কলকাতা ব্লুজ # ২০০৯

যেন আজ ভুলে গেছি প্রিয় ফুল


তালু থেকে পিছলে গেল এক ঘুরন্ত উল্লাস যখন শান্ত সন্ধ্যা নামছে ক্যাথিড্রালে। সামান্য মোমবাতি জ্বলে আর কালো গাউন পরে কেউ উঠে আসে সেন্ট পলস্ এর বুকের ভেতর আরও। তার বিবর্ণ পায়ে পায়ে ফরাসি গন্ধ; কস্তুরী ধুলো। যেন জকিরা ফিরে গেছে যে যার তাঁবুতে। তখন:


ঋজু এক ফাদার মনে পড়ে 

বৃষ্টির গির্জায় 

যেন এক ম্যাজিক হয়ে আছে

বন্‌ধের রাস্তায়


না, আদপেও বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস ছিল না অথবা ছিল না কোনো হরতাল। এসময় রোগের কিছু পথ্য কিনি।


নিয়ন জ্বলে আছে অমূল্য ঔষাধলয়। ওদিকে দানা দানা বেকবাগান। অতএব, আবারও ক্লান্তিহীন ফয়েল। শূন্য উড়ে চলে। 

সারারাত বুঁদ হয়ে বসে থাকে আস্ত সিমেটারি। কারা সব উঠে আসেন, যখন উপড়ে নেওয়া হচ্ছে স্ল্যাব-ফলক-এপিটাফ আকণ্ঠ মধ্যরাত জুড়ে...


এক বাঁক ঘুরে ধুলোর গন্ধ 

যেন ঘুম নিয়ে চলে গেছে ট্রামগাড়ি 

বিষণ্ণ বিজয় জেগে আছে

মিনারের গায়ে



হু হু বুকে পরাগচিহ্ন স্থির 


মায়া ভোর। আমার ঘুম গলে গলে আসে। একে একে ক্রিয়াপদ জমে। ব​ড় সাগরিকা মনে আসে। মনে আসে ওর পলকাটা হাসি। স্নায়ু-রোম-গ্রীবা-কমনীয় ত্বক। যেন ও এই বাহুতে ঘুরে গেল… 


আরামবিন্দু ঝরে গেল​

উরুর পাশে জেগে আছি

ভাঙা উৎসব​


এভাবে আমাদের গল্পগুলো ঘুমঘোরে বলে গেল গান। 



জেগে আছে চাঁদ কোজাগরী রাতে


'ক্রীড়া ক্রীড়া' সেই ডাক 

আর ফালি চাঁদ উঠে এল রেখায় 

বাকী অংশ আছে জরুলচিহ্নে


এভাবে জন্মদাগ ধরে ধরে মাথা কুটে যাচ্ছি। যখন এক অনন্ত ঘূর্ণি থেকে বরানগরের ঘর-বাড়ি-চৌকাঠ সব ফিকে হয়ে গেছে লক্ষ্যণীয় বিতৃষ্ণায়, জ্বর-ভ্রম নিয়ে তুরীয়ানন্দ হাতড়ে চলেছি সামগান, তখন সমাগত ভিক্ষু দেখি; দেখি তাদের অপূর্ব সমাবেশ। নাদ উঠে আসে কি কোথাও যখন সিনা ভেদ করে ঢুকে গেছে অমূল্য শিশুকাল! 


এমত বনেদী বাড়িতে ঘোর

যেন বা আরামকেদারা


ঠাকুর্দা গত হয়েছেন। বিকলাঙ্গ বাম হাত ছিল তাঁর। চুলে আমার বিলি কেটে যেত সারারাত। পূর্ববঙ্গের মতো কোনো গন্ধ ছিল তাতে। আমিও তো রাজশাহী-নাটোর দেখিনি কখনও আর বাবাও তো ঘুরে ফিরে সেই দেশান্তরী। এলো রোদে দেখি শুদ্ধ পরিবারপ্রণালী। ধ্রুব ও আহত।


ওখানে যে চিলে 

তাতে কোঠা তুলে কেউ 

আশৈশব যত বিরল অণু 

তার ক্রম দেখছে 

আর নুন ধরে ভিজে আছে 

পুরোনো তোষক



ওইখানে পড়ে আছে গৈরিক বাঁশি 


ঘোর তন্দ্রায় জেগে আছে মালগাড়ি

ট্র্যাকে রয়েছে আমারই ডেনিম

আমারই ব্লুজ 


হাঃ হাঃ হাসিতে কি ক্লান্ত গভীর সন্ধ্যা নেমে আসছে। হু হু ভেসে যাচ্ছে রোপণের কাল। গাঢ় নীল ধোঁয়ায় ফুটে আছে ধুতুরা আর তার বিষ। ঝরে যাচ্ছে এক অদম্য বসন্ত আর উল্লাস ভেঙে যাচ্ছে শিরদাঁড়া বরাবর…


আবারও সিগনাল গ্রীন। ঝমঝম করে ঢুকে আসছে আপ ডানকুনি লোকাল আর তীব্র আলোয় ঝলসে যাচ্ছে রেলপোষ্ট-ট্র্যাক-গ্রানাইট-প্ল্যাটফর্ম এবং আমাদের উল্লম্ব যত চলাচল পদ্ধতি।


ওইখানে পড়ে আছে গৈরিক বাঁশি 

পঞ্চমুখ আর বিষণ্ণ তামাক


এ এক আজিব কিস্যা; দিল্লি রোড কা কিস্যা। পুরানি বাত হ্যায় সাহাব, ছোড় দিজিয়ে… 



রচনাকাল: ২০০৯

বই: কলকাতা ব্লুজ, জুলাই, ২০০৯


No comments:

Post a Comment