অফ দ্য ট্র্যাক # ২০০৭

এক


রেবেকা চলে গেল। চলে যাওয়ার আগে কত কিছুই যে সে বলে গেল যা এতদিন ইভানের অজানাই ছিল! ইভান চুপ করে শুনে যাচ্ছিল। হার্টবিট্ বোধ হয় চাপা ছিল খানিকক্ষণ। আবার ধক্ করে লাফিয়ে উঠে চলতে থাকল। লতির কাছে শিরশির করেছিল। যাইহোক, রেবেকা হঠাৎ উঠে চলে গেল। যাওয়ার আগে একবার 'আসি' বলেও গেল না।

ইভান দাঁতে চেপে একটা সিগারেট ধরাল। হুস্ করে ছাড়া নীল ধোঁয়াটা এমার্জেন্সি আলোয় স্পিন করে ছড়িয়ে পড়ল। বস্তুত রেবেকা অন্ধকারেই চলে গেল। ইভান একবার বারণও করল না।


ইভান উঠে বারান্দায় গেল। গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। আসলে রেবেকা যা যা বলল তাতে আদৌ ইভানের কিছু যায় আসে কিনা ইভান তাই ভাবতে থাকল। রাতের বেলায় হঠাৎ করে রান্নাঘরে বাসন পড়ার শব্দ হলে যেমন ঘুম ভেঙে লোকে কিছুক্ষণ চুপ মেরে কাঠ হয়ে থাকে। তারপর জড়ানো গলায় 'কে কে' বলে ওঠে আর পরে দেখা যায়, আরে এতো বেড়াল। রেবেকার কথাগুলোর ব্যাপারেও ঠিক তাই। ইভান কিছুক্ষণ চুপ মেরে ছিল। সিগারেটের ধোঁয়াটা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে লাংস্ ও মাথা দুটোর চাপই কমে আসে।


দুই


ইভান পাশ ফিরে শুল। ঘুমের মধ্যে তার মুখ দিয়ে লালা পড়ে। বড় বাজে হ্যাবিট। তবে বহুদিন তার নাইটফলস্ হয়নি। অ্যাটচড্ বাথের মেঝেতে পর্দার ফাঁক দিয়ে হলুদ একটা আলোর বিম্।


ইভানের তন্দ্রা এসেছিল। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল। রেবেকা। ইভান কানে দিল। 

  • সব শুনে কী মনে হল? রেবেকা টানটান গলায় জিজ্ঞেস করল, যেন পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে।

  • চাপ নেই, এতো হতেই পারে। আর ও হ্যাঁ, প্রকাশভঙ্গি যথেষ্ট স্বাভাবিক ছিল।

  • তাহলে রাখছি। ঠাণ্ডা মাথায় ঘুমো। বাই, গুডনাইট। রেবেকা ফোন কেটে দিল।

ইভান কথাগুলো আবার ভাবতে থাকল এবং আবারও ও কোনো অসঙ্গতি পেল না। 

ইভান এবার সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল। যেন এই ফোনটার জন্যই এত রাত অব্ধি জেগে থাকা।


তিন


অনেক উঁচু খোলা ছাদ। শহর ছোট হয়ে আসছে। বাইপাসের শেষ সীমায় মানে এক্সট্রিম সাউথ জোনে এই সুউচ্চ মিনার। পাশাপাশি রেবেকা ও ইভান। ঘরঘর শব্দে একমাত্র লিফট নেমে গেল। বলা যায় ইভান ও রেবেকা কিংবা রেবেকা ও ইভানকে কিছুসময় একা ছেড়ে গেল।

ইভান একবার তাকাল খুব সাবধানে নিচু চোখে। মাথাটা ঘুরে গেল। ভার্টিগোটা আবার চেপে বসছে। সিকিম থেকে ভুটানের রাস্তায় সেই উঁচু ব্রিজে যেমনটা হয়েছিল। ইভান চোখ বুজে ফেলে।

  • ইভান, ভয় করছে? রেবেকার ঠোঁটে হাসি।

ইভান চোখ খুলল। রেবেকা ডাকছে। ইভানের হাত ধরে নিয়ে যেতে থাকে ক্রমশঃ ধারের দিকে। একটু একটু করে। 

শেষ সীমায় এসে ইভানের কাঁধে চাপ দিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর করে শরীরটা তুলে দুই ঠোঁট দিয়ে ইভানের ঠোঁটটা চেপে ধরে রেবেকা।

ইভান ওর কোমর জড়িয়ে ধরে। দাঁতে দাঁতে লাগছে, ইভান বোঝে।

হঠাৎ ইভানের হাঁটু ধরে যায়। ও একটা ঝট্কা মারে। রেবেকার গোড়ালি স্লিপ করে আর ইভান দুপা সরে এসে ধপ্ করে বসে পড়ে।

রেবেকা কোনো শব্দ করে না। স্রেফ ওর শরীরের ঝাঁকুনিটা দেখে ইভান।

রেবেকা পড়ে গেল।

ইভান শুনতে পেল ঘরঘর শব্দে লিফটটা আবার উঠে আসছে।

ঝট্ করে উঠে বসে ইভান। বুকের কাছটায় চাপ ব্যথা। গলা শুকিয়ে কাঠ। 


কুলকুল করে ঘামছে। ওফঃ বীভৎস। এত দ্রুত ঘটে গেল সবকিছু। ইভান হাঁফাতে থাকে। মশারি খুলে বাইরে এসে টেবিল থেকে বোতলটা তুলে ঢক্ করে জল খেতে থাকে, মুখ লাগিয়ে।

আজ আর ঘুম হবে না।


চার


ইভান উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা আস্তে ভেজিয়ে দিল যাতে কোনো শব্দ না হয়। উল্টোদিকের পোস্টের আলোটা বড় বিব্রত করছে। আলোর শেডে একটা কাক কী করে আশ্চর্য তার বাসার বাইরে এসে ইভানের মতোই একা ঝুঁকে আছে রাস্তায়! ইভান ভাবে এভাবে কারা কারা কত আশ্চর্য কারণে রাত জাগে। ঠক্ ঠক্ শব্দ হয়। ইভান বোঝে পাহারদার সেলিম পাশের গলিপথে হেঁটে যাচ্ছে। তাকে দেখা যায় না। যতক্ষণ তার লাঠির শব্দ হয় ইভান স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। শব্দ মিলিয়ে গেলে ফস্ করে একটা সিগারেট ধরায়।


আসলে রেবেকা যা যা বলল তা এত দেরিতে কেন বলল? সে কি ইভানকে পরখ করে দেখে নিচ্ছিল যে আদৌ তাকে বলা যায় কিনা? নাকি চেপেই যাবে ভেবেছিল? হঠাৎ স্পার্কের মতো ইভানের কোনো কথা মনে লাগায় হড়হড় বমির মতো সব উগরে দিল। কে জানে! ইভান বারবার পুরোটা হিসেব করে যাচ্ছিল। ইভান কিছুই স্থির করতে পারল না। 

হাতে তাপ লাগতে তার মগ্নতা ভাঙে। শেষ টানটা বড় লোভের। নাক দিয়ে ছাড়ে ইভান ধোঁয়াটা। না, আর ভাববে না। রেবেকা বলেছে এটাইতো অনেক। কত কিছু অজানা থেকে যায় কত কত বছর গা ঘষাঘষির পরও। তবে! এতো অতি অল্পেই অনেক বড় প্রাপ্তি। স্বাভাবিকভাবেই যেন একটা নদী সঞ্চিত সব পলি ঢেলে দিল মোহনায়। এবার সাগরে মিশবে।


লোমপড়া কুকুরীটা বারান্দার নিচে। অন্য সময় হলে ইভান তাড়াত। কিন্তু এই রাত তিনটেয়। থাক্। কুকুরীটা গা ঝাড়া দিল বারকয়েক। একটা ঘেয়ো যেয়ো মাংস পিণ্ড খানিক দুলে দুলে থামল যেন। ঘাড় উঁচু করে ইভানকে দেখল। হঠাৎ কাঁদতে থাকল। অসহ্য ও বেদনাময়। এই রাতদুপুরে এসব অশুভ। অমঙ্গল।

ইভান ব্যালকনি থেকে সরে এল। দরজা বন্ধ করে একটু জল খেয়ে শুয়ে পড়ল আবার। তখনও একটানা কুকুরীটা কেঁদে চলেছে....


পাঁচ


ইভানের ঘুম আসে না। শুয়ে শুয়ে ভাবে, এতক্ষণ সে যা যা ভেবেছে তাতে রেবেকার ব্যাপারটাই প্রাধান্য পেয়েছে। এই যে রেবেকা যা যা বলল থেকে শুরু করে রেবেকা দেরিতে কেন বলল অথবা দেরি হলেও তো রেবেকা বলেছে- সবইতো রেবেকার দিক থেকে। কিন্তু সেই তো সব শুনেছে তবে সে এত অফ দ্য ট্র্যাক হয়ে গেল কী করে? তার রিয়‍্যাকশন এত নিষ্প্রভ ছিল কেন? সে চুপ করে থাকলেও পরে রেবেকার ফোনে কিছু তো বলতেই পারতো! শুধু ‘চাপ নেই, এতো হতেই পারে’ এটাই কি যথেষ্ট ছিল? তবে তারপরও তার স্বপ্ন কিংবা দীর্ঘ এই ভাবনাপীড়ার কারণ কী? স্বপ্ন সে দেখেছে এবং তার সামান্য আগে রেবেকার সাথে তার স্বল্প কথোপোকথন হয়েছিল। তবে তারপর তো তার ঘুম গভীর ছিল না। না হলে স্বপ্ন কেন! তার মধ্যে এক তীব্র ডায়লামাও তো সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। অতএব ইভান বোঝে তারও কিছু বলার ছিল, অন্তত রিয়্যাকশন হিসেবে, আর এই না বলে উঠতে পারাটাই তাকে আরও গভীর কোনো ডায়ালামার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।


ইভান ওঠে। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালে। ভাবে, তার এক দীর্ঘ সঙ্গমের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে এবং অতি অবশ্যই রেবেকার সাথে। এরপর, সাময়িক এই অবদমন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য প্যাড থেকে পাতা ছেঁড়ে এবং হড়হড় করে লিখতে থাকে…


কাল কোনো এক সময়ে এবং অতি অবশ্যই সঙ্গমোত্তর পর্বে এই চিরকুট রেবেকাকে দিয়ে দিলেই চলবে। 



রচনাকালঃ ২০০৭

বইঃ নেপোলিয়নের নববর্ষ, জুলাই, ২০০৮


No comments:

Post a Comment