অপারেশন ভুন্ডু # ২০২২


গল্পটা আজ থেকে প্রায় পনেরো বছর আগেকার। তখনও মোবাইল লক করে রাখার চল হয়নি।  আমি, সুজয় আর শুভ্রজিৎ হায়দ্রাবাদে সবে একটা বাঙালি পিজিতে শিফট করেছি। সাথে আর একটা ছেলেও এসেছে। তার আসল নামটা আর বলছি না কারণ পিজিতে আসার পরপরই শিবাশিসদা ওর নাম রেখেছিল ভুন্ডু।

আমরা চারজনই একই কোম্পানিতে চাকরি করি এবং আমাদের প্রথম চাকরিপিজিটার খাওয়াদাওয়া বেশ ভালই শুনেছিলাম, সত্যিই তাইপিজিটা একটা থ্রি বি এইচ কে। দুটো বেডরুমে তিনটে করে সিঙ্গল বেড আর একটা ছোট বেডরুমে দুটো।

শিবাশিসদা, সুদীপদা, বিশ্বজিৎদা আর সৌমদা পিজিতে আগে থেকেই থাকত। আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র। যাইহোক, আমি, সুজয় আর শুভ্রজিৎ একটা বড় বেডরুমে ঢুকে গেলাম।  শিবাশিসদা, সুদীপদা, বিশ্বজিৎদা আর একটাতে থাকত। তো ভুন্ডু ঢুকল সৌমদার রুমে।

এই ভুন্ডু মালটা আমার স্কুলেই পড়ত আবার শুভ্রজিৎ-এর কলেজে। আমি আর সুজয় আবার একই কলেজে পড়েছি, একই স্ট্রিমে। ভুন্ডুটা ছিল নিতান্তই মধ্যমেধার মাল আর সেই দলের যারা ক্লাশ এইট-নাইনে পড়ার সময়ও তাদের মায়েরা রোজ স্কুলে আসত আর হেড স্যার-ক্লাশ টিচারদের সাথে পি আর করত। মানে এককথায় যেরকম মালেদের আমার একেবারেই সহ্য হত না আর কি।

বিশ্বজিৎদা ছিল সব থেকে শান্ত পাব্লিক। নিজের মতো থাকত। কোনো আড্ডা-খিল্লিতে থাকত না। মালও খেত না। আর ওদিকে শিবাশিসদা, সুদীপদা, সৌমদা যাকে বলে মস্তিবাজ পুরো। আবার আমি, সুজয় আর শুভ্রজিৎও তাই। তো রোজই প্রায় অফিস থেকে ফিরে বসত আমাদের ছজনের দারুর আড্ডা।

হ্যাঁ, এখানে বলি আমরা তখন ট্রেনিং-এ ছিলামতো, আমাদের ছঘন্টার শিফটে অফিস থাকত। আমি, সুজয় আর শুভ্রজিৎ ছিলাম দুপুরের শিফটে,  দুটো থেকে আটটা আর ভুন্ডুর ছিল মর্নিং শিফট, সকাল আটটা থেকে দুটো। শিবাশিসদা, সুদীপদা, বিশ্বজিৎদা, সৌমদার রেগুলার শিফট।

আমাদের ট্রেনিং সেন্টারটা বেশ দূরে ছিল। অফিস বাসে করে ঘন্টা দেড়েক প্রায়। আবার অফিস বাসটাও যেখান থেকে ছাড়ত সেটা ছিল আমাদের পিজি থেকে প্রায় দু কিলোমিটার দূরে। যাইহোক ভুন্ডু রোজ সকাল সাড়ে পাঁচটায় বেরত। বাস ছাড়ত ছটায়। বাসস্টান্ড অব্ধি দু কিলোমিটার ছিল ওর মর্নিং ওয়াক। আমরা তিনজন ওই রাস্তাটুকু টোতেই যাওয়া-আসা করতাম।

ভুন্ডুকে নিয়ে মুশকিল হল ও একদমই মিশুকে ছিল না। 'ভালছেলে' গোছের। অথচ সেয়ানা। এমনিতে তো প্রতিদিন মর্নিং শিফটের বাহানা করে দশটায় শুয়ে পড়ত এমনকি উইকেন্ডগুলোতেও পড়ার অজুহাত দেখিয়ে আমাদের আডায় আসত না। রুমে দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। 

তো, আমরা, মানে আমরা ছজনে, একদিন রাতে মাল খেতে খেতে ঠিক করে নিলাম এর উপযুক্ত শাস্তি ভুন্ডুকে দিতেই হবে। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। সব প্ল্যান করে নিলাম। রাতেই হবে অপারেশন ভুন্ডু। তখন পুজোর পরপর। সকালের দিকে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা থাকে।

ভুন্ডু প্রতিদিনের মতো ঘড়ির অ্যালার্ম শুনে ভোর পাঁচটায় উঠল। উঠে কিছুক্ষণ বিছানাতেই বসে থেকে তারপর বাথরুমে ঢুকল। গুনগুন করতে করতে ফ্রেশ হয়ে স্নান করে বেরিয়ে ডিও মেখে ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে জুতোয় হাল্কা পালিশ মেরে পরে বেরিয়ে গেল।

ভুন্ডু বেরিয়ে যেতেই হাসতে হাসতে তার ঘর থেকে বেরিয়ে এল সৌমদা আর ওদিক থেকে শিবাশিসদা আর সুদীপদাও। হাসতে হাসতেই দড়াম করে দরজা খুলে ঢুকল আমাদের রুমে। আমরা জেগেই ছিলাম। হাসিতে ফেটে পড়লাম। আসলে ভুন্ডুর বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমরা সবাই কোনোমতে হাসি চেপে ছিলাম। সব থেকে কষ্ট করে হাসি চেপে রেখেছিল সৌমদা কারণ সে ভুন্ডুর ঠিক পাশের বেডেই ঘুমের ভান করে পড়ে ছিল। 

অতিকষ্টে হাসি সামলে সৌমদা টেনেটেনে বললঃ আরে, মালটা উঠে আবার নিজে নিজেই বলছে আজ যেন জলদিই সকাল হয়ে গেল। ভাব আর আমি হাসি চাপছি পাশে শুয়ে। 

আমি হাসতে হাসতেই বললমঃ দাঁড়াও, আগে মালটাকে ফোন করে ডেকে নিই, রাত-বিরেতে রাস্তাঘাটে আবার কোনো লাফড়ায় না পড়ে।

ভুন্ডুকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলামঃ ভাই, আজ কি একটু বেশি অন্ধকার অন্ধকার লাগছে? 

মালটা আমায় এত ভোরে ফোন করতে শুনেই অবাক। একটু সন্দেহের গলায় বললঃ হ্যাঁ, কেন জিজ্ঞেস করছিস? 

-ভাই, তুই ফিরে আয়ে এখুনি, এখন রাত সাড়ে তিনটে। বলে হাসতে হাসতে আমি ফোনটা কেটে দিলাম।

আসলে ভুন্ডু ঘুমিয়ে পড়ার পর আমরা ভুন্ডুর অ্যালার্ম ক্লক, মোবাইল, হালের ওয়াল ক্লক এমনকি সৌমদার মোবাইলটাও দুঘন্টা এগিয়ে দিয়েছিলাম। যদিও ও সৌমদার মোবাইলটা চেক করেনি তবু সাবধানের মার নেই।

ভুন্ডু ফিরে এসে হলের আলো জ্বেলেই দেখল আমরা সোফা আর চেয়ার মিলিয়ে ছজন হাসিমুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। ওকে দেখেই হাসতে হাসতে ফেটে পড়লাম সবাই। 

ভুন্ডু কিছুক্ষণ দরজার সামনে থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর অতি দুঃখে জিজ্ঞেস করলঃ আমিই কেন?

আমি হাসি থামিয়ে বললামঃ সেটা আয়নার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।

সুজয় বললঃ যা, এখনও একঘন্টা আছে ঘুমিয়ে নে গে, যা।

দিন তিনেক পর আমরা অফিস থেকে ফিরে দেখলাম ভুন্ডু তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালিয়েছে। মাসটা অব্ধি কমপ্লিট করল না! 

No comments:

Post a Comment