কিছু মন্ত্র জেগে আছে। দেওয়ালে দেওয়ালে শ্লোগান। কার্নিশ থেকে নুন ঝরে। শ্যাওলার স্তর নালা ঘেঁষে। কফ, থুথু ও বমি। মাতাল পা চলে যাচ্ছে এ কোন সুড়ঙ্গের দিকে! যেখানে মেছোগন্ধী, চামড়ার ব্যবসা সব। ত্বক থেকে মৃদু মৃদু ঘাম। রেডিওয় ‘বাবুজি, জারা ধীরে চলো’… হু হু করে বাড়ছে রাতের পারদ। আঙুলে আঙুল ঘষাঘষি, আঁচড় আর থতমত চুম্বন।
এক শরীরি সার্কাস থেকে ফিরে ফিরে আসা এইসব গলিপথ। এই শীতের দুপুরগুলো। এক চাপড় মেরে চমকানো মাংসস্তর আর নেশা নেশা আতর। পানের কষে লাল হয়ে থাকা ঠোঁটের রং। জৌলুসে দাম বাড়ে। বয়স শুধু গন্ধ চিনে নেয়। এ পথ বড় পিচ্ছিল আর জেগে থাকে উল্লাস।
স্নায়ুকে স্নায়ুতে ধ্বনি। শীৎকার বুনে নেওয়া যায়। আঁকড়ে থাকা জীর্ণতা ক্রমশঃ মলিন হয়ে থাকে। চোরা চোরা গলি ঘিরে ফেলে। এক অন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে রঙের দুরন্ত ঝিলিক। গাঁজার খোঁজ থেকে ভেসে আসে অন্য এক গলি আর বাজার বসে যায় আনাজপাতির। ভোর হয়ে আসে।
লক্ষ্মী দুলের বয়স বেড়েছে। দরমার কাজে সে নিপুণ হয়েছে। একলা পাহারা দেয় এই গলিপথ। এখানকার প্রতিটি রাতের হিসাব রাখে। কোন ঘরে কোন হারানিধি তার দলিল থাকে তার কাছে আর চুরি যায় ইতিহাস। থামের গায়ে হ্যালান দিয়ে প্রহর গোনার বাতিক তার। শতাব্দীর গণনা করে।
ওপাশে নেপালী পল্লী। চিৎপুর খুব কাছে। গিরিশ ঘোষের বাড়িও। হেঁটে হেঁটে গঙ্গা। উত্তাল হাওয়ায় এক কামনা ভেসে আসে। এক বাঁশিতে যেন ফুঁ পড়ে আর গুটিয়ে যায় শোভাযাত্রা এই শোভাবাজারে।
ক্লান্ত বিপন্নতা ঢেলে দেওয়া যোনি পথে কী অপরূপ হয়ে আসে। কেমন এক স্নান স্নান গন্ধ। সন্ধ্যারতি হয় কোথাও কোথাও।
আনন্দ কি অক্লেশ? কেন এই মায়াপুরী? ঘোর কাটলেই যেখানে ঘোর পূর্ণিমা। গনিকার সাথে কেটে যাওয়া বিছানা। তেলের সুগন্ধ থাকে বালিশে।
চুর মাতালের এইসব গলি। বেনিয়ম আর স্নায়ুদোষ। বসন্তের শেষ সন্ধ্যাগুলি বড় বিষণ্ণ কেটে যায়। একবার সন্ধ্যাস্নান সারা হলে পর দরজার পর দরজা বন্ধ হয়। তারপর খুলে যায় শরীরের নিপুণ রীতি ও ভাষা।
ভাঙা ভাঙা আলো সব। বাতিদান আর শার্শি। কোথাও কোথাও আলপনা। দরজা-দালান সব নিকোনো হল। স্নানঘরে মৃদু মৃদু জলের শব্দ, এইখানে। এইখানে।
এইখানে ডুবে আছে শরীরের ইতিহাস, ঘামে আর ঘিলুতে।
রচনাকাল: ২০০৫
বই: কলকাতা ব্লুজ, জুলাই, ২০০৯
কলকাতা ব্লুজ বইতে লেখাটার শিরোনাম ছিল ‘ছোড় আয়ে হম ও গলিয়াঁ’
No comments:
Post a Comment