শার্শি ও সমালোচনা # ২০১২

বিশেষ কোনো বিষয়ে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। এটা যেমন পুরোপুরি সত্যি তেমন অনেক বিষয়ই আমার ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়, এটাও খাঁটি কথা। অনেক পরিচিত মানুষ আমায় ভুল ডেসক্রাইব বা অ্যানালাইজ করে থাকেন কারণ তাঁরা প্রত্যেকেই শুধুমাত্র আমার তাৎক্ষণিক কোনো কর্মকাণ্ডের নিরিখে বিচার-বিবেচনা করে হামেশাই এমনটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে আমি এই বিশেষ বিশেষ বিষয়গুলিতে যথেষ্ট ইন্টারেস্টেড এবং অচিরেই পারদর্শী হয়ে উঠব। কিন্তু এটা ভ্রান্ত এবং আমার কাছে না হলেও অনেকের কাছে বিভ্রান্তিকর। আবার অন্যদিকে এটাও নির্ভুল সত্যি যে 'ইন্টারেস্ট' শব্দটির একটি সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ হল 'স্বার্থ'। অস্বীকার করার কোনো ভণিতাই নেই বরং ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না বললে অনেক সময়ই অনেক কিছুতেই আমার স্বার্থ থেকে গেছে, যায় এবং যাবেও। গূঢ় ও স্পষ্ট। একদম নিজের মতো করে কোনো কিছু করে ওঠাটাই সবচেয়ে বড় স্বার্থ। আমার যেকোনো প্রকার ভালোবাসাও এর ঊর্ধ্বে নয়। তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক কর্মজীবন-লেখালিখি-চলচিত্র পরিচালনা-প্রেম-আড্ডা-জনসংযোগ সর্বত্রই এই স্বার্থবোধ বিরাজমান কারণ এসবেরই অপর প্রান্তে আমি স্বয়ং এবং ধ্রুবক। ফলতঃ যা কিছু আমার ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল এবং আজও হয় (ভবিষ্যতেও হবে) তা শুধুমাত্র আমার নিজের কারণেই। এমনই সুগভীর স্বার্থপরতা নিয়ে চলমান আমি পর্যবেক্ষণ-অনুভব-উপলব্ধি করে যাচ্ছি সমূহ বিষয়সমগ্র; জড় ও সচল। 

'দায়িত্বজ্ঞানহীনতা' শব্দটি আসলে ফেক্। কোনো কিছু আগেভাগেই এড়িয়ে যাব ঠিক করে রাখলে কার্যকালে তার বহিঃপ্রকাশেরই নামান্তর। তাই আজ অব্ধি যাঁরা আমার নামের আগে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' বিশেষণটি প্রয়োগ করেছেন তাঁদের সকলের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখি যে আমি আগে থেকেই ঠিক করে দায়িত্ব সহকারে সচেতনভাবে তাঁদের প্রার্থিত কার্যটি (মুহুর্তটি) এড়িয়ে গেছি। বিশেষত পারিবারিকভাবে তো একাধিকবার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিকভাবেও। 

অনেক সময় এমনও হয় যে পাশ কাটানোর ইচ্ছা থাকলেও কোনো উপায় থাকে না তার। ঠিক এরকমই একটা সিচুয়েশন। সেদিন। শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনে। দেবপ্রকাশ। ক্লাশফেন্ড। বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিল না, পাশ কাটানোর কারণ ট্রেন আসতে তখনও মিনিট পাঁচেক (ইলেকট্রনিক ঘড়ি অনুযায়ী) আর আমাদের গন্তব্যও একই দিকে। ফলতঃ প্ল্যাটফর্ম টু ভেস্টিবিউল। প্রায় মিনিট পনেরো। পুরোনো কথা। স্কুল-ফ্রেন্ড-টিচ্যার ইত্যাদি। আগে ওই নামল। রবীন্দ্রসদন। দেবপ্রকাশ নেমে যেতে বুঝলাম ও কিন্তু আশ্চর্য খোলামেলাই ছিল। এতক্ষণ। আগের মতই ঠিক। যাইহোক, ওর সাথে কথা বলে ভালোই লাগল। ফোন নাম্বারও দিলাম এবং সঠিক। ইচ্ছা করলেই ভুল নাম্বার দেওয়া যেত। 

অনেক লোককেই আমি ইদানীং দেখছি যে হয় তারা একজন মানুষকে প্রশংসা করে নয় নিন্দা। পুরোপুরি। এটাই এখন প্র্যাকটিস। আর আমার মত লোককে তাই হামেশাই তারা দ্বিচারী ঠাওরায়। মোদ্দা ব্যাপারটা হল, এরা কিছুতেই বোঝে না যে একজন বিশেষ কারও সম্পর্কে আমি নিন্দা করতে পারি আবার প্রশংসাও। একই সাথে। একটা উদাহরণ দেখা যাক, যেমন আমি বছরখানেক আগে এক আড্ডায় বললাম যে 'অমুক' খুবই লেখাপড়া জানা মানুষ এবং স্বজ্জন ও অতিথিবৎসল। এর কয়েকমাস পর অন্য একটি আড্ডায় হয়তো বললাম এবং ওই বিশেষ 'অমুক' সম্পর্কেই যে 'উনি' কবিতাটা ঠিক লিখতে পারেন বলে আমি মনে করি না কারণ 'ওনার' লেখায় আমি রক্ত-মাংসের 'ওনাকে' ঠিক পাই না। এর ফলস্বরূপ যেটা হল, পূর্বের আড্ডার কেউ কেউ হয়ত দ্বিতীয়টিতেও উপস্থিত ছিল, তারা সঙ্গে সঙ্গে আমার দ্বিচারিতা আইডেন্টিফাই করল এবং তাকে মনে মনে এই ভেবে জাস্টিফাইও করল যে নিশ্চয়ই মাঝের সময়পর্বে ওই বিশেষ 'অমুক' এর সাথে আমার দূরত্ব বেড়েছে, কিন্তু বিষয়টি আদপেই এমন নয়। আমার দুটি মন্তব্যই পাশাপাশি রাখার মতো এবং আমার ও 'অমুকের' মধ্যে কোনো প্রকার বিভাজন সৃষ্টি হয়নি। না তো ন্যূনতম স্বার্থহানি। ভাবখানা এমন যেন লেখাপড়া জানা, স্বজ্জন, অতিথিবৎসল হলেই কবিতা লিখতে পারা যায়! এই কারণেই আমি প্রকাশ্যে মন্তব্য করে আজকাল জলঘোলা বন্ধ রেখেছি। এইসব দ্বান্দ্বিক মন্তব্যের কারণে যেটুকু জল অলরেডি ঘোলা করে ফেলেছি তাতে অনেকগুলি জলহস্তীকে এখনও দেখতে পাবেন। ক্রীড়ারত। এদের সংরক্ষণ করা হোক। 

লেখালেখি আমি দীর্ঘদিন যাবৎ করে যাচ্ছি। নিয়মিত। অনিয়মিত। প্রায়শই। তবুও লেখালিখির তকমাটা আমার গায়ে শালের মত না জড়ানোই উচিত। কেন? এটা ঠিক যে আমি ঠিক কোনো হুজুগ থেকে লিখতে আসিনি বরং আমার লেখালেখির নেপথ্যে একটা হুল্লোড় ছিল বরাবর, আর সেটা উল্টোপাল্টা বেলেল্লাপনার চেয়ে বেশি মহৎ কিছু ছিল না যে 'হুল্লোড়' এর চেয়ে বড় কোনো আখ্যা পেতে পারে। আজ অব্ধি আমার সমস্ত লেখাই, কি পদ্য-কি গদ্য, সবই ওই হুল্লোড়েরই ধারাবিবরণী। সত্যি। প্রেম-ট্রেমও একপ্রকার হুল্লোড়; শুধু মদ-মাতালিটাই নয়। শোকপ্রকাশের মত দীর্ঘশ্বাসের প্রেম অপেক্ষা মদ্যপ অবস্থায় রাত্রে হাজতবাস ঢের বেশি উত্তেজক। আমার কাছে। তাই প্রেম বলতেই আমার রিক্সার পর্দা নামানো থেকে, ট্যাক্সির ব্যাকসিট থেকে, ছাদে ওঠার সিঁড়ি থেকে, ফাঁকা ফ্ল্যাটের নিরালা দুপুর থেকে, ডায়মন্ড হারবারমুখী বাসের একদম ফুলটুস্ মস্তির চলন্ত-ভরন্ত শরীরের রেষারেষি-ঠোকাঠুকি মনে পড়ে কেবল। যেমন মনে পড়ে উত্তর-মধ্য-দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে মায় শহরতলী অব্ধি দেদার বাংলা-বিলেতি-চোলাই এর গমগম মাথা ভর্তি নেশা আর পেয়ালাবাজির কথা। এসবই আসলি। খালি লেখাটাই যা নকলি। ওইসব হুল্লোড়গুলোর প্রতিলিপি করেছি মাত্র। টুকরো টাকরা। ভাঙা ভাঙা। এ্যাদ্দিন ধরে। আশা রাখি ভবিষ্যতেও অনুরূপ প্রতিলিপি পেশ করে কবি কিংবা গদ্যকার হিসেবে বাহবা কুড়োবো। আগেই বলেছিলাম তকমাটা বাহুল্যমাত্র। নেহাতই। 


এখানে নিজের সম্পর্কে কতগুলো জরুরী বিষয় বলে রাখা ভালো: 

ফাঁকা মাঠে গোল দিতে আমি নারাজ। শ্লাঘায় লাগে। বরং ভরা মাঠে গোল খেয়ে হেরে যেতে রাজি আছি অথবা ফাউল প্লে করে রেডকার্ড, মঞ্জুর। 

'ঢ্যামনা' বলে কেউ আমায় খিস্তি করলে আমার খারাপ লাগে। 'হারামি' বললে লাগেনা। কারণ ঢ্যামনার কোনো বিষ নেই। হারামির অন্তত হাতবাক্সটা আছে। 

পড়াশুনা বলতে যা বোঝায় তা আমার কিস্যু নেই। গত পঞ্চাশ-একশো বছরের গুটিকয়েক বাংলা বই একটু নেড়েচড়ে দেখেছি মাত্র। কুড়িয়ে বাড়িয়ে সামান্য কিছু ব্যবহারিক জ্ঞানই যা আমার সম্বল। এই নিয়েই রোজ কেনাবেচা চালিয়ে যাচ্ছি। হরেক হাটে। 

'অ্যাম্বিশাস' বলতে যা বোঝায় তা আমার কোনোদিনই আর হয়ে ওঠা হল না। আগামী বছর থেকে 'হব হব' করে অনেক বছর গত হয়েছে। নতুন করে আর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে তা প্রতারণা হবে।

'সময়ানুবর্তিতা' নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। যেমন কর্মস্থলে তেমনই বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে। সমস্ত অভিযোগই সঠিক কারণ ওই প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে আমার সময় কখনও আসেইনি।  

আমার প্রত্যেকটি 'ভালোবাসাই' শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে পর্যবসিত। এর কারণ আর কিছুই নয় আমার উত্তেজনা। উদাসীন হওয়া আমার দ্বারা সম্ভবপর নয়, আর উদাসীনতা কোনো অভ্যাস নয় বরং একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যা আমার নেই। 

'কর্তব্য' কথাটা শুনলেই আমার হাসি পায়। তাই 'কর্তব্যপরায়ণতা' নিয়ে কথা উঠলেই এড়িয়ে যাই। আজকাল। আমার মনে হয় 'কর্তব্য' আর 'অজুহাত' এই দুই এর অক্ষবিন্দুতে মূলতঃ আমাদের অবস্থান। সারাজীবন ধরে এই একটিই গ্রাফচিত্র। ওঠা-নামা করে। 

বারবার যদি কেউ আমার একই খুঁত ধরে আনন্দ পায় তাদেরকে উপেক্ষা করার চেয়ে আনন্দ আমি আর কিছুতেই পাই না। এটা একপ্রকার নির্লজ্জতা জানি। কিন্তু সবক্ষেত্রে লজ্জা পেলে জীবনের অনেক আনন্দ মাঠে মারা যেতে পারে। এটাও ঠিক। 

প্রয়োজনে যেসব পরিচিত মানুষজন পাশে থাকে না আমি তাদের 'বন্ধু' আখ্যা দিই না কারণ দেখা গেছে মানুষ তখনই যুথবদ্ধ হয়েছে যখন তাদের কোনো না কোনো প্রয়োজনীয়তা এসেছে। আর আমার প্রয়োজনে সুসংবদ্ধ হতে চাইলে যারা এল না তারা আমার থেকে বিচ্ছিন্ন বা আমরা যারা সুসংবদ্ধ হলাম তাদের থেকে। তা যে বিচ্ছিন্ন সে কী করে কাছের হয়! বন্ধু হয়! আদপে 'হাতিয়ার' (যে কোনো প্রকার) ছাড়া মানুষের কোনো বন্ধু নেই। বিপদকালে যে কোনো কিছুই প্রকৃতিগত ভাবে আমরা 'হাতিয়ার' রূপে ব্যবহার করে থাকি। বিপদ বা নিজেকে, যে কোনো একটাকে, ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। সুতরাং 'প্রকৃত বন্ধু': হাতিয়ার।


রচনাকাল: ২০১২

মিনিবুক: এই চলছে, জানুয়ারি, ২০১৩


No comments:

Post a Comment