটা। মড়ার পর মড়া
এসেছে। এখনও দুটো পুড়ছে
আর তিনটে ওয়েট করছে। দুটো
বডি পুলিশ দিয়ে গেছে। বাড়ির
লোক বডি নেয়নি। করোনার
ভয়ে। একটা চুল্লি খারাপ
তাই কাঠেও পোড়ানো হচ্ছে অনেক বডি। সন্ধে
নাগাদ পঞ্চু ও অন্যান্য ডোমেদের
সাথে ঘুঘনি দিয়ে বাংলা খেয়েছে
মতি।
বিশে বলে যে
ডোমটা মারা গেছে বলেছিল
গাজনদা, তার বউও করোনায়
মারা গেছে। তাদের বছর বিশেকের ছেলে
কদমেরও করোনা হয়েছিল তবে সেরে গেছে।
কদমের ঘরেই থাকার ব্যবস্থা
হয়েছে তার। ঘরটা ঠিক
মতির সেই বস্তির ঘরের
মতোই। দরমা-মাটির দেওয়াল
আর টালির চাল। মাসে মাসে
মতি কদমকে ভাড়া বাবদ কিছু
দেবে।
পঞ্চু বললঃ যাও, মতিদা,
আজ তুমি ঘরে গিয়ে
শুয়ে পর গে যাও।
কাল সক্কাল সক্কাল চলে এস। মতি
আর কথা না বাড়িয়ে
ঘাটের সিঁড়ি ভেঙে গঙ্গায় নেমে
গেল। এতক্ষণ উত্তেজনায় ক্লান্তি ভুলে ছিল সে।
ভাল করে হাত-মুখ ধুয়ে ঘাড়ে-মাথায়ও খানিক জল দিল। মুখ
তুলে আকাশের দিকে তাকাল। একদম
কালো আকাশ। মেঘ করে কোনো
তারা দেখা যাচ্ছে না।
মনে মনে ভাবল কপাল
ভাল হলে করোনায় সে
মরবে না। যেমন সেদিন
ওই ছেলেটার ছোঁড়া গুলি তার লাগেনি।
আর ‘পূন্যি’র কাজটাই তো
সে করছে আজ। তারপর
গঙ্গার দিকে তাকিয়ে একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিঁড়ি ভেঙে
ওপরে উঠতে থাকল।
প্রকাশিতঃ গ্রাফিত্তি, এপ্রিল, ২০২২
No comments:
Post a Comment