কমরেড নয়ন # মে, ২০২২




প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি, ২০২৫

প্রকাশক: হপ্তাক কাচরা

মুখবন্ধ

আমার শিশু-কিশোর-যুবাবেলা কেটেছে এক মফস্বলি পাড়ায়। 

সেই পাড়া ও সংলগ্ন অঞ্চলের বাস্তবতার স্মৃতি ও আমার কল্পনা মিলেমিশে এই আখ্যান।

কল্পিত এই চরিত্র ও তার কাল্পনিক স্থান-কাল।

হয়তো, তেমন কোনো বিশেষত্বনেই এদের মতো চরিত্রদের। 

তবুও অলীক কোনো না কোনো পাড়ায় এরা নিজেদের মতো বেঁচে থাকে। মারা যায়।


উৎসর্গ

হোলটাইমার ঁবিলুদা'কে

এই আখ্যানের সামান্য বাস্তব অনুপ্রেরণা



এক


শেষরাতে হিসু করতে উঠে নয়ন দেখল বাথরুমের বাল্বটা কেটে গেছে। উঠোন-বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে আছে চাঁদের ফিকে আলো। নয়ন দরজাটা আর বন্ধ করল না। ওই আলোতেই ঝাপ্সা সাদা রঙ ঠাওর করে ঠিক কমোডের ভেতর হিসু করতে থাকল। খালি গা। পায়জামাটা লুটিয়ে আছে পায়ের পাতায়। লম্বা ছিপছিপে চেহারা। 


হিসু করে, পায়জামা পরে, হাত ধুয়ে সরু লাল সিমেন্ট বাঁধানো টানা বারান্দা দিয়ে হেঁটে তার ঘরে আসতে আসতে নয়ন ‘উফঃ’ করে মৃদু আর্তনাদ করে উঠল। বারান্দার জায়গায় জায়গায় খুবলে গেছে। তারই একটায় বাঁপায়ের বুড়ো আঙুলটা ঘষটে গেছে। ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ আঙুল চেপে বসে থেকে একটু জল খেয়ে আবার শুয়ে পড়ল।


নয়নদের বাড়িটার বয়স প্রায় আশি। মানে একতলাটার। পাড়ার এককোনায়। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভেতরের রং কিছুটা থাকলেও বাইরের সব উঠে গেছে। বেশ বিরক্তি ধরানো শব্দে লোহার গেট খুলে চিলতে উঠোন। মাঝখানে তুলসীমঞ্চ। বাঁহাতে সরু টনা বারান্দা ধরে দুটো বড় বড় ঘর। ডাঁয়ে ঘুরে ভাঁড়ার ঘর, সিঁড়ি, রান্নাঘর আর বাথরুম। নয়নের ঠাকুর্দা যখন এই বাড়িটা করে থাকতে শুরু করে তখন তার বড় ছেলে, নয়নের জ্যাঠা, আড়াই বছরের খোকা আর ছোট ছেলে, নয়নের বাবা, মায়ের পেটে। তার পিসির জন্ম এই বাড়িতেই। বিয়ে করার আগ দিয়ে জ্যাঠা দোতলায় একটা ঘর আর বাথরুম করে। জ্যাঠতুতো বোন রিংকু হওয়ার পর করে আর একটা ঘর। জ্যাঠতুতো দাদা টিংকু তখন ছয়ে পড়েছে আর নয়ন চারে। দোতলার বাকি জায়গাটা নিয়ে ডাইনিং। তিনতলায় কয়েক বছর হল টিংকু অ্যাটাচ্ড বাথরুম নিয়ে একটা ঘর করেছে।  


লোক বলতে তারা পাঁচজন। দোতলায় তার বিরাশি বছরের জ্যাঠা। ইদানীং শয্যাশায়ী। ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হয়। জ্যাঠতুতো দাদা টিংকু আর তার বউ নুপুরবৌদি। তিনতলার ঘরটা তার ভাইজি তুলির। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। একতলার পেছনের দিকের ঘরটায় থাকে নয়ন। এই ঘরটা প্রথমে ছিল তার ঠাকুর্দা-ঠাকুমার। তার পরে থাকত তার মা। প্রায় দুবছর হল তার মা মারা গেছে। করোনার প্রথম ধাক্কায়। রিংকুর শ্বশুরবাড়ি পাড়াতেই। সামনের ঘরটায় কেউ থাকে না। ওটা পাড়ার সুপ্রিয় মাস কয়েক হল ভাড়া নিয়েছে। ওর নাটকের দল আছে। প্রতি মঙ্গল-বৃহস্পতি রিহার্সাল করে। সাড়ে চারটে-পাঁচটায় আসে সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ চলে যায়। পরিষ্কার করার দায়িত্ব ওদেরই। একজন ঠিকে কাজের লোক আছে সে দোতলা আর নিচে রান্নাঘরটুকু পরিষ্কার করে। 


নয়নের যখন দশ বছর বয়স তখন তার ঠাকুর্দা মারা যায়। লিভার ক্যান্সারে। সে ছিল রিটায়ার্ড ব্যাঙ্কার। এর দুবছর পর আকস্মিক ভাবে লরি চাপা পড়ে মারা যায় তার বাবা। সামান্য টাইপিস্ট ছিল সে। কোনোমতে দিন গুজরান হত। এর বছর চারেক বাদে ব্লাড ক্যান্সারে মারা যায় তার জেঠিমা। ঠাকুমা দীর্ঘজীবি থেকে যখন মারা গেল তখন নয়ন তিরিশ পেরিয়েছে। সেই অর্থে তার ও তার মায়ের ভরণ-পোষণ চালিয়েছে তার জ্যাঠা। 


নয়নের জ্যাঠা একটা মার্চেন্ট অফিসে বড় চাকরি করত। টিংকুকে ওখানেই মাঝারি পোস্টে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। নয়নকেউ চেয়েছিল কিন্তু সে রাজি হয়নি। নয়ন সিপিএমের হোল-টাইমার। মাস গেলে চার-পাঁচ হাজার পায়। বার কয়েক লিকার চা ছাড়া আর কোনো নেশা নেই। প্রতি মাসে দু-আড়াই মতো সংসার খরচা হিসাবে নুপুরবৌদির হাতে দিয়ে দেয়। ব্যাস, দুপুরে-রাতে খাওয়-দাওয়ার আর চিন্তা থাকে না। তাদের বাড়িতে আজও একই হাঁড়ি। জ্যাঠা মরলে হয়তো তা আর থাকবে না। হয়তো ফ্ল্যাট হয়ে যাবে বাড়িটা। ইদানীং রান্নাবান্না পুরোটাই দেখে নুপুরবৌদি। আগে দেখত মা। জ্যাঠার জন্য দিনের বেলা একজন আয়া রাখা হয়েছে। খরচ বেড়েছে। তাই নয়ন তার ঘর ছেড়ে মায়ের ঘরে চলে গেছে। সামনের ঘরটা থেকে ভাড়া বাবদ হাজার দেড়েক আসে তাদের সংসারে।


সামান্য আয় হলেও নয়ন সবসময় পরিস্কার-টিপটপ থাকে। রোজ সাবান দিয়ে স্নান করে। গরমকালে দুবার। হপ্তায় তিনবার শেভ করে। একদিন অন্তর শ্যাম্পু করে। মাত্র তিন-চার পিস থাকলেও এক পাঞ্জাবি-পায়জামা দিন দুয়েকের বেশি পরে না। গরমকালে একদিন। আর জাঙ্গিয়াতো রোজই বদলায়। প্রতি হপ্তায় বদলায় বিছানার চাদর আর বালিশের কভার। জামা-কাপড়-চাদর-কভার সব সস্তার ডিটারজেন্টে সে নিজে হাতে কাচে। মাসে একবার ছোট করে চুল ছাঁটায়। দুবার নখ কাটে। হপ্তায় দুদিন ঘর আর বাথরুম পরিষ্কার করে। 


সকালে ঘুম থেকে উঠে চা খেয়ে, পটি করে, চোখ-মুখ ধুয়ে, রেডি হয়ে পার্টি অফিসের চাবিটা নিয়ে হাওয়াইজোড়া পায়ে গলিয়ে নয়ন প্রতিদিনের মতো সাড়ে নটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। পাড়ার মোড়ের কাছে তাদের পার্টি অফিস। পাশেই ন্যড়ার চায়ের দোকানে ঘুগনি-রুটি কিংবা পরোটা-আলুর দম খেয়ে পার্টি অফিস খুলবে। খোলা-বন্ধ-ঝাড়-পোঁছ সব তারই দায়িত্ব। পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নয়ন প্রাণভরে এই দায়িত্ব পালন করে আসছে। আরও কিছু দায়িত্ব আছে তার। যেমন পাড়ার কয়েকটা বাড়িতে গণশক্তি দেওয়া। মোড়ের মাথায় গণশক্তি সাঁটা। ক্যাডারদের চাঁদা আদায় করা। এইরকম। আর ভোটের আগে তো কথাই নেই! বাড়ি বাড়ি ইস্তেহার বিলি, দেওয়াল লিখন, পোলিং এজেন্ট হয়ে বুথে বসা এরকম আরও অনেক কাজ থাকে তখন। ঢিল ছোঁড়া দূরেই তৃণমূলের পার্টি অফিসটা।


সেই সতেরো বছর বয়েসে সুকুমারদার হাত ধরে তার বামপন্থী রাজনীতিতে পা রাখা। সুকুমারদা তাদের কলেজে এসএফআইয়ের সেক্রেটারী ছিল। সুকুমারদা মারা গেছে অনেকদিন। সত্যিই আদর্শবাদী লোক ছিল একটা। তার খানিকটা হয়তো নয়নও পেয়েছে। কোনো লোভ নেই। শুধু মনপ্রাণ দিয়ে পার্টি করে যাওয়া। পার্টিই তার সব কিছু। পাসকোর্সে গ্র্যাজুয়েট হয়েও সে কোনোদিন কোনো চাকরি করেনি। ভাবেইনি। বিয়ে তো দূরের কথা কোনোদিন কোনো সম্পর্কেই জড়ায়নি সে। অটলভাবে একাগ্রচিত্তে পার্টি করে চলেছে। কাস্তে-হাতুরি-কোদাল-বেলচা কোনোটাই কোনোদিন হাতে না নিলেও আজও একই রকম গর্বে ও যত্নে হাতে তুলে নেয় পতাকা আর ইস্তেহার। সেই যুবা বয়স থেকে আজ অব্ধি ওয়ার্ড কিংবা অঞ্চলের দীর্ঘ থেকে ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসা প্রত্যেক মিছিলে সামনের দিকেই থেকে এসেছে বরাবর।


বছর পঞ্চাশের ছিপছিপে-লম্বা শরীরটা টানটান রেখে মাথা উঁচু করে পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়, পার্টির এই একনিষ্ট হোল-টাইমার, কমরেড নয়ন।


দুই


আজকাল পার্টি অফিস বেশিক্ষণ খোলা থাকে না। সকালে দশটা থেকে বেলা একটা-দেড়টা। আর সন্ধে ছটা থেকে রাত আটটা-সাড়ে আটটা। স্ট্যালিনের ছবিটা মুছতে মুছতে নয়ন ভাবছিল দশ-বারোটা বছর আগে আগে পার্টি অফিসটা সবসময় গমগম করত। বছর পাঁচ-ছয় আগেও অন্তত গোটা ছয়-সাতেক চেয়ার পাতা হত আর এখন রেগুলার বলতে মিহিরদা, এক্স-কাউন্সিলর রথীন মিত্র আর সে। মাঝে মধ্যে সজল কিংবা বিশু। দশটা প্লাস্টিকের চেয়ার দুটো সেটে ধুলো গিলছে। রোজ হয়ে ওঠে না তবে হপ্তায় বার দুয়েক অন্তত নয়ন ধুলো ঝাড়ে। 


মিহিরদা এসে পড়ল খানিক বাদেই। গণশক্তির কপিগুলো নিয়ে নয়ন পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। মোড়ের মাথায় তদের বোর্ডে সাঁটবে এক কপি। তারপর যাবে বাড়ি বাড়ি দিতে। 


গনশক্তিটা প্রণবদার বাড়িতে দিয়ে রাস্তায় পড়তেই পাশ দিয়ে মোটরসাইকেল চেপে শ্যামল হুশ করে বেরিয়ে গেল। শ্যামলকে দেখতে পেয়ে নয়ন বিরক্ত মুখে ও মনে হারুদার বাড়ির দিকে চলল। শ্যামল পাল্টি খাওয়া মাল। প্রোমোটিং করে। তাদের জমানাতেও কন্সট্রাকশন তুলেছে, এখনও তুলছে! এখন তো শুনছে নাকি বেলঘরিয়াতেও! আগে নয়ন তাকে ভাবত কমরেড-বন্ধু। কত মালই যে পাল্টি খেল লাস্ট দশ বছরে! কতজনই যে ঘরে ঢুকে গেল! আর কতজনই যে আর মেম্বারশিপ রিনিউ করল না! এইসব ভাবতে ভাবতেই হারুদার বাড়ি পৌঁছে গেল।


ভেবেছিল গণশক্তিটা দিয়ে দরজা থেকেই বিদেয় নেবে কিন্তু হারুদা ছাড়ল না। ‘আরে নয়ন, বোস না, এক কাপ চা খেয়ে তারপর যাবি।’ অগত্যা নয়ন ভেতরে ঢুকল।  ‘বোস, বোস” বলে একটা হাতল ভাঙা কাঠের চেয়ার দেখিয়ে দিল। নিজে বসল চৌকিতে। আর একটা ছোট্ট ঘর আছে বাড়িতে। অবস্থা ভালো নয়। সেই কবে হারুদার কারখানায় লক-আউট হয়। তখন নয়নদের লালপার্টির জামানা। তারপর থেকে টুকটাক জমি-বাড়ির দালালি করেই হারুদার সংসার চলে। তাতে আর কীই বা হয়! ছেলেটা হাল ধরবে ভেবেছিল। কিন্তু কপাল! এসএসসি দিয়ে বসে আছে আজ ছ-সাত বছর। চাকরি হয়নি। টিউশানির পাশাপাশি এখন আন্দোলন করতে যায়। যদি তাতে সরকারের টনক নড়ে!


‘নয়নের চিনি কম কিন্তু’ হারুদা মৌবৌদিকে উদ্দেশ্য করে বলল। ঘরের এক কোনে স্টোভের সামনে একটা নিচু কাঠের টুলে বসে মৌবৌদি চায়ের জল চড়িয়েছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে উত্তর দিল ‘জানি রে বাবা, নয়ন কি আর আজ প্রথমবার চা খাচ্ছে এখানে!’ হারুদার বাড়িতে লিকারই হয়। দুধ কেনার বিলাসিতা করে না।


গণশক্তিটায় চোখ বোলাতে বোলাতেই হারুদা চিৎকার করে বলে উঠলঃ আরিব্বাস! দেখেছিস নয়ন, মন্ত্রীর মেয়েটার চাকরি খারিজ করেছে হাইকোর্ট! ভাব! এতদিন পাব্লিক বলে গেল আমরা সিপিএম বলে নাকি শুধু শুধু কাদা ছুঁড়ছি। সেদিন মোড়ের মাথায় স্বপন তো আমায় শুনিয়ে শুনিয়েই বলছিল যে আমার ছেলেটার চাকরি হয়নি তাই ওদের সরকারকে দুষছি! এবার বল, কী বলবি? কোর্টের ওপর তো আর কোনো কথা হবে না! শালা, প্রথম থেকেই দুর্নীতিবাজ একটা পার্টি। 

হারুদার কথার মাঝেই মৌবৌদি চা দিয়ে গেছে। চায়ে চুমুক মেরে হারুদা আবার বলতে শুরু করলঃ আমরা নাকি চোর! ছেচল্লিশ বছর পার্টি করেছি। তা ছেচল্লিশ বছর ধরে চুরি করে এই দেড়খানা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি! বলে হারুদা হাসতে গিয়ে বিষম খেল। মৌবৌদি স্টোভের সামনে থেকে ঝাঁজিয়ে উঠলঃ ও, ছাড়ো তো, এক কথা খালি সারাদিন।

হারুদা বিষম কাটিয়ে মিটিমিটি হেসে চায়ে চুমুক মেরে বললঃ ছেড়েই তো দিয়েছি গো, না হলে, দুবছর হয়ে গেল আর হারু নন্দী মেম্বারশিপ রিনিউ করল না!


নয়ন মনে মনে ভাবে সত্যিই হারুদার মতো এমন ডাকসাইটে পার্টিকর্মী আজ ফুল বসে গেছে! গত দুটো বিধানসভা ভোটে আর বেরয়নি। অথচ এই হারুদাই পনেরোর পুরভোটে জান লড়িয়ে দিয়েছিল। পোলিং এজেন্ট ছিল সেবার। শেষমেষ যখন তাকে মারতে মারতে বুথ থেকে বার করে দেওয়া হচ্ছে, নাক ফেটে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে তখনও পুলিশ আর কেন্দ্রীয় বাহিনীকে চিৎকার করে বলে যাচ্ছে ‘মাজাকি হচ্ছে এটা! কি করছেন আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে? লজ্জা করে না!’

পুলিশ দুটো অবশ্য দাঁত ক্যালাচ্ছিল। নয়ন গিয়ে তাকে স্কুলের গেট থেকে, মানে বুথের সামনে থেকে, সরিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে আসে।


হারুদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশেই নিত্যর দোকান থেকে একটা কম পাওয়ারের বাল্ব কিনে নয়ন পার্টি অফিসের দিকে হাঁটা দিল। হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকলঃ ঠিকই তো! তাদের জামানায় এমন ফি বছর কোনো না কোনো মন্ত্রী কিংবা হেভিওয়েট নেতাকে নিয়ে কোর্ট-কাছারি হত না। কেন্দ্রে কোনো কালেই তাদের সরকার ছিল না। আর সিবিআই তখনও ছিল। যাক গে, হারুদার ছেলেটার চাকরিটা যেন হয়ে যায়। সেই কবের থেকে বেচারা কি পরিশ্রমটাই না করে যাচ্ছে!


পার্টি অফিসের দিকে এগোতে এগোতেই নয়ন দেখল সুজয় তার কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ন্যাড়ার দোকানে চা খাচ্ছে। সুজয় এপাড়ারই ছেলে। বরাবর অ্যান্টি-সিপিএম। মোড়ের মাথায় ওদের একটা ক্লাব আছে নেতাজী সঙ্ঘ। সুজয় তার সেক্রেটারী। আজ সেখানে রক্তদান শিবির। গমগম করে মাইকে তার ঘোষণা শোনা যাচ্ছে। 


পার্টি অফিসে ঢুকে দেখল রথীন মিত্রও এসে পড়েছে। মঝারি সাইজের একটা ফ্লাক্স নিয়ে নয়ন ন্যাড়ার দোকানে চা নিতে এল। 

‘কি নয়ন দা কেমন আছ?’ হাসিমুখে সুজয় জিজ্ঞেস করল।

ভালোই রে, তুই কেমন? নেহাত সৌজন্য করেই নয়নের উত্তর ও প্রশ্ন। এমনিতে নিজে থেকে সে সুজয়ের সাথে কথা বলে না। যদিও সুজয়ের বাড়িটা তাদের বাড়ির উল্টোদিকে তিনটে বাড়ি পরেই। 

‘এই চলে যাচ্ছে’ সুজয়ের উত্তরের মাঝখানেই নেতাজী সঙ্ঘ থেকে মাইকে ঘোষণা শোনা গেলঃ আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি, এই মাত্র আমাদের মধ্যে উপস্তিত হলেন মাননীয় পুরপ্রধান শ্রী প্রদীপ আইচ মহাশয়। বলাইবাহুল্য প্রদীপ আইচ তৃণমূল নেতা। পুরবোর্ড তাদেরই দখলে। 

‘এ্‌ চ চ, প্রদীপদা এসে পড়েছ’ বলে সুজয় এক চুমুকে তলানি চা শেষ করে ভাঁড়টা ফেলে হন্তদন্ত হয়ে ক্লাবের দিকে এগোল। পিছু পিছু তার সাঙ্গপাঙ্গ।

নয়নের ফ্লাক্সেও ততক্ষণে ন্যাড়া লিকার ঢেলে দিয়েছে। তিনটে ভাঁড় আর চাভর্তি ফ্লাক্স নিয়ে সে পার্টি অফিসে ফিরে এল। মিহিরদা আর রথীনদাকে চা দিয়ে নিজেরটা নিয়ে গণশক্তিতে ডুবে গেল। 


নব্বই দশকের শেষে তাদের লোকসভায় বিজেপি প্রার্থী জিতে যায়। তার আগে তিনটে টার্ম তাদের দখলেই ছিল। তৃণমূল পার্টি তখন সবে সবে হয়েছে। সাপোর্টও দিয়েছে বিজেপিকে। যাইহোক, সেই সাংসদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়। তারই হাত ধরে সুজয়দের উত্থান। এই ক্লাব প্রতিষ্ঠা। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। তবে এটা ঠিক সুজয়রা অনড়ভাবে জমি কামড়ে পড়ে ছিল দশ-বারোটা বছর। মানে নয়নদের জামানার শেষটুকু ধরে। ওদের আসল শক্তিটা ছিল এবং হল সংগঠন। সব সময় যে কোনো ব্যাপারে কুড়ি-তিরিশটা ছেলে এককাট্টা হয়ে যেত। শুধু এপাড়া নয়, পাড়া ছাড়িয়ে অঞ্চল, পাশের অঞ্চল এইসব জুড়ে ছিল সেইসব ছেলেদের বাস। আজও মোটামুটি তাই। অনেক চেপে দিয়েও তাই সুজয় কিংবা তার ক্লাবকে রোখা যায়নি। আর আজ তো ওদেরই জামানা। তবে সুজয় এবং ক্লাবের অন্য মাথারা কেউই সক্রিয় রাজনীতি মানে নয়নের ভাষায় কোনো পার্টি করে না। তৃণমুল সমর্থক বলা চলে। কিছু কাজও করেছে। যেমন একটা খাওয়ার জলের কল আর একটা অ্যাম্বুলেন্স। ফি বছর তেইশে জানুয়ারী বিশাল র‍্যালি করে আর ক্লাবের পেছনে ছোট্ট জমিতে করে দুর্গাপুজো। পাড়ার সার্বজনীন পুজো ছাড়া ওটাই আর একমাত্র পুজো। সুজয়দের ক্ষমতা আছে। পুজোয় সেখানে তৃণমূলের বিধায়ক-মন্ত্রীরা সব আনগোনা করে। নয়ন শুনেছে তৃণমূলের তরফে অন্যান্য ক্লাবের মত নেতাজী সঙ্ঘকেও দুলক্ষ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।


তিন


আজ মেঘনা একটু আগে এসে পড়েছে। বিকেল তখন চারটে হবে। নয়ন গড়িয়ে উঠে চোখ-মুখ ধুয়ে সবে বাথরুম থেকে বেরিয়েছে। রোজই দুপুর একটা-দেড়টায় পার্টি অফিস বন্ধ করে বাড়ি ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে বই পড়তে নয়ন ঘন্টাখানেক গড়িয়ে নেয়। 


ওপরে নুপুরবৌদি ভাতঘুম দিচ্ছে। সেই সাড়ে পাঁচটা নাগাদ তুলি কলেজ থেকে ফিরলে তখন উঠবে। তারপর চা বসাবে। তারপর টানা আটটা অব্ধি পরপর সিরিয়াল দেখবে। আটটায় টিংকু অফিস থেকে ফিরলে আর এক রাউন্ড চা। তারপর রান্নাবান্না। পৌনে দশটা-দশটা নাগাদ নুপুরবৌদি তার খাবারটা বেড়ে তার ঘরে টেবিলে ঢাকা দিয়ে রেখে নিজেদেরটা নিয়ে ওপরে চলে যায়।


নয়ন কে দেখে মেঘনা বললঃ চল, নয়নদা আজ তোমার ঘরটা দেখব।

নয়ন খুশি মনে তাকে ঘরে নিয়ে এসে খাটে বসাল। নিজে জানলার সামনে দাড়াল।  বিকেলের এই রোদটা তার দারুন প্রিয়। মেঘনা ঘরের এদিক সেদিক চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। আড়ম্বরহীন ঘর। সেটাই স্বাভাবিক। খাট ছাড়া খাটের পাশে একটা পুরনো কাঠের টুল, একটা স্টিলের আলমারি, একটা লোহার ট্রাঙ্ক, একটা কাঠের টেবিল আর তার সামনে একটা হতলছাড়া কাঠের চেয়ার। টুলের ওপর একটা জলের বোতল আর টেবিলের ওপর একটা মাঝারি সাইজের খাতা, বলপেন, হাতঘড়ি আর একপাশে এলোমেলো করে রাখা খানকয়েক বই (পুস্তিকা বলাই ভালো)। দেওয়ালে টাঙানো বহু পুরোনো একটা ফুল সাইজ আয়না যার জায়গায় জায়গায় ঘষটে গেছে।


মেঘনা সুপ্রিয়দের নাটকের দলে মাসখানেক হল ঢুকেছে। এমনিতে সুপ্রিয়র বউ, অর্পিতা ছাড়াও বিদিষা বলে আর একটা মেয়ে আছে ওদের গ্রুপে। আর আছে দুটো ছেলে। ডিরেকশনের পাশাপাশি তিন নম্বর মেল রোলটা করে সুপ্রিয়। এবারের নাটকে আরও একটা ফিমেল রোল থাকায় মেঘনাকে ওরা আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বিদিষার সুত্রে যোগাযোগ। 


মেঘনার বয়স তিরিশের কাছাকাছি। লম্বা, মেদহীন, টানটান চেহারায় একটা দৃপ্তভঙ্গী আর ক্ষিপ্রতা স্পষ্ট। তামাটে রঙের ওপর লাল-কালোয় বাঁবাহুতে একটা ট্যাটু করা। আগে কথায়-আড্ডায় নয়ন জেনেছে মেঘনা যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে আর অভিনয়টা শখ। সুপ্রিয়রা মূলত বামপন্থী নাটক করে। রিহার্সালের দিনগুলোতে সন্ধে পৌনে ছটা পর্যন্ত নয়ন ওদের সাথেই আড্ডা মারে আর রিহার্সাল দেখে। তারপর চা খেয়ে বেরিয়ে যায় পার্টি অফিস খুলতে। 


মেঘনাকে দেখে নয়নের মধ্যে যে একটা উত্তেজনা কাজ করেনি তা বললে মিথ্যা বলা হবে। বলা ভালো আগে অন্যান্য বারের অনেক উত্তেজনার মতোই নয়ন তা গিলে নিয়েছে। নয়নের ভাবনায় অবশ্য এই গিলে নেওয়া হল উত্তেজনাকে পাত্তা-প্রশ্রয় না দেওয়া এবং অন্য কোনো এনগেজমেন্ট থেকে সদা বিরত থাকা।


দু-একটা কথা, নয়নের ‘চা খাবে নাকি?’ আর প্রত্তুতরে মেঘনার ‘না’-এর পর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ মেরে যায়। তারপর মেঘনা হঠাৎ উঠে নয়নের এত কাছাকাছি এসে দাঁড়াল যে নয়ন অস্বস্তি আর উত্তেজনার মাঝখানে পড়ে গেল। তবে কয়েক লহমাই মাত্র। তার মাথার পেছনটা আলতো করে ধরে মেঘনা তার মুখটা টেনে ঝুঁকিয়ে নিল। ঘোর লাগা নয়ন বুঝতে পারল তার ঠোঁটে মেঘনার নরম আর ভেজা ঠোঁট দুটো, তারপর মুখের ভেতর, জিভের সাথে জিভ, দ্রুত শ্বাস পড়ার শব্দ ইত্যাদি। মেঘনার শরীরের গন্ধে বুঁদ নয়ন একটা অচেনা শিরশিরে অনুভুতির শিকার হয়ে ঠোঁটে-ঠোঁট আর জিভে-জিভ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল যতক্ষণ না মেঘানা তাকে ছেড়ে দিল। 


নয়ন ততক্ষণে কেমন বিভোর হয়ে গেছে যেমন নেশায় ধুর হয়ে যায় মানুষ। সে মন্ত্রমুগ্ধর মতো দাঁড়িয়ে থাকল। তবে আবারও কয়েক লহমাই মাত্র। মেঘনা হাঁটুমুড়ে বসে নয়নের পায়জামার দড়ির ফাঁসটা একটানে খুলে দিল। টুপ করে সেটা পায়ে লোটাতে লোটাতেই মুখে ভরে নিল তারটা। নয়ন এক আশ্চর্য আরাম আর তীব্র উত্তেজনায় জীবনে প্রথমবার চুর হয়ে গেল। মৃদু মৃদু শীৎকার করতে থাকল সে। এবারে অবশ্য কয়েক লহমার খানিক বেশিই। তারপর অনভিজ্ঞ নয়ন ফিসফিসিয়ে ‘এবার বেরিয়ে যাবে, বেরিয়ে যাবে’ বলতে বলতে বার করে আনল। আনতে আনতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছেটার মতো তার বীর্য। 


এই আকস্মিক ও প্রথম যৌনঅভিজ্ঞতায় নয়ন ফ্যালফ্যাল চোখে-মুখে স্থবির ও তৃপ্ত দাঁড়িয়ে ছিল। মেঘনা উঠে দাঁড়াতেই হুঁশ ফিরে চুপচাপ পায়জামাটা পরে নিল। ভ্যানিটি ব্যাগটা নিয়ে মেঘনা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বেরতে বেরতে নয়নের বাহুতে আলতো আদরের একটা চাপড় মেরে গেল। 


খোলা দরজাটার দিকে তাকিয়ে পাশের ঘরের তালা খোলার শব্দ শুনতে শুনতে নয়নের মনে হল পাষাণ রাম বসে ছিল সে এতকাল আর আজ জ্যান্ত অহল্যা এসে ছুঁয়ে গেল তাকে! নবজন্ম হল তার।


চার


সন্ধে সাড়ে ছটা হবে। পার্টি অফিসে গত পুরভোটে হারের কারণ খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করছে রথীন মিত্র আর মিহিরদা। বলা ভালো পুনরালোচনা করছে। কারণ আগেও বেশ কয়েকবার এই আলোচনা হয়ে গেছে। প্রতিবারের মতোই নয়ন এবারেও মনযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মুড়িমাখা চিবোতে চিবোতে। প্রত্যেক সন্ধেয় সুবলের দোকানের মুড়িমাখাই হল তার স্ন্যাক্স। বিশুও আছে আজ। 


তবে থেকে থকেই বিকেলের সেই চরম উত্তেজনা আর তৃপ্তি মনে পড়ে যাচ্ছে। শিহরিত হয়ে উঠছে। এখনও যেন মেঘনার শরীরের গন্ধটা টের পাচ্ছে। সত্যিই পঞ্চাশে এসে যৌনতার পয়লা ধাপে দাঁড়িয়ে সে ভেতরে ভেতরে ঠিক তেমনই টগবগ করছে যেমনটা সেই কলেজের লালরঙা উদ্দাম দিনরাতগুলোতে করত। পার্টি অফিসে বসে হাফ মনযোগ দিয়ে রথীন মিত্রর আর মিহিরদার আলোচনা শুনতে শুনতে তার তেমনই মনে হতে থাকল। 


আসলে কিছুদিন হল ওয়ার্ড কাউন্সিলর, মলয় লাহিড়ি, মারা গেছে। হঠাৎ হার্ট আ্যটাকে। তো বাই-ইলেকশন হবে। যদিও এখনও দিন ঠিক হয়নি। মনে হয় না রথীন মিত্র আবার দাঁড়াবে। বয়সের কারণে দাঁড়াবে না বলে দিয়েছে। এবার পার্টি যা সিদ্ধান্ত নেবে। আসলে টানা তিনবারের কাউন্সিলর ছিল। শেষ দুবার শোচনীয় হারের পর হারের হ্যাট্রিকটা আটকাতে চাইছে। তিয়াত্তরে পড়ল এবার। পূর্ত দফতরে চাকরি করত। তবে রথীন মিত্র না দাঁড়ালে মনে হয় পার্টি মিহিরদাকেই প্রার্থী করবে। তবে সত্যি বলতে যেই প্রার্থী হোক না কেন জেতার প্রায় কোনো আশাই নেই। আর সেটা নয়ন ও অন্যান্য কমরেডরা সকলেই জানে। তবে প্রত্যয় হারালে তো চলবে না।


নয়নের জীবনে এর আগে কখনওই কোনো শারীরিক অভিজ্ঞতা হয়নি। মাস্টারবেশন ছাড়া। যা সে আজও করে। প্রেম থেকে নিজেকে বিরত রাখায় প্রেমিকা হয়নি তো সেক্স হবে কি করে! আর টাকা দিয়ে সেক্স কেনা তার মোর‍্যালিটি কখনওই সাপোর্ট করেনি। সুতরাং হাতে রইল ওই মাস্টারবেশন। এদিকে আবার কোনোদিনই কোনো অশ্লীল ভিডিও কি ছবি সে দখেনি। দৈবাৎ কখনও কোথাও চোখে পড়ে গেলেও চোখ সরিয়ে সরে গেছে সেখান থেকে। আর সে কিনা আজ প্রথমবারেই এত্তটা একসাথে পেয়ে গেল! নয়ন অবাক হয়ে যাচ্ছে ভেবে ভেবে!


সতেরো বছর বয়স পার্টির ভাবাদর্শের সাথে পরিচয় যেমন তার জীবন সব থেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা তেমনই আর একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে এবং তা যৌনতাকেন্দ্রিক।


শরীরটা খারাপ লাগায় কলেজ থেকে সেদিন সে দুপুর নাগাদ ফিরে এসেছিল। বাড়িতে থাকার মধ্যে ছিল মা-ঠাকুমা আর জ্যাঠা সেদিন অফিস যায়নি সেটা সে দেখেই গিয়েছিল। 


নিচের ঘরে মাকে না দেখতে পেয়ে নয়ন সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে একটা হাল্কা গোঙানির আওয়াজ পাচ্ছিল। দোতলায় প্রথম ঘরটাই জ্যাঠার। আওয়াজটা তার ভেতর থেকেই আসছিল। দরজাটা ভেজানো ছিল। দুপাল্লার মাঝের ফাঁক দিয়ে নয়ন যা দেখেছিল তা তাকে একইসাথে অবাক ও শিহরিত দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। খাটের ওপর হামাগুড়ি দেওয়ার মতো করে তার মা আর পেছনে মেঝেতে দাঁড়িয়ে জ্যাঠা তাকে করছে। দুজনেই পুরো উলঙ্গ। দুহাতে মায়ের কোমরটা চেপে ধরে জ্যাঠা বেশ জোরে জোরেই আর মা বুঁদ শীৎকারে। ঠিক কতক্ষণ তা নয়নের মনে নেই তবে হবে কিছুক্ষণ। তারপর নয়ন আর দাঁড়ায়নি। সোজা নিচে নেমে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। 


প্রথম প্রথম তার মা ও জ্যাঠা দুজনের ওপরেই খুব রাগ হয়েছিল। পরে বুঝেছিল। তার বাবা তো চলে গেছে সেই কবে। জেঠিমাও নেই। তো জ্যাঠা-মায়ের সম্পর্কটাকে তো আর অবৈধ বা অনৈতিক বলা চলে না। তার ওপর তারা দুজনেই তো তাদের তিন ভাই-বোনকে পালছে। নিজেদের শরীরের খিদে যদি পরস্পর মিটিয়েই থাকে তাতে দোষের কি! মাকে তো কখনওই দুখী বা অত্যাচারিতা মনে হয় না বরং সবসময় একটা সত্যি সত্যি খুশি লুকিয়ে থাকে তার হাসির মধ্যে। অতএব তার মায়ের ইছাতেই যখন এই সহবাস তখন আদর্শবাদী নয়ন বেশ কিছুদিন দোলাচলে থেকে শেষটায় তা মেনে নেয়। এরপর থেকে নয়ন কখনও আগে বাড়ি ফিরে মাকে নিচের ঘরে না দেখতে পেলে সিঁড়ি ভেঙে আর দোতলায় ওঠেনি।


সেদিনের ওই মিনিটখানেক ধরে দেখা লাইভ সেক্স আজও তার মাস্টারবেশনের ইন্ধন হয়ে আছে। শুরুটা হয়ে যায় সেটা মনে করেই। তারপর ডালপালা মেলে নয়নের কল্পনা।


নয়নের অনেকটা বড় বয়স পর্যন্ত মাঝে মাঝে রাতে নয়ন ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে তার মা ঘর থেকে বেরিয়ে দোতলায় চলে যেত। আধঘন্টা কি চল্লিশ মিনিট বাদে ফিরে আসত। নয়ন ঘুমের ভান করে পরে থাকত পাছে মায়ের কোনো অস্বস্তি হয়। 


মা মারা যাওয়ার পর তার মৃতদেহ দেখে জ্যাঠার ওই বাজে পোড়া গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকাটা আজও নয়নের চোখে ভাসে। তার পরপরই আরও অসুস্থ হয়ে বিছানা নিল সে। শেষ বয়েসেও আবার সঙ্গিনীবিহীন হয়ে পড়ার আঘাতটা আর নিতে পারেনি। বাবা-ভাই-বউ-মা-ভাইয়ের বউ একে একে সকলকেই তো বিদায় দিল সে। 


পাঁচ


দিনকয়েক বাদে সকালবেলা নয়ন বোর্ডপিন দিয়ে গণশক্তিটা তাদের বোর্ডে সাঁটছে। ওদিকে কল্লোলের পান-বিড়ির দোকানের সামনে থেকে  বাবলু-গিটু আর বাপি তাকে টিটকিরি মারছে। ‘ওরে গান্ডু, আর ওই জালি কাগজ লাগিয়ে কি হবে? কেউ তো পড়ে না।’ বাপি বলল। বাবলু-গিটু খিলখিলিয়ে উঠল। হাসতে হাসতে গিটু বললঃ নিজেই লাগায়, নিজেই পড়ে, বালটা। 


নয়ন মুখ লাগায় না। তার গণশক্তি সাঁটা হয়ে গেলে হনহন করে পার্টি অফিসের দিকে পা চালায়। এরা সব তৃণমূল করে। তার থেকে বয়সে বেশ ছোট। নয়ন মনে মনে ভাবে কী অসভ্য! কোনো সম্মান দিতে জানে না। সকাল সকাল মুখ খিস্তি করছে। আজ অব্ধি কেউ বলতে পারবে যে নয়ন কখনও কাউকে খিস্তি করেছে। প্রচন্ড রেগে গেলেও সে নিজেকে সামলে নিয়েছে বরাবর। খুব বেশি হলে ‘শাল্লা” বলে কচ্চিৎ কদাচিৎ হয়তো  চিৎকার করে উঠেছে। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। 


নয়ন বুঝতে পারল মাথাটা ব্যাথা করছে আবার। এটা যে কি হয় তার! বছর দেড়েক ধরে মাঝে মাঝেই তার মাথাটা কেমন ব্যাথা করতে শুরু করে। আগেও হয়েছে। দু-এক বার। অল্প সল্প। কিন্তু গত এক বছরে যেন উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে ব্যাথাটা। আর ফ্রিকুয়েন্সিও বেড়েছে। আগে হয়তো দুমাসে একবার হত। কিংবা হয়তো মাসে একবার। তবে ইদানীং প্রায় প্রতি হপ্তাতেই এই ব্যাথাটা হচ্ছে। সাথে মনে হচ্ছে চোখেও সমস্যা হচ্ছে কিছু। মাঝে মধ্যে দেখতে আসুবিধা হচ্ছে। গত এক-দুমাসে অসহ্য যন্ত্রণার পাশাপাশি বমিও হয়েছে। সে কাউকে কিছু জানায়নি। মিহিরদা আর বিশুই যা জেনেছে। তবে বমি-টমি বা চোখের সমস্যার কথা কিছু জানে না। বার দুয়েক পার্টি অফিসেই যন্ত্রণা হওয়ায় তাদের জানাতেই হয়েছে। কারণ সে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। আজও মনে হচ্ছে তাই হবে।


রঘুনাথ মেডিক্যাল স্টোর্স থেকে একপাতা স্যারিডন কিনে নয়ন পার্টি অফিসে ঢুকল। ততক্ষণে বেশ ব্যাথা শুরু হয়েছে তার। সজল আর মিহিরদা বসে ছিল। আলাদা কোনো কথায় না ঢুকে ব্যাথাটা ভুলে থাকা যাবে ভেবে ও চেয়ারে বসে গণশক্তির পাতা উল্টাতে থাকল। 


না, বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারল না নয়ন। মিহিরদা-সজলকে জানাতেই হল যে আবার তার মাথা ব্যাথা করছে সে বাড়ি চলে যাবে। মিহির নয়নকে খুবই স্নেহ করে। নয়ন যে কলেজ থেকে বিএ পাশ করেছিল সেই সরোজ গাঙ্গুলী কলেজের লাইব্রেরিয়ান ছিল মিহির। বছর তিনেক হল রিটায়ার করেছে। সেই থেকেই নয়নের কাছে প্রিয় ‘মিহিরদা’। শুনেই মিহিরদা তাকে বলে উঠলঃ তুই এখুনি বাড়ি চলে যা। শরীর ভালো না লাগলে সন্ধেবেলা তোকে আর আসতে হবে না। আমি চাবি নিয়ে যাব। রাতে পার্টি অফিস বন্ধ করে তোর বাড়ি ঘুরে আসব না হয়। চাবিটাও দিয়ে আসব যদি দেখি ঠিক আছিস। আর শোন, এটা তো বারবারই হচ্ছে, তুই ডাক্তার দেখা।

সজলও সায় দিয়ে বললঃ হ্যঁ, নয়নদা একবার দেখিয়ে নাও।

‘হুম দেখাব’ বলে নয়ন উঠে পড়ল। যন্ত্রণায় তার মাথাটা তখন ছিঁড়ে যাচ্ছিল। 


কোনোমতে বাড়ি ফিরে স্নান করে নয়ন ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। দুপুরে আর কিছু খেল না। খাটে শুয়ে চোখদুটো বন্ধ করে পড়ে থাকল। যন্ত্রণায় ঘুম এল না।


কেমন একটা আচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে শুয়ে নয়ন বুঝতে পারছিল বেলা গড়িয়ে বিকেল নামছে। বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধে। একটু আগে গেট খোলার আওয়াজ হল। তুলি ফিরল। রান্নাঘরে বাসন পড়ার শব্ধ। নুপুরবৌদি উঠে পড়েছে। 


ভেজানো দরজয় নক করার শব্দ হল। কে? প্রায় চিঁচিঁ করে জিজ্ঞেস করল নয়ন।

‘আমি, আসব?’ গলা শুনে নয়ন বুঝল নুপুরবৌদি। 

‘এস’ এতটা যন্ত্রণা হচ্ছে যে এই একটা দুটো শব্দ উচ্চারণ করতেও নয়েনের কষ্ট হচ্ছে। 

একটা জলের বোতল নিয়ে নুপুরবৌদি ঘরে এসে ঢুকল। খাটের পাশে টুলের ওপর জলের বোতলটা রাখতে রাখাতে জিজ্ঞেস করলঃ কেমন আছ এখন? চা খাবে? 

নয়ন তখন যন্ত্রণায় মাথা তুলতে পারছিল না। কোনোমতে বললঃ না।

‘তুমি কালকেই ডাক্তার দেখাবে বলে দিলাম।’ নুপুরবৌদি আদেশের মতো করে বলল। তারপর বললঃ দাঁড়াও তোমার দাদা ফিরুক। ওকে বলছি।

'আচ্ছা বেশ' বলে নয়ন আবার চোখ বন্ধ করে নিল। নুপুরবৌদি ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেল।


আর একটু পর আবার গেট খোলার আওয়াজে বুঝল জ্যাঠার আয়া  চলে গেল।


রাত সাড়ে আটটা নাগাদ প্রায় একইসঙ্গে মিহিরদা আর তার টিংকু তাকে দেখতে এল। ব্যাথাটা তখন কিছুটা কম হলেও চোখের সমস্যা হচ্ছিল আর একটা বমি বমি ভাব। স্নানের সময়ও একবার বমি হয়েছিল। নয়ন শুয়েই ছিল। 

টিংকুও বলল ডাক্তার দেখাতে এমনকি টাকাপয়সা কিছু লাগলে যেন জানায় তাও বলে গেল। একটা জরুরি ফোন আসায় টিংকু তার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।  


মিহিরদা চেয়ারটা তার খাটের পাশে টেনে এনে বসেছে। 'চিন্তা করিস না, তবে ফেলেও রাখিস না ভাই।' গম্ভীরভাবে সে বলল।

-না, না, আমি ডাক্তার দেখিয়ে নেব। ক্লান্ত ধরা গলায় নয়ন জবাব দিল।

-বেশ, আর কথা বলিস না, চুপচাপ শুয়ে থাক, আমি চাবিটা আমার কাছেই রাখছি। আপাতত পার্টি অফিস খোলা-বন্ধ নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই শরীরের খেয়াল রাখ। বলে পকেট থেকে ওয়ালেট বার করে তার থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বার করল মিহিরদা। 

নয়ন কিছু বলার আগেই ‘কোনো কথা বলবি না, নয়ন’ প্রায় ধমকের সুরে বলে নোটটা ওর মাথার বালিশের নিচে রেখে মিহিরদা চলে গেল। 


ঘরে শুয়ে শুয়েই সে গন্ধ পেল মুরগির মাংস হচ্ছে বাড়িতে। টিংকু অফিস ফেরত কোনো কোনো দিন নিয়ে আসে। মাছের ব্যাপারটা এখন এ সংসারে প্রায় বিলাসিতা। তুলি তো আবার মাছ খাইই না। ওই মাসে দু-চারবার পুঁটি, তেলাপিয়া কি মৌরলা। অন্যান্য দিন ডাল-ভাজা-তরকারি কিংবা ডিমের ঝোল। জ্যাঠার জন্য দুপুরে চালে-ডালে আর রাতে দুধ-খই। ব্যাস, এই হল আজকাল তাদের বাড়ির হেঁশেল।


রাতেও নয়ন কিছু খেল না। আর একবার বমিও হল তার। নুপুরবৌদি এক গ্লাশ দুধ তার খাটের পাশে টুলের ওপর ঢাকা দিয়ে রেখে গেল। রাত তখন প্রায় দশটা। নয়ন প্রায় অচেতন। জোর করে ঘুমের চেষ্টা করে যাচ্ছে। 


ছয়


এক হপ্তা পর আজ আবার মেঘনা আগে এল। নয়ন তখন গড়াচ্ছিল। গত মঙ্গলবার ও যখন রিহার্সালে এসেছিল তখন পাঁচটা বেজে গিয়েছিল। ওরা রিহার্সাল শুরু করবে করবে। নয়ন কিছুটা সুস্থ বোধ করায় রিহার্সাল ঘরে গিয়েছিল। ওখান থেকে পার্টি অফিস যাবে ঠিক করে রেখেছিল। মেঘনা অন্যান্য দিনের মতোই সবাইকে হাই জানিয়ে রিহার্সালে লেগে পড়েছিল। নয়ন একটু গুটিয়ে ছিল। মেঘনার এই স্বাভাবিক ব্যবহারে সেও হাঁফ ছেড়ে আস্তে আস্তে সহজ হয়ে গিয়েছিল। 


একটা চোরা দ্বন্দ্ব কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল নয়নকে। তার এতদিনের এই যে নিষ্কলঙ্ক কমরেড জীবন, তাতে কি দাগ লাগল কোনো? কিন্তু না, সে তো ইনসিস্ট করেনি, যা করার তা তো মেঘনাই করেছে এবং স্বতস্ফুর্তভাবেই। তহলে? আর সেক্স করা তো কোনো পাপ নয়! নয়নের মনের ভেতর এমনই নানান কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল ক্রমাগত।


গত দুদিনে মাথা ব্যাথাটা আর হয়নি। আজও দিব্যি আছে। পার্টি অফিসেও গেছিল। তবে ঘুমটা বেশি হচ্ছে একটু। ঘুমঘুম একটা ভাবও সারাদিন। আর চোখের সমস্যাটা। 


সোমবারই সন্ধে নাগাদ একটু সুস্থ লাগায় বেরিয়ে পাড়ার গগনডাক্তারকে দেখিয়ে এসেছিল। তিনশো টাকা ফী নিয়ে দুটো ওষুধ আর সিটি স্ক্যান-এমআরআই এরকম কয়েকটা টেস্ট লিখে দিল। টেস্টগুলো নাকি অবশ্যই করে নিতে হবে। গগনডক্তারের ভাষায় ‘অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল’। তারপর রিপোর্ট নিয়ে আবার চেক-আপ। 


নয়ন টেস্টগুলোর কথা পরে ভাববে। অনেকগুলো টাকার ব্যাপার। আপাতত ওষুধ শুরু করেছে। মনে তো হচ্ছে কাজও হচ্ছে। দেখা যাক কদিন। তবে ওষুধের যা দাম! বলতে নেই নয়ন খুব বেশি ভোগেনি আজ অব্ধি। ওই সর্দি-কাশি-জ্বরজারির ওপর দিয়েই যা গেছে। বড় কিছু হলে ট্রিটমেন্ট চালাতে পারত না হয়তো। অন্তত সেদিন ডাক্তারের ফী আর ওষুধের দাম দেওয়ার সময় তার তাইই মনে হয়েছিল।


যাইহোক, গেট খোলার শব্দে নয়ন খাটের ওপর উঠে পা ঝুলিয়ে বসেছিল। মেঘনা নক করে তার ঘরে চলে এল। দরজাটা ভেজানো ছিল খালি। ঘরে ঢুকে মেঘনা প্রথমেই দরজাটা বন্ধ করে ছিটকিনি এঁটে দিল। তারপর ভ্যানিটি ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে নয়নের দিকে ঘুরে বললঃ একটা গান চালিয়ে দিই কেমন?

‘বেশ’ বলে উঠল নয়ন।

'কি গান শুনবে বল?' হাসি হাসি মুখে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল মেঘনা।

প্রশ্নটায় একটু থতমত খেয়ে গেল নয়ন। গান মানে তো সেই হয় গণসঙ্গীত নয় কিশোরকুমার। গণসঙ্গীতটা বলা বোধহয় উচিত হবে না। একটু ‘উঁ’ করে নয়ন বললঃ কিশোরকুমারের কোনো গান। মানে যদি তোমারও ভালো লাগে আর কি।

মেঘনা অল্প হেসে মোবাইলে গান চালিয়ে দিল। চলতে চলতে মেরে ইয়ে গীত ইয়াদ রখ না…


মেঘনা নয়নের কাছে এসে দাঁড়াল। ওর গালে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকল। 

ওর কাঁধদুটো দুহাতে ধরে চোখে চোখ রেখে নয়ন জিজ্ঞেস করলঃ কাজটা কি ঠিক হচ্ছে, মেঘনা? 

‘কী ভুলটা হচ্ছে? বউকে লুকিয়ে করছ? আমায় জোর করে করছ? কোনোটাই নয়, তাই না? আর আমি কোনো কমিটমেন্টে যাই না। বেশি বয়সি পুরুষ পছন্দ করি। তোমাকে ভালো লেগেছে। তোমার এই স্লিম চেহারাটা আমার দারুন লাগে। ব্যাস, সেক্সের জন্য আর কী লাগে? তোমাদের কমিউনিজমে কি সেক্স করা বারণ নাকি! অদ্ভুত!’ মেঘানা সোজা নয়নের চোখে চোখ রেখে টানা বলে গেল। চাপা গলায়।

উত্তরে নয়ন কিছুই বলতে পারল না। 


এটা সত্যিই যে মেঘনা কিছু ভুল বলেনি। যৌথ সম্মতিতে যৌন মিলনে কোনো ভুল বা অপরাধ নেই। আসলে মাস্টারবেশন ছাড়া অন্য কোনোরকম যৌনঅভিজ্ঞতা যে তার হতে পারে নয়ন এটাই কোনোদিন ভেবে উঠতে পারেনি। আজ অযাচিত ভাবেই এই বন্ধনহীন যৌনতা এসেছে তার জীবনে! যা শুধুই আনন্দের। 

যদিও কমিউনিজম সে তেমন পড়েনি তবে তাতে যৌনতায় নিষেধাজ্ঞা থাকবে তা হতেই পারে না। কমরেড ও সন্ন্যাসী তো আর এক নয়! অতএব...


চুমুতে নয়নকে আবিষ্ট করে মেঘনা তাকে বিছানায় ফেলল। ততক্ষণে নয়নের পাঞ্জাবিটা সে খুলে দিয়েছে। চিৎ হয়ে নয়ন খাটে শুয়ে শুয়ে দেখল ওর সামনে মেঝেতে দাঁড়িয়েে এক এক সবকিছু খুলে পুরো উলঙ্গ হয়ে গেল মেঘনা। সেই তার মায়ের খোলা শরীরের পর এই প্রথম অন্য কোনো শরীর উলঙ্গ দেখল নয়ন। পায়জামাটা খুলে দিল মেঘনা। 


নয়নের ওপরে উঠে করছে মেঘনা। পুরো রাশটাই তার হাতে। দুহাতে ধরে আছে নয়নের দুহাত। দুজনেই শরীর ভরে নিচ্ছে অপূর্ব এই সোহাগ। 


তবে খুব বেশিক্ষণ নয়। বয়স বেশি হলেও সে তো নেহাতই আনাড়ি। একটু পরেই সে তৃপ্তিতে বুজে আসা গলায় বলে উঠলঃ এবার আমার বেরিয়ে যাবে, মেঘনা। 

মেঘনা আরও দ্রুত ওঠানামা করতে করতে হিসহিসে গলায় জিজ্ঞেস করলঃ কি, শ্রেনীহীন সমাজে সেক্স থাকবে না, বল? 

শীৎকার করতে করতে অস্ফুটে নয়ন বললঃ থাকবে, থাকবে। 

তারপরই নয়ন ‘আর ধরে রাখতে পারছি না, বার করে নাও, প্লিজ’ বলতে না বলতেই মেঘনা বার করে দিল। 


আহ! আজকের এই ক্ষরণ আগের দিনের চেয়ে আরও বেশি তৃপ্তির। নয়নের তেমনই মনে হল।


কিছুক্ষণ নয়নের বুকের ওপর শুয়ে থাকল মেঘনা। নয়ন দুহাতে জড়িয়ে থাকল তাকে। একটা প্রগাঢ় চুমু দিয়ে মেঘনা উঠে জামাকাপড় পরে ‘পরে আসব, আবার’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নয়ন পাশের ঘরের তালা খোলার শব্দ শুনতে শুনতে পায়জামাটা পরে ফেলল। প্রথমেই বাথরুমে যেতে হবে তাকে।


খানিকক্ষণ রিহার্সাল দেখে নুপুরবৌদি দরজা নক করে চায়ের জানান দিতে চা খেয়ে নয়ন বেরিয়ে গেল পার্টি অফিস খুলতে। 


সাত


দুদিন আবার অসহ্য যন্ত্রণায় শয্যাশায়ী থেকে আজ একটু সুস্থ বোধ করায় নয়ন পার্টি অফিসে ঢুকল। তখন বেলা প্রায় দশটা। মিহিরদা এসে পড়েছে। এখন চাবিটা মিহিরদাই রাখছে। নয়ন বলেছিল যে ওকেই দিয়ে রাখতে কিন্তু মিহিরদা রাজি হয়নি। হবেটাই বা কি করে! আজ মাসখানেক ধরে ছাড়া ছাড়া ভাবে কখনও টানা দুদিন কখনও টানা তিনদিন মাথার যন্ত্রণায় কাবু হয় নয়ন পড়ে থাকছে বাড়িতে। 


মিহিরদা ওকে ঢুকতে দেখেই জিজ্ঞেস করলঃ কি রে তোর শরীর কেমন?

-আজ চাঙ্গা আছি গো, দাও, গণশক্তিগুলো দিয়ে আসি বাড়ি বাড়ি। আর বোর্ডেও মেরে দিই। হাসি মুখে নয়ন জবাব দিল।

-না থাক, তুই বোস। বিশু বোর্ডে মারতে গেছে। এখুনি ফিরেই ও কপিগুলো নিয়ে যাবে। মিহিরদা বলল।

-আরে, না, না দাও না আমি দিয়ে আসছি। তারপর এসে চা খাব। বেকার বাড়ি বসে আছি এতদিন। বলে নয়ন কপিগুলো নিয়ে মিহিরদা কিছু বলার আগেই হন্তদন্ত হয়ে পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল।


এক্স কাউন্সিলর রথীন মিত্রর বাড়িটাই খালি বাকি। বাকি সব বাড়িতে দেওয়া হয়ে গেছে। ওর বাড়িটা আসলে এই পাড়ায় নয়। পাশের পাড়ায়। একই ওয়ার্ড। আজ রথীন মিত্র পার্টি অফিসে আসবে না তাই বাড়িতে দেওয়া। না হলে পার্টি অফিস থেকেই নিয়ে নেয়। 


মস্ত তিনতলা বাড়ির নিচের গেটে বেল টিপে নয়ন কিছক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। রথীন মিত্রর ছেলে এসে ‘সব ভালো তো?’ জিজ্ঞেস করে গণশক্তিটা নিয়ে নিল। নয়ন ‘হ্যাঁ, চলছে আর কি।’ বলতে বলতে সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। আসলে এতটা সময় নিল নয়ন উত্তরটা দিতে। বুল্টু, মানে রথীন মিত্রর ছেলেকে দোষ দেওয়া যায় না। খানিক অপেক্ষা করেছিল সে উত্তরের। তারপর অগত্যা। 


এখন যেখানে রথীন মিত্রর বাড়ি সেখানে আগে থাকত জগারা। জগা, জগার বাবা-মা আর বোন। জগা নয়নের বয়সই ছিল। সে প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা। দুপাশে-সামনে খোলা জমির মাঝে একচালা একটা ঘর ছিল জগাদের। এই পাড়ায় তখন ওই একটাই টালির চালের ঘর ছিল। বাকিসব বাড়ি পাকা। জগাদের বাড়িতে আবার ইলেক্ট্রিসিটিও ছিল না। রথীন মিত্র তখন ছেলে-বউ নিয়ে ভাড়া থাকত এপাড়ায়। তারপর একদিন জগারা উঠে গেল। অন্য জায়গায় ঘর করে নিল। কোথায় তা নয়ন জানে না বা এখন মনে পড়ে না। জগারা জমিটা রথীন মিত্রকে বেচে দিয়ে গিয়েছিল। বুক হাত দিয়ে বললে নয়নকে এইটা বলতেই হবে যে জগারা ন্যায্য দাম পায়নি। কিছুদিন তারা টালবাহানা করার পর একদিন তাদের জোর করেই উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।


পার্টি অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নয়ন ভাবতে থাকল আজ পার্টির এই অবস্থার জন্য পার্টিই কি দায়ী! কিছু কিছু ভুলচুক তো হয়েছেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার ইমেজ খারাপ হয়েছে কোনো কোনো ঘটনায়। তবে নির্লজ্জের মতো এরকম দলবদল ও আরও নির্লজ্জের মতো ঘর ওয়াপসি তাদের পার্টিতে কখনওই দেখা যায়নি। ইদানীং এইসব ভাবতে শুরু করলেই তার মাথাটা প্রথমে দপদপ করতে শুরু করে। তারপর আবার মাথা ব্যাথা শুরু হয়। 


পার্টি অফিসে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারল না। মাথাযন্ত্রণাটা বাড়ছে। অনেক্ষণ চেপে রেখেও শেষমেষ আর পারল না। বমি করে ফেলল নয়ন। চোখ ঝাপ্সা হয়ে এল। অজ্ঞান হয়ে পড়েই যাচ্ছিল চেয়ার থেকে। নেহাত মিহিরদা ধরে নিল!


আট 


নয়ন হাতের বইটা বন্ধ করে মাথার পাশে রেখে দিল। আধশোয়া হয়ে এতক্ষণ ধরে সেটাই পড়ছিল। কিছুদিন হল বইটা পেয়েছে। মিহিরদাই দিয়েছে। পড়া হচ্ছিল না। আজ অনেকটা পড়ে ফেলছে। জনৈক তাত্বিক কমরেডের লেখা। মহান বলশেভিক বিপ্লবের একশো বছর, ফিরে দেখা, মূল্যায়ন, সাম্প্রতিক সময়ে তার প্রাসঙ্গিকতা ইত্যাদি নিয়ে প্রাঞ্জল ভাষায় চমৎকার লেখা। এখানে বলে রাখা দরকার নয়ন শুধুমাত্র তাদের পার্টির পাব্লিকেশনের বই-পত্রই পড়ে। প্রতি বছর পুজোর সময় প্যান্ডেলের পাশে তদের স্টল হয়। অন্য কয়েকজন কমরেডের সাথে নয়নও স্টল সামলায়। সেখান থেকে কিছু বই কেনে। আর কিছু বই তাকে মিহিরদা উপহার দেয়। 


মাথার যন্ত্রণাটা এখন অনেক কম। সেদিন পার্টি অফিস থেকে মিহিরদা রিকশা করে তাকে বাড়ি দিয়ে গিয়েছিল। গতকাল তাকে রিহার্সাল রুমে না দেখে দরজা নক করে সুপ্রিয়রা এসে দেখে গেছে। মেঘনাও ছিল। তখন সে আচ্ছন্নের মতো পড়ে ছিল। খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল তখন। ওরা নক করায় আর সুপ্রিয়র ‘নয়নদা, আছ নাকি?’ শুনে কোনোভাবে ‘আছি, আয়’ বলেছিল নয়ন। 

-কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ নাকি? সুপ্রিয়র প্রশ্নটা শুনে অতি কষ্টে ‘মাথা যন্ত্রণা’ বলেছিল নয়ন। 

-ঠিক আছে তুমি ঘুমাও আমরা পরে আসব’ বলে ওরা ঘর থেকে চলে গিয়েছিল।


রাতে পার্টি অফিস বন্ধ করে মিহিরদা সজলকে নিয়ে তাকে দেখতে এসেছিল। তখন ঘরে টিংকুও ছিল। দুদিনে নয়নের অবস্থার কোনো উন্নতি না দেখে মিহিরদা নাকি গগনডাক্তারকে নিয়ে আসতে তার চেম্বারে গিয়েছিল। কিন্তু সে আসেনি। তার কথায় ‘দেখ, আমি গিয়ে আর নতুন করে কী দেখব? যতক্ষণ না এমআরআই রিপোর্ট দেখছি আসল ট্রিটমেন্ট শুরু করতে পারব না। আমি একটা ওষুধ চেঞ্জ করে দিচ্ছি। এটা একটু স্ট্রং তাতে ব্যাথা কিছুটা কমবে। তোমরা এমআরআইটা করাও ইমিডিয়েটলি।’ মিহিরদা নিজেই সেই ওষুধ কিনে নিয়ে এসেছিল। খুব ভালো মনে নেই তবে মোটামুটি এইসবই বলাবলি করছিল তারা। রাতে নুপুরবৌদি একটু চিকেন স্ট্যু খাইয়ে দিয়েছিল।


নতুন ওষুধে কিছুটা কাজ দিয়েছে। রবি-সোম-মঙ্গল শুয়ে থেকে আজ সে উঠে বসেছে। বইও পড়ল। দুপুরে ভাত খেয়েছে। তৃপ্তি করে খেয়েছে। নিজেই খেয়েছে। রবি-সোম তো খায়নি বলাই ভালো। গতকাল কোনোমতে। তাও রোজই খাইয়ে দিতে হয়েছিল। ভাবল আজ একবার পার্টি অফিসেও যাবে। এখন তো সে মোটামুটি সুস্থই আছে। 


এমআরআই করানো হবে আর দু-চর দিনেই। মানে এটা ডিসাইড করা হয়েই গেছে। সিদ্ধান্তটা অবশ্য নিয়েছে মিহিরদা আর টিংকু মিলে। নয়নও আপত্তি করেনি। কষ্টটাও তো আর সহ্য করা যাচ্ছে না। দু-চারদিনে পার্টি থেকে মাসোহারাটাও পেয়ে যাবে। এমআরআই-এর পর যে কি হবে কে জানে! নয়ন আর ভাবতে পারে না।


সন্ধেবেলা চা খেতে খেতে তার মনে পড়ল চিত্তদার কথা। বড়রাস্তার ওপারে যতীন কলোনীতে থাকত। হার্ডকোর কমরেড ছিল। একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়াত। মাঝে মাঝে তাদের পার্টি অফিসেও আসত। এছাড়া পার্টির সভা কিংবা অন্য কোনো প্রোগ্রামে তো দেখা হতই। কি দারুন লোক ছিল! কোনো দিন পদের লোভ করেনি। কেউ বলতে পারবে না যে কোনো জুলুমবাজি-ক্ষমতা প্রদর্শন চিত্তদা কখনও করেছে। সবে থেকে বড় গুণ ছিল যে চিত্তদা দারুন সুন্দর বক্তৃতা দিতে পারত। কমিউনিষ্ট আন্দোলন নিয়ে অনেক পড়াশুনা করেছিল। তার মুখ থেকেই নয়ন ও অন্যান্য কমরেডরা ইউরোপ-আমেরিকার নানান দেশের গণসংগ্রামের গল্প শুনে শিক্ষিত হয়েছে। নয়নের এখনও মনে পড়ে কিউবা-চিলি-গুয়াতেমালার সেইসব সংগ্রামী মানুষের কথা শুনতে শুনতে তার চোখ চকচক করে উঠত। তাদের সেই আমরণ সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে নিয়ে চলার গর্বে তার বুক চওড়া হয়ে উঠত। আজও মনে পড়লে একইরকম চওড়া হয়ে ওঠে। গত বছর চিত্তদা করোনায় মারা গেলে যে গুটিকয়েক কমরেড ভয় উপেক্ষা করে তার শেষযাত্রায় সামিল হয়েছিল তাদের মধ্যে নয়নও ছিল।


পার্টি অফিসের দিকে যেতে যেতে নয়ন মনে মনে ভাবতে থাকল তাদের সাথে কত পার্থক্য আজকের এই তৃণমূল করতে আসা নতুন ছেলেদের। তারা এসেছিল হাতের মুঠি শক্ত করে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে। পার্টিকে কি কিছু দেবে বলে। আর এসেইছে হাত পেতে। কিছু পাবে বলে। কেউ চাকরি তো কেউ অটোর পারমিট, কেউ সিন্ডিকেট তো কেউ বাজারের তোলার ভাগ। পার্টির জন্য তারা জান লড়িয়ে দিতে সদা প্রস্তুত ছিল, আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে। তারা কি পেল তা নিয়ে ভাবার কোনো অবকাশই নেই তাদের। পার্টি জিতবে, ক্ষমতায় থাকবে, মানুষের জন্য কাজ করবে এইটাই একমাত্র স্বপ্ন। হ্যাঁ তাদের পার্টিরও কেউ কেউ হয়তো করে খেয়েছে তবে সে আর কজন! ওটুকু চোনা কোথায় থাকে না! আর এদের তো পুরোটাই চোনা। তাদের পার্টির প্রথম সারির কটা নেতা-মন্ত্রীর দিকে লোকে আঙুল তুলতে পারবে!


প্রণবদার বাড়িটা ক্রশ করতে করতে নয়ন ভাবতে থাকল পার্টির জন্য সে মারও খেয়েছে। রক্তও ঝরেছে। আর তা তো হবেই। কমরেড হতে গেলে লড়াকু তো হতেই হবে। মারাটা তো সহজ কিন্তু মার খেয়ে সহ্য করে লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাই আসল। যেমন ষোলোর বিধানসভা ভোটে। সেবার নয়ন ছিল পোলিং এজেন্ট। বুথে বসে আছে। ও বাবা! হঠাৎ দেখে বাবলু আর গিটু ঢুকে পড়ল। বাপি ছিল ওদের পোলিং এজেন্ট। সে যথারীতি ভেতরেই ছিল। তখনও বেলা এমন কিছু বাড়েনি আর ভোট লুটতে চলে এসেছে! তাদের জামানাতেও যে হয়নি তা নয় কিন্তু একটা চক্ষুলজ্জা তো থাকবে! দুটো পর্যন্ত তো অন্তত মানুষকে ভোট দিতে দেবে! নয়ন এসব মেনে নেওয়ার পাত্র নয়। সে প্রতিবাদ করে। ওরা নয়নকে বুথ থেকে বার করে দিতে যায়। সেই থেকে ধস্তাধস্তি-হাতাহতি। তার নতুন পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ল। মুখ ফাটল। টিকটা ঝেড়েছিল গিটু। নয়ন পাঞ্জাবির হাতায় মুখের রক্ত মুছতে মুছতে শান্ত অথচ দৃঢ় ভাবে বলেছিলঃ আরে মার না, কত মারবি, মার। আমিও নয়ন। মেরে লাশ ফেলে দিলেও বুথ ছেড়ে নড়ব না। 

পুলিশ-কেন্দ্রীয় বাহিনীর কিছুটা তৎপরতায় ও হস্তক্ষেপে আর উপস্থিত ভোটারদের সামনে ইমেজ খারাপ হচ্ছে বুঝে বাবলু-গিটু বেরিয়ে গেল। ছেঁড়া পাঞ্জাবি পরে নয়ন বসে থাকল বুথে। একটু দুঃখ হচ্ছিল তার। নতুন কেনা পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে দিল শালারা। 

তবে রেজাল্ট বেরনোর দিন কোথায় উবে গেল তার পাঞ্জাবির শোক! আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল সে। এগারোয় হেরে গিয়েও সেবার আবার জিতে বিধায়ক হয়েছিল তাদেরই পার্টির কাঞ্চন সান্যাল। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সীট কমে গিয়েছিল অনেক। 

 

আর একবার মার খেয়েছিল এগারোয়। সেবার তো পালাবদল হল। তার পর পরই একদিন বাবলু-গিটু আর বাপির নেতৃ্ত্বে বেপাড়ার ছেলেরা ঢুকে পড়ল পাড়ায়। যারা যারা সিপিএম করে এবং হাতের সামনে পেয়েছিল বেদম কেলিয়েছিল তাদের। যথারীতি নয়নও বাদ পড়েনি। সে পার্টি অফিসের সামনেই বসে ছিল। মারের চোটে তার মাথা ফাটে আর বাঁকনুইতে ফ্র্যাকচার হয়। 

সব থেকে বেশি মেরেছিল বাবুনদাকে। বাবুনদা এপাড়ার লোক নয়। তবে এ অঞ্চলেরই লোক। এই ওয়ার্ডের পার্টি অফিসে নিত্য যাতায়াত ছিল। বাবুনদার ওপরে রাগও ছিল অনেকের। আসলে নয়নের যেটা মনে হয় তা হল বাবুনদার মতো কমরেডদের জন্য পার্টির সংগঠন যেমন মজবুত হয়েছিল তেমন ভাবমুর্তিও নষ্ট হয়েছিল খানিক। ওইদিনের আক্রমণের পর থেকে বাবুনদাকে অবশ্য আর এপাড়ায় দেখা যায়নি। 

যাইহোক, নয়ন তো আর মার খেয়ে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। স্টিচ কাটার পরই আবার তাকে দেখা গিয়েছিল পার্টি অফিস খুলছে। বাঁহাতে প্লাস্টার। 


রাতে খাওয়-দাওয়া সেরে শুয়ে শুয়ে নয়নের মেঘনার কথা মনে পড়ল। বলা ভালো তার সাথে করা সেই সেক্সের কথা। আগেও কয়েকবার মনে পড়েছে। বার দুয়েকে মাস্টারবেশনও করেছে। টুক করে উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা খাতাটা থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে এনে নয়ন আবার শুয়ে পড়ল। পায়জামার দড়িটা খুলে নামিয়ে দিল সেটা। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভাবতে ভাবতে তাড়িয়ে তাড়িয়ে মাস্টারবেট করল। শরীরটা যেন হাল্কা হয়ে গেল তার। কাগজে মুছে পায়জামাটা পরে উঠে কাগজটা ফেলে দিল ডাস্টবিনে। তারপর জল খেয়ে শুয়ে পড়ল।


নয় 


এই নিয়ে পরপর তিনটে বৃহস্পতিবার মেঘনা আগে এল। মানে তখনও রিহার্সালে আর কেউ আসেনি। সাধরণত সাড়ে চারটে থেকে ওরা একে একে আসতে থাকে। আগের দুদিন মেঘনা চারটে থেকে চারটে দশের মধ্যে এসে পড়েছিল। আজ এল আরও আগে। তখন সবে পৌনে চারটে। গতকাল বিকেল থেকে মাথাট আর ব্যথা করেনি। পার্টি অফিসে যেতেই মিহিরদা দরজা থেকে ধরে সোজা বাড়ি দিয়ে গিয়েছিল তাকে। 


আগেরবারের মতোই দরজাটা বন্ধ করে নয়নের কাছে এল। নয়ন খাটে বসে ছিল। পা ঝুলিয়ে। আসলে মেঘনা ভেবেছিল নয়ন হয়তো এখনও অসুস্থ আছে। গত মঙ্গলবার তার ইচ্ছে থাকলেও সে নয়নের মাথ্যয় একবারও হাত বুলিয়ে দিতে পারেনি। দলের অন্যরা সবাই ছিল। ও সুস্থ আছে দেখে গান চালাতে চালাতে খুব খুশি হয়ে বললঃ বাহ! এই তো উঠে বসেছ। সাবাশ! তারপর ওর গালে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলঃ ডাক্তার দেখিয়েছ? 

আলগা করে ‘হ্যাঁ’ বলল নয়ন।

মেঘনাঃ কী বলল?

নয়নঃ ওই ওষুধ দিয়েছে আর কয়েকটা টেস্ট করতে বলেছে। ওষুধ শুরুও করে দিয়েছি। 

মেঘনাঃ টেস্টগুলোও করে নাও তাড়াতাড়ি।

নয়নঃ হ্যাঁ, এই কাল-পরশুই যাব। 

মেঘনাঃ করবে কি আজ?

নয়নঃ হ্যাঁ, মানে তোমার ইচ্ছে থাকলে।

‘বেশ তবে আজ তুমি আমায় কর' বলে মেঘনা সব খুলে খাটে উঠে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। 

নয়নও পায়জামা-পাঞ্জাবি খুলে ওর ওপর উঠে এল।


কিছুক্ষণ মেঘনাকে আদর করতে করতে তার শরীরের গন্ধটা প্রাণভরে নিল নয়ন। তারপর ঢোকাতে গিয়ে মায়ের সাথে জ্যাঠার সেই যৌনদৃশ্যের স্মৃতি মনে আসায় নয়ন মেঘনাকে বললঃ তুমি হামাগুড়ি দেওয়ার মত করে উপুড় হবে, প্লিজ? আমি পেছন থেকে করব।

খুব খুশি আর একটু বিস্ময়ে হাসিমুখে ‘ওহ! ডগি স্টাইল, জিও।’ বলে অভ্যস্ত মেঘনা উপুড় হয়ে দুপা মেলে দিল। 

ভিজিয়ে নিতে নিতে নয়ন বুঝতে পারল মাথাটা দপদপ করতে শুরু করেছে আবার। 


একে প্রথম প্রথম তাও অসুস্থ শরীর। কিন্তু সে প্রায় সর্বশক্তি দিয়ে করে যেতে থাকল। মেঘনা মৃদু মৃদু শীৎকার করতে করতে অনুরোধ ভরা গলায় বললঃ ভেতরে ফেল না, প্লিজ। 

-না, না। আগেই বার করে নেব। বলে নয়ন জোর বাড়াল।


প্রাণপণে মাথার যন্ত্রণা উপেক্ষা করে আজ এতখানি বয়সে এসে এই যে সে মেঘনার সাথে করে চলেছে এটা যেন একটা স্বপ্ন! 


স্বপ্নভঙ্গ হল অচিরেই। নয়নের ঝরে গেল। 


এরপর মেঘনা নয়নকে খাটে চিৎ হয়ে শুতে বলল। মেঘনার গরম-ভেজা মুখের ভেতর আবারও সেই চরম সুখানুভুতি পেতে পেতে নয়ন বুঝতে পারল মাথাযন্ত্রণাটা বাড়ছে। 


নয়নের ওপর উঠে আদেশের সুরে ‘ফেলবে না, ধরে রাখ’ বলে মেঘনা ওপর-নিচ করতে করতে আবার শীৎকারে ডুবে গেল। 


জোরে জোরে ওঠানামা করতে করতে একটু বাদেই মেঘনা প্রবল শীৎকার দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাল্কা ঘামে ভেজা শরীরটা এলিয়ে দিল নয়নের বুকের ওপর। নয়নের বুকটাও তখন ভিজে গেছে ঘামে। 


মেঘনার ক্ষরণের অনুভুতি ছুঁয়ে গেল নয়নকেও। এই অভাবনীয় অভিজ্ঞতায় দারুন একটা তৃপ্তি হল তার। ও দুহাতে মেঘনাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকল। 


জামা-কাপড় পরতে পরতে মেঘনা বললঃ সামনের সপ্তাহে আমি আসব না। দিল্লি যাচ্ছি। জেএনইউতে একটা সেমিনার আছে। তারপর কলেজের পুরনো বন্ধুদের সাথে কয়েকদিন থেকে শনিবার রাতে ফিরব। তুমি শরীরের খেয়াল রেখ, কিন্তু। 

‘বেশ, সাবধানে যেও’ পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়ে নিতে নিতে নয়ন বলল। 


বিছানায় উঠে বসলেও তার মাথাটা তখন বেশ যন্ত্রণা করছে। ঠিক করল আজ আর পার্টি অফিসে যাবে না। রিহার্সালও দেখবে না। মেঘনা বেরিয়ে যেতেই সে আবার বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে ফেলল।


দশ 


এমআরআই করিয়ে বাড়ির সামনে এসে রিকশা থেকে নামার সময় নয়ন দেখল পিলু ঘোষ মাথা নিচু করে হেঁটে আসছে। মিহিরদাও ছিল সাথে। রিকশা থেকেই নয়নকে বললঃ পার্টি অফিসে যদি এসেছিস তো মার খাবি এবার। চুপচাপ ঘরে রেস্ট নে। বলেই আর দেরি করল না রিকশাওয়ালাকে বললঃ চল, আমায় পার্টি অফিসের সামনে নামিয়ে দেবে। তখন বেলা দশটা বেজে গেছে। পার্টি অফিস খুলতে হবে। ইচ্ছে করেই সক্কাল সক্কাল মিহিরদা অ্যাপয়েন্টমেন্টটা করেছিল। রোদে নয়নের মাথায় যদি আবার যন্ত্রণা শুরু হয়।


নয়ন আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। ওদিকে পিলু ঘোষও তাদের বাড়িটা ক্রশ করে চলে গেল। পিলু ঘোষকে দেখলেই নয়নের সেই পিউয়ের আত্মহত্যার কথা মনে পড়ে। পাড়ার মোড়ে পিলু ঘোষের একটা লটারির দোকান আছে। টেনেটুনে সংসার চলে। পিউ ছিল পিলু ঘোষের মেয়ে। তখন তার বয়স হবে সাতাশ-আটাশ। সুশ্রী-লম্বা। একটা কল সেন্টারে কাজও করত শুনেছিল নয়ন। কেন যে সে এই রাস্তা বেছে নিয়েছিল তা আজও অজ্ঞাত। মানে পাড়ার লোকেদের কাছে। পিউই ছিল বড়। আর একটা ছেলে আছে। পিলু ঘোষের বাড়িটা নয়নদের দুটো বাড়ির পরেই।


ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগের। প্রতিদিনের মতোই পার্টি অফিসের সামনেটায় চেয়ার পেতে বসে নয়ন ও অন্যান্য কমরেডরা আড্ডা দিচ্ছিল। কাউন্সিলর রথীন মিত্রও ছিল। সেবার বোর্ড তৃণমূল গড়লেও বেশ কয়েকটা ওয়ার্ডের মতো এই ওয়ার্ডটাও তারা ধরে রাখতে পেরেছিল।


সন্ধে সাতটা হবে। হঠ্যৎ পাশের বাড়ির শুভ ছুটতে ছুটতে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বললঃ নয়নদা, সজলদা শিগগিরি চল। পিউদি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে আর তারপরি চিৎকার করেছে। আর দরজা খুলছে না। কাকিমা, বিল্টু ডাকাডকি করছে কিন্তু তাও খুলছে না। শুনেই নয়ন ও অন্যান্যরা দৌড় লাগাল পিলু ঘোষের বাড়ি। 


নয়নরা পৌঁছে দেখল পিউয়ের খুড়তুতো দাদা ভেলু ‘পিউ, এই পিউ’ বলে ডাকতে ডাকতে প্রবল ধাক্কাধাক্কি করছে দরজায়। সামান্য অপেক্ষা করেই নয়ন আর ভেলু মিলে ধাক্কা দিয়ে দরজার ছিটকানি ভেঙে ফেলল। দরজা থেকে ঘরের ভেতর তাকিয়েই নয়ন হতভম্ব দাঁড়িয়ে গেল। ওড়নার ফাঁস দিয়ে খাটের ঠিক ওপরে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে পিউ। খাটের সামনে মেঝের ওপর একটা প্লাস্টিকের টুল উল্টে পড়ে আছে। ভেলুও হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপর দৌড়ে গিয়ে খাটে উঠে পড়ল। দেখাদেখি নয়নও। 


‘ওরে তুই এ কী করলি রে?’ বলে দরজা ধরে আর্তচিৎকার করে উঠল পিউয়ের মা। ওদিকে নয়ন দুহাতে পিউয়ের কোমরটা জাপ্টে ধরে তুলে রেখেছে তার নিষ্প্রাণ শরীরটা আর ভেলু প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ফাঁস খোলার। কিন্তু পারছে না। ‘শিগগির একটা ছুরি আন’ বলতেই বিল্টু ছুটে রান্নাঘরে চলে গেল ছুরি আনতে। ততক্ষণে পার্টি কমরেডরা, পাশের বাড়ির কেউ কেউ, পিউয়ের কাকিমা ইত্যাদি সবাই ঘরে ঢুকে পড়েছে। সুজয়ও এসে গেছে। খবর পেয়ে। ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকছে। অ্যাম্বুলেন্স ডাকাটা নেহাতই নিয়মরক্ষা আর এখনও হয়তো আশা আছে এমন ধরে নেওয়া। মিরাক্যল কি ঘটে না!


সত্যি বলতে কি নয়নের যে ঠিক কেমন অনুভুতি হচ্ছিল তা সে কোনোদিনই প্রকাশ করতে পারেনি। হয়তো পারবেও না। পরিণত বয়সে সেই প্রথম সে কোনো যুবতী শরীর এভাবে জড়িয়ে ধরেছিল অথচ সে শরীর মৃত! 


ছুরি দিয়ে ফাঁস কেটে পিউয়ের শরীরটা ভেলু আর নয়ন মিলে যখন বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছে তখনই নয়ন বুঝল পিউ আর নেই। মানে থাকতে পারে না। তার হাতে ধরা পিউয়ের ঘাড়। স্পাইনাল কর্ড ভেঙে গিয়ে লটপট করছে আর হিসুও বেরিয়ে গেছে পিউয়ের। পেটের নিচে ম্যাক্সির খানিকটা ভিজে গেছে। শেষ প্রেশারটা আর কি। 


পিউয়ের মা বিলাপ করে যাচ্ছিল একটানা। নয়নকে সামনে পেয়ে তার পাঞ্জাবিটা দুহাতে শক্ত করে ধরে 'ওরে নয়ন এ আমার কি হল রে!' বলে ডুকরে উঠতেই নয়ন মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে বললঃ কিচ্ছু হয়নি বৌদি, আমরা তো ঠিক সময় এসে পড়েছি, অ্যম্বুলেন্সও এসে গেছে, শান্ত হও একটু।


ততক্ষণে ধীরে-সুস্থে রথীন মিত্র ঘরে এসে ঢুকল। পরপরই তৃণমুলের পরাজিত প্রার্থী মলয় লাহিড়ি। অ্যম্বুলেন্স এসে গেছে। বিশ্বাস না করলেও এটা সত্যি যে পিউয়ের প্রায় ঠান্ডা হয়ে আসা শরীরটা যে চারজন ধরাধরি করে অ্যম্বুলেন্সে তুলল তারা হল রথীন মিত্র, মলয় লাহিড়ি, নয়ন আর সুজয়। যতটুকু নয়নের মনে পড়ে সেই প্রথম ও শেষবারের মতো তারা চারজন মিলে একইসাথে কোনো কাজ করেছিল।


অ্যম্বুলেন্স স্টার্ট দিতে না দিতেই পিলু ঘোষ এসে পৌঁছল। তাকে দেখে পিউয়ের মা আবার ডুকরে উঠে বললঃ ওগো, আমাদের পিউ গলায় দড়ি দিয়েছে গো! বলেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। 


নয়ন একটা কথা শুনেছিলঃ অল্প শোকে কাতর আর বেশি শোকে পাথর। সেইবার দেখল। পিলু ঘোষ একটাও কথা বলল না। বৌদি ছুটে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাকে খামছে ধরে বুকে মাথা রেখে বিলাপ করে যাচ্ছিল। আর সত্যি সত্যিই ঠিক পাথরের মতোই স্তির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পিলু। চোখে জল নেই কোনো। একবারের জন্য যে হাত তুলে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরবে তারও শক্তি ছিল না।  


অ্যম্বুলেন্সে করে পিউকে নিয়ে চলে যেতেই নয়ন আবার ওই ঘরে এসে ঢুকেছিল। তার নজরে পড়েছিল নিচু দেরাজের ওপর পেন চাপা দেওয়া একটা রুলটানা কাগজ। সে ওটা নিয়ে পিউয়ের কাকিমার হাতে দিল। যদি পুলিশ কেস হয় তখন লাগবে সেটা। ওটা আর কিছুই নয় পিউয়ের সুইসাইড নোট। ইংলিশে লেখা। নয়ন পুরোটা পড়েনি। চোখ বোলাতেই ‘আই কুইট’ লেখাটা দেখে নিয়েছিল। তবে যেটা নয়নের নজরে পড়েছিল তা হল পিউয়ের হাতের লেখা ঝকঝকে মুক্তোর মতো। শেষলেখাতেও দ্যুতি হারায়নি। 


নয়ন বাড়ি ঢুকেই সোজা বাথরুমে চলে গেল। ঠান্ডা জলে অনেক্ষণ ধরে স্নান করল। মাথাটা ব্যাথা না করলেও বমি বমি ভাবে আর চোখের সমস্যায় কাবু ছিল সে। এখুনি হয়তো আবার মাথা যন্ত্রণাও শুরু হবে! ঘরে গিয়ে বিছানায় বসল। নুপুরবৌদি এসে একটু দইয়ের ঘোল দিয়ে গেল। সেটা খেয়ে নিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। 


এগারো


আজ তিন-চারদিন হল নয়ন বিছানায় পড়ে আছে। তিন-চারদিনই হবে হয়তো। নয়ন পুরোপুরি ঠাওর করতে পারে না। যন্ত্রণায় মাথাটা তার ছিঁড়ে যাচ্ছে। এমআরআই করে ফেরার পর থেকে আর বাড়ি থেকে বেরোয়নি। মাঝে মাঝে জ্ঞান ফিরছে। একটুক্ষণ থেকেই আবার চলে যাচ্ছে। একটা ঘোর তন্দ্রার মধ্যে বেঁচে আছে যেন। প্রথম দু-তিনদিন কোনোমতে উঠে বাথরুম যেতে পারছিল। গতকাল থেকে তাও পারছে না। টিংকু ধরে নিয়ে গিয়ে কাল আর আজ পটি করিয়ে দিয়েছে। হিসুটা বিছানাতেই। প্রথমদিন দুপুরে ডিম-ভাত খেয়েছিল। বমি হয়ে গেল। তারপর ফ্যানাভাত তাও বমি হল। গত দু-তিনদিন দুধ-খই। আজ শুধু দুধ খেয়েছে একবার। নিজে খেতে পারছে না। মাথাই তুলতে পারছে না। নুপুরবৌদি খাইয়ে দিচ্ছে। কি যে হল!


মিহির আর টিংকু ওদিকে এমআরআই রিপোর্ট নিয়ে গিয়েছিল গগনডাক্তারের কাছে। ভালো করে দেখে জবাব দিয়ে দিয়েছে। ব্রেণ টিউমার। ফাইনাল স্টেজ। সে নাকি সেটাই সন্দেহ করেছিল। ‘দেখ, আমায় যদি জিজ্ঞেস কর তবে বলব, আর কিচ্ছু করার নেই। একেবারে একজ্যাক্ট তো বলা সম্ভব নয় তবে একমাসও থাকতে পারে, দুমাসও থাকতে পারে কি কিছু বেশিও হতে পারে। তবে ট্রিটমেন্টে আর কাজ হবে না। তাও, তোমরা একটা সেকেন্ড ওপিনিয়ন নিয়ে নাও।’ বলে গগনডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল।


ইশ! সামনেই বাই-ইলেকশন। আর তাকে ঠিক এখনই বিছানায় পড়তে হল! একবার দুবার বুঝেছিল যে কেউ কেউ তাকে দেখতে আসছে। রিংকু আর তার বর রবি এল। মিহিরদাতো এলই। রথীন মিত্রও যেন এল মনে হল। আর হ্যাঁ, সুপ্রিয়রা এল। ইশ! যদি মেঘনা থাকত এই সময়। কি সুন্দর করে ও মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল! সেই যেমন মা দিত। আর ওই যে শরীরিসুখ! ঘোরের মধ্যে পড়ে থাকতে থাকতে নয়নের এমনই সব মনে হত লাগল।


পার্টি অফিসের কথা, হারুদা-মিহিরদার সাথে প্রথম ভোটের কাজ করার দিনগুলোর কথা, এক্স এমএলএ কাঞ্চন সান্যালের সাথে আলাপ হওয়ার দিনটা, পুরনো পার্টি অফিসটার কথা, রেড ভলেন্টিয়ার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে করোনার দিনগুলোর লড়াইয়ের কথা এইসব আরও অনেককিছু ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে মনে পড়তে থাকল তার।


সেকেন্ড ওপিনিয়নও নেওয়া হল। টিংকুর এক কলিগের সুবাদে কলকাতার এক বড় ডাক্তারের থেকে। তবে বিশেষ কোনো হেরফের হল না। গগনডাক্তার ভুল বলেনি কিছু। একবার জ্ঞান ফিরে নয়ন যখন জিজ্ঞেস করেছিল রিপোর্টের কথা টিংকু তাকে মিথ্যা বলেছিলঃ ও তেমন কিছু নয়, ওষুধে আস্তে আস্তে সেরে যাবে। তুই ওসব নিয়ে ভাবিস না। চুপ করে ঘুমো এখন। 


মায়ের গলাটা পেল যেন, ওই তো মেঘনা এল মনে হয়, গেটে যেন শব্দ হল, মিহিরদা ডাকছে, না? ‘এই বিশু এটা কিভাবে লিখছিস? দে, তুলিটা আমায় দে, তুই ধর এগুলো’ সজল বিরক্ত হয়ে বলে উঠল যেন। নয়ন চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। নির্ঘুম এক ঘোর খালি। একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন তার পাশে বসে অপেক্ষা করছে আর প্রস্তুতি নিচ্ছে ঝাঁপিয়ে পড়ার। আর কতক্ষণ! 


মেঘনার সাথে সঙ্গমের তৃপ্তি, যার গাঢ়তার রেশ তখনও মেলায়নি আর আসন্ন বাই-ইলেকশনে কোনো কন্ট্রিবিউশন না রাখতে পারার চূড়ান্ত আক্ষেপ নিয়ে নয়ন জ্ঞান-অজ্ঞানের মাঝে পড়ে থাকল।


বারো


নয়ন মারা গেল। একদিন ভোরবেলা। শেষ এগারোটা দিন আর জ্ঞান ফেরেনি।


প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠে নয়নকে দেখতে এসে তার গায়ে হাত দিয়েই নুপুরের মনে হয়েছিল যে নয়ন বোধহয় আর নেই। টিংকু-তুলিকে ঘুম থেকে তুলে সে তা জানায়। তারপর গগনডাক্তার এসে পরীক্ষা করে ডেথ-সার্টিফিকেট দিয়ে গেল। 


শেষশয্যায় পরিচ্ছন্ন নয়ন বেশ নোংরা হয়ে গিয়েছিল। হিসু-পটি সে সবই বিছানায় করছিল। জ্যাঠার আয়াকে কিছু এক্সট্রা টাকা দিয়ে সারাদিনে একবারই পরিষ্কার করাতে পারছিল তার দাদা-বৌদি। আর গাটাই যা মুছিয়ে সে দিত একবার। মাঝে মধ্যে শেভিং। পায়জামাটা খুলে নেওয়া হয়েছিল প্রথমেই। দিন পাঁচেক পর গন্ধ বেরলে খুলে নেওয়া হয় পাঞ্জাবিটাও। যে নয়ন রোজ সাবান দিয়ে স্নান করত এই এতদিন স্নান না করে পড়েছিল। গায়ে চাপা দেওয়া চাদরটাই যা বদলে দেওয়া হত। 


খবর পেয়েই মিহির, বিশু আর সজলকে নিয়ে, ছুটে এল। একটু পরেই এল সুপ্রিয় আর অর্পিতা। রথীন মিত্র আর হারু এসে শেষদেখা দেখে গেল। ততক্ষণে রিংকু আর রবিও এসে পড়েছে। মেঘনা সুপ্রিয়কে বলেই রেখেছিল 'নয়নদা কেমন থাকে আমায় জানাস’। সব শেষে এল মেঘনা। উদভ্রান্তের মতো ছুটে এসে নয়নের ঘরে ঢুকে সবাইকে চমকে দিয়ে সে নয়নের মাথায়-বুকে-গালে হাত বোলাতে বোলাতে ডুকরে কেঁদে উঠল। তারপর কারও দিকে না তাকিয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। এই ঘরে সে আর থাকতে পারছিল না। তুলসীমঞ্চের সামনেটায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে উবের বুক করতে থাকল। সুপ্রিয় আর অর্পিতা তাকে দুপাশ থেকে স্বান্তনা দিচ্ছিল। 


কিছুক্ষণ থেকে সুপ্রিয় আর অর্পিতাও চলে গেল। মিহির-সজল-বিশু মিলে নয়নের গাটা ভিজে গামছা দিয়ে ভালো করে মুছিয়ে তারই কাচা-ধোয়া পাঞ্জাবি-পায়জামায় সাজিয়ে দিল তাকে। খাট সাজাল ফুলে। ধরাধরি করে নয়নের জানহীন শরীরটা যখন খাটে শোয়ানো হল তুলসিপাতা, চন্দন ইত্যাদি দিয়ে তখন যন্ত্রণায় সেটা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। হু-হু করে ওজন পড়ে গিয়ে অস্থিচর্মসার কুঁকড়ে আছে। তার ওপরেই পরম যত্নে তিন কমরেড মিলে বিছিয়ে দিল লাল রঙের একটা বড় কাপড়। তার মাঝখানে সাদা রঙে আঁকা কাস্তে-হাতুরি।


বেলা বাড়তে না বাড়তেই তার আশি বছরের পুরনো একতলার ঘর ছেড়ে শেষযত্রায় চলল নয়ন। নুপুর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে তাকে শেষবিদায় দিল। তুলি আর রিংকুও জলভরা চোখে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। শুধু তার বিরাশি বছরের শয্যশায়ী জ্যাঠা জানতে পারল না যে তার আদরের নয়ন চলে গেল।


টিংকুর মনে হতে থাকল সত্যিই! সারাজীবন তার এই ভাইটা নিজের জন্য কিচ্ছু চাইল না! শুধু প্রাণ ঢেলে পার্টি করে গেল! তার বাবা ডেকে চাকরি দিলেও সে ফিরিয়ে দিয়েছিল! দুবেলা দুমুঠো যে খেত তার জন্যও মাসখরচ দিত! একটা ঘরও নিজে থেকে ছেড়ে দিয়েছিল পরিবারের আয়ের কথা ভেবে! আর কি করবে! পায়জামা-পাঞ্জাবি-হাওয়াই পরেই কাটিয়ে দিল গোটা জীবন। ছিল বলতে খালি সস্তার হাতঘড়ি, বলপেন, খাতা-বই, ফুট থেকে কেনা চিরুনি আর অতি সাধারণ একটা সেলফোন। ওয়ালেটের বিলাসিতাও করেনি কখনও। জীবনটা ভোগ করে নয়, শুধুমাত্র কাটিয়ে চলে গেল ভাইটা তার।


কোনোদিন পার্টিক্লাশ না করা, সেভাবে মার্ক্স-লেনিন না-পড়া (বাংলা অনুবাদে সামান্য ছাড়া) কিন্তু বহু যুদ্ধের ঘাম-রক্তঝরা সৈনিক, পার্টির চিরঅনুগত ও একনিষ্ঠ হোল-টাইমার নয়ন তার শেষযাত্রায় মাত্র তিনজন কমরেডকে পেল। সাথে চলল রবি আর টিংকু। ঘাটকাজ তো টিংকুই করবে।


টেম্পোটা স্টার্ট দিতেই মিহির চোখ মুছে শুন্যে হাত ছুঁড়ে চিৎকার করে উঠলঃ কমরেড নয়ন রায় অমর রহে।

বিশু-সজলের সাথে আজ, কেন জানে না, কোরাসে রবি-টিংকুও বলে উঠলঃ অমর রহে, অমর রহে।


বিছানায় পড়ার আগে পর্যন্ত তার ছিপছিপে-লম্বা শরীরটা টানটান রেখে মাথা উঁচু করে বেঁচে গেল কমরেড নয়ন। আজীবন দৃপ্ত ও লড়াকু নয়ন। যাকে লোভ কিংবা ভোগ কোনোটাই কোনোদিন স্পর্শ করার হিম্মত করেনি!


টেম্পো চলতে থাকল…

মিহির-সজল-বিশু গণসংগীত গাইতে শুরু করল…


No comments:

Post a Comment